গল্প : হারিয়ে যাওয়া লাল ছাতাটি।

সেদিন সকাল থেকেই শহরে টানা বৃষ্টি।

রাস্তায় জল জমে গেছে। বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের হাতে নানা রঙের ছাতা।

সাংবাদিক তন্ময় একটি ছোট্ট খবরের জন্য পুরোনো বাজারের দিকে যাচ্ছিল। বাসে ওঠার সময় হঠাৎ এক বৃদ্ধা তার হাতে একটি লাল ছাতা দিয়ে বললেন,

“বাবা, এটা একটু রাখবে?”

তন্ময় অবাক হয়ে বলল, “কেন?”

বৃদ্ধা কিছু বললেন না। শুধু ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন।

তন্ময় ছাতাটি নিয়ে বাসে উঠল।

বাস থেকে নামার পর সে দেখল, ছাতার হাতলের নিচে ছোট্ট একটি কাগজ গোঁজা।

কাগজে লেখা—

“ছাতাটি যার কাছে যাবে, সে যেন বাজারের পুরোনো ঘড়ির নিচে যায়।”

তন্ময় প্রথমে বিষয়টি নিয়ে হাসল।

কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে অদ্ভুত ঘটনার প্রতি তার কৌতূহল ছিল।

সে পুরোনো বাজারে গিয়ে ঘড়ির নিচে দাঁড়াল।

কয়েক মিনিট পর একজন যুবক এসে তার পাশে দাঁড়াল।

“আপনার কাছে লাল ছাতাটা আছে?”

তন্ময় চমকে উঠল।

“আপনি কে?”

যুবক উত্তর দিল না।

সে শুধু বলল,

“ওটা খুলবেন না।”

তারপর দ্রুত চলে গেল।

তন্ময় ছাতাটার দিকে তাকাল।

কী এমন আছে এতে?

অবশেষে সে ছাতাটি খুলল।

ভেতরের কাপড়ের একটি অংশ অস্বাভাবিকভাবে মোটা।

সেলাই খুলতেই বেরিয়ে এল ছোট্ট একটি মেমোরি কার্ড।

তন্ময় সঙ্গে সঙ্গে বুঝল, ঘটনাটি গুরুতর।

সে কার্ডটি নিজের ল্যাপটপে খুলল।

ভেতরে কয়েকটি ভিডিও।

ভিডিওতে দেখা গেল শহরের একটি গুদামে রাতের বেলা কিছু মানুষ দামি ইলেকট্রনিক পণ্য বাক্সবন্দি করছে।

আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেল কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাদের গোপন বৈঠক।

তন্ময় বুঝতে পারল, এটি বড় ধরনের চোরাচালানের প্রমাণ হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন একটাই—

বৃদ্ধা তাকে কেন ছাতাটি দিলেন?

সে বাজারে ফিরে গিয়ে বৃদ্ধাকে খুঁজতে লাগল।

এক চায়ের দোকানি বলল,

“আপনি যে মহিলার কথা বলছেন, তিনি এখানে মাঝে মাঝে আসেন। তবে আজ সকালে তাকে দুজন লোক অনুসরণ করছিল।”

তন্ময়ের সন্দেহ আরও বাড়ল।

সে ভিডিওগুলোর কপি তৈরি করে পুলিশের এক পরিচিত কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে দিল।

সেই রাতেই তন্ময়ের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল।

“মেমোরি কার্ডটা ফেরত দিন।”

তন্ময় বলল, “কার্ডটা আমার কাছে নেই।”

ওপাশ থেকে কঠিন গলা—

“মিথ্যে বলবেন না।”

কল কেটে গেল।

পরদিন সকালে তন্ময় খবর পেল, পুরোনো বাজারের একটি গুদামে আগুন লেগেছে।

সে ঘটনাস্থলে গেল।

পুলিশ ইতিমধ্যে এলাকা ঘিরে ফেলেছে।

একজন কর্মকর্তা তাকে আলাদা করে বললেন,

“আগুন লাগার আগে গুদাম থেকে বেশ কিছু জিনিস সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।”

তন্ময় জিজ্ঞেস করল,

“কেউ ধরা পড়েছে?”

“একজন বৃদ্ধা।”

তন্ময়ের বুক ধক করে উঠল।

সে থানায় গেল।

সেখানে সেই বৃদ্ধাকে দেখতে পেল।

বৃদ্ধা তন্ময়কে দেখে বললেন,

“ছাতাটা ঠিক জায়গায় পৌঁছেছিল?”

তন্ময় মাথা নাড়ল।

“আপনি এসব করলেন কেন?”

বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“আমার ছেলে ওই গুদামে কাজ করত।”

তিনি জানালেন, কয়েক মাস আগে তার ছেলে চোরাচালানের ঘটনা জানতে পেরে প্রতিবাদ করেছিল। এরপর এক রাতে তার ছেলে নিখোঁজ হয়ে যায়।

বৃদ্ধা বিশ্বাস করতেন, ঘটনাটির সঙ্গে গুদামের লোকেরা জড়িত।

তিনি নিজে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।

কিন্তু একা পুলিশের কাছে যেতে ভয় পেয়েছিলেন।

তাই এমন একজনকে খুঁজছিলেন, যে প্রমাণ প্রকাশ করতে পারবে।

তন্ময় বলল,

“আপনি আমাকে বেছে নিলেন কেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,

“কারণ তুমি প্রতিদিন ওই বাজারের মানুষের সঙ্গে কথা বলো। তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল, তুমি সত্যিটা লুকাবে না।”

কয়েকদিনের তদন্তে চোরাচালান চক্রের বেশ কয়েকজন ধরা পড়ল।

বৃদ্ধার ছেলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটিও নতুন করে তদন্ত শুরু হল।

কয়েক মাস পর তার ছেলের সন্ধান পাওয়া গেল অন্য একটি শহরে। সে সেখানে ভয়ে আত্মগোপন করে ছিল।

মায়ের সঙ্গে তার দেখা হওয়ার দিন তন্ময়ও উপস্থিত ছিল।

বৃদ্ধা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন।

তন্ময় দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল।

তার চোখও ভিজে উঠেছিল।

বৃদ্ধা পরে তাকে লাল ছাতাটি ফেরত দিতে চাইলেন।

তন্ময় বলল,

“এটা আপনার কাছেই থাক।”

“কেন?”

“কারণ এটা শুধু একটা ছাতা নয়। এটা আপনার সাহসের গল্প।”

বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।

বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

তিনি লাল ছাতাটি খুলে মাথার ওপর ধরলেন।

আর তন্ময় বুঝল—

কখনও কখনও সত্যকে সামনে আনতে বড় কোনো অস্ত্রের দরকার হয় না।

একজন সাধারণ মানুষের সাহস আর একটি ছোট্ট প্রমাণই যথেষ্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *