কলকাতার বারোয়ারি ও ক্লাব পুজো : জনগণের উৎসব, থিমের মহোৎসব।

ভূমিকা

কলকাতার দুর্গা পুজো আজ বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে। UNESCO এই উৎসবকে “Intangible Cultural Heritage of Humanity” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর অন্যতম কারণ হল শহরের বারোয়ারি ও ক্লাব পুজো—যা একসময় জমিদার ও বনেদি বাড়ির আঙিনার বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে দুর্গা পুজোকে পৌঁছে দিয়েছিল। আজ এগুলিই শহরের প্রধান আকর্ষণ, যেখানে শিল্পকলা, থিম, সামাজিক বার্তা এবং জনসম্পৃক্ততা একসঙ্গে মিলেমিশে এক মহোৎসবে পরিণত হয়।


বারোয়ারি পুজোর জন্ম

“বারোয়ারি” শব্দটি এসেছে “বারো” (বারোজন) + “ইয়ার” (বন্ধু) থেকে।

  • প্রথম সূচনা: ১৭৯০ সালে উত্তর কলকাতার গঙ্গারাম মিত্রের নেতৃত্বে প্রথম সার্বজনীন দুর্গা পুজোর আয়োজন হয়।
  • জনসাধারণের অংশগ্রহণ: জমিদার বাড়ির আমন্ত্রণনির্ভর পুজোর বদলে এখানে সবাইকে স্বাগত জানানো হত।
  • উদ্দেশ্য: সমাজের সব স্তরের মানুষ যাতে একসঙ্গে দেবী দর্শন করতে পারে, সেই ভাবনা থেকেই বারোয়ারি পুজোর জন্ম।

ক্লাব পুজোর উত্থান

বিশ শতকের গোড়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন যুবক সমিতি ও ক্লাব।

  • স্বদেশি যুগের ভূমিকা: ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় ক্লাবগুলি পুজোর আয়োজনের মাধ্যমে মানুষকে একত্রিত করত।
  • পরবর্তী সময়ে: এই পুজোগুলি হয়ে ওঠে পাড়ার গর্ব, যেখানে স্থানীয় মানুষ একসঙ্গে অর্থসংগ্রহ থেকে শুরু করে সাজসজ্জা পর্যন্ত সবকিছু করেন।

কলকাতার বিখ্যাত বারোয়ারি ও ক্লাব পুজো

১. বাগবাজার সার্বজনীন

  • প্রতিষ্ঠা: ১৯১৮
  • বিশেষত্ব: একচালা ঠাকুর, ঐতিহ্যবাহী সাজ, ভক্তিমূলক আবহ।
  • বিশেষ আকর্ষণ: ভিড় নিয়ন্ত্রণের সুব্যবস্থা ও ক্লাসিক পরিবেশ।

২. কুমোরটুলি সার্বজনীন

  • বিশেষত্ব: শিল্পীদের পাড়ায় হওয়া এই পুজোতে প্রতিমার নান্দনিকতা অনন্য।
  • থিম: প্রায়ই কলকাতার শিল্প ও হস্তশিল্পকে তুলে ধরা হয়।

৩. কলেজ স্কোয়ার

  • বিশেষত্ব: লেকের ধারে প্রতিফলিত প্রতিমা—যা দর্শকদের জন্য এক অসাধারণ দৃশ্য।

৪. দেশপ্রিয় পার্ক

  • বিশ্বরেকর্ড: বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্গা প্রতিমা তৈরি করে খ্যাতি পেয়েছে।
  • থিম: সামাজিক বার্তা ও বিশাল আকারের মণ্ডপই এর বৈশিষ্ট্য।

৫. সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার

  • বিশেষত্ব: বিদেশি থিম ও রাজপ্রাসাদের মতো মণ্ডপ বানানোর জন্য জনপ্রিয়।

৬. সুরুচি সংঘ

  • বিশেষত্ব: আন্তর্জাতিক থিম, সামাজিক বার্তা এবং অনন্য লাইটিং।

থিম পুজোর উত্থান

১৯৯০-এর দশক থেকে কলকাতার ক্লাব পুজোয় থিমের বিপ্লব ঘটে।

  • মণ্ডপ সজ্জা: কখনো রাজস্থানি হাওয়া মহল, কখনো গ্রামবাংলার ঝুপড়ি, কখনো মিশরের পিরামিড—সবই দেখা যায়।
  • প্রতিমার রূপ: প্রথাগত একচালা থেকে বেরিয়ে আসা প্রতিমা, কখনো আধুনিক, কখনো বিমূর্ত শিল্পকর্ম।
  • সামাজিক বার্তা: মণ্ডপে তুলে ধরা হয় নারী সুরক্ষা, শিক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, শিশু অধিকার ইত্যাদি।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

  • অর্থনৈতিক দিক: এই পুজো ঘিরে হাজারো শিল্পী, লাইট ডিজাইনার, কারিগর, ঢাকিদের রোজগার হয়।
  • সাংস্কৃতিক দিক: পাড়ার মানুষ একত্রিত হন, অনুষ্ঠান, নাচ-গান, ধুনুচি নাচ প্রতিযোগিতা হয়।
  • পর্যটন: দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ পর্যটক কলকাতার থিম পুজো দেখতে আসেন।

চ্যালেঞ্জ

  • ভিড় নিয়ন্ত্রণ: জনপ্রিয় পুজোয় মানুষের ঢল নামায় নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ।
  • অর্থসংগ্রহ: বিশাল বাজেট সামলাতে অনেক সময় কর্পোরেট স্পনসরশিপের ওপর নির্ভর করতে হয়।
  • প্রতিযোগিতা: প্রতিবার নতুন কিছু করার চাপ থাকে।

উপসংহার

কলকাতার বারোয়ারি ও ক্লাব পুজো আজ শহরের প্রাণস্পন্দন। এটি কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং সমাজের মিলনমেলা, শিল্পকলার প্রদর্শনী এবং এক বিশাল সাংস্কৃতিক কার্নিভাল। বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য যেখানে অতীতের স্মৃতি ধরে রেখেছে, ক্লাব পুজো সেখানে বর্তমানের সৃজনশীলতা আর ভবিষ্যতের দিশা দেখাচ্ছে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *