যে শেষ রঙতুলিটি বদলে দিয়েছিল এক বন্দি মানুষের জীবন।

শহরের পুরোনো মহল্লায় একটি ছোট্ট বাড়ি ছিল। বাড়িটির জানালাগুলো সব সময় বন্ধ থাকত। বাইরের দেওয়ালের রং উঠে গিয়েছিল, উঠোনে জমেছিল শুকনো পাতা। বাড়ির ভিতরে একা থাকতেন অবিনাশবাবু। বয়স প্রায় বাহাত্তর।

একসময় তিনি ছিলেন পরিচিত চিত্রশিল্পী। তাঁর আঁকা ছবিতে ফুটে উঠত গ্রামের মাঠ, নদীর ঘাট, মানুষের মুখ, উৎসবের আনন্দ এবং প্রকৃতির নানান রূপ। শহরের কয়েকটি প্রদর্শনীতেও তাঁর ছবি প্রশংসা পেয়েছিল।

কিন্তু প্রায় দশ বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর ডান হাতের আঙুলে গুরুতর চোট লাগে। চিকিৎসার পর হাতের স্বাভাবিক শক্তি আর পুরোপুরি ফিরে আসেনি। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও আগের মতো ছবি আঁকতে পারেননি তিনি।

ধীরে ধীরে রঙতুলি, ক্যানভাস সবকিছু আলমারিতে তুলে রাখেন। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। প্রদর্শনীতে যাওয়া বন্ধ করেন। তাঁর মনে হতে থাকে, যে শিল্পী আর ছবি আঁকতে পারে না, তার জীবনে বুঝি আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

স্ত্রী মারা যাওয়ার পর নিঃসঙ্গতা আরও বেড়ে যায়। ছেলে অন্য শহরে থাকত। ফোনে কথা হলেও অবিনাশবাবু নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলতেন না।

একদিন বিকেলে বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল পনেরো বছরের রুদ্র। স্কুল থেকে ফেরার পথে সে হঠাৎ জানালার পাশে একটি পুরোনো ছবি দেখতে পেল। ছবিতে ছিল বর্ষার দিনের একটি নদী। আকাশে কালো মেঘ, নদীর জলে নৌকা, আর ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী।

ছবিটি দেখে রুদ্র থমকে গেল।

পরদিন সে সাহস করে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল।

অবিনাশবাবু দরজা খুলে বিরক্ত গলায় বললেন, “কী চাই?”

রুদ্র বলল, “আপনার জানালায় যে ছবিটা দেখেছি, সেটা কি আপনি এঁকেছেন?”

অবিনাশবাবু একটু অবাক হয়ে বললেন, “হ্যাঁ। অনেক পুরোনো ছবি।”

“খুব সুন্দর হয়েছে। আপনি এখন আর ছবি আঁকেন না?”

অবিনাশবাবু মুখ ফিরিয়ে বললেন, “না। এখন আর পারি না।”

রুদ্র চলে গেল। কিন্তু পরদিন আবার এল। এবার তার হাতে ছিল একটি ছোট স্কেচবুক।

সে বলল, “আমি ছবি আঁকতে শিখতে চাই। আপনি কি আমাকে একটু শেখাবেন?”

অবিনাশবাবু হেসে ফেললেন।

“আমার কাছে কেন শিখবি? শহরে কত ভালো আর্ট স্কুল আছে।”

রুদ্র মাথা নিচু করে বলল, “আমাদের বাড়িতে অত টাকা নেই। আর আপনার ছবিগুলো আমার খুব ভালো লাগে।”

অবিনাশবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “দেখি, তোর আঁকা ছবিটা।”

রুদ্র স্কেচবুক খুলে একটি গাছের ছবি দেখাল। গাছের ডালপালা ঠিকঠাক হয়নি, পাতাগুলোও এলোমেলো। কিন্তু ছবিতে একটা আন্তরিকতা ছিল।

অবিনাশবাবু বললেন, “গাছটা একটু অদ্ভুত হয়েছে। তবে তুই যা দেখেছিস, সেটা আঁকার চেষ্টা করেছিস। এটাই ভালো।”

রুদ্রের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

সেদিন থেকে সপ্তাহে দুদিন রুদ্র অবিনাশবাবুর বাড়িতে আসতে শুরু করল। অবিনাশবাবু তাকে ছবি আঁকার প্রাথমিক নিয়ম শেখাতেন। আলো কোথা থেকে আসছে, ছায়া কোথায় পড়ছে, দূরের জিনিস কেন ছোট দেখায়—এসব বোঝাতেন।

প্রথমদিকে অবিনাশবাবু শুধু মুখে নির্দেশ দিতেন। নিজের হাতে তুলির কাজ খুব কম করতেন।

একদিন রুদ্র জিজ্ঞাসা করল, “আপনি নিজে আঁকেন না কেন?”

অবিনাশবাবু বললেন, “হাত আর আগের মতো চলে না। তুলি ধরতে গেলেই কাঁপে।”

রুদ্র বলল, “তাহলে বাঁ হাতে চেষ্টা করুন না!”

অবিনাশবাবু হেসে বললেন, “সবকিছু কি এত সহজ?”

রুদ্র উত্তর দিল, “সহজ নয় বলেই তো চেষ্টা করতে হয়।”

কথাটি শুনে অবিনাশবাবু কিছু বললেন না।

পরদিন রুদ্র একটি ছোট রঙের বাক্স নিয়ে এল। বাক্সে ছিল কয়েকটি জলরং এবং একটি নতুন তুলি।

“এটা আপনার জন্য।”

অবিনাশবাবু অবাক হয়ে বললেন, “এত টাকা কোথায় পেলি?”

রুদ্র জানাল, সে নিজের হাতখরচ থেকে কিছু টাকা জমিয়েছে। বাকিটা দিয়েছে তার মা।

অবিনাশবাবু বাক্সটি হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

সেদিন রাতে তিনি বহু বছর পর আলমারি খুললেন। পুরোনো ক্যানভাস, রং আর তুলি বের করলেন। ডান হাতে তুলি ধরার চেষ্টা করলেন। হাত কেঁপে গেল। কয়েকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন।

হতাশ হয়ে সবকিছু সরিয়ে রাখতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই রুদ্রের কথাটা মনে পড়ল—বাঁ হাতে চেষ্টা করুন না!

তিনি ধীরে ধীরে বাঁ হাতে তুলি ধরলেন। প্রথমে অস্বস্তি হচ্ছিল। রেখা সোজা হচ্ছিল না। রংও ঠিকমতো বসছিল না। তবু তিনি চেষ্টা চালিয়ে গেলেন।

কয়েকদিন পর একটি ছোট্ট ছবি তৈরি হলো। ছবিতে ছিল জানালার বাইরে একটি গাছ, তার ডালে বসে থাকা দুটি পাখি।

ছবিটি নিখুঁত ছিল না। কিন্তু অবিনাশবাবুর চোখে সেটি ছিল অনেক বড় সাফল্য।

পরদিন রুদ্রকে ছবিটি দেখিয়ে বললেন, “দেখ, আমি আবার চেষ্টা করেছি।”

রুদ্র আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “দারুণ হয়েছে! এবার আমরা আরও ছবি আঁকব।”

এরপর থেকে অবিনাশবাবুর বাড়ির পরিবেশ বদলাতে লাগল। রুদ্রের সঙ্গে আরও দু-একজন শিশু আসতে শুরু করল। কেউ ছবি আঁকতে চাইত, কেউ রং সম্পর্কে জানতে চাইত। অবিনাশবাবু তাদের শেখাতে শুরু করলেন।

তিনি বুঝতে পারলেন, নিজের হাতের দক্ষতা আগের মতো না থাকলেও তাঁর অভিজ্ঞতা এখনও অন্যদের কাজে লাগতে পারে।

একদিন রুদ্র একটি প্রতিযোগিতার কথা জানাল। শহরের একটি সাংস্কৃতিক সংস্থা শিশুদের জন্য ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। বিষয়—‘আমার দেখা পৃথিবী’।

রুদ্র বলল, “আমরা সবাই অংশ নেব। আপনিও একটা ছবি জমা দেবেন।”

অবিনাশবাবু প্রথমে রাজি হলেন না।

“এই বয়সে আবার প্রতিযোগিতা? আমার ছবি দেখে সবাই হাসবে।”

রুদ্র বলল, “আপনি তো আমাদের শিখিয়েছেন, ছবি সুন্দর হওয়ার আগে সত্যি হওয়া দরকার। আপনার ছবিতে আপনার গল্প থাকবে।”

কথাটা অবিনাশবাবুর মনে গভীরভাবে দাগ কাটল।

তিনি ঠিক করলেন, এবার এমন একটি ছবি আঁকবেন যেখানে তাঁর জীবনের দুই সময় একসঙ্গে থাকবে। ছবির একদিকে থাকবে একটি বন্ধ জানালা, ধুলো জমা রঙের বাক্স আর নিঃসঙ্গ ঘর। অন্যদিকে থাকবে খোলা জানালা, কয়েকটি শিশু, রঙের কৌটো এবং আলোয় ভরা উঠোন।

ছবিটির নাম দিলেন—‘আবার শুরু’।

ছবি আঁকতে তাঁর অনেক সময় লাগল। বাঁ হাতে রং বসাতে গিয়ে কয়েকবার ভুল হলো। কখনও রং ছড়িয়ে গেল, কখনও রেখা বেঁকে গেল। কিন্তু এবার তিনি আর ছবি নষ্ট করে ফেলে দেননি। ভুলের ওপর নতুন রং লাগিয়ে ছবিটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

প্রতিযোগিতার দিন রুদ্র ও তার বন্ধুরা নিজেদের ছবি জমা দিল। অবিনাশবাবুও নিজের ছবিটি নিয়ে গেলেন।

বিচারকদের একজন তাঁর ছবি দেখে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি অনেকদিন ধরে ছবি আঁকছেন?”

অবিনাশবাবু বললেন, “একসময় আঁকতাম। মাঝখানে অনেক বছর বন্ধ ছিল। এখন আবার শুরু করেছি।”

বিচারক বললেন, “এই ছবিতে শুধু রং নেই, একটা অভিজ্ঞতাও আছে।”

প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশের দিন রুদ্র দ্বিতীয় পুরস্কার পেল। অবিনাশবাবুর ছবিটি পেল বিশেষ সম্মাননা।

কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় ঘটনা ঘটল অন্যভাবে।

সাংস্কৃতিক সংস্থার কর্মকর্তারা অবিনাশবাবুর কাজ দেখে তাঁকে স্থানীয় একটি শিশুদের শিল্পশিক্ষা কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানালেন। তাঁরা বললেন, তাঁর অভিজ্ঞতা শিশুদের কাছে খুব মূল্যবান হতে পারে।

অবিনাশবাবু প্রথমে বিশ্বাস করতে পারলেন না।

“আমি কি সত্যিই শেখাতে পারব?”

সংস্থার প্রতিনিধি বললেন, “আপনি তো ইতিমধ্যেই শেখাচ্ছেন। এবার আরও কিছু শিশুর কাছে পৌঁছনোর সুযোগ পেলেন।”

কয়েক মাসের মধ্যে তাঁর বাড়ির একটি ঘর ছোট্ট আঁকার ক্লাসে পরিণত হলো। দেয়ালে ঝুলল শিশুদের ছবি। এক কোণে রাখা হলো পুরোনো ক্যানভাস। আর জানালার পাশে সাজানো থাকল রঙের বাক্স।

একদিন তাঁর ছেলে বাড়িতে এল। বাবার ঘরের এই পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে গেল।

সে বলল, “বাবা, এতদিন তোমাকে ভেবেছিলাম তুমি নিজের সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছ। কিন্তু এখানে তো অন্যরকম একটা পৃথিবী তৈরি হয়েছে!”

অবিনাশবাবু মৃদু হেসে বললেন, “আমি ভেবেছিলাম, ছবি আঁকতে না পারলে আমার জীবন থেমে যাবে। রুদ্র এসে বুঝিয়ে দিল, কাজের ধরন বদলাতে পারে, কিন্তু ভালোবাসাটা হারিয়ে যায় না।”

ছেলে বাবার পাশে বসে রুদ্রের আঁকা ছবিগুলো দেখতে লাগল।

সেদিন সন্ধ্যায় ক্লাস শেষ হওয়ার পর রুদ্র অবিনাশবাবুর কাছে এসে বলল, “স্যার, আপনার ওই প্রথম ছবিটা কোথায়? যে ছবিতে পাখি ছিল?”

অবিনাশবাবু ছবিটি বের করে দিলেন।

রুদ্র বলল, “এটা কি আপনার সবচেয়ে প্রিয় ছবি?”

অবিনাশবাবু কিছুক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। কারণ এই ছবিটা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি আবার শুরু করতে পারি।”

রুদ্র হেসে বলল, “তাহলে আপনার শেষ রঙতুলিটা কিন্তু শেষ নয়!”

অবিনাশবাবু হেসে উঠলেন।

জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঘরের ভিতরে ছোট্ট বাতিটি জ্বলছে। টেবিলের ওপর পড়ে আছে রং, তুলি আর অর্ধসমাপ্ত ক্যানভাস।

একসময় যে মানুষটি নিজের অক্ষমতাকে জীবনের শেষ বলে মেনে নিয়েছিলেন, তিনি এখন অন্যদের স্বপ্নে রং ভরছেন।

আর সেই পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল একটি কিশোরের আন্তরিক প্রশংসা এবং একটি ছোট্ট রঙতুলির হাত ধরে।

শিক্ষণীয় কথা: জীবনের কোনো একটি বাধা আমাদের সমস্ত সম্ভাবনার শেষ কথা হতে পারে না। পরিস্থিতি বদলালে কাজের পদ্ধতি বদলাতে হয়, কিন্তু নিজের আগ্রহ ও অভিজ্ঞতাকে কখনও মূল্যহীন ভাবা উচিত নয়। অনেক সময় একজন মানুষের সামান্য উৎসাহ অন্য একজনের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারে। নতুন করে শুরু করার জন্য বয়স নয়, প্রয়োজন ইচ্ছা ও সাহস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *