
শহরের মাঝখানে একটি পুরোনো চারতলা বাড়ি। বাড়িটির ছাদে ছিল ছোট্ট একটি বাগান। নানা রকম গাছের ভিড়ে সেখানে একটি অদ্ভুত ফুলগাছ ছিল—বছরের পর বছর যার কোনো ফুল ফুটত না।
বাড়ির নতুন ভাড়াটে অয়ন প্রথম দিন ছাদে উঠে গাছটি দেখে অবাক হল।
পাশের বাড়ির মেয়ে মেঘলা বলল, “ওটা অনেক পুরোনো গাছ। কেউ জানে না কে লাগিয়েছিল।”
অয়ন হেসে বলল, “ফুল না ফুটলেও এত যত্ন কেন?”
মেঘলা উত্তর দিল, “কারণ কিছু জিনিস ফুলের জন্য নয়, অপেক্ষার জন্য বাঁচিয়ে রাখতে হয়।”
কথাটা অয়নের মনে গেঁথে গেল।
তারপর থেকে প্রতিদিন বিকেলে দুজনের দেখা হতে লাগল ছাদে। অয়ন গাছে জল দিত, মেঘলা শুকনো পাতা সরাত।
কথা বলতে বলতে দুজন কখন যে একে অপরের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি।
মেঘলা ছবি আঁকত। তার স্বপ্ন ছিল নিজের একটি প্রদর্শনী করা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না।
অয়ন বলত, “তুমি একদিন খুব বড় শিল্পী হবে।”
মেঘলা হেসে বলত, “তুমি সবসময় এত নিশ্চিন্ত কীভাবে থাকো?”
“কারণ তোমার ওপর আমার বিশ্বাস আছে।”
একদিন মেঘলা জানাল, সে অন্য শহরে একটি আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
অয়নের মুখে হাসি থাকলেও ভেতরে কোথাও একটা শূন্যতা তৈরি হল।
“তুমি যাবে?”
“যেতে চাই।”
“তাহলে অবশ্যই যাবে।”
মেঘলা বলল, “কিন্তু আমাদের?”
অয়ন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “দূরত্ব যদি সত্যিকারের সম্পর্ককে ভেঙে দেয়, তাহলে সেটা কখনও সত্যিকারের ছিল না।”
পরদিন মেঘলা চলে গেল।
প্রথম কয়েক মাস ফোনে কথা হত। তারপর কাজ, পড়াশোনা আর ব্যস্ততার কারণে কথাবার্তা কমে গেল।
একসময় প্রায় বন্ধই হয়ে গেল।
অয়নও নিজের কাজে ডুবে গেল।
তবু ছাদের সেই ফুলগাছটিতে সে নিয়ম করে জল দিত।
এক বছর কেটে গেল।
দুই বছর।
তিন বছর।
গাছটিতে ফুল ফুটল না।
একদিন বাড়ির মালিক বললেন, “গাছটা কেটে ফেলি? জায়গাটা খালি হবে।”
অয়ন বলল, “না। আর একটু থাকতে দিন।”
সেই বছর শরতের এক সকালে অয়ন ছাদে উঠে অবাক হয়ে গেল।
গাছটিতে একটি ফুল ফুটেছে।
অদ্ভুত সুন্দর নীলচে-বেগুনি ফুল।
ফুলটির নিচে একটি ছোট কাগজ বাঁধা।
অয়ন কাগজটি খুলে দেখল—
“তুমি এখনও গাছটায় জল দাও?”
অয়নের বুক কেঁপে উঠল।
এই হাতের লেখা সে চেনে।
মেঘলা!
সে চারদিকে তাকাল।
পেছন থেকে মেঘলার গলা শোনা গেল—
“উত্তরটা কী?”
অয়ন ঘুরে দাঁড়াল।
তিন বছর পর মেঘলা তার সামনে।
হাতে স্কেচবুক। চোখে সেই পুরোনো হাসি।
অয়ন কিছু বলতে পারল না।
মেঘলা নিজেই বলল, “আমি ফিরে এসেছি।”
“কেন?”
“কারণ অনেক দূরে গিয়ে বুঝেছি, স্বপ্ন পূরণ করার জন্য মানুষকে সবকিছু ছেড়ে দিতে হয় না।”
অয়ন মৃদু হেসে বলল, “তোমার প্রদর্শনী?”
মেঘলা স্কেচবুক খুলে দেখাল।
প্রথম পাতায় আঁকা সেই পুরোনো ছাদ।
ছাদের মাঝখানে একটি ফুলগাছ।
আর পাশে দাঁড়িয়ে দুজন মানুষ।
“আমার প্রথম প্রদর্শনীর নাম দিয়েছি—‘অপেক্ষার ফুল’।”
অয়ন কিছুক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর বলল, “তুমি জানো, এই গাছটা তিন বছর ফুল দেয়নি।”
মেঘলা হাসল।
“জানি।”
“তবু তুমি আশা রেখেছিলে?”
“গাছটার জন্য নয়।”
“তাহলে?”
মেঘলা ধীরে বলল,
“যে মানুষ সত্যিই ভালোবাসে, সে সবসময় অপেক্ষা করে না। কিন্তু সে এমন কিছু জিনিস যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখে, যেগুলো একদিন ফিরে আসার পথ চিনিয়ে দিতে পারে।”
অয়ন গাছটির দিকে তাকাল।
সকালের রোদে নীল ফুলটি দুলছিল।
তিন বছর ধরে যে গাছটি নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছিল, তার প্রথম ফুল যেন সেদিন দুজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া কথাগুলো আবার ফিরিয়ে দিল।
সেদিন সন্ধ্যায় ছাদের বাগানে আরও একটি নতুন গাছ লাগানো হল।
অয়ন জিজ্ঞেস করল, “এটার নাম কী?”
মেঘলা বলল,
“নতুন শুরু।”
অয়ন হেসে বলল,
“এবার কিন্তু নিয়ম করে জল দিতে হবে।”
মেঘলা বলল,
“এবার দুজন মিলে দেব।”
ছাদের আকাশে তখন সন্ধ্যার প্রথম তারা উঠেছে।
আর বহুদিন পর সেই পুরোনো বাড়ির ছাদে আবার দুজন মানুষের হাসির শব্দ শোনা গেল।












Leave a Reply