মশারির নিচে নিরাপদ ঘুম : স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন।

ভূমিকা

রাতের ঘুম মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোর একটি। কিন্তু অনেক সময় সেই শান্ত ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত বিরক্তিকর প্রাণী – মশা। শুধু বিরক্তিই নয়, মশা বহন করে নানা ভয়ঙ্কর রোগ – যেমন ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, জিকা ভাইরাস প্রভৃতি। এ অবস্থায় ঘুমের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে মশারি। আধুনিক নানা প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকলেও মশারির ব্যবহার এখনো প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রবন্ধে আমরা মশারি ব্যবহারের উপকারিতা, তার স্বাস্থ্যগত দিক, পরিবেশবান্ধব দিক, গ্রামীণ ও শহুরে সমাজে তার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব এবং আধুনিক জীবনে তার টিকে থাকার কারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।


১. মশারির ইতিহাস ও বিবর্তন

মশারির ব্যবহার হাজার বছরের পুরনো। মিশরীয় সভ্যতায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতে ও উপমহাদেশে মশারির প্রচলন বহুদিনের। মূলত হাতে বোনা সুতি কাপড় বা নেট ব্যবহার করে মশারি তৈরি হতো। ১৯শতকের শেষ দিকে যখন ম্যালেরিয়া একটি মহামারি রূপে দেখা দেয়, তখন মশারি ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ে। ব্রিটিশরা সেনা ছাউনিতে মশারির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছিল।

আজকের দিনে নানা ধরনের উন্নত প্রযুক্তির মশারি পাওয়া যায় – যেমন কীটনাশকযুক্ত মশারি, পোর্টেবল মশারি, উইন্ডো বা দরজার স্ক্রিন ইত্যাদি। কিন্তু মৌলিক নকশা ও ধারণা একিই রয়ে গেছে – একটি পর্দার নিচে ঘুমিয়ে নিজেকে মশা থেকে রক্ষা করা।


২. স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

(ক) রোগ প্রতিরোধে সহায়ক

মশারি ব্যবহারের প্রধান গুণ হলো এটি মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে সহায়ক:

  • ডেঙ্গু প্রতিরোধে: এডিস মশা সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ালেও, রাতে মশারি ব্যবহার ঘরের মশার সংখ্যা কমিয়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমায়।
  • ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে: প্লাসমোডিয়াম পরজীবী বহনকারী অ্যানোফিলিস মশা রাতে কামড়ায়। তাই রাতে মশারি ব্যবহারে এর সংক্রমণ রোধ হয়।
  • চিকুনগুনিয়া ও জিকার ঝুঁকি হ্রাসে: মশারির সুরক্ষা রাতে ঘুমের সময় এই রোগগুলো থেকেও সুরক্ষা দেয়।

(খ) শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য উপকারী

শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। গর্ভাবস্থায় ম্যালেরিয়া বা ডেঙ্গু মারাত্মক হতে পারে। এই কারণে মশারির ব্যবহার তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


৩. পরিবেশবান্ধব পন্থা

(ক) রাসায়নিক মুক্ত সুরক্ষা

মশা তাড়াতে আমরা প্রায়ই কয়েল, লিকুইড রিপেলেন্ট, স্প্রে ইত্যাদি ব্যবহার করি। এইসব উপাদানে থাকে নানা ধরনের ক্ষতিকারক রাসায়নিক, যা:

  • শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • ঘরের বাতাস দূষিত করে।

মশারি ব্যবহারে এইসব ঝুঁকি নেই। এটি একটি প্রাকৃতিক এবং নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

(খ) টেকসই ও অর্থনৈতিক দিক

একটি ভালো মানের মশারি বছরের পর বছর ব্যবহার করা যায়। একবার বিনিয়োগ করলেই বহু বছর ধরে সুরক্ষা পাওয়া যায়। এতে বারবার নতুন উপাদান কেনার প্রয়োজন হয় না।


৪. আরামদায়ক ও মানসিক প্রশান্তির ঘুম

মশার কামড় শুধু যন্ত্রণার বিষয় নয়, এটি মানসিক চাপও তৈরি করে। একজন মানুষ যখন মশার কামড়ে বারবার ঘুম থেকে উঠে পড়েন, তখন তার ঘুমের চক্র ভেঙে যায়, ফলে:

  • দিনভর ক্লান্তি আসে
  • কাজের গতি কমে
  • মেজাজ খারাপ হয়

মশারি ব্যবহারে এই সমস্যাগুলো দূর হয়। এটি শুধু শারীরিক সুরক্ষা নয়, মানসিক শান্তিও নিশ্চিত করে।


৫. গ্রামীণ জীবন ও মশারি

গ্রামীণ এলাকায় আজও অনেক ঘরবাড়িতে মশার প্রতিরোধ ব্যবস্থা সীমিত। সেখানে মশারির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে জলাভূমি বা ধানক্ষেতের কাছাকাছি বসবাসকারীরা মশার প্রকোপে বেশি ভোগে। তাদের কাছে এটি একটি জরুরি রক্ষাকবচ।

অনেক সময় গ্রামীণ নারীরা নিজের হাতে মশারি সেলাই করে থাকেন। এটি একটি উপার্জনের পথ হিসেবেও বিবেচিত। বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠী মশারি তৈরি করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন।


৬. শহুরে জীবনে আধুনিক মশারি

বর্তমানে শহরের মানুষ নানা রকম আধুনিক সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও মশার উপদ্রব থেকে মুক্ত নয়। শহরের ড্রেন, আবর্জনা, নির্মাণাধীন ফাঁকা ভবন – এসব স্থানে মশার জন্ম হয়। ফলে নিচের ধরণের মশারি এখন জনপ্রিয়:

  • বেড-ক্যানোপি মশারি: বিশেষ করে বাচ্চার বিছানায়।
  • মশার স্ক্রিন জানালায়: দিনের বেলায় ঘরে মশা ঢোকা বন্ধ করে।
  • পোর্টেবল টেন্ট মশারি: ভ্রমণ বা ক্যাম্পিংয়ের জন্য সহজে বহনযোগ্য।

৭. মশারি ও সংস্কৃতি

মশারি শুধু একটি সুরক্ষার উপায় নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলা সাহিত্যে, কবিতায় এমনকি সিনেমায় পর্যন্ত মশারির উল্লেখ রয়েছে। শিশুর ঘুমের সময় মা হাতে করে মশারি টাঙিয়ে দিচ্ছেন – এ এক অনন্য চিত্র।

বাঙালি পরিবারের অনেকেরই স্মৃতিতে আছে, কাঠের খাটে চারদিক থেকে টাঙানো মশারির ভিতরে পরিবারের সদস্যদের ঘুমানোর দৃশ্য। এটি যেন এক নিরাপদ, আপন ঘর।


৮. সরকারের ভূমিকা ও প্রচার

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ভারত সরকার বহু বছর ধরেই কীটনাশকযুক্ত মশারি বিতরণের কর্মসূচি চালু রেখেছে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও ম্যালেরিয়া প্রবণ অঞ্চলে।

  • সরকার শিশু, গর্ভবতী মহিলা ও বৃদ্ধদের মাঝে বিনামূল্যে মশারি বিতরণ করছে।
  • বিভিন্ন NGO ও স্বাস্থ্যকর্মী ঘরে ঘরে গিয়ে মশারি ব্যবহারের প্রচার করছেন।

৯. কিছু ভুল ধারণা ও সতর্কতা

অনেকেই মনে করেন, মশারি suffocation বা অক্সিজেনের অভাব ঘটাতে পারে। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। মশারির কাপড় এমনভাবে তৈরি যাতে হাওয়া চলাচল ঠিক থাকে, কিন্তু মশা প্রবেশ করতে না পারে।

তবে কিছু সতর্কতা মানা জরুরি:

  • ব্যবহারের আগে দেখে নিন ছেঁড়া বা ফুটো হয়েছে কিনা
  • নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত
  • মাটিতে না ছোঁয়ানো অবস্থায় ঝুলিয়ে রাখতে হবে
  • বাচ্চাদের মশারিতে জট না লাগাতে সতর্ক থাকতে হবে

১০. উপসংহার

বর্তমান যুগে প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক না কেন, কিছু প্রাকৃতিক ও কার্যকর পদ্ধতি চিরকাল প্রাসঙ্গিক থেকে যায়। মশারি তারই একটি উদাহরণ। এটি শুধু একটি কাপড় নয় – এটি আমাদের স্বাস্থ্য, ঘুম ও মানসিক প্রশান্তির রক্ষাকবচ।

পরিবেশবান্ধব, খরচ সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ – মশারি এক আধুনিক, প্রাচীন, সর্বজনীন সুরক্ষা। তাই যেখানেই থাকুন না কেন, রাতে মশারির নিচে নিশ্চিন্তে ঘুমোনোই বুদ্ধিমানের কাজ।

তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ভারতীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক, UNICEF, জনপ্রিয় স্বাস্থ্য সাময়িকী, বাংলা সাহিত্য ও স্মৃতিচারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *