তামাক নয়, বাঁচার অধিকার বেছে নিন: স্বাস্থ্যের শত্রু তামাকের বিরুদ্ধে একটি তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধ।


ভূমিকা:

আজকের পৃথিবীতে যেসব অভ্যাস আমাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার মধ্যে তামাক সেবন অন্যতম। ধূমপান, গুটখা, জর্দা, পান মিশ্রিত তামাক কিংবা বিড়ি—সবকিছুতেই তামাকের উপস্থিতি ও প্রভাব সুস্পষ্ট। বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং স্বাস্থ্য সচেতনতায় উত্তরণের যুগেও তামাক সেবন একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা তামাক সেবনের ভয়ঙ্কর প্রভাব, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি, আর্থসামাজিক প্রভাব এবং এই অভ্যাস থেকে মুক্তির পথ নিয়ে আলোচনা করব।


তামাক কি?

তামাক (Nicotine tabacum) একটি উদ্ভিদ, যার পাতায় নিকোটিন নামক আসক্তিকর রাসায়নিক পদার্থ থাকে। প্রাথমিকভাবে আমেরিকার স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যবহৃত হলেও ঔপনিবেশিক যুগে এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ধূমপান, চিবানো এবং সেবনযোগ্য বিভিন্ন পণ্যের মাধ্যমে এর ব্যবহার হয়।


তামাক সেবনের বিভিন্ন রূপ:

  1. ধূমপান: সিগারেট, বিড়ি, সিগার, হুক্কা।
  2. চিবানো তামাক: গুটখা, জর্দা, খৈনি, পান মিশ্রিত তামাক।
  3. ধোঁয়াহীন তামাক: স্নাফ, ইনহেলেবল পাউডার বা পাতলা তামাক।
  4. ই-সিগারেট: আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রস্তুত ধোঁয়া-উৎপন্নকারী যন্ত্র।

তামাক সেবনের শারীরিক ক্ষতি:

১. ক্যান্সারের ঝুঁকি:

  • ফুসফুস, মুখ, গলা, খাদ্যনালী, পাকস্থলী, কোলন, যকৃত প্রভৃতি অঙ্গের ক্যান্সার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা।
  • মুখের ঘা, সাদা দাগ (লিউকোপ্লাকিয়া) থেকে শুরু করে তা ক্যান্সারে পরিণত হতে পারে।

২. হৃদরোগ ও রক্তচাপ:

  • নিকোটিন রক্তনালিকে সংকুচিত করে, ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

৩. শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা:

  • ক্রনিক ব্রংকাইটিস, অ্যাজমা ও এমফিসিমার মত রোগ হতে পারে।
  • দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস বিকল হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা।

৪. পাচনতন্ত্রের সমস্যা:

  • পাকস্থলীতে আলসার, অ্যাসিডিটি, কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি।

৫. দাঁত ও মুখের ক্ষয়:

  • দাঁতের হলদেটে ভাব, দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির রোগ, মুখে দুর্গন্ধ।

৬. গর্ভবতী নারীর স্বাস্থ্যহানি:

  • অপরিণত শিশু জন্ম, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, মৃত সন্তানের জন্ম।

মানসিক ও আসক্তির দিক:

  • নিকোটিন আসক্তি অত্যন্ত প্রবল। একবার অভ্যাস গড়ে উঠলে তা ছাড়তে অনেক কষ্ট হয়।
  • তামাক সেবনে মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যা সাময়িক আনন্দ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।

পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক ক্ষতি:

  • ধূমপানের ধোঁয়া আশেপাশের মানুষদের প্যাসিভ স্মোকার করে তোলে। এতে শিশুরা ও বৃদ্ধরা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হন।
  • বাড়িতে, অফিসে বা গণপরিবহনে ধূমপান করলে অন্যদেরও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।
  • স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তামাক সেবন শুরু করলে তারা দ্রুত মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

আর্থিক ক্ষতির দিক:

  • একজন তামাকসেবীর মাসিক ও বার্ষিক খরচ উল্লেখযোগ্য। গরীব মানুষদের একটি বড় অংশ খাওয়া ও চিকিৎসা বাদ দিয়ে তামাকে টাকা খরচ করে।
  • সরকারের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ক্যান্সার ও হৃদরোগজনিত ব্যয় বেড়ে যায়।

তামাক সেবন ও শিশু-কিশোর:

  • বিজ্ঞাপন, সিনেমা, ও বন্ধুদের মাধ্যমে শিশুরা তামাকের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
  • কিশোর বয়সে নেশার অভ্যাস শুরু হলে, তা জীবনভর টেনে নিয়ে যায়।

আইনগত দিক:

  • ভারতের COTPA আইন ২০০৩ অনুযায়ী, সর্বসাধারণের স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ।
  • তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ।
  • প্যাকেটে সচিত্র সতর্কীকরণ বাধ্যতামূলক।
  • স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের ১০০ মিটার এলাকার মধ্যে বিক্রি নিষিদ্ধ।

তামাক বর্জনের উপায়:

১. মানসিক প্রস্তুতি:

  • তামাক ত্যাগের জন্য দৃঢ় সংকল্প তৈরি করতে হবে।

২. নিয়মিত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং:

  • অনেক হাসপাতালে তামাক বিরোধী ক্লিনিক রয়েছে, যেখানে চিকিৎসক ও পরামর্শদাতারা সাহায্য করেন।

৩. নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (NRT):

  • চিকিৎসক পরামর্শে নিকোটিন গাম, লজেঞ্জ বা প্যাচ ব্যবহার করা যেতে পারে।

৪. যোগ ও মেডিটেশন:

  • মানসিক শক্তি বাড়াতে নিয়মিত যোগ ও ধ্যান খুবই কার্যকর।

৫. পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তা:

  • পরিবারের উৎসাহ, বন্ধুবান্ধবের সহানুভূতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সচেতনতা ও প্রচার:

  • ৩১ মে বিশ্ব তামাক বিরোধী দিবস হিসেবে পালিত হয়।
  • স্কুল, কলেজ, অফিস ও গ্রামে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করতে হবে।
  • মিডিয়ায় তামাকবিরোধী প্রচার আরও জোরদার হওয়া উচিত।

উপসংহার:

তামাক সেবন একটি মারাত্মক অভ্যাস যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক ও জাতীয় দিক থেকেও ক্ষতিকর। এটি শুধু ক্যান্সার বা হৃদরোগই নয়, ধীরে ধীরে সমাজের উৎপাদনশীল অংশকে দুর্বল করে দেয়। আমরা যদি আজই তামাক বর্জনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নির্মল ও স্বাস্থ্যবান সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। মনে রাখতে হবে—তামাক নয়, জীবন বেছে নিন।


তথ্যসূত্র:

  • WHO – Tobacco Fact Sheets
  • ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
  • COTPA Act 2003
  • ICMR গবেষণা তথ্য
  • বিভিন্ন মেডিকেল জার্নাল

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *