
একসময় বিকেল নামলেই গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় শিশুদের কোলাহল শোনা যেত। কোথাও গোল্লাছুট, কোথাও কানামাছি, আবার কোথাও নানা ধরনের ধরা-পাকড়ার খেলা। খেলাগুলোর অনেকগুলোর জন্য কোনো বিশেষ সরঞ্জাম লাগত না। কয়েকজন বন্ধু আর সামান্য একটু খোলা জায়গাই ছিল যথেষ্ট।
এই লোকজ খেলাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ছিল চোরকাঁটা নামের একটি খেলার কথাও। নামটি সব অঞ্চলে একইভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এমন নয় এবং নিয়মেও স্থানীয় পার্থক্য থাকতে পারে। কোথাও এটি ধরা-পাকড়ার ধরনের খেলা, কোথাও আবার নির্দিষ্ট সীমানা ও নিরাপদ জায়গাকে কেন্দ্র করে খেলা হতো।
আজকের দিনে এই ধরনের নাম অনেক শিশুর কাছেই অপরিচিত। কিন্তু একসময় পাড়ার বন্ধুদের নিয়ে এমন খেলাই ছিল বিকেলের অন্যতম বিনোদন।
নামের মধ্যেই কৌতূহল
“চোরকাঁটা”—নামটি শুনলেই শিশুদের মনে কৌতূহল তৈরি হওয়ার মতো।
লোকজ খেলায় অনেক সময় খেলার চরিত্র বা নিয়ম থেকেই এমন নাম তৈরি হয়েছে। “চোর” শব্দটি থাকায় বোঝা যায়, খেলাটির কোনো কোনো আঞ্চলিক রূপে একজন বা একদল খেলোয়াড়কে ধরার বা চোরের ভূমিকায় থাকতে হতে পারে।
তবে অঞ্চলভেদে খেলার নিয়ম বদলানোর কারণে সব জায়গায় একই কাঠামো ছিল—এমন দাবি করা ঠিক নয়।
এই বৈচিত্র্যই পুরনো লোকজ খেলাগুলোর একটি আকর্ষণীয় দিক।
কীভাবে খেলা হতো?
চোরকাঁটার প্রচলিত বিভিন্ন রূপে খেলোয়াড়দের একটি নির্দিষ্ট খেলার জায়গা ঠিক করে নিতে হতো। এরপর খেলোয়াড়দের মধ্যে ভূমিকা ভাগ করা হতে পারত।
যে খেলোয়াড় ধরার দায়িত্বে থাকত, তাকে অন্যদের স্পর্শ করে ধরতে হতো। অন্যরা চেষ্টা করত তার কাছ থেকে দূরে থাকতে এবং নির্দিষ্ট নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে।
কোথাও নিরাপদ স্থানকে “ঘর” হিসেবে ধরা হতে পারে, আবার কোথাও সীমানার মধ্যেই দৌড়ঝাঁপ চলত।
খেলার নিয়ম আগে থেকেই সবাই মিলে ঠিক করে নিত। এটাই ছিল লোকজ খেলাগুলোর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
দৌড়ের সঙ্গে বুদ্ধির ব্যবহার
শুধু দ্রুত দৌড়াতে পারলেই এই ধরনের খেলায় সবসময় সুবিধা পাওয়া যেত না।
একজন খেলোয়াড় যদি একদিকে দৌড়ানোর ভান করে হঠাৎ অন্যদিকে চলে যায়, তাহলে ধরতে আসা খেলোয়াড়কে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হতো।
আবার কয়েকজন খেলোয়াড় একসঙ্গে থাকলে তারা একে অপরের অবস্থান বুঝে সিদ্ধান্ত নিত।
কখন সামনে যেতে হবে, কখন পিছিয়ে আসতে হবে এবং কখন নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিতে হতো।
বন্ধুদের মধ্যে তৈরি হতো দলগত সমন্বয়
দলবদ্ধভাবে খেলা হলে একে অপরকে সাহায্য করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত।
কেউ সামনে গিয়ে ধরার খেলোয়াড়ের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দিতে পারত। সেই সুযোগে অন্য একজন নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে পারত।
এভাবে খেলতে খেলতেই শিশুরা বুঝতে শিখত যে দলগত খেলায় নিজের পাশাপাশি অন্য খেলোয়াড়ের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
বড় মাঠের প্রয়োজন ছিল না
চোরকাঁটার মতো লোকজ খেলাগুলোর একটি বড় সুবিধা ছিল—খুব বড় মাঠের প্রয়োজন হতো না।
গ্রামের বাড়ির সামনের খোলা জায়গা, পরিষ্কার উঠোন বা পাড়ার ফাঁকা মাঠ ব্যবহার করা যেত।
তবে বর্তমানে খেলার জায়গা নির্বাচন করার সময় নিরাপত্তার বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
খেলার আগে নিয়ম ঠিক করা
পুরনো দিনের শিশুদের মধ্যে অনেক সময় খেলার নিয়ম নিয়ে নিজেরাই আলোচনা হতো।
কতজন খেলবে?
কে প্রথম ধরবে?
কোথায় নিরাপদ জায়গা?
কতবার ধরা পড়লে ভূমিকা বদলাবে?
সীমানার বাইরে গেলে কী হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খেলার আগেই ঠিক করে নেওয়া হতো।
ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে নিয়ম মানার অভ্যাসও তৈরি হতো।
কেন এই খেলা হারিয়ে গেল?
চোরকাঁটার মতো অনেক লোকজ খেলা এখন আগের তুলনায় কম দেখা যায়।
এর একটি বড় কারণ হলো খেলার জায়গার পরিবর্তন। আগে গ্রামের পাড়ায় অনেক ফাঁকা জায়গা থাকলেও এখন বহু জায়গায় বাড়িঘর, রাস্তা বা অন্যান্য নির্মাণ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, শিশুদের অবসর বিনোদনের ধরন বদলে গেছে। মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম ও অনলাইন বিনোদনের কারণে বাইরে গিয়ে দলবদ্ধভাবে খেলার সময় অনেক ক্ষেত্রে কমেছে।
তৃতীয়ত, অনেক পুরনো খেলার নাম ও নিয়ম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়নি।
হারিয়ে যাওয়া খেলার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে শব্দও
লোকজ খেলা হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক স্থানীয় শব্দও হারিয়ে যায়।
একটি গ্রামের কোনো খেলার নাম হয়তো অন্য গ্রামের মানুষ জানেন না। আবার একই খেলা অন্য অঞ্চলে অন্য নামে পরিচিত হতে পারে।
তাই পুরনো খেলা সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় নাম, নিয়ম ও গল্পও লিখে রাখা দরকার।
বয়স্ক মানুষদের কাছ থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গ্রামীণ খেলাধুলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল তৈরি হতে পারে।
শিশুদের জন্য খেলাটির আকর্ষণ
ধরা-পাকড়ার ধরনের খেলায় শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই আনন্দ পায়। কারণ এখানে সব সময় কিছু না কিছু ঘটছে।
কখনও কেউ দৌড়াচ্ছে, কখনও কেউ অন্যকে ধরার চেষ্টা করছে, আবার কখনও সবাই হেসে এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে।
খেলার মধ্যে অপেক্ষা করার সময়ও থাকে। কেউ ধরা পড়লে তাকে আবার পরবর্তী নিয়ম অনুযায়ী খেলায় ফিরতে হতে পারে।
এই ওঠানামার কারণেই খেলা একঘেয়ে হয় না।
শারীরিক সক্রিয়তার সুযোগ
দৌড়নির্ভর লোকজ খেলায় শরীর সক্রিয় থাকে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা থেকে বেরিয়ে শিশুরা দৌড়ায়, থামে, আবার দিক পরিবর্তন করে।
তবে কোনো খেলাকে শুধুমাত্র শরীরচর্চা হিসেবে না দেখে আনন্দ ও সামাজিক মেলামেশার মাধ্যম হিসেবেও দেখা উচিত।
খেলতে গিয়ে শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং নিয়ম মানার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
নিরাপত্তা সবার আগে
চোরকাঁটার মতো দৌড়ঝাঁপের খেলায় শিশুরা উত্তেজিত হয়ে দ্রুত ছুটতে পারে। তাই নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া এই ধরনের খেলা আয়োজন করা উচিত নয়।
খেলার সময় বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে—
- খেলার জায়গা সমতল ও পরিষ্কার হতে হবে।
- রাস্তার পাশে বা যানবাহন চলাচল করে এমন জায়গায় খেলা যাবে না।
- পুকুর, খাল, নদী বা জলাশয়ের একেবারে পাশে খেলা উচিত নয়।
- নির্মাণাধীন বাড়ি বা ভাঙা দেওয়ালের কাছে খেলা যাবে না।
- কাচ, পাথর, লোহার টুকরো বা ধারালো বস্তু আগে সরিয়ে ফেলতে হবে।
- ধাক্কা দিয়ে কাউকে ধরার নিয়ম রাখা উচিত নয়।
- ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে ফেলে দেওয়া বা জামাকাপড় টেনে ধরা যাবে না।
- ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের নজরদারি থাকা ভালো।
- প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘক্ষণ একটানা দৌড়ানো উচিত নয়।
- খেলার মাঝে বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত জল পান করার সুযোগ রাখতে হবে।
- কেউ পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে খেলা থামাতে হবে।
- আঘাত লাগলে ব্যথা উপেক্ষা করে খেলা চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
স্কুলে ফিরতে পারে পুরনো খেলার স্মৃতি
বিদ্যালয়ের ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পুরনো লোকজ খেলা সম্পর্কে শিশুদের পরিচিত করানো যেতে পারে।
তবে সরাসরি পুরনো নিয়ম অনুসরণ করার বদলে শিক্ষকরা বয়স অনুযায়ী নিরাপদ নিয়ম তৈরি করতে পারেন। খেলার আগে মাঠ পরীক্ষা করা, সীমানা নির্দিষ্ট করা এবং পর্যাপ্ত তদারকি রাখা জরুরি।
একই সঙ্গে শিশুদের জানানো যেতে পারে—এই খেলাগুলো শুধু বিনোদন নয়, এগুলো বাংলার লোকজ সংস্কৃতির অংশ।
স্মৃতির উঠোনে ফিরে দেখা
আজ হয়তো কোনো পাড়ায় চোরকাঁটার নাম শুনলেই অনেকেই অবাক হবেন। কিন্তু পুরনো দিনের শিশুদের কাছে এই ধরনের খেলা ছিল বিকেলের স্বাভাবিক আনন্দের অংশ।
কোনো দামি খেলনা নয়, কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ নয়, কোনো মোবাইল স্ক্রিনও নয়। কয়েকজন বন্ধু, একটি খোলা জায়গা আর নিজেদের তৈরি নিয়ম—এই ছিল খেলার সম্পদ।
সময়ের স্রোতে সেই খেলাগুলো হারিয়ে গেলেও তাদের স্মৃতি রয়ে গেছে মানুষের গল্পে।
চোরকাঁটার মতো লোকজ খেলাগুলো তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একসময় শৈশবের আনন্দ ছিল অনেক বেশি সরল, অনেক বেশি কাছের এবং অনেক বেশি মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।












Leave a Reply