বাবার আলমারির তৃতীয় ড্রয়ার।

বাবা মারা যাওয়ার পর বাড়িটা যেন হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল।

একই ঘর, একই বারান্দা, একই উঠোন—তবু কোথাও যেন বাবার সেই পরিচিত উপস্থিতি নেই।

অর্ণব শহরে চাকরি করত। বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে সে গ্রামে ফিরে এসেছিল। ছোট ভাই অমিতও এসেছিল, কিন্তু দুজনের মধ্যে বহুদিন ধরেই কথা প্রায় বন্ধ।

বাবা বেঁচে থাকতে দুজন ভাইয়ের ঝগড়া ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

জমি নিয়ে, বাড়ি নিয়ে, টাকা নিয়ে—সবকিছুতেই মতের অমিল।

বাবা শেষ জীবনে শুধু একটি কথাই বলতেন,

“তোরা একদিন বুঝবি, সম্পত্তির চেয়ে ভাই বড়।”

কেউ তখন কথাটার গুরুত্ব দেয়নি।

বাবার শ্রাদ্ধের পরদিন অর্ণব পুরোনো কাঠের আলমারিটি খুলতে গেল। আলমারির চাবি বাবার বালিশের নিচে পাওয়া গিয়েছিল।

প্রথম ড্রয়ারে পুরোনো জামাকাপড়।

দ্বিতীয় ড্রয়ারে জমির কাগজপত্র।

তৃতীয় ড্রয়ারটি তালাবন্ধ।

অর্ণব চাবি ঘোরাতেই ড্রয়ার খুলে গেল।

ভেতরে একটি ছোট্ট খাম।

খামের ওপর লেখা—

“অর্ণব ও অমিত—দুজন একসঙ্গে না থাকলে খুলবি না।”

অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

সন্ধ্যায় অমিতকে ডেকে খামটি দেখাল।

অমিত বলল,

“বাবা আবার কী লিখে গেছেন?”

অর্ণব খাম খুলল।

ভেতরে একটি চিঠি।

“তোরা যখন এই চিঠি পড়ছিস, তখন আমি আর নেই। তোদের দুজনের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তার জন্য আমি নিজেকেই দায়ী মনে করি।”

দুই ভাই চুপ করে পড়তে লাগল।

“তোরা ছোটবেলায় যখন মাকে হারাস, তখন আমি ভেবেছিলাম তোদের সবকিছু দিতে পারলেই তোদের কষ্ট কমবে। তাই তোদের চাহিদা পূরণ করতে করতে বুঝতেই পারিনি, তোদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে গেছে।”

অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।

চিঠিতে আরও লেখা—

“অর্ণব ভাবত, আমি অমিতকে বেশি ভালোবাসি। অমিত ভাবত, আমি অর্ণবকে বেশি গুরুত্ব দিই। অথচ সত্যিটা হলো—তোরা দুজনেই আমার কাছে সমান।”

অমিত ধীরে ধীরে মাথা নিচু করল।

চিঠির শেষে লেখা—

“তৃতীয় ড্রয়ারের নিচে আরেকটি জিনিস আছে।”

দুজন মিলে ড্রয়ারের নিচের কাঠের পাতটি তুলল।

সেখানে একটি পুরোনো খাতা।

খাতা খুলতেই দেখা গেল, বাবার হাতে লেখা হিসাব।

বছরের পর বছর ধরে তিনি অর্ণবের পড়াশোনা, অমিতের পড়াশোনা, দুজনের চাকরির জন্য দেওয়া টাকা—সব লিখে রেখেছেন।

কিন্তু শেষ পাতায় একটি হিসাব দেখে দুজনেই থমকে গেল।

সেখানে লেখা—

“অর্ণবের জন্য বাকি: ৩ লাখ টাকা।”

তার নিচে—

“অমিতের জন্য বাকি: ৩ লাখ টাকা।”

অমিত অবাক হয়ে বলল,

“এগুলো কী?”

অর্ণব খাতা উল্টাতে উল্টাতে দেখল, তাদের বাবা বহু বছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছিলেন।

শেষ পাতায় লেখা—

“এই টাকা তোদের জন্য নয়। তোদের মায়ের নামে গ্রামের স্কুলে একটি ছোট লাইব্রেরি তৈরি করার জন্য।”

দুই ভাই একে অপরের দিকে তাকাল।

বাবার স্বপ্ন ছিল গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্য একটি বইয়ের ঘর তৈরি করা।

কিন্তু তিনি জীবদ্দশায় তা করতে পারেননি।

অর্ণব বলল,

“আমরা এটা করব।”

অমিত মাথা নাড়ল।

“দুজন মিলে।”

সেই প্রথম বহু বছর পর দুই ভাই পাশাপাশি বসেছিল।

কয়েক মাসের মধ্যে গ্রামের স্কুলের পাশে একটি ছোট লাইব্রেরি তৈরি হলো।

দরজার ওপর নাম লেখা হলো—

“সুবর্ণা স্মৃতি পাঠাগার”

তাদের মায়ের নাম সুবর্ণা।

উদ্বোধনের দিন অর্ণব বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“বাবা, তুমি ঠিকই বলেছিলে। সম্পত্তির চেয়ে ভাই বড়।”

অমিত পাশে দাঁড়িয়ে তার হাত ধরল।

দুজনের চোখেই জল।

সেদিন রাতে অর্ণব আবার সেই আলমারির সামনে দাঁড়াল।

তৃতীয় ড্রয়ারটি খোলা।

কিন্তু সেখানে এবার আর কোনো চিঠি নেই।

শুধু একটি ছোট্ট কাগজ।

অর্ণব কাগজটি তুলে পড়ল—

“এবার তোরা বুঝেছিস, তাই ড্রয়ারটা আর বন্ধ রাখলাম না।”

অর্ণব মৃদু হেসে কাগজটি বুকের কাছে রাখল।

বাবা চলে গেছেন।

কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সম্পদ—দুই ভাইয়ের সম্পর্ক—আবার ফিরে এসেছে।

আর অর্ণব বুঝতে পারল, বাবার আলমারির তৃতীয় ড্রয়ারে আসলে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না।

সেখানে লুকিয়ে ছিল একটি পরিবারের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *