ইলা ভাট: কর্মজীবী নারীদের আত্মনির্ভরতার পথ দেখানো এক মহীয়সী নারী।

ভূমিকা

একজন নারী যখন নিজের হাতে উপার্জন করেন, তখন শুধু তাঁর নিজের জীবনই বদলে যায় না—বদলে যেতে পারে তাঁর পরিবার, সন্তান এবং গোটা সমাজের ভবিষ্যৎ। কিন্তু ভারতের দরিদ্র ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত বহু নারী দীর্ঘদিন ধরে শ্রম দিলেও তাঁদের কাজের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং আর্থিক সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

এই বাস্তবতা বদলানোর জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ইলা রমেশ ভাট। তিনি ছিলেন একজন আইনজীবী, সমাজকর্মী এবং নারী-অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মী।

তাঁর সবচেয়ে পরিচিত উদ্যোগ Self-Employed Women’s Association বা SEWA। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি এমন বহু নারীকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেন, যাঁরা ঘরে বসে কাজ করতেন, রাস্তার ধারে পণ্য বিক্রি করতেন, কৃষিকাজ করতেন, নির্মাণক্ষেত্রে শ্রম দিতেন বা ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে সংসার চালাতেন।

ইলা ভাটের দর্শন ছিল সহজ—নারীকে শুধু সাহায্য করলে হবে না, তাঁকে এমন সুযোগ দিতে হবে যাতে তিনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন।

শৈশব ও শিক্ষা

ইলা ভাটের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর আহমেদাবাদে। তাঁর পরিবার ছিল শিক্ষিত এবং সামাজিকভাবে সচেতন।

তিনি উচ্চশিক্ষা লাভ করেন এবং আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। আইনশাস্ত্রের শিক্ষা পরবর্তীকালে তাঁর কর্মজীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

কারণ তিনি খুব কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিলেন, সমাজের প্রান্তিক মানুষের সমস্যা শুধু অর্থের অভাবের কারণে তৈরি হয় না। অনেক সময় তাঁদের অধিকার, শ্রমের মূল্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সংগঠিত হওয়ার সুযোগের অভাবও তাঁদের দুর্বল করে রাখে।

শ্রমজীবী নারীদের বাস্তবতা

ইলা ভাটের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি সমস্যাকে দূর থেকে দেখেননি।

তিনি অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত নারীদের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করেছিলেন।

একজন সবজি বিক্রেতা হয়তো প্রতিদিন ভোরে বাজারে যান। একজন কাপড়ের কাজ করা নারী বাড়িতে বসে দীর্ঘ সময় শ্রম দেন। কেউ আবার মাথায় বোঝা নিয়ে কাজ করেন বা ছোট দোকান চালান।

এঁদের অনেকেই ছিলেন স্বনির্ভর কর্মজীবী। কিন্তু তাঁদের কাজকে অনেক সময় প্রচলিত অর্থে “চাকরি” হিসেবে দেখা হতো না।

ফলে তাঁদের জন্য শ্রমিক হিসেবে সংগঠিত হওয়া বা বিভিন্ন সামাজিক সুবিধা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।

ইলা ভাট এই সমস্যাটিকেই গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনেন।

SEWA প্রতিষ্ঠার গল্প

১৯৭২ সালে ইলা ভাট Self-Employed Women’s Association (SEWA) প্রতিষ্ঠা করেন।

এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, কারণ এখানে মূল লক্ষ্য ছিল স্বনির্ভর ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত নারীদের সংগঠিত করা।

SEWA-র মাধ্যমে নারীরা নিজেদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে একসঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।

তাঁদের মধ্যে সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সমর্থনের কাঠামো তৈরি হয়।

এই সংগঠনের ভাবনা ছিল—দরিদ্র নারীকে শুধু সাহায্য গ্রহণকারী হিসেবে না দেখে তাঁকে একজন কর্মী, উপার্জনকারী এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী মানুষ হিসেবে দেখা।

অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব

ইলা ভাট বুঝেছিলেন, নারীর স্বাধীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

একজন নারী নিজের আয় করতে পারলে পরিবারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা বাড়তে পারে। সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, খাবার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে।

কিন্তু আয় করাই যথেষ্ট নয়।

সেই আয় নিরাপদে রাখা, প্রয়োজনে ঋণ পাওয়া, সঞ্চয় করা এবং নিজের কাজকে আরও বড় করার সুযোগও প্রয়োজন।

এই কারণেই SEWA-র কাজ শুধু সংগঠন তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

দরিদ্র নারীদের জন্য সমবায় ভাবনা

ইলা ভাট সমবায় ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

ছোট ছোট আয়ের নারীরা যখন একসঙ্গে সংগঠিত হন, তখন তাঁরা নিজেদের সঞ্চয়, ঋণ এবং ব্যবসার বিভিন্ন প্রয়োজন নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারেন।

এই পদ্ধতি নারীদের মধ্যে আর্থিক শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—নারীদের নিজের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

ব্যাংকিংয়ের নতুন দরজা

দরিদ্র ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা নারীদের অনেকেরই প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশ করা কঠিন ছিল।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য ১৯৭৪ সালে SEWA Bank প্রতিষ্ঠিত হয়।

ব্যাংকটি মূলত দরিদ্র স্বনির্ভর কর্মজীবী নারীদের আর্থিক পরিষেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে।

এর মাধ্যমে ছোট সঞ্চয়, ঋণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়।

এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা—দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা নারীও একজন আর্থিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি এবং তাঁরও ব্যাংকিং পরিষেবার অধিকার থাকা উচিত।

সংগঠিত হওয়ার শক্তি

ইলা ভাটের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল—একজন মানুষ একা যতটা করতে পারেন, সংগঠিত মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশি করতে পারেন।

একজন নারী যদি একা নিজের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দাবি করেন, তাঁর পক্ষে তা কঠিন হতে পারে।

কিন্তু একই সমস্যায় থাকা হাজার হাজার নারী যদি একসঙ্গে নিজেদের কথা বলেন, তাহলে তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়।

এই সংগঠিত শক্তিকেই ইলা ভাট তাঁর কাজের অন্যতম ভিত্তি করেছিলেন।

শ্রমের মর্যাদা

ইলা ভাটের চিন্তায় একটি বিষয় বারবার সামনে আসে—শ্রমের মর্যাদা

অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা নারীদের অনেক কাজই ঘরের কাজ এবং জীবিকার কাজের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।

কেউ বাড়িতে খাবার তৈরি করে বিক্রি করেন, কেউ কাপড় তৈরি করেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করেন।

এই কাজগুলিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ইলা ভাটের কাজ সেই অদৃশ্য শ্রমকে দৃশ্যমান করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নারী ও নেতৃত্ব

ইলা ভাট শুধু নারীদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করার কথা বলেননি। তিনি তাঁদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগও তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

যে নারী নিজের জীবনের সমস্যার কথা জানেন, তিনিই সেই সমস্যার সমাধানের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন—এই ধারণা তাঁর কাজের মধ্যে ছিল।

ফলে SEWA-র কাঠামোর মধ্যেও সাধারণ কর্মজীবী নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ইলা ভাটের কাজ ভারতের সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পরিচিতি লাভ করে।

তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দরিদ্র নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়।

তিনি Ramon Magsaysay Award-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মান লাভ করেন।

তবে তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ছিল সেইসব নারীর জীবনে পরিবর্তন, যাঁরা নিজেদের শ্রম ও সংগঠনের মাধ্যমে নতুন সুযোগ পেয়েছিলেন।

শুধু দারিদ্র্য দূরীকরণ নয়

ইলা ভাটের কাজকে শুধু দারিদ্র্য দূরীকরণের উদ্যোগ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তিনি নারীর মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তাঁর কাছে একজন নারী শুধু পরিবারের সদস্য নন। তিনি একজন কর্মী, উদ্যোক্তা, সঞ্চয়কারী, উৎপাদক এবং অর্থনৈতিক নাগরিক।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র নারীদের জন্য শিক্ষা

ভারতের অর্থনীতির একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অসংগঠিত ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল।

এই ক্ষেত্রে কর্মরত মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নারী।

তাঁদের কাজ অনেক সময় আনুষ্ঠানিক নথিতে ধরা পড়ে না। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান বা আর্থিক পরিষেবার ক্ষেত্রেও তাঁরা পিছিয়ে পড়তে পারেন।

ইলা ভাটের কাজ দেখিয়েছে, উন্নয়নের পরিকল্পনায় এই কর্মজীবী নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

ইলা ভাটের জীবন থেকে নতুন প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সাহায্য করার পাশাপাশি ক্ষমতায়নের পথ তৈরি করতে হয়।

কাউকে একবার সাহায্য করলে হয়তো সাময়িক সমস্যা মেটে। কিন্তু একজন মানুষকে যদি এমন সুযোগ দেওয়া যায় যাতে তিনি নিজেই নিজের আয় তৈরি করতে পারেন, সঞ্চয় করতে পারেন এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাহলে পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

আরেকটি শিক্ষা হলো—ছোট কাজ বলে কোনো কাজকে অবহেলা করা উচিত নয়।

একজন রাস্তার বিক্রেতা, কারিগর, কৃষিশ্রমিক বা গৃহভিত্তিক কর্মীর শ্রমও অর্থনীতির অংশ।

তাঁর উত্তরাধিকার

ইলা ভাট ২০২২ সালের ২ নভেম্বর আহমেদাবাদে মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর চলে যাওয়ার পরও তাঁর প্রতিষ্ঠিত ভাবনা এবং সংগঠন নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

SEWA-র মতো উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে দরিদ্র নারীদের নিয়ে কাজ করার সময় তাঁদের শুধু সুবিধাভোগী হিসেবে দেখার পরিবর্তে তাঁদের নিজেদের সংগঠনের নেতৃত্বে আনা সম্ভব।

এই চিন্তাধারা ভারতের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে।

উপসংহার

ইলা ভাটের জীবন ছিল মানুষের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করার গল্প।

তিনি বুঝেছিলেন, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে সম্ভব নয়। মানুষের নিজের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নারীদের এমন সুযোগ দিতে হবে যাতে তাঁরা নিজের শ্রমের মূল্য বুঝতে পারেন, সঞ্চয় করতে পারেন, ঋণ নিতে পারেন, ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তিনি যে নারীদের নিয়ে কাজ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই সমাজের চোখে হয়তো ছোট পেশার মানুষ ছিলেন। কিন্তু ইলা ভাট তাঁদের কাজের মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন।

তিনি দেখিয়েছিলেন—অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু উপার্জনের বিষয় নয়; এটি আত্মসম্মান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে তুলে নেওয়ারও একটি পথ।

তাই ইলা ভাটের জীবন ভারতীয় সমাজে নারী ক্ষমতায়নের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তিনি এমন একটি ভাবনা রেখে গেছেন, যার মূল কথা খুব সহজ—নারীকে সুযোগ দিন, সংগঠিত হতে সাহায্য করুন, নিজের শক্তি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করে দিন।

এই দর্শনই তাঁকে একজন সমাজকর্মী থেকে আরও বড় পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছে—তিনি হয়ে উঠেছেন আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন দেখা অসংখ্য নারীর এক অনুপ্রেরণার নাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *