রেললাইনের ধারে একটি আলো।

রাত নামলে কাঁকনপুর গ্রামের সবচেয়ে নির্জন জায়গাটি হয়ে উঠত রেললাইন।

দিনের বেলা লাইন ধরে মানুষ যাতায়াত করত, দূরে মাঠে কৃষকেরা কাজ করত, ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেত। কিন্তু সন্ধ্যার পর চারপাশে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসা ট্রেনের শব্দ।

রেললাইনের পাশে একটি ছোট্ট ঘর ছিল।

সেখানে থাকতেন মদনবাবু।

বয়স পঞ্চান্ন। প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি ওই রেলক্রসিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর কাজ ছিল নির্দিষ্ট সময়ে গেট বন্ধ করা, ট্রেন চলে গেলে আবার খুলে দেওয়া এবং আশপাশের পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা।

গ্রামের অনেকেই তাঁকে চিনত।

কেউ বলত, “রেলগেটের মদনদা।”

কেউ বলত, “ওই যে লাল লণ্ঠন হাতে লোকটা।”

মদনবাবু কখনও নিজের কাজকে ছোট করে দেখতেন না।

তিনি বলতেন,

—“রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানে শুধু গেট খোলা-বন্ধ করা নয়। এখানে একটুখানি অসাবধানতাও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।”

তাঁর একমাত্র মেয়ে তিথি তখন কলেজে পড়ে।

তিথি বাবার কাজ নিয়ে মাঝে মাঝে বন্ধুদের সামনে অস্বস্তি বোধ করত।

একদিন এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল,

—“তোর বাবা কী করেন?”

তিথি একটু থেমে বলেছিল,

—“রেলগেটে কাজ করেন।”

বন্ধুটি হেসে বলেছিল,

—“ও!”

সেই ছোট্ট “ও” শব্দটা তিথির মনে অনেকক্ষণ ধরে বাজছিল।

সেদিন বাড়ি ফিরে সে বাবাকে বলল,

—“বাবা, তুমি অন্য কোনও কাজ করতে পারতে না?”

মদনবাবু মেয়ের দিকে তাকালেন।

—“কেন?”

—“কিছু না।”

—“বল।”

তিথি চুপ করে গেল।

মদনবাবু আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।

শুধু জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

—“কাজের পরিচয় বড় নয় রে। কাজটা ঠিকভাবে করা বড়।”

তিথি উত্তর দিল না।

সেই রাতেই প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হল।

আকাশ যেন ফেটে পড়েছে। রেললাইনের দু’পাশে জল জমে গেল। বাতাসে গাছের ডাল ভেঙে পড়ছিল।

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।

মদনবাবু গেটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল, লাইনের ওপর কিছু একটা পড়ে আছে।

তিনি টর্চ নিয়ে এগিয়ে গেলেন।

একটি বড় গাছের ডাল রেললাইনের ওপর আড়াআড়ি পড়ে আছে।

আর দূরে ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে।

মদনবাবুর বুক ধড়ফড় করে উঠল।

তিনি সঙ্গে সঙ্গে সংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন এবং দৌড়ে লাইনের দিকে গেলেন।

বৃষ্টি তখন এতটাই প্রবল যে কয়েক হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না।

তিনি প্রাণপণে সংকেত দিতে থাকলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনটি ধীরে ধীরে থামল।

ড্রাইভার ও কর্মীরা নেমে এলেন।

সবাই মিলে গাছের ডাল সরিয়ে ফেলল।

কিছুটা সময় পরে ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল।

সেদিন বড় একটি দুর্ঘটনা এড়ানো গেল।

কিন্তু ঘটনাটা সেখানেই শেষ হল না।

পরদিন সকালে খবর ছড়িয়ে পড়ল পুরো গ্রামে।

চায়ের দোকানে সবাই বলাবলি করতে লাগল,

—“মদনদা না থাকলে কী হতো কে জানে!”

—“লোকটা এত বছর ধরে কাজ করছে, অথচ আমরা কখনও গুরুত্ব দিইনি।”

তিথিও খবরটা শুনল।

তার মনে পড়ল আগের দিনের কথা।

সে বাবার কাছে গিয়ে চুপ করে দাঁড়াল।

মদনবাবু তখন লণ্ঠনটা পরিষ্কার করছিলেন।

তিথি বলল,

—“বাবা।”

—“হ্যাঁ?”

—“তুমি কাল রাতে ভয় পেয়েছিলে?”

মদনবাবু একটু হেসে বললেন,

—“ভয় তো পেয়েছিলাম।”

—“তবু গিয়েছিলে?”

—“আমার কাজ ছিল।”

তিথি আর কিছু বলতে পারল না।

কিছুক্ষণ পরে সে বাবার হাত থেকে লণ্ঠনটা নিয়ে বলল,

—“এটা আমাকে দাও।”

—“কেন?”

—“আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”

মদনবাবু অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন।

সেদিন প্রথমবার তিথি বুঝেছিল, বাবার হাতে থাকা লণ্ঠনটি শুধু আলো দেয় না।

ওটা অনেক মানুষের নিরাপত্তার প্রতীক।

কয়েক সপ্তাহ পর তিথি কলেজে একটি প্রকল্প করার সুযোগ পেল।

বিষয় ছিল—“স্থানীয় মানুষের অদৃশ্য অবদান।”

তিথি প্রথমে অনেক বিষয় ভেবেছিল।

শেষে সে বাবাকে বেছে নিল।

সে বাবার সঙ্গে বসে তাঁর তিরিশ বছরের কাজের গল্প শুনল।

কত রাত একা গেট পাহারা দিয়েছেন।

কতবার বৃষ্টিতে দাঁড়িয়েছেন।

কতবার অসুস্থ শরীর নিয়েও দায়িত্ব পালন করেছেন।

কত অচেনা মানুষ তাঁর কারণে নিরাপদে বাড়ি ফিরেছে।

তিথি সব লিখে রাখল।

তারপর বাবার ছবি তুলল।

এক হাতে লণ্ঠন।

অন্য হাতে সংকেতের পতাকা।

পেছনে অন্ধকার রেললাইন।

প্রকল্পটির নাম দিল—

“একটি আলো, হাজার নিরাপদ পথ”।

কলেজে প্রদর্শনীর দিন তিথির কাজটি সবার নজর কেড়ে নিল।

একজন শিক্ষক তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“এই মানুষটি তোমার কে?”

তিথি এবার গর্ব করে বলল,

—“আমার বাবা।”

কথাটা বলার সময় তার চোখে জল এসে গিয়েছিল।

সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তিথি বাবাকে বলল,

—“বাবা, তোমার কাজটা আমি আগে বুঝিনি।”

মদনবাবু হেসে বললেন,

—“সবকিছু বুঝতে সময় লাগে।”

—“তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছিলে?”

—“না।”

—“একটুও না?”

মদনবাবু মাথা নেড়ে বললেন,

—“তুই ছোট ছিলি। এখন বুঝেছিস, সেটাই বড় কথা।”

বছরখানেক পর মদনবাবুর অবসর নেওয়ার সময় এল।

শেষ দিন সন্ধ্যায় গ্রামের অনেক মানুষ রেলগেটের কাছে এসে দাঁড়াল।

যে চায়ের দোকানের লোকেরা একসময় তাঁকে শুধু “গেটের মদন” বলে ডাকত, তারাও এল।

একজন বৃদ্ধ বললেন,

—“তুমি না থাকলে আমাদের কত রাতের পথ অন্ধকার হয়ে যেত।”

একজন কৃষক বললেন,

—“আপনি গেট বন্ধ না করলে আমরা নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারতাম না।”

মদনবাবু শুধু মাথা নত করলেন।

ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

মদনবাবু শেষবারের মতো গেট বন্ধ করলেন।

তারপর ট্রেন চলে গেল।

তিনি ধীরে ধীরে লাল লণ্ঠনটা নামিয়ে রাখলেন।

তিথি পাশে দাঁড়িয়েছিল।

সে বাবার হাত ধরল।

—“বাড়ি চল?”

মদনবাবু হাসলেন।

—“চল।”

দু’জনে হাঁটতে শুরু করল।

পেছনে রেলগেটটা তখন অন্ধকার।

কিন্তু তিথির মনে হচ্ছিল, সেখানে এখনও একটা আলো জ্বলছে।

সেই আলো কোনও লণ্ঠনের নয়।

সেটা একজন মানুষের সৎভাবে নিজের কাজ করে যাওয়ার আলো।

যে আলো অনেক বছর ধরে অচেনা মানুষকে নিরাপদে পথ দেখিয়েছে।

তিথি বুঝেছিল—

সব আলো চোখে দেখা যায় না। কিছু আলো মানুষের কাজের মধ্যে জ্বলে থাকে, আর তার উজ্জ্বলতা বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *