
থাইল্যান্ডের উত্তরের পর্বতঘেরা অঞ্চলে অবস্থিত চিয়াং মাই (Chiang Mai)— দেশটির সবচেয়ে সাংস্কৃতিক, প্রাচীন ও প্রকৃতি–সমৃদ্ধ শহর।
ব্যাংককের কোলাহল আর সমুদ্র–তটের ঝলকানি থেকে ভিন্ন, চিয়াং মাই আপনাকে নিয়ে যায় শান্ত পাহাড়, সোনালি মন্দির, ট্রাইব গ্রাম, প্রাকৃতিক ঝর্ণা, জঙ্গল সাফারি, নাইট মার্কেট আর বৌদ্ধ ঐতিহ্যের গভীরে।
৮০০ বছরের পুরোনো লান্না রাজ্যের রাজধানী ছিল এই শহর। তারই ছাপ এখনো রঙিন দেয়ালচিত্র, কাঠের ঘর, প্রাচীন প্রাচীর আর নদীর তীরে ছড়িয়ে আছে।
চিয়াং মাই এমন একটি শহর—
যেখানে আপনি চাইলে ধ্যান–ধ্যানে ডুবে যেতে পারেন,
আবার চাইলে পাহাড়ে অ্যাডভেঞ্চার করে দিন কাটাতে পারেন।
⭐ চিয়াং মাইয়ের বিশেষত্ব
- থাইল্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দর ও পুরোনো মন্দির শহর
- পাহাড়, ট্রেকিং, ঝর্ণা, জঙ্গল
- হাতির স্যাংচুয়ারি
- হস্তশিল্প–সংস্কৃতির রাজধানী
- ক্যাফে, কফি, থাই রান্না
- নাইট মার্কেট ও ট্রাইব সংস্কৃতি
- ঠান্ডা, মনোরম আবহাওয়া
এ যেন থাইল্যান্ডের “কালচারাল সোল”।
চিয়াং মাইয়ের প্রধান দর্শনীয় স্থান
১) দোই সুতেপ (Doi Suthep) – শহরের পাহাড়ের মণিমুক্তা
চিয়াং মাইয়ের পরিচয় বলতে প্রথমেই আসে—
Wat Phra That Doi Suthep
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,০৬০ মিটার উঁচু পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সোনালি মন্দির।
এখানে পৌঁছাতে হয় ৩০০+ সিঁড়ি পেরিয়ে, দুই পাশে নাগা সাপের প্রতীক।
উপর থেকে চিয়াং মাই শহরটি যেন ছবির মতো ঝলমল করে।
পাহাড়ের নির্জনতা আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি— মনকে ছুঁয়ে যায়।
২) ওল্ড সিটি (Old City) – মন্দির আর ইতিহাসের মিশেল
চিয়াং মাই শহরের কেন্দ্রের চারদিকে প্রাচীন দেয়াল ও খাল।
এর ভেতরেই সবচেয়ে বিখ্যাত মন্দিরগুলো—
- Wat Chedi Luang
- Wat Phra Singh
- Wat Chiang Man
এলাকার সরু রাস্তা, ক্যাফে, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের যাত্রা— সব মিলিয়ে শান্ত, নিরিবিলি আবহ।
৩) দোই ইনথানন (Doi Inthanon) – থাইল্যান্ডের ‘রুফ টপ’
থাইল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ।
এখানে—
- মেঘের ভেতর হাঁটা
- প্রাকৃতিক ঝর্ণা
- ট্রেকিং
- পাহাড়ি জনপদ
- রাজা–রানির প্যাগোডা
সবকিছু মিলিয়ে অনন্য অভিজ্ঞতা।
৪) এলিফ্যান্ট নেচার পার্ক – হাতিদের আশ্রয়ভূমি
চিয়াং মাই হাতিদের জন্য বিখ্যাত, তবে এখানকার সবচেয়ে মানবিক অভিজ্ঞতা—
Elephant Nature Park
এখানে কোনো রাইড নেই, নেই পশু নির্যাতন।
আপনি হাতিদের খাবার দিতে পারেন, তাদের স্নান করাতে পারেন।
মানুষ আর প্রাণীর সম্পর্ক এখানে সত্যিই ছুঁয়ে যায়।
৫) জঙ্গল ট্রেকিং ও হিল ট্রাইব ভিজিট
চিয়াং মাইয়ের আশেপাশে লান্না, কারেন, হামং সহ নানা উপজাতির গ্রাম।
জঙ্গল–পাহাড়ের ভেতর ট্রেকিং করে এসব গ্রামে গেলে থাই সংস্কৃতির এক অন্য রূপ দেখা যায়।
৬) আর্ট, হস্তশিল্প, কফি ও ক্যাফে কালচার
চিয়াং মাই আর্ট শহর—
এখানে আছে:
- পেইন্টিং স্টুডিও
- সিল্ক কারখানা
- সিলভার হস্তশিল্প
- হাতে বানানো গহনা
- কাঠখোদাই শিল্প
শহরের রুস্টিক ক্যাফেগুলোর কফি— দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার সেরা।
চিয়াং মাইয়ের নাইট মার্কেট
১) Sunday Walking Street Market
রবিবার সন্ধ্যায় ওল্ড সিটির রাস্তায় শুরু হয় বিশাল বাজার।
এখানে—
- হাতে বানানো শিল্পকর্ম
- পোশাক
- স্থানীয় খাবার
- সংগীত
- নাচ
পুরো রাস্তাজুড়ে উৎসবের আমেজ।
২) Night Bazaar
প্রতিদিন খোলা এই বাজারে স্যুভেনির, ব্যাগ, কাঠের কাজ, পোশাক— সব পাবেন।
চিয়াং মাইয়ের উৎসব
Yi Peng (Lantern Festival)
আকাশে একসঙ্গে হাজার হাজার কাগজের বাতি ভাসানোর দৃশ্য—
থাইল্যান্ডের অন্যতম সুন্দর উৎসব।
চিয়াং মাইয়ের খাবারের পরিচয়
চিয়াং মাইয়ের খাবার ব্যাংকক বা দক্ষিণ থাইল্যান্ডের থেকে আলাদা।
অবশ্যই খাবেন—
- Khao Soi (নুডল কারি)— শহরের সিগনেচার খাবার
- Sai Ua (উত্তর থাই সসেজ)
- Sticky Rice with Coconut
- Thai BBQ
- Mango Sticky Rice
এখানকার রাস্তার খাবারও খুবই জনপ্রিয়।
চিয়াং মাইয়ে কীভাবে ঘুরবেন
- সঙথাও (লাল রঙের শেয়ারড ট্যাক্সি)
- টুক-টুক
- বাইসাইকেল
- বাইক রেন্ট
- গ্রাব ট্যাক্সি
ধীরে আর আরামে ঘুরে দেখার জন্য বাইক বা সাইকেল খুব ভালো।
ভ্রমণ করার উপযুক্ত সময়
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি—
সবচেয়ে ঠান্ডা, পরিষ্কার এবং সুন্দর মৌসুম।
শেষ কথা
চিয়াং মাই এমন একটি শহর—
যা আপনাকে একই সঙ্গে শান্তি, ইতিহাস, প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার এবং গভীর থাই সংস্কৃতির স্বাদ দেয়।
এ শহর ব্যস্ত জীবন থেকে পালানো,
মনকে রিসেট করা,
আনন্দে ডুবে যাওয়া—
সব কিছুর জন্যই আদর্শ।
থাইল্যান্ডে গেলে চিয়াং মাই আপনার ভ্রমণের রঙ আরও গভীর করে দেবে।












Leave a Reply