জালের প্রতিটি গিঁট।।

মেঘডাঙা গ্রামের পূর্বদিকে ছিল বিস্তীর্ণ একটা জলাভূমি।

বর্ষাকালে সেখানে জল বেড়ে যেত। শীতকালে জল কমে এলে চারদিকে কচুরিপানা আর ঘাসে ঢেকে থাকত।

গ্রামের অনেক মানুষ সেই জলাভূমিতে মাছ ধরত।

তাদের মধ্যে ছিলেন গদাধর।

বয়স ষাটের বেশি।

সারাজীবন মাছ ধরেই সংসার চালিয়েছেন।

কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় ছিল অন্য।

তিনি ছিলেন জাল বোনার কারিগর।

নিজের হাতে এমন সূক্ষ্ম জাল বানাতে পারতেন, যার গিঁট দেখে গ্রামের অন্য জেলেরা অবাক হয়ে যেত।

তাঁর ছেলে শহরে চলে গিয়েছিল।

বছরের পর বছর বাবার কাছে ফিরত না।

শুধু নাতি রুদ্র মাঝে মাঝে ছুটিতে গ্রামে আসত।

রুদ্রের বয়স চৌদ্দ।

সে শহরের স্কুলে পড়ে।

গ্রামে এসে মাছ ধরার কাজ দেখে তার ভালো লাগত না।

একদিন গদাধার জাল বুনছিলেন।

রুদ্র পাশে বসে মোবাইল দেখছিল।

দাদু বললেন,

—একবার জালটা ধর তো।

রুদ্র অনিচ্ছায় জালটা হাতে নিল।

—এতে কী আছে?

—গিঁট।

—একই তো সব।

গদাধার হেসে বললেন,

—একই দেখায়। কিন্তু সব গিঁট এক নয়।

রুদ্র অবাক হল।

—কীভাবে?

গদাধার একটা গিঁট দেখিয়ে বললেন,

—এইটা শক্ত করে বাঁধা।

আরেকটা দেখিয়ে বললেন,

—এইটা একটু ঢিলে।

—তাতে কী হয়?

—মাছের আকার অনুযায়ী জালের ফাঁক বদলাতে হয়।

রুদ্র প্রথমবার মন দিয়ে জালটার দিকে তাকাল।


পরদিন সকালে গদাধার তাকে সঙ্গে নিয়ে জলাভূমিতে গেলেন।

সূর্য তখন উঠছে।

পাখির ডাক।

জলের ওপর কুয়াশা।

রুদ্র নৌকায় বসে চারপাশ দেখছিল।

গদাধার জাল ফেললেন।

কিছুক্ষণ পর জাল টেনে তুললেন।

কয়েকটা ছোট মাছ আটকে আছে।

রুদ্র বলল,

—এগুলো এত ছোট!

গদাধার সঙ্গে সঙ্গে মাছগুলো জাল থেকে ছাড়িয়ে জলে ছেড়ে দিলেন।

রুদ্র অবাক।

—ছেড়ে দিলেন কেন?

—এগুলো এখনই ধরার মতো বড় হয়নি।

—কিন্তু মাছ তো মাছ।

গদাধার বললেন,

—আজ যদি সব ধরে ফেলি, কাল কী ধরব?

কথাটা রুদ্রের মনে রয়ে গেল।


কয়েকদিন পরে গ্রামের জেলেদের মধ্যে ঝামেলা শুরু হল।

কেউ কেউ খুব ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করছিল।

তাতে বড় মাছের সঙ্গে ছোট মাছও ধরা পড়ছিল।

জলাভূমির মাছ দ্রুত কমে যাচ্ছিল।

গদাধার সবাইকে বললেন,

—এভাবে চললে কয়েক বছরের মধ্যে জলাভূমি খালি হয়ে যাবে।

কেউ শুনল না।

একজন বলল,

—আজ পেট চালানো দরকার। পাঁচ বছর পর কী হবে, সেটা পরে দেখা যাবে।

গদাধার চুপ করে গেলেন।

রুদ্র সব শুনছিল।

শহরে পড়াশোনা করার সময় সে পরিবেশ নিয়ে একটা অধ্যায় পড়েছিল।

তার হঠাৎ মনে হল—

দাদুর কথাটাই ঠিক।


রুদ্র স্কুলের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলল।

তারপর একটা পরিকল্পনা করল।

গ্রামের জেলেদের নিয়ে একটা বৈঠক ডাকল।

সবাই ভাবল, শহর থেকে আসা একটা ছেলে আবার কী শেখাবে!

রুদ্র একটা কাগজে ছবি এঁকে দেখাল—

একটা বড় মাছ।

তার পাশে অনেক ছোট মাছ।

তারপর লিখল—

‘আজ সব ধরলে কাল কিছু থাকবে না।’

একজন জেলে হেসে বলল,

—বই পড়ে মাছ ধরা শেখা যায় না।

রুদ্র মাথা নিচু করল।

গদাধার তখন বললেন,

—কথাটা ঠিক। কিন্তু বই পড়ে যদি কেউ আমাদের ভুলটা বুঝতে পারে, তাকে শুনতে ক্ষতি কী?

সবাই চুপ করল।


রুদ্র প্রস্তাব দিল,

—আমরা জালের ফাঁসের একটা নিয়ম করি।

ছোট মাছ যাতে ধরা না পড়ে, সেই মাপের জাল ব্যবহার করব।

কিছু এলাকায় নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরব না।

বর্ষার সময় যখন মাছ ডিম পাড়ে, তখন জলাভূমির একটা অংশে মাছ ধরা বন্ধ রাখব।

প্রথমে কেউ রাজি হল না।

তারপর গদাধার বললেন,

—আমার জাল আমি নিজে বদলাব।

তিনি নিজের পুরোনো জাল খুলে নতুন ফাঁসের জাল বুনতে শুরু করলেন।

রুদ্র পাশে বসে সাহায্য করল।

একটা গিঁট।

দুটো গিঁট।

শত শত গিঁট।

রুদ্র বিরক্ত হয়ে বলল,

—এত গিঁট বাঁধতে আপনার ক্লান্তি লাগে না?

গদাধার বললেন,

—জীবনও তো গিঁটে গিঁটে বাঁধা।

—মানে?

—একটা গিঁট ভুল হলে পুরো জাল দুর্বল হয়। মানুষের জীবনও তেমন।

রুদ্র চুপ করে গেল।


কয়েকজন জেলে গদাধারের পথ অনুসরণ করল।

তারপর আরও কয়েকজন।

এক মাসের মধ্যে গ্রামের অধিকাংশ জেলে নতুন ধরনের জাল ব্যবহার শুরু করল।

জলাভূমির একটা অংশে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হল।

প্রথম কয়েক মাস কোনও পরিবর্তন দেখা গেল না।

বরং মাছ কম পাওয়ায় অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ল।

একদিন একজন বলল,

—দেখলে? এত নিয়ম করে লাভ কী হল?

গদাধার বললেন,

—মাটির নিচে বীজ পুঁতে পরদিন গাছ দেখা যায়?

—না।

—তাহলে জলেও সময় দিতে হয়।


এক বছর কেটে গেল।

বর্ষা এল।

জলাভূমি আবার জলে ভরে গেল।

শীতের সকালে একদিন রুদ্র দাদুর সঙ্গে নৌকায় গেল।

গদাধার জাল ফেললেন।

কিছুক্ষণ পর জাল তুলতেই দেখা গেল—

বড় বড় মাছ।

রুদ্র অবাক হয়ে গেল।

—এত মাছ!

গদাধার হেসে বললেন,

—জলকে একটু সময় দিলে জলও মানুষকে ফিরিয়ে দেয়।

সেদিন গ্রামের বাজারে মাছের পরিমাণও বেড়ে গেল।

জেলেদের আয় বাড়ল।

যারা একসময় নিয়ম মানতে চাইত না, তারাও বুঝল—

সংরক্ষণ মানে মাছ না ধরা নয়।

সংরক্ষণ মানে ভবিষ্যতের জন্য মাছ রেখে দেওয়া।


রুদ্র এবার দাদুর কাছ থেকে জাল বোনা শেখা শুরু করল।

একদিন সে একটা ছোট জাল নিজে বানিয়ে ফেলল।

গদাধার জালটা হাতে নিয়ে দেখলেন।

একটা গিঁট একটু বাঁকা।

তিনি বললেন,

—এখানে ভুল হয়েছে।

রুদ্র বলল,

—কোথায়?

—এই গিঁটটা।

রুদ্র খুলে আবার বাঁধল।

গদাধার বললেন,

—এবার ঠিক।

রুদ্র হাসল।

—আমি শিখে গেলাম।

গদাধার বললেন,

—না। আজ শুধু একটা গিঁট শিখলি।

—আর?

—জীবনে আরও হাজার গিঁট শিখতে হবে।


কয়েক বছর পরে রুদ্র পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করল।

শহরে চাকরির সুযোগ পেলেও সে গ্রামের জলাভূমি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিল।

সে গ্রামে ফিরে এসে জেলেদের নিয়ে একটি সমবায় গড়ে তুলল।

জলের মাছ, পাখি, জলজ উদ্ভিদ—সবকিছুর হিসাব রাখা শুরু হল।

জলাভূমির পাশে একটা ছোট সাইনবোর্ড লাগানো হল—

‘এই জল আমাদের জীবিকা।
তাই একে বাঁচানো আমাদের দায়িত্ব।’

নিচে লেখা—

‘শিখিয়েছেন: গদাধার মণ্ডল।’

গদাধার সেই বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন,

—আমার নাম এত বড় করে লিখেছিস কেন?

রুদ্র হেসে বলল,

—কারণ আপনি আমাকে মাছ ধরতে শেখাননি।

—তাহলে?

—আপনি আমাকে শিখিয়েছেন, কীভাবে কিছু না নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়।

গদাধার নাতির কাঁধে হাত রাখলেন।

দূরে জলাভূমির ওপর সূর্যের আলো পড়ছিল।

হাজার হাজার ছোট ঢেউ একে অপরের সঙ্গে মিলছিল।

রুদ্রের হাতে তখন সেই পুরোনো জাল।

সে জালের প্রতিটি গিঁটের দিকে তাকিয়ে ভাবল—

একটা একটা গিঁট আলাদা।

কিন্তু সব গিঁট একসঙ্গে না থাকলে জাল তৈরি হয় না।

মানুষও তেমন।

একজনের ভালো কাজ আরেকজনকে ছুঁয়ে যায়।

একটা ছোট সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে একটা পরিবারকে।

একটা পরিবার বদলে দিতে পারে একটা গ্রামকে।

আর একটা গ্রামের সচেতনতা বাঁচিয়ে দিতে পারে একটা জলাভূমিকে।

সেদিন গদাধার নৌকার বৈঠা হাতে নিয়ে বললেন,

—চল রে।

রুদ্র জিজ্ঞেস করল,

—কোথায়?

গদাধার হাসলেন।

—জাল ফেলতে নয়।

—তাহলে?

—জল দেখতে।

দুজন নৌকা নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

জলের ওপর তখন বিকেলের আলো।

আর নৌকার পেছনে ছোট ছোট ঢেউ তৈরি করে যেন জলাভূমি বলছিল—

‘যে আমাকে বাঁচায়, আমিও একদিন তাকে বাঁচাব।’

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *