
গ্রামের নাম শালবনি। গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল বিশাল একটি পুকুর। নাম—কালাদিঘি।
দিনের বেলা পুকুরটি দেখতে অন্য সব পুকুরের মতোই। চারপাশে নারকেল গাছ, শেওড়া আর বাঁশঝাড়। কিন্তু সূর্য ডোবার পর কেউ আর সেখানে যেত না।
গ্রামের লোকজনের বিশ্বাস ছিল, রাতের বেলা কালাদিঘির জলে একজন মহিলার মুখ ভেসে ওঠে।
কেউ তাকে কখনও স্পষ্ট দেখেনি। শুধু জলের ওপর একটা মুখ, আর তারপর ঢেউ।
অনেকে বলত, বহু বছর আগে ওই পুকুরে এক মহিলা ডুবে মারা গিয়েছিলেন।
কিন্তু গ্রামের স্কুলশিক্ষক অরিন্দম এসব বিশ্বাস করতেন না।
একদিন সন্ধ্যায় গ্রামের চায়ের দোকানে বসে তিনি বললেন, “জলে মুখ দেখা যায় কীভাবে? নিশ্চয়ই কোনো আলোর প্রতিফলন।”
দোকানের বৃদ্ধ মালিক বললেন, “তাহলে আজ রাতে গিয়ে দেখে আসুন।”
অরিন্দম হেসে বললেন, “যাব।”
সেদিন রাতেই তিনি টর্চ আর মোবাইল নিয়ে কালাদিঘির দিকে রওনা হলেন।
আকাশে চাঁদ ছিল না। চারপাশ অন্ধকার।
পুকুরের কাছে পৌঁছে তিনি টর্চ জ্বালালেন।
জল একেবারে স্থির।
অরিন্দম পুকুরের ধারে বসে মোবাইলে ভিডিও করতে শুরু করলেন।
দশ মিনিট কেটে গেল।
কিছুই হল না।
হঠাৎ—
জলের মাঝখানে ছোট্ট একটি ঢেউ উঠল।
তারপর আরেকটি।
অরিন্দম টর্চের আলো ফেলতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
জলের ওপর সত্যিই একটি মুখ দেখা যাচ্ছে।
একজন মহিলার মুখ।
চোখ দুটি যেন সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে।
অরিন্দম উঠে দাঁড়ালেন।
ঠিক তখনই মুখটি অদৃশ্য হয়ে গেল।
তিনি দৌড়ে বাড়ি ফিরে এলেন।
পরদিন সকালে ভিডিওটি দেখতে বসে দেখলেন, ক্যামেরায় কিছুই নেই।
শুধু শেষ কয়েক সেকেন্ডে একটি অস্পষ্ট শব্দ—
“ওকে খুঁজে বের করুন…”
অরিন্দমের কৌতূহল বেড়ে গেল।
তিনি গ্রামের প্রবীণদের কাছে পুরোনো ঘটনা জানতে শুরু করলেন।
তখন গ্রামের নব্বই বছরের বৃদ্ধা সরলা দেবী একটি কথা বললেন।
“যে মহিলার কথা সবাই বলে, তার নাম ছিল কমলা।”
“কী হয়েছিল তার?”
সরলা দেবী বললেন, “তখন আমি ছোট। কমলা একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। সবাই বলেছিল, পুকুরে পড়ে মারা গেছে। কিন্তু তার দেহ কখনও পাওয়া যায়নি।”
অরিন্দম অবাক হলেন।
“দেহ পাওয়া যায়নি?”
“না।”
“তাহলে মানুষ ধরে নিল সে মারা গেছে কেন?”
বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না।
অরিন্দম পুরোনো গ্রামের নথি খুঁজতে শুরু করলেন। কয়েকদিন পর তিনি পঞ্চায়েতের পুরোনো রেজিস্টারে একটি তথ্য পেলেন।
কমলা নিখোঁজ হওয়ার কয়েকদিন আগে থানায় একটি অভিযোগ করেছিলেন।
অভিযোগে লেখা ছিল—গ্রামের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পুকুরের জমি দখল করার চেষ্টা করছে।
অরিন্দম এবার বুঝতে পারলেন, বিষয়টি শুধু ভূতের গল্প নয়।
তিনি আরও অনুসন্ধান করলেন।
পুরোনো একটি বাড়ির ভাঙা ঘরে তিনি কমলার লেখা একটি খাতা পেলেন।
শেষ পাতায় লেখা—
“যদি আমার কিছু হয়, কালাদিঘির উত্তর পাড়ের বড় বটগাছের নিচে খুঁজবেন।”
অরিন্দম সঙ্গে সঙ্গে সেখানে গেলেন।
বটগাছের নিচে মাটি খুঁড়তেই একটি মরচে ধরা টিনের বাক্স বেরিয়ে এল।
বাক্সের মধ্যে ছিল জমির পুরোনো দলিল, কয়েকটি ছবি এবং কিছু নামের তালিকা।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়—দলিল অনুযায়ী কালাদিঘির চারপাশের জমি গ্রামের মানুষের যৌথ সম্পত্তি। কেউ সেটি ব্যক্তিগতভাবে দখল করতে পারে না।
অরিন্দম সমস্ত নথি নিয়ে প্রশাসনের কাছে গেলেন।
তদন্ত শুরু হল।
তদন্তে জানা গেল, বহু বছর আগে জমি দখলের উদ্দেশ্যে কমলাকে ভয় দেখানো হয়েছিল। এরপর সে নিখোঁজ হয়ে যায়। তার পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে জমির কাগজপত্র লুকিয়ে রাখার বিষয়টি সত্যি প্রমাণিত হয়।
কালাদিঘির জমি দখলের পুরোনো চেষ্টা বন্ধ হয়ে গেল।
কয়েকদিন পর অরিন্দম আবার রাতে পুকুরের ধারে গেলেন।
জল শান্ত।
তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
হঠাৎ জলের ওপর আবার সেই মুখটি ভেসে উঠল।
তবে এবার মুখটির চোখে ভয়ের বদলে যেন শান্তি।
অরিন্দম ধীরে বললেন,
“আপনার কাগজগুলো রক্ষা পেয়েছে।”
মুখটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
তারপর থেকে আর কখনও কালাদিঘির জলে কোনো মুখ দেখা যায়নি।
গ্রামের মানুষ আজও জানে না কমলার আসল পরিণতি কী হয়েছিল।
কিন্তু তারা একটি কথা জানে—
কখনও কখনও মৃত মানুষের আত্মার গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকে জীবিত মানুষের চাপা দেওয়া সত্য।
আর সেই সত্য প্রকাশ পাওয়ার অপেক্ষায় বছরের পর বছর জলের তলায়ও থাকতে পারে।












Leave a Reply