
শহর থেকে কিছুটা দূরে ছোট্ট একটি জনপদ। সেখানে ছিল একটি পুরোনো উচ্চবিদ্যালয়। লাল ইটের দোতলা বাড়ি, সামনে বড় মাঠ, পাশে কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। স্কুলটি খুব বিখ্যাত ছিল না, কিন্তু এলাকার বহু মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার স্মৃতি।
এই স্কুলেই একসময় পড়ত সৌম্য। ছোটবেলায় সে ছিল খুব চুপচাপ। ক্লাসের শেষ বেঞ্চে বসত। পড়াশোনায় মোটামুটি হলেও অঙ্কের খাতায় তার নম্বর প্রায়ই কম আসত। শিক্ষকরা তাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। সহপাঠীদের কেউ কেউ তাকে নিয়ে হাসাহাসিও করত।
তবে একটি মানুষ তাকে কখনও অবহেলা করেননি। তিনি ছিলেন স্কুলের প্রাক্তন অঙ্কের শিক্ষক, অমলেন্দু বাবু।
একদিন পরীক্ষার খাতা ফেরত দেওয়ার সময় সৌম্যর নম্বর দেখে কয়েকজন ছাত্র হেসে উঠেছিল। সৌম্য মাথা নিচু করে বসেছিল। অমলেন্দু বাবু খাতা হাতে নিয়ে বলেছিলেন, “নম্বর কম হয়েছে, তাই বলে বুদ্ধি কমে যায় না। ভুল কোথায় হয়েছে, সেটা খুঁজে বের করাই আসল কাজ।”
সেদিন ক্লাস শেষে তিনি সৌম্যকে ডেকে একটি কথা বলেছিলেন।
“তুমি হয়তো এখন নিজের ক্ষমতা বুঝতে পারছ না। কিন্তু মনে রেখো, জীবনে এমন কিছু কাজ আছে, যা একদিন তোমাকেই করতে হবে। তখন যেন পিছিয়ে না যাও।”
সৌম্য কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি। তবু সেদিন সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল, একদিন এমন কিছু করবে যাতে অমলেন্দু বাবু গর্ব অনুভব করেন।
সময়ের সঙ্গে জীবন বদলে গেল। উচ্চমাধ্যমিকের পর সৌম্য শহরে চলে গেল। পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পেল। সংসার, কাজ আর দায়িত্বের ভিড়ে স্কুলের স্মৃতিগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।
অমলেন্দু বাবুর সঙ্গে যোগাযোগও আর রাখা হয়নি।
প্রায় পনেরো বছর পর একদিন পুরোনো এক সহপাঠীর ফোন এল।
“সৌম্য, তুই কি জানিস অমলেন্দু স্যার এখন খুব অসুস্থ? স্কুলের কাছেই থাকেন। একা একাই দিন কাটে।”
খবরটা শুনে সৌম্যর বুকের মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হল। সে অনেক দিন পর ছুটির ব্যবস্থা করে গ্রামে ফিরল।
স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে হল, সময় যেন অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। মাঠের একপাশে নতুন ভবন তৈরি হয়েছে। পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছটির একটি বড় ডাল ভেঙে পড়েছে। তবু স্কুলের গেটটি আগের মতোই আছে।
সে সরাসরি অমলেন্দু বাবুর বাড়িতে গেল।
বৃদ্ধ শিক্ষক বিছানায় শুয়ে ছিলেন। শরীর দুর্বল, চোখে আগের মতো তেজ নেই। সৌম্যকে দেখে প্রথমে চিনতে পারেননি। পরিচয় দেওয়ার পর তাঁর মুখে হাসি ফুটল।
“তুই সেই সৌম্য? শেষ বেঞ্চের ছেলেটা?”
সৌম্য হেসে বলল, “হ্যাঁ স্যার। এখনও শেষ বেঞ্চের কথাটা মনে আছে?”
“মনে থাকবে না কেন? তোর চোখে তখন অনেক প্রশ্ন দেখতাম।”
কিছুক্ষণ গল্পের পর সৌম্য জিজ্ঞাসা করল, “স্যার, আপনার কোনও কিছু দরকার হলে বলবেন। আমি ব্যবস্থা করে দেব।”
অমলেন্দু বাবু ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
“আমার নিজের জন্য তেমন কিছু দরকার নেই। তবে একটা চিন্তা আছে। আমাদের স্কুলে এখন অনেক ছাত্রছাত্রী পড়ে। তাদের মধ্যে অনেকেই অঙ্ককে ভয় পায়। কেউ ভুল করলে হাসাহাসি হয়। কেউ আবার কম নম্বর পেয়ে নিজেকে অযোগ্য ভাবে। আমি চাই, তারা যেন বুঝতে শেখে—ভুল করা মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়।”
সৌম্য চুপ করে শুনছিল।
বৃদ্ধ আবার বললেন, “স্কুলের পুরোনো অঙ্কের ঘরটা এখন প্রায় ব্যবহার হয় না। সেখানে একসময় ছাত্রছাত্রীরা দল বেঁধে অঙ্ক করত। যদি আবার এমন কিছু করা যেত, যেখানে নম্বরের ভয় ছাড়াই তারা অঙ্ক শিখতে পারে!”
সৌম্যর মনে পড়ে গেল নিজের স্কুলজীবন। শেষ বেঞ্চে বসে থাকা সেই ছেলেটি, যে ভুল উত্তরের জন্য মাথা নিচু করে থাকত।
সে বলল, “স্যার, ঘরটা আবার চালু করা যায় না?”
অমলেন্দু বাবু মৃদু হেসে বললেন, “চালু করার মানুষ কোথায়?”
সৌম্য উত্তর দিল না। কিন্তু তার মনে তখন একটি সিদ্ধান্ত তৈরি হয়ে গেছে।
পরের দিন সে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করল। প্রস্তাবটি শুনে প্রধান শিক্ষক আগ্রহী হলেন। কয়েকজন অঙ্কের শিক্ষকও এগিয়ে এলেন। সৌম্য নিজের কর্মস্থলের পরিচিত কয়েকজনের কাছ থেকে কিছু অর্থ সংগ্রহ করল। পুরোনো ঘরটি পরিষ্কার করা হল। ভাঙা বেঞ্চ মেরামত করা হল। দেওয়ালে লাগানো হল বিভিন্ন গাণিতিক ধাঁধা, সূত্র এবং মজার সমস্যা।
ঘরটির নাম দেওয়া হল—‘ভুল থেকে শেখা’।
নিয়মও ছিল একটু আলাদা। এখানে কোনও ছাত্রকে তার ভুল উত্তরের জন্য বকাঝকা করা হবে না। বরং সে কীভাবে ভেবেছে, কোথায় আটকে গেছে, তা বোঝার চেষ্টা করা হবে। কেউ চাইলে নিজের নাম না লিখেও প্রশ্ন জমা দিতে পারবে।
প্রথম দিন খুব বেশি ছাত্রছাত্রী এল না। মাত্র সাতজন। তাদের মধ্যে ছিল নবম শ্রেণির ছাত্রী মেঘলা। অঙ্কে সে বরাবরই দুর্বল। বাড়িতে বাবা-মা তাকে প্রায়ই বলতেন, “তোমার দ্বারা অঙ্ক হবে না।”
ঘরে ঢুকে সে চুপচাপ এক কোণে বসে পড়ল।
সৌম্য তার কাছে গিয়ে বলল, “কী সমস্যা?”
মেঘলা নিচু গলায় বলল, “আমি অঙ্ক বুঝি না। সবাই হাসে।”
সৌম্য একটি ছোট প্রশ্ন লিখে তার সামনে রাখল। মেঘলা চেষ্টা করল, কিন্তু উত্তর ভুল হল।
সৌম্য বলল, “দারুণ! এবার আমরা বুঝতে পারব ভুলটা কোথায় হয়েছে।”
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
“ভুল করেও দারুণ?”
“অবশ্যই। চেষ্টা না করলে ভুল হবে কীভাবে?”
সেদিন মেঘলা প্রথমবার অঙ্কের খাতা বন্ধ না করে পুরো সময় বসে রইল।
ধীরে ধীরে ঘরটির জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল। যে ছাত্রছাত্রীরা ক্লাসে প্রশ্ন করতে ভয় পেত, তারা এখানে এসে নিজেদের সমস্যা জানাতে শুরু করল। কেউ বোর্ডে অঙ্ক করত, কেউ অন্যের সমাধান বুঝিয়ে দিত। প্রতিযোগিতার বদলে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি হল।
সৌম্য প্রতি মাসে একবার গ্রামে আসত। বাকি সময় স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখত। সে বুঝতে পারল, শুধু অর্থ দিয়ে কোনও উদ্যোগ দীর্ঘদিন চালানো যায় না। প্রয়োজন মানুষের অংশগ্রহণ।
তাই সে কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে একটি ছোট দল তৈরি করল। কেউ সপ্তাহে একদিন পড়াতে আসত, কেউ বই দিত, কেউ আবার নতুন নতুন ধাঁধা তৈরি করত।
একদিন মেঘলা একটি কঠিন সমস্যা সমাধান করে ফেলল। আনন্দে সে ছুটে এসে সৌম্যকে বলল, “দাদা, আমি পেরেছি!”
সৌম্য বলল, “তুমি তো পারতেই। শুধু নিজের ওপর বিশ্বাসটা একটু দেরিতে এসেছিল।”
কয়েক মাস পর স্কুলে একটি ছোট বিজ্ঞান ও গণিত প্রদর্শনীর আয়োজন করা হল। মেঘলা সেখানে নিজের তৈরি একটি গাণিতিক মডেল নিয়ে অংশ নিল। বিচারকদের সামনে দাঁড়িয়ে সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের কাজ ব্যাখ্যা করল।
প্রদর্শনী শেষে সে পুরস্কার পেল কি পেল না, তা নিয়ে তার আর বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। কারণ সে প্রথমবার বুঝেছিল, নিজের চিন্তাকে অন্যের সামনে তুলে ধরার সাহসও একটি বড় সাফল্য।
সেদিন সৌম্য অমলেন্দু বাবুকে প্রদর্শনীর ছবি দেখাতে গেল।
বৃদ্ধ ছবিগুলো দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তুই সেই কথাটা মনে রেখেছিস?”
সৌম্য অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কোন কথা স্যার?”
“যেদিন তোকে বলেছিলাম, একদিন এমন কিছু করবি যাতে পিছিয়ে না যাস।”
সৌম্যর চোখ ভিজে উঠল।
“স্যার, আমি তো শুধু আপনার শেখানো কথাটাই ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।”
অমলেন্দু বাবু তার হাত ধরে বললেন, “শিক্ষকের কাছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?”
কয়েক দিন পর অমলেন্দু বাবুর মৃত্যু হল। খবর পেয়ে সৌম্য আবার গ্রামে ফিরল। স্কুলের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী এবং প্রাক্তনীরা সবাই তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিল।
সৌম্য সেদিন স্কুলের অঙ্কের ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ একা বসে রইল। ঘরের শেষ বেঞ্চটির দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ল নিজের সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা।
সে বেঞ্চটির নিচে হাত দিতেই একটি ছোট কাগজের টুকরো পেল। তাতে পেনসিলে লেখা—
“ভুল করতে ভয় পেয়ো না। একদিন তুমিই অন্য কাউকে সাহস দেবে।”
লেখাটি কার, তা জানা গেল না। হয়তো বহু বছর আগে কোনও ছাত্র লিখেছিল। কিন্তু সৌম্যর মনে হল, কথাগুলো যেন অমলেন্দু বাবুরই।
সে কাগজটি যত্ন করে তুলে রাখল।
পরদিন ঘরের দরজার পাশে নতুন একটি বাক্য লেখা হল—
“এখানে কেউ ব্যর্থ নয়, সবাই শিখছে।”
সময়ের সঙ্গে ‘ভুল থেকে শেখা’ ঘরটি স্কুলের অন্যতম প্রিয় জায়গা হয়ে উঠল। মেঘলা পরে গণিত নিয়ে উচ্চশিক্ষা শুরু করল। একদিন সে নিজেই ছোটদের পড়াতে এল। নতুন কোনও ছাত্র ভুল করলে সে আর হাসত না। বরং বলত, “চলো, আবার চেষ্টা করি।”
সৌম্য বুঝতে পারল, তার বহু বছরের পুরোনো প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়েছে। তবে সেই পূরণ কোনও পুরস্কার বা সম্মাননার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষের শেখানো বিশ্বাস আরেকজন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে—এটাই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন।
জীবনের শিক্ষা: একজন শিক্ষকের প্রকৃত সাফল্য শুধু ছাত্রের নম্বর বা পরীক্ষার ফলাফলে মাপা যায় না। তিনি যদি একজন মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে পারেন, তবে সেই শিক্ষা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে। ভুলকে ভয় না করে ভুল থেকে শেখার সাহসই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়।












Leave a Reply