
একসময় ভারতে জীবপ্রযুক্তি বা বায়োটেকনোলজি ছিল মূলত গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচনার বিষয়। সাধারণ মানুষের কাছে এই ক্ষেত্রের সম্ভাবনা খুব বেশি পরিচিত ছিল না। সেই সময় এক তরুণী বিজ্ঞান ও উদ্যোক্তা-চিন্তাকে একসঙ্গে নিয়ে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা পরবর্তীকালে ভারতের বায়োটেকনোলজি শিল্পের অন্যতম পরিচিত নাম হয়ে ওঠে।
তিনি কিরণ মজুমদার-শ।
তাঁর জীবন শুধু একজন সফল ব্যবসায়ীর গল্প নয়। এটি বিজ্ঞানকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার, গবেষণাকে শিল্পে রূপ দেওয়ার এবং প্রচলিত বাধার মধ্যেও নিজের পথ তৈরি করার একটি দীর্ঘ যাত্রা।
শৈশবের স্বপ্ন ছিল অন্যরকম
কিরণ মজুমদার-শ ১৯৫৩ সালে বেঙ্গালুরুতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন United Breweries-এর প্রধান ব্রিউমাস্টার। বাবার পেশার সূত্রে ছোটবেলা থেকেই শিল্পক্ষেত্রের একটি বিশেষ পরিবেশের সঙ্গে তাঁর পরিচয় তৈরি হয়।
প্রথমদিকে তাঁর নিজেরও ইচ্ছা ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা করার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং বেঙ্গালুরুর মাউন্ট কারমেল কলেজ থেকে প্রাণীবিজ্ঞানে স্নাতক হন।
পরবর্তীকালে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে মল্টিং ও ব্রিউইং নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ব্রিউমাস্টার হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন।
তখন ভারতে এই ধরনের পেশায় নারীর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত।
এই অভিজ্ঞতাই তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে ওঠে—যে ক্ষেত্রেই কাজ করতে চান, সেখানেই নিজের দক্ষতা প্রমাণ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
কর্মজীবনের প্রথম বাধা
বিদেশে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ভারতে ফিরে এসে কিরণ মজুমদার-শ ব্রিউইং শিল্পে কাজ করতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু একজন নারী হিসেবে এই পেশায় কাজ পাওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না। শিল্পক্ষেত্রে নারী কর্মীর সংখ্যা তখন কম, আর বিশেষ করে ব্রিউইং-এর মতো প্রযুক্তিগত ও কারিগরি ক্ষেত্রে নারীদের নিয়ে প্রচলিত ধারণা ছিল আরও সংকীর্ণ।
এই অভিজ্ঞতা তাঁকে থামিয়ে দেয়নি।
বরং তিনি বুঝতে পারেন, নিজের জন্য একটি নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করার প্রয়োজন রয়েছে।
মাত্র ছোট পরিসরে শুরু
১৯৭৮ সালে তিনি Biocon প্রতিষ্ঠা করেন। বেঙ্গালুরুর একটি ছোট গ্যারেজ থেকে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়েছিল।
শুরুতে অর্থ, পরিকাঠামো এবং দক্ষ কর্মী—সবকিছুরই সীমাবদ্ধতা ছিল। এমনকি একটি তরুণী উদ্যোক্তার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়াও সহজ ছিল না।
কিন্তু কিরণ মজুমদার-শ ছোট থেকে শুরু করতে দ্বিধা করেননি।
প্রথমদিকে Biocon শিল্পের জন্য এনজাইম উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রে কাজ শুরু করে। এনজাইম খাদ্য, বস্ত্র, ডিটারজেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার করা হয়।
এই ব্যবসা থেকেই ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি জীবপ্রযুক্তির বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রবেশ করে।
গবেষণার গুরুত্ব
কিরণ মজুমদার-শের উদ্যোক্তা-দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল গবেষণা।
তিনি বুঝেছিলেন, বায়োটেকনোলজির মতো ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য শুধুমাত্র প্রচলিত পণ্য বিক্রির ওপর নির্ভর করে না। নতুন প্রযুক্তি, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের ওপর বিনিয়োগ করতে হয়।
এই কারণেই Biocon ধীরে ধীরে শিল্প-এনজাইমের পাশাপাশি বায়োফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণা ও উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যায়।
এখানেই তাঁর ব্যবসায়িক যাত্রা অন্য অনেক উদ্যোক্তার থেকে আলাদা হয়ে ওঠে।
ব্যবসাকে তিনি কেবল মুনাফার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বিজ্ঞান ও গবেষণাকে প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
বায়োফার্মাসিউটিক্যাল ক্ষেত্রে প্রবেশ
সময়ের সঙ্গে Biocon ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলি ডায়াবেটিস, ক্যানসার এবং অন্যান্য গুরুতর রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বায়োলজিক ও বায়োসিমিলার ওষুধের গবেষণা ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়।
বিশেষ করে বায়োসিমিলার ওষুধের ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি পেতে শুরু করে।
বায়োসিমিলার হল এমন জৈবিক ওষুধ, যা ইতিমধ্যে অনুমোদিত একটি জৈবিক ওষুধের সঙ্গে অত্যন্ত সাদৃশ্যপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট মান ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করে।
এই ক্ষেত্রটি প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল। ফলে গবেষণা, উৎপাদন এবং নিয়ন্ত্রক অনুমোদন—সব ক্ষেত্রেই উচ্চমানের দক্ষতা প্রয়োজন।
কিরণ মজুমদার-শের নেতৃত্বে Biocon এই জটিল শিল্পক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে।
বিজ্ঞান ও মানুষের প্রয়োজন
বায়োটেকনোলজির জগৎ অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জটিল মনে হয়। কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
নতুন ওষুধ তৈরি, চিকিৎসার খরচ কমানোর চেষ্টা, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি—এসব ক্ষেত্রেই জীবপ্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে।
কিরণ মজুমদার-শ এই বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনাকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—উচ্চপ্রযুক্তির গবেষণাকে ভারতের শিল্পক্ষেত্রের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পথ
কিরণ মজুমদার-শের সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে তাঁর প্রভাব।
তিনি যখন ব্যবসা শুরু করেছিলেন, তখন ভারতে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি খুবই সীমিত ছিল।
একজন নারী নিজের হাতে একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে সেটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন—এই ধারণাটিই ছিল অনেকের কাছে নতুন।
তাঁর পথচলা পরবর্তী প্রজন্মের বহু নারী উদ্যোক্তার জন্য একটি দৃশ্যমান উদাহরণ তৈরি করে।
তবে তাঁর সাফল্যকে শুধু ‘নারী উদ্যোক্তার সাফল্য’ হিসেবে দেখলে তাঁর কাজের বৈজ্ঞানিক ও শিল্পগত দিকটি ছোট হয়ে যায়। তিনি একই সঙ্গে একজন বিজ্ঞানমনস্ক উদ্যোক্তা এবং গবেষণাভিত্তিক শিল্পের নির্মাতা।
বেঙ্গালুরুর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
কিরণ মজুমদার-শের কর্মজীবনের সঙ্গে বেঙ্গালুরুর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
বেঙ্গালুরু আজ ভারতের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। Biocon-এর মতো বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠান এই শহরের গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পপরিবেশকে আরও পরিচিত করেছে।
একটি ছোট গ্যারেজ থেকে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার গল্প বেঙ্গালুরুর উদ্যোক্তা-সংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
দাতব্য কাজ ও স্বাস্থ্যক্ষেত্র
ব্যবসার পাশাপাশি কিরণ মজুমদার-শ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে তাঁর আগ্রহ উল্লেখযোগ্য। Biocon Foundation-এর মাধ্যমে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা, জনস্বাস্থ্য সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যপরিকাঠামো উন্নয়নের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে তাঁর কাজের আরেকটি দিক সামনে আসে—বিজ্ঞান ও ব্যবসার সাফল্যকে সমাজের বৃহত্তর প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা।
পরিবেশের প্রতিও দায়বদ্ধতা
একটি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
কিরণ মজুমদার-শের নেতৃত্বে টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব শিল্পচর্চা এবং সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলি নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞান ও শিল্প যত বড় হয়, তার সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাবও তত বড় হয়। তাই আধুনিক উদ্যোক্তার কাছে শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
কিরণ মজুমদার-শ তাঁর কাজের জন্য ভারত ও বিদেশে বহু সম্মান পেয়েছেন।
ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী এবং পরবর্তীকালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করেছে।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিজ্ঞানমহলেও তাঁর কাজের স্বীকৃতি রয়েছে।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনও পুরস্কার নয়। একটি ছোট উদ্যোগকে গবেষণাভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার দীর্ঘ প্রক্রিয়াই তাঁর কর্মজীবনের প্রধান পরিচয়।
ব্যর্থতার ভয়কে অতিক্রম
কিরণ মজুমদার-শের জীবনের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—সাফল্যের শুরুতেই সবকিছু অনুকূল ছিল না।
অর্থের অভাব ছিল। প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো সীমিত ছিল। সামাজিক পূর্বধারণা ছিল। নতুন শিল্পক্ষেত্রের ঝুঁকি ছিল।
কিন্তু প্রতিটি সমস্যাকে তিনি শেখার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
এই মানসিকতা উদ্যোক্তা জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নতুন কিছু তৈরি করার পথে অনিশ্চয়তা থাকবেই।
তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
কিরণ মজুমদার-শের জীবন তরুণদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
প্রথমত, নিজের শিক্ষাকে বাস্তব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নতুন কোনও ক্ষেত্র ছোট মনে হলেও তার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
তৃতীয়ত, গবেষণা ও জ্ঞানকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—প্রথম বাধাতেই পথ পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। কখনও কখনও বাধাই নতুন পথ তৈরি করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার
কিরণ মজুমদার-শের জীবন ভারতীয় বিজ্ঞান ও উদ্যোক্তা-জগতের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
একটি ছোট গ্যারেজ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পৌঁছানো সহজ পথ ছিল না। এর পেছনে ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, দীর্ঘ পরিশ্রম, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং গবেষণার ওপর আস্থা।
তিনি দেখিয়েছেন, বিজ্ঞান কেবল গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সঠিক উদ্যোগ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বিজ্ঞান মানুষের স্বাস্থ্য, শিল্প এবং অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তাঁর যাত্রা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনে—নতুন শিল্প তৈরি করতে হলে শুধু ব্যবসায়িক বুদ্ধি নয়, জ্ঞান, গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োজন।
আজ ভারতের বায়োটেকনোলজি ক্ষেত্র যখন বিশ্ব অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে, তখন সেই শিল্পের প্রাথমিক পথচলায় কিরণ মজুমদার-শের মতো পথিকৃৎদের অবদান স্মরণ করা জরুরি।
একসময় যে স্বপ্ন একটি ছোট গ্যারেজে শুরু হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীকালে ভারতীয় জীবপ্রযুক্তি শিল্পের একটি পরিচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। তাঁর জীবন তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়—এটি বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করে নতুন কিছু তৈরি করার সাহসের গল্প।












Leave a Reply