কলকাতার থিম পুজো : সৃজনশীলতার রঙে রঙিন দুর্গোৎসব।

ভূমিকা

কলকাতার দুর্গা পুজো একসময় ছিল সম্পূর্ণ ধর্মীয় আচারকেন্দ্রিক। কিন্তু বিগত কয়েক দশকে এই উৎসব শিল্পকলা, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক বার্তার এক অভূতপূর্ব মিশ্রণে পরিণত হয়েছে। এর বড় উদাহরণ হল থিম পুজো—যা আজ কলকাতার দুর্গা পুজোর প্রধান আকর্ষণ। প্রতি বছর কয়েকশো ক্লাব ও সংগঠন প্রতিযোগিতায় নামে—কে সবচেয়ে অভিনব থিম তৈরি করতে পারে, কে দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করতে পারে।


থিম পুজোর সূচনা

কলকাতায় থিম পুজোর শুরু ১৯৯০-এর দশকে।

  • প্রথম উদ্যোগ: বিখ্যাত পুজো কমিটি শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব, দেশপ্রিয় পার্ক, সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার ইত্যাদি প্রথম দিকের থিম পুজোর পথিকৃৎ।
  • উদ্দেশ্য: নতুনত্ব আনা, দর্শকদের মণ্ডপে টানা, এবং সমাজের জন্য কিছু বার্তা দেওয়া।

থিম পুজোর ধরন

১. স্থাপত্য-ভিত্তিক থিম

মণ্ডপকে বানানো হয় বিশ্বের বিখ্যাত স্থাপত্যের আদলে—

  • মিশরের পিরামিড
  • রাশিয়ার ক্রেমলিন
  • রাজস্থানের হাওয়া মহল
  • দক্ষিণ ভারতের মন্দির স্থাপত্য

২. সামাজিক বার্তা-ভিত্তিক থিম

  • নারী সুরক্ষা
  • শিক্ষা সচেতনতা
  • প্লাস্টিক মুক্ত পরিবেশ
  • গ্রামীণ জীবনযাত্রা

৩. শিল্প ও সংস্কৃতি-ভিত্তিক থিম

  • বাউল গান, লোকশিল্প, পটচিত্র
  • রবীন্দ্রনাথের কাব্য
  • বাংলার ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প

থিম পুজোর বড় নাম

শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব

  • খ্যাতি: বিপুল বাজেট, বিশাল মণ্ডপ, সেলিব্রিটি উদ্বোধন।
  • থিম উদাহরণ: পদ্মাবত প্রাসাদ, টাইটানিক জাহাজ, রাম মন্দির।

দেশপ্রিয় পার্ক

  • খ্যাতি: বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুর্গা প্রতিমা।
  • থিম উদাহরণ: রাজপ্রাসাদ, বিশাল আলোকসজ্জা।

সন্তোষ মিত্র স্কোয়ার

  • খ্যাতি: বিদেশি রাজপ্রাসাদ বা বিখ্যাত স্থাপত্যের মণ্ডপ।

সুরুচি সংঘ

  • খ্যাতি: সামাজিক বার্তাধর্মী থিম, পরিবেশবান্ধব মণ্ডপ।

একডালিয়া এভারগ্রিন

  • খ্যাতি: ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা, কিন্তু মণ্ডপে অভিনব স্থাপত্য।

থিম পুজোর অর্থনীতি

থিম পুজো আজ এক বিশাল অর্থনৈতিক শিল্প

  • বাজেট প্রায় কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছে যায়।
  • হাজার হাজার শিল্পী, কারিগর, আলোকশিল্পী, কাঠমিস্ত্রি, পেইন্টার কাজ করেন মাসের পর মাস।
  • দুর্গা পুজোতে পর্যটক টেনে আনে দেশ-বিদেশ থেকে, যা শহরের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে।

সাংস্কৃতিক প্রভাব

  • কলকাতার দুর্গা পুজো একপ্রকার ওপেন-এয়ার আর্ট গ্যালারিতে পরিণত হয়েছে।
  • শিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতা সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারেন।
  • থিম পুজোর কারণে পাড়ার মানুষদের অংশগ্রহণও বেড়েছে।

চ্যালেঞ্জ

  • অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা: কখনো কখনো মৌলিকতার অভাব দেখা যায়।
  • অর্থসংগ্রহের সমস্যা: বড় বাজেট সামলাতে কর্পোরেট স্পনসরশিপ দরকার।
  • ভিড় নিয়ন্ত্রণ: লাখ লাখ দর্শনার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বড় দায়িত্ব।

উপসংহার

কলকাতার থিম পুজো আজ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এক বিশাল সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এটি শিল্প, স্থাপত্য, সমাজচেতনা ও প্রযুক্তির এক অসাধারণ মেলবন্ধন। বাঙালির সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তির সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী বলা চলে। ভবিষ্যতে প্রযুক্তি, আলোকসজ্জা ও থিমের মাধ্যমে এই পুজো আরও বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *