গিল্লি-ডান্ডা: হারিয়ে যেতে বসা এক দেশি খেলার স্মৃতি।

গিল্লি-ডান্ডা: মাঠের ধুলোয় মিশে থাকা শৈশবের এক অধ্যায়

একটা সময় ছিল, যখন শিশুদের খেলাধুলার জন্য দামি ব্যাট, বল, জার্সি কিংবা বিশেষ মাঠের প্রয়োজন হতো না। গ্রামের রাস্তার পাশে একটু খালি জায়গা, বাড়ির উঠোন, মাঠের ধারে পড়ে থাকা কয়েকটি কাঠের টুকরো—এই সামান্য উপকরণ দিয়েই শুরু হয়ে যেত আনন্দের খেলা। সেইসব দেশি খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল গিল্লি-ডান্ডা

বাংলায় এই খেলাটি ডাংগুলি নামেও পরিচিত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আবার এর বিভিন্ন নাম রয়েছে। কোথাও এটি ভিটি-দাণ্ডু, কোথাও কিটি-পুল্লু, কোথাও চিন্নি-দাণ্ডু নামে পরিচিত। মূলত দুটি কাঠের টুকরো দিয়ে এই খেলা খেলা হয়—একটি ছোট কাঠি ‘গিল্লি’ এবং অন্যটি বড় কাঠি ‘ডান্ডা’।

আজকের দিনে ক্রিকেট, ফুটবল, মোবাইল গেম এবং নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের দাপটে গিল্লি-ডান্ডা অনেক জায়গাতেই আগের মতো দেখা যায় না। অথচ একটা সময় এই খেলাই ছিল বহু গ্রাম ও মফস্বল এলাকার শিশু-কিশোরদের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন।

কীভাবে খেলা হতো গিল্লি-ডান্ডা?

গিল্লি-ডান্ডার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর সরলতা। খেলার জন্য খুব বেশি সরঞ্জামের প্রয়োজন হতো না। একটি ছোট কাঠের টুকরো, যার দুই প্রান্ত সাধারণত সরু করে তৈরি করা হতো, সেটিই গিল্লি। আর একটু লম্বা কাঠের লাঠি ছিল ডান্ডা।

খেলার জায়গায় সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থান তৈরি করা হতো। খেলোয়াড় ডান্ডার সাহায্যে গিল্লির এক প্রান্তে আঘাত করে সেটিকে মাটি থেকে উপরে তুলতেন। গিল্লি বাতাসে উঠলে সেটিকে আবার ডান্ডা দিয়ে জোরে আঘাত করে দূরে পাঠানোর চেষ্টা করা হতো।

অন্যদিকে মাঠে থাকা খেলোয়াড়রা চেষ্টা করতেন গিল্লিটি মাটিতে পড়ার আগেই ধরে ফেলতে। ধরা পড়লে ব্যাটিং করা খেলোয়াড় আউট হয়ে যেতে পারতেন। আবার বিভিন্ন অঞ্চলে খেলার নিয়মে কিছু পার্থক্যও ছিল। কোথাও গিল্লি কত দূরে গিয়েছে, তা ডান্ডার দৈর্ঘ্য দিয়ে মেপে পয়েন্ট দেওয়া হতো।

অর্থাৎ, আজকের ক্রিকেটের মতো এখানে ব্যাটসম্যান, ফিল্ডার এবং রান বা দূরত্বের হিসাবের ধারণা থাকলেও পুরো খেলাটিই ছিল অনেক বেশি স্বতঃস্ফূর্ত ও স্থানীয় নিয়মনির্ভর।

গ্রামের মাঠ থেকে পাড়ার গলি

গিল্লি-ডান্ডার জন্য বড় কোনো স্টেডিয়ামের দরকার ছিল না। গ্রামের খোলা মাঠ, বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গা কিংবা পাড়ার রাস্তার পাশের সামান্য জায়গাও হয়ে উঠত খেলার মাঠ।

পুরনো দিনের শিশুদের কাছে এটাই ছিল খেলার অন্যতম আনন্দ। স্কুল ছুটির পর বন্ধুরা এক জায়গায় জড়ো হতো। কারও হাতে থাকত ডান্ডা, কেউ তৈরি করত গিল্লি। তারপর শুরু হয়ে যেত খেলা।

এই খেলায় বয়সের ব্যবধানও অনেক সময় বড় বাধা ছিল না। ছোটরা যেমন খেলত, তেমনই কিশোররাও খেলায় যোগ দিত। অনেক ক্ষেত্রে খেলোয়াড়ের সংখ্যারও নির্দিষ্ট সীমা ছিল না। স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী দুই দল তৈরি করে খেলা চলত।

গিল্লি-ডান্ডার সঙ্গে ক্রিকেটের মিল

গিল্লি-ডান্ডার সঙ্গে ক্রিকেটের কিছু কাঠামোগত মিল রয়েছে। একটি কাঠের বস্তুতে লম্বা কাঠি দিয়ে আঘাত করে সেটিকে দূরে পাঠানো, প্রতিপক্ষের সেটি ধরার চেষ্টা এবং আঘাতের দূরত্বের ভিত্তিতে হিসাব—এই ধরনের বৈশিষ্ট্য গিল্লি-ডান্ডাকে ব্যাট-বলভিত্তিক অন্যান্য খেলার সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ করে।

কিছু ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া সংস্থা গিল্লি-ডান্ডাকে ক্রিকেট, বেসবল ও সফটবলের মতো পরবর্তী ব্যাটিং খেলাগুলোর সঙ্গে তুলনা করে থাকে। তবে গিল্লি-ডান্ডাই সরাসরি আধুনিক ক্রিকেটের উৎস—এমন দাবিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়; এই বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।

শুধু খেলা নয়, ছিল শারীরিক দক্ষতার অনুশীলন

গিল্লি-ডান্ডা দেখতে সহজ হলেও খেলতে যথেষ্ট দক্ষতার প্রয়োজন হতো। গিল্লিকে সঠিকভাবে আঘাত করার জন্য চোখ ও হাতের মধ্যে সমন্বয় দরকার। কখন আঘাত করতে হবে, কতটা জোরে করতে হবে এবং গিল্লি কোন দিকে যেতে পারে—এসব অনুমান করার ক্ষমতাও দরকার হয়।

খেলোয়াড়দের দৌড়াতে হতো, দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে হতো এবং মাঠের পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হতো। ফলে খেলাটি ছিল একই সঙ্গে বিনোদন এবং শারীরিক সক্রিয়তার একটি মাধ্যম। ঐতিহ্যবাহী গেম নিয়ে প্রকাশিত শিক্ষামূলক উপকরণেও গিল্লি-ডান্ডাকে হাত-চোখের সমন্বয়, বিচারক্ষমতা ও শারীরিক দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

খেলার সরঞ্জাম ছিল অত্যন্ত সস্তা

আজকের দিনে একটি ক্রিকেট ব্যাট বা ফুটবল কিনতে যথেষ্ট টাকা খরচ হতে পারে। কিন্তু গিল্লি-ডান্ডার জন্য সেই ধরনের খরচের প্রয়োজন ছিল না।

গাছের শুকনো ডাল বা কাঠের টুকরো কেটে অনেক সময় নিজেরাই গিল্লি ও ডান্ডা তৈরি করে নেওয়া হতো। ফলে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিশুরাও এই খেলায় অংশ নিতে পারত।

এই সহজলভ্যতাই গিল্লি-ডান্ডাকে একসময় এত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। মাঠ ছিল সবার, সরঞ্জাম ছিল সহজলভ্য এবং নিয়মও এলাকার মানুষের সুবিধা অনুযায়ী তৈরি করা যেত।

বাংলায় ডাংগুলির স্মৃতি

বাংলার গ্রামাঞ্চলেও গিল্লি-ডান্ডার নিজস্ব পরিচিতি রয়েছে—ডাংগুলি নামে। অনেক বয়স্ক মানুষ এখনও তাঁদের শৈশবের সঙ্গে এই খেলাটির স্মৃতি জড়িয়ে রাখেন।

একসময় বিকেল নামলেই গ্রামের ফাঁকা জায়গায় ছেলেদের দল ডাংগুলি খেলত। গাছের ডাল কেটে ছোট গিল্লি তৈরি করা, মাটিতে খেলার জায়গা নির্দিষ্ট করা, কে আগে খেলবে তা নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ তর্ক—সব মিলিয়ে খেলাটি হয়ে উঠত সামাজিক আনন্দের অংশ।

খেলার মধ্যে কখনও প্রতিযোগিতা থাকত, আবার কখনও শুধুই বন্ধুত্বপূর্ণ আনন্দ। জিতলে আনন্দ, হারলে আবার পরের দিন জেতার চেষ্টা—এইভাবেই তৈরি হতো শৈশবের অসংখ্য স্মৃতি।

কেন হারিয়ে যাচ্ছে গিল্লি-ডান্ডা?

সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। শহর ও মফস্বলে খোলা মাঠের সংখ্যা কমেছে। বাড়িঘর, রাস্তা ও অন্যান্য নির্মাণের কারণে অনেক জায়গায় শিশুদের অবাধে খেলার সুযোগ আগের তুলনায় সীমিত হয়েছে।

তার পাশাপাশি ক্রিকেট, ফুটবল এবং অন্যান্য সংগঠিত খেলাধুলার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ভিডিও গেম ও ইন্টারনেটও শিশুদের অবসর কাটানোর পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে।

ফলে গিল্লি-ডান্ডার মতো অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবন থেকে দূরে সরে গেছে। ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচনাতেও খোলা জায়গার সংকট এবং আধুনিক বিনোদনের প্রসারকে পুরনো দেশি খেলাগুলোর জনপ্রিয়তা কমার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হারিয়ে যাওয়া খেলাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?

গিল্লি-ডান্ডাকে আবার জনপ্রিয় করার জন্য বড় স্টেডিয়াম তৈরির প্রয়োজন নেই। স্কুলের মাঠ, গ্রামের খেলার মাঠ কিংবা স্থানীয় ক্লাবের উদ্যোগেই এই ধরনের খেলার আয়োজন করা সম্ভব।

বিদ্যালয়ে ‘ঐতিহ্যবাহী খেলা দিবস’ পালন করা যেতে পারে। শিশুদের শুধু আধুনিক খেলাধুলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দেশের পুরনো খেলাগুলোর ইতিহাসও জানানো যেতে পারে।

গ্রাম বা পাড়ায় ছোট প্রতিযোগিতা আয়োজন করা গেলে নতুন প্রজন্মের শিশুরা এই খেলাটির সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবীণ মানুষদের কাছ থেকে পুরনো নিয়ম ও স্মৃতিও সংগ্রহ করা যেতে পারে। এর ফলে শুধু একটি খেলা নয়, একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতিও সংরক্ষিত হবে।

স্মৃতির পাতায় নয়, মাঠে ফিরুক ডাংগুলি

গিল্লি-ডান্ডা শুধুমাত্র একটি পুরনো খেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামীণ জীবন, বন্ধুত্ব, শৈশব, খোলা মাঠ এবং খুব সামান্য উপকরণে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার এক সময়ের সংস্কৃতি।

আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো গিল্লি-ডান্ডা অপরিচিত। কিন্তু একসময় এই ছোট্ট কাঠের গিল্লি এবং একটি ডান্ডাই বহু শিশুর বিকেলকে আনন্দে ভরিয়ে দিত।

সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলাবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পুরনো খেলাগুলোর ইতিহাস যদি আমরা ভুলে যাই, তাহলে হারিয়ে যাবে আমাদের সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও। তাই গিল্লি-ডান্ডার মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে শুধু ‘পুরনো দিনের গল্প’ হিসেবে না দেখে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

হয়তো আবার কোনো এক বিকেলে গ্রামের মাঠে শোনা যাবে—“গিল্লিটা ধর! ধর!”

আর সেই শব্দের সঙ্গে ফিরে আসবে বহু পুরনো দিনের শৈশবের স্মৃতি।

তথ্যসূত্র: Traditional Games Federation of India, Central University/শিক্ষামূলক উপকরণ এবং ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *