
সকাল সাড়ে সাতটা। প্রতিদিনের মতো অফিস যাওয়ার জন্য শহরতলির স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিল রুদ্র।
স্টেশনে তখন প্রচণ্ড ভিড়। কেউ ট্রেন ধরতে ছুটছে, কেউ চা খাচ্ছে, কেউ খবরের কাগজ পড়ছে।
হঠাৎ রুদ্রের চোখ পড়ল প্ল্যাটফর্মের শেষের একটি বেঞ্চে।
সেখানে একটি কালো ব্যাগ পড়ে আছে।
ব্যাগটির আশেপাশে কেউ নেই।
রুদ্র প্রথমে গুরুত্ব দিল না। কিন্তু প্রায় পনেরো মিনিট পরও যখন ব্যাগটি একই জায়গায় পড়ে থাকল, তার সন্দেহ হল।
সে স্টেশনের নিরাপত্তারক্ষীকে খবর দিল।
রক্ষী এসে ব্যাগটি পরীক্ষা করতে গিয়ে বললেন, “আপনি একটু দূরে যান।”
কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ এল।
ব্যাগ খুলে দেখা গেল, ভেতরে একটি পুরোনো ডায়েরি, কিছু নথি, একটি পেনড্রাইভ এবং একটি ছোট্ট খেলনা গাড়ি।
টাকা বা মূল্যবান কোনো জিনিস নেই।
পুলিশ ডায়েরিটি খুলে দেখল। প্রথম পাতায় লেখা—
“যে মানুষটি এই ব্যাগটি খুঁজে পাবেন, তিনি যেন পেনড্রাইভটি পুলিশের হাতে দেন।”
পুলিশ পেনড্রাইভটি পরীক্ষা করল।
তার মধ্যে ছিল কিছু ভিডিও।
ভিডিওতে দেখা গেল শহরের একটি নির্মাণস্থলে রাতের বেলা কয়েকজন মানুষ গোপনে মাটি খুঁড়ছে।
পরের ভিডিওতে দেখা গেল, একটি পুরোনো বাড়ি ভাঙার সময় কিছু নথি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ বুঝল, বিষয়টি সাধারণ নয়।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল—কোথাও ব্যাগটির মালিকের পরিচয় নেই।
রুদ্রের মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরতে লাগল।
কে ব্যাগটি রেখে গেল?
পরদিন সে আবার সেই স্টেশনে গেল।
প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চটির নিচে সে একটি ছোট কাগজ দেখতে পেল।
কাগজে লেখা—
“খেলনা গাড়িটাকে ভালো করে দেখুন।”
রুদ্র পুলিশকে খবর দিল।
খেলনা গাড়িটি পরীক্ষা করে তার ভেতরে একটি ক্ষুদ্র মেমোরি কার্ড পাওয়া গেল।
সেখানে ছিল একটি মাত্র ছবি।
একটি শিশুর ছবি।
ছবির পেছনে লেখা—
“ওকে খুঁজে বাঁচান।”
পুলিশ তদন্ত শুরু করল।
ছবিটি দেখে এক কর্মকর্তা বললেন, “এই শিশুটিকে আমি কোথাও দেখেছি।”
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জানা গেল, শিশুটি একটি নিখোঁজ মামলার সঙ্গে যুক্ত।
ছয় মাস আগে শহরের একটি অনাথ আশ্রম থেকে সাত বছরের একটি ছেলে নিখোঁজ হয়েছিল। অভিযোগ থাকলেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পুলিশ নতুন সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করল।
ভিডিওর নির্মাণস্থল, পুরোনো বাড়ি এবং কয়েকজন ব্যক্তির গতিবিধি পরীক্ষা করা হল।
অবশেষে একটি পরিত্যক্ত গুদামঘরের সন্ধান মিলল।
সেখানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করল।
শিশুটি ভয়ে কাঁপছিল।
কিন্তু সে জীবিত।
তদন্তে জানা গেল, একটি চক্র অনাথ ও অসহায় শিশুদের অন্যত্র পাচার করার চেষ্টা করছিল। কিছু মানুষ অর্থের বিনিময়ে তাদের পরিচয় বদলে দেওয়ার পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল।
ব্যাগটি রেখে যাওয়া ব্যক্তি সম্ভবত সেই চক্রের ভেতরের কেউ ছিলেন।
কিন্তু তিনি কে?
কেউ জানল না।
পুলিশ স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করল।
সেখানে দেখা গেল, ভোর ছয়টা দশ মিনিটে একজন বৃদ্ধ লোক প্ল্যাটফর্মে এসে ব্যাগটি বেঞ্চে রেখে চলে যাচ্ছেন।
মুখটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না।
কয়েকদিন পর রুদ্র আবার স্টেশনে গেল।
বেঞ্চটির কাছে দাঁড়িয়ে সে ভাবছিল, সেই অজ্ঞাত মানুষটি এখন কোথায়?
ঠিক তখনই এক বৃদ্ধ চা বিক্রেতা বললেন,
“ওই লোকটাকে আমি চিনি।”
রুদ্র চমকে উঠল।
“কে?”
চা বিক্রেতা বললেন, “লোকটা কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন এখানে আসত। একটা ছোট ছেলের ছবি হাতে নিয়ে বসে থাকত।”
“ছেলেটা কি তার নাতি?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“না। নিজের ছেলে নয়। আশ্রমে কাজ করত।”
রুদ্র বুঝল, সত্যিটা প্রকাশ করার জন্য লোকটি নিজের নিরাপত্তার কথাও ভাবেনি।
কিন্তু তার পরিচয় আর কখনও জানা গেল না।
কয়েক সপ্তাহ পর উদ্ধার হওয়া শিশুটিকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হল।
স্টেশনের সেই বেঞ্চটি অবশ্য আগের মতোই রয়ে গেল।
শুধু রুদ্র যখনই সেখানে বসত, তার মনে পড়ত সেই কালো ব্যাগটির কথা।
একদিন বেঞ্চে বসে সে দেখল, পাশে একটি ছোট ছেলে খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছে।
ছেলেটি হেসে বলল,
“দাদা, দেখুন! আমার গাড়িটা কত সুন্দর!”
রুদ্র মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাঁ। খুব সুন্দর।”
তারপর সে মনে মনে বলল—
কখনও কখনও একজন অচেনা মানুষের রেখে যাওয়া ছোট্ট একটি ব্যাগও কারও জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে।
আর পৃথিবীর সব নায়কের পরিচয় জানা যায় না।
কিছু মানুষ নিজের নাম না রেখেই মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে চলে যায়।












Leave a Reply