রাস্তা নেই, পুকুরই ভরসা! প্রাণ হাতে নিয়ে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে যাচ্ছে ১২৭ শিশু।

বালুরঘাট, নিজস্ব সংবাদদাতা: ——রাস্তা নেই, পুকুরই ভরসা। আর সেই পুকুরের বুক চিরে, জলে ভিজে, পিছলে পড়ার ভয় মাথায় নিয়েই চলছে পড়াশোনার টানাটানি। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার গঙ্গারামপুরের হাপনিয়া এলাকায় ২২৮ নম্বর অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের বাস্তব চিত্র যেন চোখ কপালে তোলার মতো! একশোরও বেশি শিশু আর প্রসূতি মায়েদের জন্য গড়ে ওঠা এই শিশু বিকাশ কেন্দ্র এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।

অঙ্গনওয়াড়ি মানেই শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, পুষ্টির কেন্দ্র, ভবিষ্যতের ভিত। অথচ হাপনিয়ার সুসংহত শিশু বিকাশ কেন্দ্রটিতে পৌঁছনোই দুঃসাহসের কাজ। কোনো রাস্তা নেই, পায়ের তলায় কাদা-পিচ্ছিল। ফলে কেন্দ্রের একমাত্র দিদিমনি মনোয়ারা বিবি থেকে শুরু করে খুদে পড়ুয়ারা—সবাইকে প্রতিদিন জলে নেমে পার হতে হয় পুকুর। একটু অসাবধান হলেই ভিজে যাচ্ছে জামাকাপড়, আর বড় ভয়—ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি।

বিগত করোনাকালে কেন্দ্রটির হেল্পার মারা যাওয়ায় একাই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন দিদিমনি মনোয়ারা বিবি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একাই গোটা সেন্টারের কাজ সামলাতে হচ্ছে। কিন্তু এখানে আসা মানেই প্রাণ হাতে নিয়ে আসা। শিশুদের তো বাঁচানোই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আমি অনেক সময় অভিভাবকদের বলি, নিজেরাই নিয়ে আসুন।”

প্রায় ১২৭ জন শিশু এবং ৯ জন প্রসূতি মা এই কেন্দ্রের আওতায় থাকলেও, রাস্তা না থাকার জেরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে সমস্ত পরিষেবা। স্থানীয় বাসিন্দা পারুল বিবি এবং আতিউর রহমানরা বলেন, “পুকুর ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই। বহুবার প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু সুরাহা হয়নি। দুই বছর আগে একটি দোকানঘর গড়ে ওঠার পরই বন্ধ হয়ে গিয়েছে একমাত্র চলার রাস্তা। তার পর থেকে দুর্ভোগ চরমে।”

এই পরিস্থিতি ঘিরে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ জমেছে। অভিভাবকদের দাবি, খুদে সন্তানদের জীবন নিয়ে প্রতিদিন এমন বাজি খেলা মেনে নেওয়া যায় না। তাদের আরো অভিযোগ, বারবার পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে ব্লক প্রশাসনের দোরগোড়ায় গিয়েও মিলছে না কোনো সুরাহা। ফলে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের প্রশ্ন, “শিশুদের জন্য তৈরি এই প্রকল্প যদি তাদের জীবনকেই বিপন্ন করে তোলে, তবে এমন কেন্দ্র চালিয়ে লাভটা কোথায়?”

অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য শিশু ও মাতৃসুরক্ষা। অথচ হাপনিয়ার এই কেন্দ্র যেন দুর্ঘটনার প্রহর গুনছে। গ্রামবাসীদের প্রশ্ন—কোনো শিশু যদি অকালে প্রাণ হারায়, তার দায় নেবে কে? প্রশাসন? নাকি উদাসীনতার আড়ালে লুকোনো সেই নীরব ব্যবস্থা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *