
শৈশবের কিছু খেলা আছে, যেগুলোর জন্য কোনো ব্যাট-বল, বোর্ড বা দামি খেলনার প্রয়োজন হয় না। কয়েকজন বন্ধু, একটু খোলা জায়গা আর সামান্য কল্পনাশক্তিই যথেষ্ট। লুকোচুরি তেমনই একটি খেলা।
একজন চোখ বন্ধ করে নির্দিষ্ট সংখ্যা পর্যন্ত গুনবে, আর অন্যরা সেই সময়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়বে। গোনা শেষ হলে শুরু হবে খোঁজার পালা। কে কোথায় লুকিয়েছে? কে আগে ধরা পড়বে? কেউ কি গোপনে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে যাবে?
এই ছোট্ট রহস্য আর উত্তেজনাই লুকোচুরিকে শিশুদের কাছে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
লুকোচুরির কোনো একক নিয়ম নেই
লুকোচুরি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্নভাবে খেলা হয়েছে। বাংলাতেও পাড়া ও পরিবারভেদে এর নিয়ম বদলাতে দেখা যায়।
কোথাও একজন ‘চোখ-বন্ধ’ বা খোঁজার খেলোয়াড় থাকে। অন্যরা লুকিয়ে পড়ে। নির্দিষ্ট সময় পরে সে সবাইকে খুঁজতে শুরু করে।
আবার কোথাও একটি নির্দিষ্ট স্থানকে ‘ঘর’ বা নিরাপদ স্থান হিসেবে ধরা হয়। খোঁজার খেলোয়াড় কাউকে দেখতে পাওয়ার পর তাকে ধরে ফেলার চেষ্টা করে। অন্যদিকে লুকিয়ে থাকা খেলোয়াড়ের লক্ষ্য থাকে ধরা পড়ার আগে সেই নিরাপদ জায়গায় পৌঁছানো।
এই স্থানীয় বৈচিত্র্যই খেলাটিকে আরও মজার করে তুলত।
গোনা শেষ হলেই শুরু উত্তেজনা
লুকোচুরির সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্যটি সম্ভবত গোনার সময়।
একজন দেয়ালের দিকে মুখ করে বা চোখ বন্ধ করে গুনছে—
“এক… দুই… তিন…”
আর অন্যরা দৌড়ে নিজেদের পছন্দের জায়গা খুঁজছে।
কেউ দরজার আড়ালে, কেউ গাছের পাশে, কেউ আবার উঠোনের কোনো কোণে লুকিয়ে পড়ছে।
গোনা শেষ।
তারপর সেই বিখ্যাত ডাক—
“আমি কিন্তু আসছি!”
শুরু হয়ে গেল খোঁজ।
কোথায় লুকোবে, সেটাও ছিল কৌশল
লুকোচুরিতে ভালো লুকানোর জন্য শুধু দ্রুত দৌড়ালেই হতো না। জায়গা বেছে নেওয়ার বুদ্ধিও দরকার ছিল।
যে জায়গা খুব সহজে দেখা যায়, সেখানে লুকিয়ে লাভ নেই। আবার অত্যন্ত দূরে চলে গেলেও বিপদ হতে পারে।
তাই শিশুরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখত কোন জায়গাটি সুবিধাজনক।
একবার কোনো জায়গায় ধরা পড়লে পরেরবার সেখানে না লুকিয়ে নতুন জায়গা বেছে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যেত।
এভাবেই খেলতে খেলতে শিশুরা পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করত।
শুধু লুকিয়ে থাকাই নয়
লুকোচুরির আসল মজা অনেক সময় লুকিয়ে থাকার মুহূর্তে।
কাছেই কেউ হাঁটছে, অথচ নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করা যাবে না। বন্ধুর পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে, কিন্তু নড়াচড়া করলে ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
আবার কখনও খোঁজার খেলোয়াড় একেবারে কাছ দিয়ে চলে গেলেও লুকিয়ে থাকা শিশু নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে।
এই অপেক্ষার মধ্যেই তৈরি হতো খেলাটির উত্তেজনা।
পাড়ার সামাজিক জীবনের অংশ
লুকোচুরি শুধু শিশুদের খেলা ছিল না; অনেক পাড়ায় এটি ছিল সামাজিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম।
বিকেলে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়া, সবাই মিলে দল তৈরি করা এবং তারপর খেলা শুরু করা—এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল শৈশবের সামাজিক জীবনের অংশ।
একই খেলায় বিভিন্ন বয়সের শিশুরাও কখনও অংশ নিত। বড়রা ছোটদের নিয়ম বুঝিয়ে দিত, আবার ছোটরা নিজেদের নতুন কৌশল আবিষ্কার করত।
খেলার মধ্য দিয়ে পরিচয় হতো নতুন বন্ধুদের সঙ্গে।
শহরের জীবন ও লুকোচুরির পরিবর্তন
আগে অনেক বাড়িতে বড় উঠোন ছিল। গ্রামে ছিল খোলা মাঠ, গাছপালা এবং বিস্তৃত বাড়ির আঙিনা। ফলে লুকোচুরির জন্য নানা জায়গা পাওয়া যেত।
বর্তমানে বহু শহরে আবাসিক জীবন অনেক বেশি ঘনবসতিপূর্ণ। গাড়ি, নির্মাণকাজ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং নানা ধরনের ঝুঁকি থাকায় শিশুদের ইচ্ছেমতো যেকোনো জায়গায় লুকিয়ে পড়া নিরাপদ নয়।
ফলে খেলাটির পুরনো রূপ অনেক জায়গায় হারিয়ে গেছে।
তবে নিরাপদ জায়গা নির্ধারণ করে লুকোচুরি এখনও খেলা সম্ভব।
শিশুদের নিরাপত্তা: লুকোচুরিতে বিশেষ সতর্কতা জরুরি
লুকোচুরি খেলায় নিরাপত্তার বিষয়টি অন্য অনেক দৌড়ের খেলার তুলনায় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ খেলায় লুকিয়ে থাকার জন্য শিশু কখনও এমন জায়গা বেছে নিতে পারে, যেখানে বড় বিপদ রয়েছে।
খেলার আগে বড়দের স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিতে হবে—কোন কোন জায়গায় লুকানো যাবে এবং কোন কোন জায়গায় একেবারেই যাওয়া যাবে না।
কখনও শিশুদের—
- ছাদ বা বারান্দার রেলিংয়ের কাছে,
- সিঁড়ির বিপজ্জনক অংশে,
- আলমারি, বাক্স বা এমন বন্ধ জায়গায় যেখানে আটকে যেতে পারে,
- গাড়ির নিচে বা গাড়ির পেছনে,
- নির্মাণাধীন বাড়িতে,
- পরিত্যক্ত বাড়িতে,
- পুকুর, নদী, খাল বা গভীর জলাশয়ের পাশে,
- রেললাইন বা ব্যস্ত রাস্তার কাছে
লুকাতে দেওয়া উচিত নয়।
বিশেষ করে গাড়ির ভিতর বা এমন কোনো বন্ধ জায়গায় লুকানো উচিত নয়, যেখান থেকে শিশুর বের হওয়া কঠিন হতে পারে।
লুকোচুরি খেলতে গিয়ে শিশুরা যেন খেলার সীমানার বাইরে চলে না যায়, সেটাও আগে থেকেই পরিষ্কার করে দিতে হবে।
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে একজন বড় মানুষের নজরদারি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেলার আগে সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে—কেউ যদি ভয় পায়, অসুস্থ বোধ করে বা কোথাও আটকে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সাহায্যের জন্য ডাকতে হবে।
এখানে একটি নিয়ম বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার:
লুকিয়ে থাকার জন্য কখনও নিজের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যাবে না।
আধুনিক সময়ে লুকোচুরির নতুন রূপ
লুকোচুরি ফিরিয়ে আনতে হলে পুরনো নিয়ম হুবহু অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। নিরাপদ স্কুল প্রাঙ্গণ, কমিউনিটি হলের খোলা অংশ বা বাড়ির নির্দিষ্ট উঠোন ব্যবহার করা যেতে পারে।
খেলার এলাকা আগে থেকেই চিহ্নিত করা যেতে পারে। ছোট শিশুদের জন্য এলাকা আরও ছোট রাখা যায় এবং খেলার সময়সীমাও কম রাখা যায়।
প্রয়োজনে বড়রা খেলার বাইরে থেকে নজর রাখতে পারেন।
এতে শিশুরা স্বাধীনভাবে খেলবে, আবার অভিভাবকরাও নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।
হারিয়ে যাওয়া সেই ডাক
আজকের দিনে অনেক শিশু হয়তো লুকোচুরি খেলতে জানে, কিন্তু আগের প্রজন্মের মতো পাড়ার পর পাড়া দল বেঁধে খেলার অভিজ্ঞতা তাদের হয় না।
তবুও লুকোচুরি এমন একটি খেলা, যা খুব সহজেই নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনা যায়।
একটি নিরাপদ জায়গা, কয়েকজন বন্ধু এবং কিছু নিয়ম—এই সামান্য আয়োজনেই তৈরি হতে পারে আনন্দের পরিবেশ।
শৈশবের স্মৃতিতে লুকোচুরি তাই শুধু একটি খেলার নাম নয়। এটি অপেক্ষা, উত্তেজনা, বন্ধুত্ব, হাসি আর হঠাৎ ধরা পড়ে যাওয়ার আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক টুকরো অতীত।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও সেই পরিচিত ডাকটি যেন এখনও কোথাও শোনা যায়—
“সবাই লুকিয়েছ? আমি আসছি!”
আর সেই ডাকের সঙ্গে ফিরে আসে এক সরল, নির্মল শৈশব।












Leave a Reply