মা, তোমার ভালোবাসার ঋণ কোনো জন্মেও শোধ করতে পারব না।

মা, তোমাকে নিয়ে যতবার লিখতে বসি, ততবার মনে হয়—তোমার ভালোবাসার গভীরতা বোঝানোর মতো ভাষা আমার জানা নেই। পৃথিবীর সব শব্দ এক জায়গায় করলেও হয়তো তোমার ত্যাগের গল্প শেষ হবে না। কারণ তুমি শুধু আমাকে জন্ম দাওনি, তুমি তোমার জীবনের অসংখ্য মুহূর্ত দিয়ে আমাকে একটু একটু করে গড়ে তুলেছ।

মনে আছে মা, ছোটবেলায় যখন কিছু বুঝতাম না, তখন তুমি আমার হাত ধরে পথ দেখিয়েছিলে? যখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারতাম না, তখন তুমি আমাকে হাঁটতে শিখিয়েছিলে। যখন পৃথিবীর মানুষকে চিনতাম না, তখন তুমি শিখিয়েছিলে কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়। আজ আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছি ঠিকই, কিন্তু জীবনের পথে যখনই হোঁচট খাই, তখন তোমার সেই হাত দুটোর কথা মনে পড়ে।

ইচ্ছে করে, আবার যদি ছোটবেলায় ফিরে যেতে পারতাম! তোমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তাম, তোমার আঁচলের গন্ধে সমস্ত দুঃখ ভুলে যেতাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমার মুখটা দেখতাম, আর নিশ্চিন্তে ভাবতাম—আমার পৃথিবীতে কোনো বিপদ নেই, কারণ আমার মা আমার পাশে আছেন।

কিন্তু সময় তো আর ফিরে আসে না, মা। শৈশবের সেই দিনগুলো শুধু স্মৃতি হয়ে মনের ভিতর থেকে যায়।

আজ বুঝতে পারি, আমার ছোট্ট ছোট্ট ইচ্ছেগুলো পূরণ করতে গিয়ে তুমি কত বড় বড় ইচ্ছেকে নিজের বুকের মধ্যে চাপা দিয়েছিলে। আমার নতুন জামা কেনার জন্য হয়তো নিজের পছন্দের জিনিসটি কেনোনি। আমার মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে গিয়ে হয়তো নিজের পছন্দের খাবারটুকুও ছেড়ে দিয়েছ। আমি যেন ভালো থাকি, সেই চিন্তায় হয়তো কত রাত তোমার ঘুম হয়নি।

অথচ তখন আমি কিছুই বুঝিনি। ভেবেছি, এটাই তো স্বাভাবিক। মা তো এমনই হয়!

আজ বুঝি, মা হওয়া মানে শুধু সন্তানের জন্ম দেওয়া নয়; মা হওয়া মানে নিজের হৃদয়ের একটা অংশকে অন্যের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা। সন্তানের হাসিতে নিজের সুখ খুঁজে পাওয়া, সন্তানের কান্নায় নিজের বুক ভেঙে যাওয়া, আর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের বর্তমানটুকু নিঃশব্দে বিসর্জন দেওয়া।

মা, তোমার ভালোবাসা এমন এক ঋণ, যার কোনো হিসাব নেই, কোনো শেষ নেই, কোনো প্রতিদান নেই।

জীবনে অনেক মানুষের উপকার হয়তো কোনো দিন ফিরিয়ে দিতে পারব। অনেক সম্পর্কের দায়িত্ব পালন করতে পারব। কিন্তু তোমার জন্য যা করা উচিত ছিল, তার সবটুকু কি কখনো করতে পারব? তোমার ত্যাগের তুলনায় আমার সমস্ত চেষ্টা হয়তো খুবই সামান্য।

তবুও আমি চেষ্টা করতে চাই, মা। তোমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমার পাশে আরও বেশি করে থাকতে চাই। তোমার শরীর খারাপ হলে তোমার কপালে হাত রাখতে চাই। তুমি মন খারাপ করে বসে থাকলে তোমার পাশে বসে তোমার কথা শুনতে চাই। তুমি কোনো কিছু চাইতে সংকোচ করলে, তোমার না-বলা ইচ্ছেগুলো বোঝার চেষ্টা করতে চাই।

কারণ তুমি যখন আমার ছোট্ট হাত ধরে পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলে, তখন তো আমার কোনো সামর্থ্য ছিল না। আজ আমার যতটুকু সামর্থ্য হয়েছে, তার মধ্যে তোমার জন্য একটু সময়, একটু যত্ন আর একটু ভালোবাসা রাখাটা কি আমার কর্তব্য নয়?

মা, পৃথিবীর কাছে সফল হওয়ার জন্য আমি হয়তো অনেক পরিশ্রম করব। নিজের পরিচয় তৈরি করব, স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করব। কিন্তু দিনের শেষে আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে, যদি তুমি আমার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্তে বলতে পারো—“আমার সন্তান আমার পাশে আছে।”

আমি চাই না, তোমার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তুমি একাকিত্ব অনুভব করো। আমি চাই, তোমার প্রতিটি দিন ভালোবাসায় ভরে উঠুক। তোমার মনে যেন কখনো এই প্রশ্ন না আসে যে, তোমার সন্তান তোমাকে ভুলে গেছে।

তুমি আমার জন্য সারাজীবন যে দরজা খোলা রেখেছ, আমি চাই তোমার জন্যও আমার জীবনের দরজা সব সময় খোলা থাকুক।

জানো মা, মাঝে মাঝে খুব ভয় হয়। মনে হয়, সময় এত দ্রুত চলে যাচ্ছে কেন? তোমার সঙ্গে কাটানো দিনগুলো এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাচ্ছে কেন? আরও কত কথা বলার আছে, কত স্মৃতি তৈরি করার আছে, কতবার তোমার পাশে বসে তোমার হাতটা ধরে থাকার আছে!

তাই এখন থেকে তোমার সঙ্গে কাটানো সাধারণ মুহূর্তগুলোকেও অসাধারণ করে রাখতে চাই। তোমার সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া, একটু হাসাহাসি করা, পুরোনো দিনের গল্প শোনা—এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই একদিন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকবে।

মা, তোমার কাছে আমার কোনো দাবি নেই। শুধু চাই, তুমি সুস্থ থেকো, ভালো থেকো, আর তোমার আশীর্বাদের হাতটা আমার মাথার উপর রেখো।

ঈশ্বরের কাছে যদি কখনো কিছু চাওয়ার সুযোগ পাই, তাহলে নিজের জন্য খুব বেশি কিছু চাইব না। চাইব, আমার মা যেন ভালো থাকেন। তাঁর মুখের হাসি যেন অটুট থাকে। তাঁর জীবনের কষ্টগুলো যেন একটু একটু করে কমে আসে।

আর যদি কোনো দিন তোমার মনে হয়, তোমার সন্তান তোমাকে যথেষ্ট ভালোবাসে না, তাহলে একবার আমার চোখের দিকে তাকিয়ো, মা। হয়তো মুখে সব কথা বলতে পারব না, কিন্তু আমার চোখের গভীরে তুমি তোমার জন্য জমে থাকা সমস্ত ভালোবাসা খুঁজে পাবে।

মা, তুমি আমার জীবনের প্রথম আশ্রয়, প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু। তোমার কাছেই আমার পৃথিবী শুরু হয়েছে, আর তোমার ভালোবাসার মধ্যেই আমি জীবনের সমস্ত অর্থ খুঁজে পাই।

তুমি শুধু আমার মা নও, তুমি আমার অস্তিত্বের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।

জীবন যত দিনই চলুক, যত পরিবর্তনই আসুক, তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা যেন কোনো দিন কমে না যায়। তোমার পাশে থাকার ইচ্ছেটা যেন কোনো ব্যস্ততা, কোনো দূরত্ব, কোনো অজুহাতের কাছে হেরে না যায়।

শেষে শুধু এটুকুই বলব—

“মা, তুমি আমাকে এই পৃথিবীতে এনেছ, নিজের ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করেছ। তোমার কাছে আমি চিরঋণী। হয়তো তোমার সমস্ত ত্যাগের প্রতিদান দিতে পারব না, কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তোমাকে ভালোবাসার চেষ্টা করে যাব। তুমি আমার পাশে থেকো, মা। তোমার সন্তান হিসেবে তোমার হাত ধরে আরও অনেকটা পথ চলতে চাই।”

ভালোবাসি মা। আজ, আগামীকাল, প্রতিটি নতুন ভোরে, জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে—আর যত দিন এই হৃদয় স্পন্দিত হবে, তত দিন।

পৃথিবীর সব সুখ একদিকে, আর মায়ের মুখের একটুকরো হাসি অন্যদিকে—আমার কাছে মায়ের হাসিটাই অমূল্য। ❤️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *