পিট্টু বা সাতপাথর: এক সময়ের জনপ্রিয় দেশি খেলা, আজ স্মৃতির পাতায়।

পিট্টু বা সাতপাথর: সাতটি পাথর আর একটি বলেই জমে উঠত মাঠ

একটা সময় ছিল, যখন শিশুদের খেলাধুলার জন্য দামি সরঞ্জাম বা আধুনিক ক্রীড়া পরিকাঠামোর প্রয়োজন হতো না। গ্রামের মাঠ, পাড়ার খোলা জায়গা কিংবা বাড়ির পাশের সামান্য ফাঁকা জমিই হয়ে উঠত তাদের খেলার মাঠ। সেই সময়ের এমনই একটি জনপ্রিয় দলগত খেলা ছিল পিট্টু, যা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে লাগোরি, সাতপাথর, সেভেন স্টোনসসহ নানা নামে পরিচিত।

খেলার মূল উপকরণ ছিল কয়েকটি সমতল পাথর এবং একটি বল। সাধারণত সাতটি পাথর একটির উপর আরেকটি সাজিয়ে রাখা হতো। একটি দল বল ছুড়ে সেই পাথরের স্তূপ ভেঙে দিত। এরপর তাদের লক্ষ্য থাকত পাথরগুলো আবার সাজিয়ে দেওয়া। অন্য দল বল দিয়ে তাদের আটকানোর চেষ্টা করত।

সরল নিয়ম, সামান্য সরঞ্জাম এবং প্রচুর দৌড়ঝাঁপ—এই তিনটি বিষয়ই পিট্টুকে শিশুদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।

সাতটি পাথরের খেলা

পিট্টুর সবচেয়ে পরিচিত রূপে সাতটি সমতল পাথর ব্যবহার করা হয়। পাথরগুলো ছোট থেকে বড় বা সুবিধাজনক আকার অনুযায়ী একটির উপর আরেকটি সাজিয়ে একটি ছোট স্তম্ভ তৈরি করা হয়।

এরপর নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে একটি দল বল ছুড়ে পাথরের স্তূপে আঘাত করে। লক্ষ্য থাকে যত কম চেষ্টায় পাথরের স্তূপটি ভেঙে ফেলা যায়।

পাথর ভেঙে পড়ার পর শুরু হয় আসল উত্তেজনা।

যে দল বল ছুড়েছে, তাদের খেলোয়াড়রা ছড়িয়ে পড়ে ভাঙা পাথরগুলো সংগ্রহ করে আবার আগের মতো সাজানোর চেষ্টা করে। বিপক্ষ দল meanwhile বলটি নিয়ে তাদের খেলোয়াড়দের আঘাত করে আউট করার চেষ্টা করে।

পাথরগুলো আবার সাজিয়ে ফেলার আগে যদি কোনো খেলোয়াড় বলের আঘাতে বাদ পড়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি বদলে যায় এবং পালা অন্য দলের হাতে চলে যেতে পারে।

অঞ্চলভেদে নিয়মের পার্থক্য থাকলেও এই মূল কাঠামোটিই খেলাটির অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য।

কেন এত জনপ্রিয় ছিল?

পিট্টু জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এর সহজলভ্যতা।

ক্রিকেট খেলতে ব্যাট, বল, স্টাম্প দরকার। ফুটবলের জন্য দরকার বল ও উপযুক্ত মাঠ। কিন্তু পিট্টুর জন্য প্রায় যেকোনো জায়গা থেকেই কয়েকটি সমতল পাথর সংগ্রহ করা যেত।

একটি সাধারণ বল থাকলেই খেলা শুরু করা সম্ভব ছিল। অনেক সময় নির্দিষ্ট বল না থাকলে স্থানীয়ভাবে পাওয়া অন্য কোনো উপযুক্ত বলও ব্যবহার করা হতো।

ফলে অর্থনৈতিক সামর্থ্য এই খেলায় অংশগ্রহণের বড় বাধা ছিল না।

দলগত খেলার আনন্দ

পিট্টুর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি দলগত খেলা।

এখানে শুধু একজন খেলোয়াড়ের দক্ষতার উপর নির্ভর করে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় না। দলের প্রত্যেক সদস্যকে একে অপরকে সাহায্য করতে হয়।

একজন পাথর সংগ্রহ করছে, অন্যজন বিপক্ষের বল এড়িয়ে তাকে সাহায্য করছে। কেউ আবার দূরে গিয়ে বলটি আটকানোর চেষ্টা করছে।

ফলে খেলাটির মধ্যে তৈরি হয় সহযোগিতা, পরিকল্পনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস।

শিশুরা খেলার ছলে বুঝতে শিখত—একসঙ্গে কাজ করলে কঠিন পরিস্থিতিও সামলানো যায়।

দৌড়ঝাঁপে ভরা খেলা

পিট্টু বসে খেলার কোনো বিষয় নয়। পুরো খেলাতেই থাকে প্রচুর দৌড়ঝাঁপ।

পাথর ভেঙে যাওয়ার পর একদিকে যেমন দ্রুত সেগুলো সংগ্রহ করতে হয়, অন্যদিকে বিপক্ষের বল থেকে নিজেকে বাঁচাতেও হয়।

কখন কোথায় দৌড়াতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন সতীর্থকে সাহায্য করতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত মুহূর্তের মধ্যে নিতে হয়।

এই কারণে খেলাটি শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তার একটি স্বাভাবিক মাধ্যম হিসেবেও কাজ করত।

মাঠের পাশাপাশি তৈরি হতো বন্ধুত্ব

পুরনো দিনের দেশি খেলাগুলোর একটি বিশেষ দিক ছিল—সেগুলো শুধু শরীরচর্চা নয়, সামাজিক সম্পর্ক তৈরিরও মাধ্যম ছিল।

বিকেল হলেই পাড়ার ছেলেমেয়েরা এক জায়গায় জড়ো হতো। খেলা শুরু হওয়ার আগে দল ভাগ করা নিয়ে আলোচনা চলত। তারপর শুরু হতো প্রতিযোগিতা।

খেলার সময় তর্ক-বিতর্কও হতো। কেউ বলত বল লেগেছে, কেউ বলত লাগেনি। কেউ নিয়ম নিয়ে আপত্তি করত, আবার কিছুক্ষণ পরেই সবাই হাসতে হাসতে আবার খেলায় ফিরে যেত।

এই ছোটখাটো ঘটনাগুলোই শিশুদের বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করত।

আজকের ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে সেই স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিকতার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই কমে গেছে।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নাম

পিট্টু বা লাগোরির মতো খেলাগুলো ভারতের লোকজ ক্রীড়া সংস্কৃতির একটি বৈচিত্র্যময় অংশ। অঞ্চলভেদে এর নাম, নিয়ম এবং ব্যবহৃত উপকরণে পার্থক্য দেখা যায়।

কোথাও সাতটি পাথরের কারণে এটি ‘সাতপাথর’ নামে পরিচিত, কোথাও ‘লাগোরি’ বা ‘লিঙ্গোরি’, আবার কোথাও অন্য স্থানীয় নামে পরিচিত।

এই নামের বৈচিত্র্যই দেখায় যে খেলাটি কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে খেলাটি বিকশিত হয়েছে।

খেলাটির মধ্যে কৌশলও ছিল

দূর থেকে বল ছুড়ে পাথরের স্তূপ ভেঙে দেওয়া যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা সহজ নয়।

বল কত জোরে ছোড়া হবে, কোন কোণে ছোড়া হবে এবং পাথরের কোন অংশে আঘাত করলে স্তূপ দ্রুত ভেঙে পড়বে—এসব বুঝতে হতো।

আবার পাথর ভেঙে যাওয়ার পর অন্য দলের খেলোয়াড়দের সামনে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে পাথর সাজানোর ক্ষেত্রেও কৌশল দরকার হতো।

অর্থাৎ খেলাটির মধ্যে শক্তির পাশাপাশি উপস্থিত ছিল লক্ষ্য নির্ধারণ, সময়জ্ঞান, সতর্কতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

পিট্টু আর আজকের শিশু

বর্তমান সময়ে শিশুদের বিনোদনের ধরন অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোন, অনলাইন গেম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।

শহরাঞ্চলে খোলা মাঠও আগের তুলনায় কমেছে। অনেক আবাসিক এলাকায় শিশুদের স্বাধীনভাবে দল বেঁধে খেলার সুযোগ সীমিত।

ফলে পিট্টুর মতো দেশি খেলাগুলো অনেক জায়গায় নিয়মিত জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে খেলাটির প্রতি আগ্রহ একেবারে শেষ হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্কুল, ক্রীড়া সংগঠন এবং ঐতিহ্যবাহী খেলা সংরক্ষণে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝে এমন খেলাগুলোর আয়োজন করে থাকে।

স্কুলে ফিরতে পারে সাতপাথর

পিট্টুকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একটি সহজ জায়গা হতে পারে বিদ্যালয়।

স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে শুধু দৌড়, লং জাম্প বা ক্রিকেট নয়, ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

একটি ছোট খোলা জায়গা, সাতটি নিরাপদ সমতল কাঠের টুকরো বা পাথরের বিকল্প এবং নরম বল দিয়েই খেলাটি আয়োজন করা সম্ভব।

বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তার জন্য ধারালো বা ভারী পাথরের পরিবর্তে উপযুক্ত হালকা উপকরণ ব্যবহার করা যেতে পারে।

হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলো সংরক্ষণ কেন জরুরি?

একটি দেশের সংস্কৃতি শুধু সাহিত্য, সংগীত, স্থাপত্য বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অবসর, খেলাধুলা এবং শিশুদের বিনোদনের মধ্যেও সংস্কৃতির পরিচয় থাকে।

পিট্টুর মতো খেলাগুলো সেই লোকজ জীবনের সাক্ষ্য বহন করে।

এক প্রজন্ম যে খেলায় বড় হয়েছে, পরবর্তী প্রজন্ম সেটি না জানলে ধীরে ধীরে সেই স্মৃতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়ে যায়।

তাই পুরনো খেলাগুলোর নিয়ম, স্থানীয় নাম, খেলার ধরন এবং মানুষের স্মৃতি সংগ্রহ করে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণদের কাছ থেকে এই খেলাগুলোর গল্প সংগ্রহ করাও হতে পারে এক ধরনের লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ।

আবার কি মাঠে ফিরবে পিট্টু?

পিট্টুকে আগের সময়ের মতো সর্বত্র ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু নতুন প্রজন্মকে এই খেলার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া অবশ্যই সম্ভব।

একটি স্কুলের মাঠে কয়েকটি শিশু যখন সাতটি পাথর সাজিয়ে দাঁড়াবে, একটি বল হাতে নিয়ে অন্য দল প্রস্তুত হবে, আর প্রথম খেলোয়াড়টি দূর থেকে বল ছুড়বে—তখন হয়তো কয়েক দশক আগের সেই বিকেলগুলো আবার কিছুটা হলেও ফিরে আসবে।

পিট্টু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আনন্দ পাওয়ার জন্য সবসময় আধুনিক সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও সাতটি পাথর, একটি বল আর কয়েকজন বন্ধু দিয়েই একটি বিকেল স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারে।

পুরনো দিনের এই খেলাগুলো তাই শুধু অতীতের গল্প নয়। এগুলো আমাদের শৈশব, সামাজিকতা এবং দেশজ সংস্কৃতির একেকটি জীবন্ত স্মৃতি।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *