ওড়িশার পুরী ভ্রমণ – জগন্নাথদেবের অধিষ্ঠান ভূমি (ভক্তি, ইতিহাস ও সমুদ্রের মিলনক্ষেত্র)।

গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতীর মতোই ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক মানচিত্রে এক অনন্য নাম পুরী। এই শহরটি শুধু একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি এক চিরন্তন বিশ্বাসের প্রতীক — ভগবান জগন্নাথের পবিত্র অধিষ্ঠান ভূমি। ওড়িশা রাজ্যের সমুদ্রতটে অবস্থিত এই শহর প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত ও পর্যটকের আগমন ঘটায়, যারা আসেন ঈশ্বরের দর্শন, ভক্তির অনুভব এবং প্রকৃতির শান্তিতে নিজেকে নিমজ্জিত করতে।


ইতিহাস ও তাৎপর্য

পুরীর নাম ইতিহাসে অমর কারণ এখানেই অবস্থিত শ্রী জগন্নাথ মন্দির, যা ভারতীয় চারধামের (দ্বারকা, বদ্রিনাথ, রামেশ্বরম, পুরী) মধ্যে একটি।
এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন গঙ্গা বংশের রাজা অনন্তবর্মন চোড়গঙ্গ দেব দ্বাদশ শতকে।
ভগবান জগন্নাথ (অর্থাৎ বিশ্বনাথ), তাঁর ভ্রাতা বলভদ্র ও বোন সুভদ্রা—এই তিন দেবতার পূজা এখানে অনুষ্ঠিত হয়।

জগন্নাথদেবকে বলা হয় “বিশ্বরূপ বিষ্ণু”, যিনি সকল জাতি ও ধর্মের ঊর্ধ্বে। তাঁর মূর্তি কাঠের তৈরি, যা প্রতি ১২ বছরে একবার নবকাঠের মাধ্যমে নবীকরণ করা হয়—এটি “নবকলেবর উৎসব” নামে পরিচিত, যা সারা বিশ্বের ভক্তদের আকর্ষণ করে।


জগন্নাথ মন্দিরের স্থাপত্য

পুরীর শ্রী জগন্নাথ মন্দির ভারতের অন্যতম গম্ভীর ও বিশাল মন্দির। ২১৪ ফুট উঁচু এই মন্দিরের গম্বুজের ওপরে উড়ে এক বিশাল পতাকা — নীলচক্র ধ্বজা, যা প্রতিদিনই পরিবর্তিত হয়, কিন্তু কখনোই থামে না।
মন্দিরের স্থাপত্যে কলিঙ্গ স্টাইল অনুসৃত হয়েছে—দৃঢ় পাথরের প্রাচীর, সূক্ষ্ম খোদাই ও বিশাল প্রাঙ্গণ এই মন্দিরকে করে তুলেছে শিল্প ও ভক্তির মিলনক্ষেত্র।
এখানকার ‘সিংহদ্বার’ বা প্রধান প্রবেশদ্বারে পাথরের সিংহ রক্ষী আছে, আর তার পাশেই রয়েছে সুবিখ্যাত অন্নভোগ ভাণ্ডার, যেখানে প্রতিদিন ভগবানের জন্য ৫৬ প্রকার ভোগ রান্না করা হয়, যা পরে ভক্তদের মধ্যে মহাপ্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়।


রথযাত্রা — জগন্নাথের মহোৎসব

পুরী মানেই রথযাত্রা। প্রতি বছর আষাঢ় মাসে অনুষ্ঠিত হয় এই বিশ্ববিখ্যাত উৎসব।
সেই সময়ে জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা তিনটি বিশাল কাঠের রথে আরোহন করে গুন্ডিচা মন্দিরে যান, যা প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই রথ টানেন, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই অংশ নেন এই উৎসবে।
এ যেন ভক্তি, আনন্দ ও সমতার মহা উৎসব, যেখানে সকলেই সমানভাবে অংশীদার।


পুরী সমুদ্র সৈকত

মন্দির দর্শনের পর পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হল পুরী সমুদ্র সৈকত
সোনালি বালুকাবেলা, ঢেউয়ের মৃদু ছন্দ, ভোরবেলার সূর্যোদয় এবং সন্ধ্যার লাল আভা—সবকিছুই এই সৈকতকে করে তোলে অপূর্ব সুন্দর।
ভক্তরা সকালে গঙ্গাস্নানের মতোই এখানে স্নান করেন, কারণ এই সমুদ্রকেও ‘মহোদধি তীর্থ’ বলে পবিত্র মনে করা হয়।
সৈকতের পাশে সারি সারি দোকান, হস্তশিল্পের সামগ্রী, শাঁখা-গয়না, আর ওড়িশার বিখ্যাত পট্টচিত্র—সব মিলিয়ে এক জীবন্ত মেলা।


️ ধর্ম, সংস্কৃতি ও শান্তি

পুরী শুধু ধর্মীয় তীর্থ নয়, এটি ভারতীয় সংস্কৃতির এক কেন্দ্র।
এখানে স্বামী চৈতন্যদেব তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়েছিলেন। তাঁর আশ্রম ও পদচিহ্ন আজও ভক্তদের জন্য পবিত্র স্থান।
পুরীর মানুষ সহজ, ধর্মভীরু ও অতিথিপরায়ণ। জগন্নাথদেবের দর্শনে যেমন আত্মা শান্ত হয়, তেমনি এখানকার পরিবেশে এক গভীর প্রশান্তি অনুভূত হয়।


কীভাবে পৌঁছাবেন

  • রেলপথে: পুরী ভারতের প্রায় সব বড় শহরের সঙ্গে রেলপথে সংযুক্ত। কলকাতা থেকে সরাসরি পুরী এক্সপ্রেস বা ধৌলি এক্সপ্রেসে পৌঁছানো যায়।
  • সড়কপথে: ভুবনেশ্বর থেকে পুরীর দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার; ট্যাক্সি বা বাসে এক ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়।
  • বিমানপথে: নিকটতম বিমানবন্দর ভুবনেশ্বর (বিজু পট্টনায়ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)।

দর্শনীয় স্থানসমূহ

পুরীর আশেপাশে আরও অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে:

  • চিলিকা লেক: এশিয়ার বৃহত্তম লবণাক্ত জলাধার।
  • কোণার্ক সূর্য মন্দির: ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট।
  • গুন্ডিচা মন্দির: রথযাত্রার গন্তব্যস্থল।
  • লোকনাথ মন্দির, স্বর্গদ্বার ঘাট, চৈতন্যঘাট—সবই ভক্তির স্পর্শে পবিত্র স্থান।

✨ উপসংহার

পুরী এমন এক স্থান যেখানে ভক্তি ও প্রকৃতি মিলেমিশে সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ব পরিবেশ।
জগন্নাথদেবের চিরন্তন দৃষ্টি যেন আশীর্বাদ দেয় সকলকে—

“সবাই সুখে থাকো, সবাই মুক্তি পাও।”

এখানে এসে মনে হয়, জীবনের সমস্ত ক্লান্তি, দুঃখ আর সংশয় গলে যায় গঙ্গার মতো, শুধু রয়ে যায় শান্তি, প্রেম আর এক অজানা আত্মিক তৃপ্তি।
পুরী তাই শুধু ভ্রমণের স্থান নয়—এ এক অন্তরযাত্রা, ঈশ্বরের পথে মানুষের অগ্রযাত্রা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *