হাতের আঁকা সাইনবোর্ড কি হারিয়ে যাবে? গ্রামবাংলার অক্ষরশিল্প, ছোট ব্যবসা ও বদলে যাওয়া বিজ্ঞাপনের দুনিয়া নিয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার।

গ্রামবাংলার অক্ষরশিল্প, ছোট ব্যবসা ও বদলে যাওয়া বিজ্ঞাপনের দুনিয়া নিয়ে সাইনবোর্ড শিল্পী রতন হালদারের সঙ্গে মুখোমুখি

বিশেষ সাক্ষাৎকার | কাল্পনিক

একটা সময় ছিল, রাস্তার ধারে দাঁড়ালেই চোখে পড়ত হাতে আঁকা অসংখ্য সাইনবোর্ড। চায়ের দোকানের সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা থাকত দোকানের নাম, সেলুনের দেওয়ালে দেখা যেত রঙিন চুলের নকশা, মিষ্টির দোকানের বোর্ডে আঁকা থাকত রসগোল্লা বা সন্দেশের ছবি। ওষুধের দোকান, সাইকেল মেরামতির দোকান, কাপড়ের ব্যবসা, ছোট হোটেল, গ্যারেজ—প্রায় প্রতিটি ব্যবসার নিজস্ব পরিচয় তৈরি করত হাতে আঁকা বোর্ড।

সেই বোর্ড শুধু বিজ্ঞাপন ছিল না। তার মধ্যে ছিল অক্ষরের নিজস্ব সৌন্দর্য, শিল্পীর হাতের ছোঁয়া এবং স্থানীয় বাজারের আলাদা চরিত্র।

ডিজিটাল প্রিন্টিং, ফ্লেক্স, এলইডি বোর্ড ও অনলাইন বিজ্ঞাপনের যুগে সেই হাতের কাজ অনেকটাই কমে এসেছে। কিন্তু এখনও বিভিন্ন গ্রাম ও মফস্বলের বাজারে কিছু শিল্পী হাতে রং-তুলি নিয়ে সাইনবোর্ড আঁকেন।

এই বদলে যাওয়া শিল্প নিয়ে আমাদের কাল্পনিক সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হলেন দীর্ঘদিনের সাইনবোর্ড শিল্পী রতন হালদার


প্রশ্ন: রতনবাবু, হাতে আঁকা সাইনবোর্ডকে আপনি শিল্প বলবেন, না শুধু ব্যবসার কাজ?

রতন হালদার: আমি বলব দুটোই। সাইনবোর্ডের প্রথম উদ্দেশ্য অবশ্যই ব্যবসার পরিচয় দেওয়া। কিন্তু সেই পরিচয় তৈরি করতে যে অক্ষর, রং, ছবি ও বিন্যাস ব্যবহার করা হয়, তার মধ্যে শিল্পের ব্যাপার আছে।

একটি বোর্ডে দোকানের নাম লেখা হলেই কাজ শেষ নয়। কোথায় বড় অক্ষর থাকবে, কোথায় ছোট, কোন শব্দ দূর থেকে পরিষ্কার দেখা যাবে, কোন রং অন্য রঙের ওপর ভালো ফুটবে—এসব ভাবতে হয়।

তার সঙ্গে যদি কোনও ছবি থাকে, সেটিও এমনভাবে আঁকতে হয় যাতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পথচারীর চোখে পড়ে।

তাই এটি একই সঙ্গে কারিগরি এবং শিল্প।


প্রশ্ন: আপনি কীভাবে এই কাজ শিখেছিলেন?

উত্তর: আমার শেখাটা কোনও প্রতিষ্ঠানে বসে হয়নি। ছোটবেলায় এক প্রবীণ শিল্পীর কাছে কাজ দেখতাম।

প্রথমে আমার কাজ ছিল রং মেশানো, তুলি পরিষ্কার করা, বোর্ড প্রস্তুত করা। পরে বড় অক্ষরের বাইরে ছোট অক্ষর লিখতে দেওয়া হয়।

হাতের লেখা ভালো হলেই সাইনবোর্ড লেখা যায় না। অক্ষরের মাপ ঠিক রাখতে হয়। একই লাইনে সব অক্ষরকে ভারসাম্যের মধ্যে রাখতে হয়।

একসময় বুঝলাম, বোর্ডে লেখা মানে কাগজে লেখা নয়। দূর থেকে মানুষ কীভাবে দেখবে, সেটাই আসল।


প্রশ্ন: সাইনবোর্ডের জন্য অক্ষর আঁকা কি সাধারণ হাতের লেখার থেকে আলাদা?

উত্তর: অনেকটাই আলাদা।

কাগজে ছোট করে সুন্দর লেখা আর বড় বোর্ডে অক্ষর আঁকা এক বিষয় নয়। বড় অক্ষরের ক্ষেত্রে সামান্য ভুলও চোখে পড়ে।

ধরুন, একটি দোকানের নাম পাঁচ মিটার দূর থেকে পড়তে হবে। তখন অক্ষরের আকার, ফাঁক এবং রঙের বৈপরীত্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা অক্ষরের নিজস্ব গঠন আছে। কার, ফলা, যুক্তাক্ষর—এসব ঠিকভাবে বসাতে না পারলে বড় বোর্ডে লেখা অস্বস্তিকর দেখাতে পারে।

একজন অভিজ্ঞ শিল্পী সাধারণত বোর্ডে রং দেওয়ার আগে হালকা রেখা দিয়ে পুরো বিন্যাস ঠিক করে নেন।


প্রশ্ন: আগে কি শুধু বাংলা অক্ষরেই সাইনবোর্ড লেখা হতো?

উত্তর: না। বাংলা, ইংরেজি এবং অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যাও ব্যবহার করা হতো।

গ্রামবাংলার বাজারে এমন বোর্ডও দেখা যেত যেখানে একই দোকানের নাম বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় লেখা হয়েছে।

কখনও আবার দোকানের নামের সঙ্গে পণ্যের ছবি থাকত। যেমন চায়ের দোকানে কাপ, মিষ্টির দোকানে মিষ্টি, মাছের দোকানে মাছের ছবি।

এই ছবিগুলো অনেক সময় শিল্পীর নিজস্ব কল্পনা থেকে তৈরি হতো।


প্রশ্ন: হাতে আঁকা সাইনবোর্ডের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কোথায়?

উত্তর: এর অসম্পূর্ণতার মধ্যেই সৌন্দর্য।

ডিজিটাল প্রিন্টে একই অক্ষর বারবার একরকম হয়। হাতে আঁকা বোর্ডে সামান্য পার্থক্য থাকে। একটি অক্ষর অন্যটির তুলনায় সামান্য মোটা হতে পারে, কোথাও তুলি চলার দাগ থাকতে পারে।

কিন্তু সেই কারণে বোর্ডটির একটি ব্যক্তিগত পরিচয় তৈরি হয়।

আপনি বুঝতে পারেন, এটি কোনও একজন মানুষের হাতে তৈরি।


প্রশ্ন: তাহলে ডিজিটাল প্রিন্টিং আসার পর কী পরিবর্তন হয়েছে?

উত্তর: সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে সময় ও খরচের ক্ষেত্রে।

আগে একটি বড় বোর্ড তৈরি করতে কয়েক ঘণ্টা বা কখনও এক-দুদিনও লাগত। এখন কম্পিউটারে ডিজাইন তৈরি করে প্রিন্ট করা যায়।

একই ডিজাইন অনেকবার ব্যবহার করা যায়। ছবি পরিষ্কার থাকে, অক্ষর একই রকম থাকে।

ব্যবসায়ীরা দ্রুত কাজ চান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ডিজিটাল প্রিন্টিং জনপ্রিয় হয়েছে।


প্রশ্ন: এতে কি হাতে আঁকা শিল্পীরা কাজ হারিয়েছেন?

উত্তর: অনেক ক্ষেত্রেই কাজ কমেছে। বিশেষ করে বড় আকারের সাধারণ বিজ্ঞাপন বোর্ডে।

তবে হাতে আঁকা কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিছু ব্যবসায়ী এখনও আলাদা ধরনের বোর্ড চান।

কেউ পুরনো দিনের চেহারা চান, কেউ কাঠের ওপর লেখা চান, কেউ নিজের দোকানের জন্য আলাদা নকশা চান।

আবার কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মেলা বা থিমভিত্তিক দোকানেও হাতে আঁকা কাজের চাহিদা আছে।


প্রশ্ন: একজন সাইনবোর্ড শিল্পীর কাজ শুরু হয় কোথা থেকে?

উত্তর: বোর্ড প্রস্তুত করা দিয়ে।

কাঠ, ধাতু বা অন্য কোনও উপকরণ ব্যবহার করা হলে সেটিকে পরিষ্কার করতে হয়। পুরনো রং থাকলে তা সরাতে হয়।

তারপর বেস কোট বা প্রাথমিক রং দেওয়া হয়। শুকিয়ে গেলে অক্ষরের বিন্যাস করা হয়।

এরপর ধীরে ধীরে বড় অক্ষর, ছোট লেখা, ছবি এবং অলংকরণ করা হয়।

সবশেষে প্রয়োজন অনুযায়ী সুরক্ষামূলক আবরণ দেওয়া হয়, যাতে রোদ-বৃষ্টিতে রং দ্রুত নষ্ট না হয়।


প্রশ্ন: রং বাছাই করার সময় কী কী ভাবতে হয়?

উত্তর: বোর্ড কোথায় থাকবে সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।

রাস্তার পাশে থাকলে দূর থেকে পড়া দরকার। দোকানের ভিতরের বোর্ড হলে অন্যরকম হতে পারে।

ব্যাকগ্রাউন্ড এবং অক্ষরের মধ্যে যথেষ্ট বৈপরীত্য দরকার।

আবার সব রং একসঙ্গে ব্যবহার করলেই সুন্দর হয় না। অতিরিক্ত রং দিলে বোর্ড বিশৃঙ্খল দেখাতে পারে।

একজন শিল্পীকে বুঝতে হয় কোথায় থামতে হবে।


প্রশ্ন: সাইনবোর্ডে ছবি আঁকার কাজ কতটা কঠিন?

উত্তর: নির্ভর করে ছবির ওপর।

আগে অনেক দোকানের বোর্ডে মানুষের মুখ, সিনেমার অভিনেতা, খাবার, গাড়ি বা পণ্যের ছবি হাতে আঁকা হতো।

মানুষের মুখ আঁকা বিশেষ কঠিন। কয়েকটি রেখার ভুলেই মুখের অভিব্যক্তি বদলে যেতে পারে।

তবে সাইনবোর্ডের ছবি সাধারণত দূর থেকে দেখার জন্য তৈরি হয়। তাই খুব বেশি সূক্ষ্ম কাজের পরিবর্তে পরিষ্কার আকৃতি ও শক্তিশালী রেখা গুরুত্বপূর্ণ।


প্রশ্ন: দোকানের মালিকরা কি নিজেদের মতো ডিজাইন চাইতেন?

উত্তর: অবশ্যই।

কেউ বলতেন, ‘আমার দোকানের নামটা খুব বড় করে লিখবেন।’

কেউ বলতেন, ‘মিষ্টির ছবিটা যেন দূর থেকেই দেখা যায়।’

কেউ আবার পাশের দোকানের থেকে আলাদা কিছু চাইতেন।

অনেক সময় মালিকের সঙ্গে শিল্পীর দীর্ঘ আলোচনা হতো। এখন সেই কাজের অনেকটাই কম্পিউটারের ডিজাইনার করেন।


প্রশ্ন: গ্রামের বাজারের সাইনবোর্ড কি কোনও এলাকার ইতিহাসও বহন করতে পারে?

উত্তর: অবশ্যই।

একটি পুরনো বাজারের সাইনবোর্ড দেখলে বোঝা যায় সেই সময়ে কী ধরনের দোকান ছিল।

কোনও দোকানের নাম হয়তো কোনও পেশার সঙ্গে যুক্ত। কোনও দোকানের নাম কোনও পুরনো পরিবারের পরিচয় বহন করছে।

কোথাও স্থানীয় ভাষার শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও পুরনো বানান দেখা যাচ্ছে।

এই কারণে পুরনো সাইনবোর্ডের ছবি সংগ্রহ করা স্থানীয় ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।


প্রশ্ন: কখনও কি কোনও পুরনো সাইনবোর্ড দেখে আপনি অতীতের কোনও ঘটনা মনে করেছেন?

উত্তর: অনেকবার।

একবার একটি পুরনো চায়ের দোকানের বোর্ড দেখে মনে পড়েছিল, সেখানে ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম।

বোর্ডটি তখন নতুন ছিল। বহু বছর পর দেখি রং উঠে গেছে, কিন্তু অক্ষরগুলো এখনও বোঝা যাচ্ছে।

তখন মনে হল, একটি বোর্ডও মানুষের জীবনের সাক্ষী হয়ে থাকতে পারে।

আমরা সাধারণত বড় বড় ভবন, মূর্তি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সংরক্ষণ করার কথা ভাবি। কিন্তু সাধারণ দোকানের একটি পুরনো বোর্ডও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ইতিহাস বহন করে।


প্রশ্ন: এই শিল্পে বাংলা ভাষার ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

উত্তর: খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলা অক্ষরের গঠন খুব সুন্দর। বড় আকারে লিখলে তার আলাদা নান্দনিকতা তৈরি হয়।

তবে যুক্তাক্ষর বা জটিল শব্দ বড় বোর্ডে লিখতে দক্ষতা দরকার।

আরেকটি বিষয় হল বানান। একজন সাইনবোর্ড শিল্পীকে ভাষার মৌলিক জ্ঞান থাকা দরকার। ভুল বানানে একটি দোকানের নাম লিখে দিলে সেটি দীর্ঘদিন মানুষের চোখের সামনে থাকে।

তাই শিল্পীর পাশাপাশি ভাষার প্রতিও দায়িত্ব আছে।


প্রশ্ন: আজকের দিনে হাতে আঁকা সাইনবোর্ডের নতুন বাজার কোথায় তৈরি হতে পারে?

উত্তর: অনেক জায়গায়।

রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র, হস্তশিল্পের দোকান, বইয়ের দোকান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—এসব জায়গায় হাতে আঁকা বোর্ড আলাদা পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

শুধু দোকানের নাম নয়, হাতে লেখা মেনু, দেওয়ালচিত্র, দিকনির্দেশক বোর্ড—এসব ক্ষেত্রেও কাজ হতে পারে।

এমনকি বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্যও হাতে আঁকা স্বাগত বোর্ড তৈরি করা যায়।


প্রশ্ন: তরুণ প্রজন্মকে এই কাজে আনা সম্ভব?

উত্তর: সম্ভব, তবে পুরনো পদ্ধতিতে শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না।

তরুণদের অক্ষর আঁকার পাশাপাশি ডিজিটাল ডিজাইনও শেখানো যেতে পারে।

একজন শিল্পী হাতে আঁকা অক্ষর ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করতে পারেন। নিজের তৈরি অক্ষরের ধরন থেকে ডিজিটাল ফন্টের ধারণাও তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ তুলি ও কম্পিউটারকে একে অপরের শত্রু না বানিয়ে একসঙ্গে ব্যবহার করা দরকার।


প্রশ্ন: হাতে আঁকা সাইনবোর্ড কি ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে মিশে যেতে পারে?

উত্তর: অবশ্যই।

ধরুন, একটি দোকানের মূল নাম হাতে আঁকা। তার পাশে ছোট একটি QR কোড রয়েছে। ক্রেতা সেটি স্ক্যান করে দোকানের অনলাইন পেজে যেতে পারছেন।

অথবা হাতে আঁকা একটি বোর্ডের ছবি তুলে সেটিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা যেতে পারে।

এমনকি কোনও শিল্পী তাঁর হাতে আঁকা অক্ষরকে ডিজিটাল ডিজাইনে ব্যবহার করতে পারেন।

ঐতিহ্যকে ডিজিটালের সঙ্গে যুক্ত করলে তার বাজার বাড়তে পারে।


প্রশ্ন: এই শিল্পের সঙ্গে পরিবেশেরও কোনও সম্পর্ক আছে?

উত্তর: আছে, যদিও বিষয়টি খুব বড় করে বলা উচিত নয়।

ডিজিটাল প্রিন্টে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ ও ব্যানার ব্যবহারের পর বর্জ্য তৈরি হতে পারে। হাতে আঁকা একটি পুরনো কাঠের বোর্ড অনেক সময় নতুন করে রং করে আবার ব্যবহার করা যায়।

তবে রং, দ্রাবক বা অন্যান্য উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

শুধু ‘হাতে তৈরি’ হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবেশবান্ধব—এমন ধারণা ঠিক নয়।


প্রশ্ন: পুরনো সাইনবোর্ড সংরক্ষণ করতে হলে কী করা উচিত?

উত্তর: প্রথমে ছবি তুলতে হবে।

বোর্ডটি কোথায় ছিল, কোন দোকানের, আনুমানিক কত বছরের, কে এঁকেছিলেন—যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।

যদি বোর্ডটি এখনও ব্যবহারযোগ্য হয়, তাহলে মালিকের অনুমতি নিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

অতি পুরনো কাঠের বোর্ড হলে সরাসরি নতুন রং করে পুরনো অক্ষর ঢেকে দেওয়া উচিত নয়। তার আগে তার ছবি ও তথ্য নথিভুক্ত করা দরকার।


প্রশ্ন: একটি পুরনো সাইনবোর্ডকে কি মিউজিয়ামে রাখা যায়?

উত্তর: অবশ্যই। তবে আরও ভালো হয় যদি শুধু বোর্ড না রেখে তার গল্পটিও রাখা হয়।

বোর্ডটি কোন বাজারে ছিল, দোকানটি কী বিক্রি করত, কত বছর চলেছিল, কে বোর্ডটি এঁকেছিলেন—এসব তথ্য পাশে থাকলে দর্শক বুঝতে পারবেন এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ।

একটি ছোট ‘স্থানীয় বাজারের ইতিহাস’ প্রদর্শনীতে এমন বহু বোর্ড রাখা যেতে পারে।


প্রশ্ন: স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের এই শিল্প শেখানো যেতে পারে?

উত্তর: খুব সহজেই।

প্রথমে ছোট কাঠ বা শক্ত কাগজে বড় অক্ষর আঁকার অনুশীলন করা যায়।

তারপর শিক্ষার্থীদের বলা যেতে পারে নিজেদের স্কুলের জন্য একটি কাল্পনিক সাইনবোর্ড তৈরি করতে।

কেউ বাংলা অক্ষর ব্যবহার করবে, কেউ পুরনো শৈলী অনুসরণ করবে, কেউ আধুনিক নকশা করবে।

এর মাধ্যমে তারা অক্ষর, অনুপাত, রং এবং নকশা সম্পর্কে ধারণা পাবে।


প্রশ্ন: এই কাজের মধ্যে গণিতও আছে কি?

উত্তর: অবশ্যই আছে।

একটি বড় বোর্ডকে সমান ভাগে ভাগ করা, অক্ষরের উচ্চতা নির্ধারণ করা, শব্দের মধ্যে দূরত্ব রাখা—এসবের মধ্যে অনুপাতের ব্যবহার আছে।

একটি লম্বা বোর্ডে যদি অক্ষর খুব বড় হয়, সব লেখা ধরবে না। আবার খুব ছোট হলে দূর থেকে দেখা যাবে না।

তাই একজন দক্ষ সাইনবোর্ড শিল্পী অনেক সময় হিসাব করেই অক্ষর বসান।


প্রশ্ন: সাইনবোর্ড শিল্পী হিসেবে আপনার সবচেয়ে কঠিন কাজ কোনটি?

উত্তর: কম সময়ে পরিষ্কার কাজ করা।

দোকানের মালিকের তাড়া থাকে। দোকান বন্ধ রেখে বোর্ড বানানো সম্ভব নয়।

আবার তাড়াহুড়ো করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আরেকটি কঠিন বিষয় হল এমন জায়গায় কাজ করা যেখানে বাতাস, ধুলো বা বৃষ্টি আছে।

তবুও কাজ শেষ করার পর যখন দেখি দূর থেকে দোকানের নাম পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, তখন ভালো লাগে।


প্রশ্ন: এই পেশায় সম্মানের অভাব আছে বলে মনে করেন?

উত্তর: কিছু ক্ষেত্রে আছে।

মানুষ অনেক সময় ভাবেন, ‘এ তো শুধু নাম লিখে দেওয়া।’

কিন্তু একটি সুন্দর বোর্ড তৈরি করতে যে দক্ষতা দরকার, সেটি বোঝা দরকার।

একজন দক্ষ শিল্পী অল্প সময়ের মধ্যে অক্ষরের মাপ, দূরত্ব, রং এবং বিন্যাস ঠিক করতে পারেন। এই দক্ষতা বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আসে।

কারিগরি কাজের মর্যাদা বাড়ানো দরকার।


প্রশ্ন: ভবিষ্যতে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সবচেয়ে জরুরি কী?

উত্তর: তিনটি বিষয় বলব—শিক্ষা, বাজার এবং নথিভুক্তকরণ।

শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে অক্ষর ও আঁকার কৌশল শেখাতে হবে।

বাজারের মাধ্যমে শিল্পীকে আয় করার সুযোগ দিতে হবে।

আর নথিভুক্তকরণের মাধ্যমে পুরনো কাজ ও জ্ঞান হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে।

এই তিনটি একসঙ্গে না হলে শুধু আবেগ দিয়ে শিল্প বাঁচানো কঠিন।


প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন হাতে আঁকা সাইনবোর্ড আবার জনপ্রিয় হতে পারে?

উত্তর: আগের মতো সর্বত্র ফিরে আসবে কি না, সেটা বলা কঠিন। তবে নতুন ধরনের জনপ্রিয়তা তৈরি হতে পারে।

মানুষ এখন অনেক সময় এমন জিনিস পছন্দ করেন যার মধ্যে ব্যক্তিগত ও হাতে তৈরি অনুভূতি রয়েছে।

তাই হাতে আঁকা অক্ষর, পুরনো বাজারের নকশা বা ঐতিহ্যবাহী সাইনবোর্ডের শৈলী নতুন ব্যবসার ব্র্যান্ডিংয়েও ব্যবহার করা যেতে পারে।

পুরনোকে হুবহু ফিরিয়ে আনার বদলে তার সৌন্দর্যকে নতুনভাবে ব্যবহার করাই হয়তো বেশি কার্যকর।


প্রশ্ন: শেষ প্রশ্ন। একজন তরুণ যদি এই পেশায় আসতে চায়, তাকে কী বলবেন?

উত্তর: প্রথমে ধৈর্য ধরতে বলব।

অক্ষর আঁকা, রেখা নিয়ন্ত্রণ করা, রং বোঝা—এসব একদিনে শেখা যায় না।

প্রতিদিন কাগজে বড় অক্ষর আঁকতে হবে। পুরনো সাইনবোর্ড দেখতে হবে। বাজারে গিয়ে লক্ষ্য করতে হবে কোন বোর্ড দূর থেকে ভালো দেখা যায় এবং কেন।

তারপর হাতে আঁকা কাজের সঙ্গে ডিজিটাল ডিজাইন শেখা উচিত।

কারণ ভবিষ্যতের শিল্পী হয়তো শুধু তুলি দিয়ে বোর্ড আঁকবেন না। তিনি একই নকশা কাঠে আঁকবেন, কম্পিউটারে ডিজাইন করবেন, অনলাইনে বিক্রি করবেন এবং নিজের কাজের ভিডিওও প্রকাশ করবেন।

শিল্পের মাধ্যম বদলাতে পারে। কিন্তু চোখ, হাত আর সৃজনশীলতা—এই তিনটি থাকলে শিল্পী নতুন পথ খুঁজে নিতে পারেন।


সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর শেষ কথা

একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো সাইনবোর্ডকে আমরা হয়তো প্রতিদিন দেখি, কিন্তু তার দিকে বিশেষভাবে তাকাই না। অথচ সেই বোর্ডের অক্ষর, রং, ছবি এবং ব্যবহৃত ভাষার মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি বাজারের বহু বছরের ইতিহাস।

ডিজিটাল প্রিন্টিং দ্রুত, সুবিধাজনক এবং আধুনিক ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আগের অবস্থায় হাতে আঁকা সাইনবোর্ড ফিরে আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

কিন্তু ঐতিহ্যবাহী অক্ষরশিল্পের মূল্য অন্য জায়গায়।

এটি মানুষের হাতে তৈরি। প্রতিটি বোর্ডের নিজস্বতা রয়েছে। একজন শিল্পীর অভিজ্ঞতা, স্থানীয় ভাষা, বাজারের সংস্কৃতি এবং ব্যবসায়ীর পরিচয়—সবকিছু মিলে একটি সাইনবোর্ডকে আলাদা করে তোলে।

হয়তো ভবিষ্যতে গ্রামবাংলার প্রতিটি দোকানের সামনে আর হাতে আঁকা বোর্ড দেখা যাবে না। কিন্তু এই শিল্পকে নতুন ডিজাইন, পর্যটন, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী, ছোট ব্যবসার ব্র্যান্ডিং এবং ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর নতুন জীবন তৈরি হতে পারে।

কারণ প্রযুক্তি পুরনো পদ্ধতিকে সরিয়ে দিতে পারে, কিন্তু মানুষের হাতে তৈরি একটি স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রয়োজন কখনও পুরোপুরি শেষ হয় না।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ কাল্পনিকভাবে রচিত। রতন হালদার নামের সাক্ষাৎকারদাতা ও তাঁর বক্তব্য বাস্তব ব্যক্তি বা বাস্তব সাক্ষাৎকার হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। লেখাটি গ্রামবাংলার হাতে আঁকা সাইনবোর্ড, অক্ষরশিল্প ও ছোট ব্যবসার পরিবর্তন নিয়ে সৃজনধর্মী ফিচার হিসেবে তৈরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *