সুবর্ণ রঙের হিমোসিল ও কিছু ব্যঞ্জন ধ্বনির আর্তনাদ : নিমাই জানা।

” সকালে এসে টের পায় সে মৃত্যু /আর রাতকে দোষ দিয়ে চলে যায় /ঘোর ধূলিঝড় ওঠা দুপুরের দিকে / বিকেলের এক পশলা বৃষ্টি শেষে / সন্ধ্যার গন্ধে নিজের লাশ / ফিরে আসি ফের রাতের ঘরে / পোস্টমর্টেম হবে আজ , হবেই / কবিতা ক্ষত হৃদপিন্ডের ” (পোস্ট মর্টেম)

এমন এক কবির কবিতার শরীরের ভেতর ব্যবচ্ছেদের অঙ্গুরীমাল নেশা ধরে আছে অসীম অক্ষর যাত্রার পরে । মাতাল অভয়ারণ্যের দিকে শত সহস্র জোনাকি বিন্দুগুলি জ্বলে আছে আরব সাগরের মতো , এখানে প্রতিদিন শরীরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা প্রশ্বাস বায়ুকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখি কঠিন অংক শাস্ত্র কত সাবালক হতে পারে । অভয়ারণ্য কি ? আইরিশ বলের মতো প্রস্থচ্ছেদ ? না নিজের চিরহরিৎ বাগানে একটি আপেল বৃক্ষের চতুর্থ গতিসূত্র আবিষ্কার করার পদ্ধতিকে পুনরায় ক্রোমোপ্লাস্টে পরিণত করার প্রাচীন পদ্ধতি । নিজের হাতে ঝুলে থাকে পেন্ডুলামের মতো কিছু মানুষ সন্ধ্যাকালীন যাত্রাপথ শেষে মিলিয়ে যায় অন্য কোন গ্রহ অভ্যন্তরস্থ সন্ধ্যাবেলায় ।সেখানে কমলালেবুর মতো দূষিত উদ্ভিদগুলো পরস্পর জড়িয়ে ধরে , নিজেরাই সম্পাদ্য কথা বলে একে অন্যের সাথে । তাদের কোন কথা নেই ‌, তাদের কোন এক অন্তর্লীন হয়ে যাওয়া ছায়াপথের কথা থাকে না । এমন অসাধারণ কবিতাগুলো পড়ছিলাম কবি আর কেউ নয় বিশিষ্ট কবি সুবর্ণ রায় । কবি একজন অ্যাডিশনাল ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদে আসীন ব্যক্তি যদিও পেশাগত পরিচয়টুকু না বলে দার্শনিক কবি চেতনার পরিচয় দিতেই ভালো লাগে আমার । কাব্যগ্রন্থের নাম ” পর্ণমোচী বৃক্ষ তোমাকে” বইটি পাঠ করলাম । কিছুদিন আগে শ্রদ্ধেয় দাদা আমাকে এক গুচ্ছ বই পাঠিয়েছেন , জানিনা কবিতার মর্ম আমি বুঝি কিনা , অবশ্যই আমি বুঝিনা । তিনি অথচ আমাকে পাঠের সুযোগ দিয়েছেন এজন্য কবির কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ । ”

পর্ণমোচী বৃক্ষ তোমাকে ” কবিতার বইটির মধ্যে দুটো অংশ রয়েছে প্রথম অংশে রয়েছে আত্মহননের আনন্দে । এই পর্বের ভেতর কিছু অসাধারণ কবিতা রয়েছে । দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে হৃদয় তান্ত্রিক নামে আরো একটি পর্ব । সেখানে কিছু উদ্ধৃতি নয় , এক লাইনের কবিতা ও নয়, অসংখ্য মহাভারতের এক একটি ইন্দ্রপ্রস্থ রচনা করেছেন তিনি । প্রথমেই পড়ছিলাম আত্মহননের আনন্দ এই পর্বের কিছু কবিতা । পড়তে পড়তে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম কখনো কখনো দিগন্তের পারে থাকা কোন এক অজানা দেবদারু গাছের তলায় অজস্র কথকতা বিছিয়ে দেওয়া আছে কারুকাজ স্বর্ণালঙ্কারের মতো । কবি প্রথম কবিতা মাধুকরীতে বললেন” আমি কুড়াতে এসেছি কেবল / ঝরা পাতা আর ঝরে যাওয়া পাতা ”
পুরনো পাতা কুড়োনোর কোন সমীকরণ থাকে কি ? বোধহয় না । আবারও সমীকরণ থাকতেও পারে , সমীকরণ কখনো অভেদ হতে পারে , কারণ প্রতিটি মানুষ আসলে এক একটা পাটিগণিতের জলে ডোবানো স্ফটিক খণ্ড । প্রতিটি রাত্রিবেলায় নিজের সমীকরণ পাল্টে ফেলে পর্ণমোচী বৃক্ষের মতো । ধীরে ধীরে তার পাতাগুলো ঝরে যায় একটি নাভি কুন্ডের কাছে । নাভিকুন্ড আর কিছু নয় এক হেমন্তের সব গোপনীয়তা ভেঙে নিজের শরীরের ভেতর জমে থাকা কিউমুলোনিম্বাস মেঘকে ছুঁয়ে ফেলার অদম্য ইচ্ছা । ছুঁতে পারা যায় কিছু স্তরীভূত কুয়াশার শরীর । তাদের কোনো স্বেদবিন্দু থাকে না । যদি ছুঁতে পারো কবিতায় কবি বললেন ” মেঘ জন্ম তোমার বৃষ্টি জন্ম আর /
এসব শ্রাবন পেরিয়ে বহুদূর , দূরে /
চলে এসেছে বিষাদ আর বলিরেখা !/

এটি একটি হরিদ্রাভ রঙের হেমন্ত কবিতা । তার শরীরে বলিরেখা আছে তার শরীরে নীরব অবতল মানুষ গুলো শুয়ে থাকে ঈষদুষ্ণ জলে ‌ নিজেকে নিমজ্জিত করার পর কম্পাঙ্ক জলের মর্মার্থ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি শুধু বুঝতে পেরেছি একটা পাখির আর্তনাদ । পাখির কম্পাঙ্ক ও আছে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য আছে অথচ তার ভেতরে একটা পরিযায়ী হয়ে যাওয়ার নেশা টুকুই ঘিরে ধরেছে অনন্তকাল ধরে । কবিতায় যেমন প্রাচুর্য রয়েছে ঠিক তেমনি ঐশ্বরিক চেতনার আধার ও তার বীজপত্রকে সুপ্তভাবে পল্লবীতে করে রেখেছে তুলসী পাতার মতো । কোনো দুঃখ নেই কবিতায় অকপটে বলেন ” সমস্ত শ্রাবণ মাস ভিজে যায় /
কেয়া পাতা জুঁইফুল জানালার নিরালা /
কবিতার ঘর-দুয়ার …./
বিষাদ ময় প্রাচুর্যে নয় আনন্দঘন বিশ্বাসেই /
কোন দুঃখ নেই তোমায় দুঃখ নামে ডাকায় ”

এমন সব অসাধারণ কবিতার অক্ষর পড়তে পড়তে কবি এগিয়ে যান নিজস্ব গন্তব্যের দিকে । গন্তব্য শূণ্য হতে পারে না , শূণ্য একটি বিস্তৃত জলরাশি মাত্র । সেখানে পাললিক স্তর আছে , স্তরীভূত জীবাশ্ম আছে । জীবাশ্মের ভেতরে থাকা এক একটি গোপন গুহার গর্ভ আছে , আগ্নেয় পাথর লক লক করছে নিজের শরীরের ভিতর অসংখ্য ভুত-প্রেত এঁকেবেঁকে জঙ্গলের দিকে চলে যাচ্ছে । তারা সকলেই অশরীরী । প্রশ্বাস ক্রমশ গাঢ় হয়ে উঠছে বৃষ্টির মতো । এলোমেলো চশমা সকলের গন্তব্য কথা লিখে রাখে । মৃত মানুষদের কোন গলনাঙ্ক নেই । নিজেদের শরীর জড়িয়ে ধরে নিজেদের অভাব বোধ আর কিছু দীর্ঘায়িত পাটিগণিতের সমীকরণ । কবি খুবই ভাঙতে ভালোবাসেন কখন ও তিনি নিজের স্নানঘরের ভেতর একটা বায়োস্কোপিক পথের সূচনা করেন , সেখানে ভ্রমণ সংক্রান্ত গতিসূত্র ভেঙে কবি শূন্যতার কবিতায় লিখে ফেলেন একটি অকপট কথা” গাছ তলায় পা ছড়িয়ে বসে ত্রিকোণমিতি , সরল পাটিগণিতে ভুল হয়ে গেছে দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধানে ”

এ কবিতায় পরাবাস্তবের প্রতিটি উপাংশ ছুঁয়ে দীর্ঘায়িত হয়েছে কবিতা । কবিতায় কখনো মেঘ জমেছে , তা আবার উর্বর স্থানাঙ্কের দিকে বয়ে গেছে এক একটা দীর্ঘ সরলরেখা ধরে ‌। সব রাস্তাই জঙ্গলের দিকে চলে যায় । পোস্টমর্টেম কবিতায় হৃদপিন্ডের শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া উর্ধ ও নিম্ন মহাশিরা ধরে যে তৃণভোজী মানুষেরা অবিশ্রান্ত হেঁটে যায় তার ব্যবচ্ছেদ করতে করতে প্রতিটি কবিতার অক্ষরে একটি অত্যন্ত উচ্চ গলনাংক বিশিষ্ট মানুষ অকপটে উড়ে যায় তরাই অথবা ডুয়ার্সের স্নায়বিক ক্ষেত্রফলের দিকে । সকলেই নীল রঙের কাঁটা কম্পাসটিকে বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখে অন্তর্বাসের মতো । প্রতিটি কবিতাই আলাদা আলাদা একটি সরিসৃপ পাথরকুচি পাতার মতো উভয়লিঙ্গ জিব বের করে প্যারেনকাইমা খাচ্ছে । কবি বলেন” পোস্টমর্টেম হবে আজ হবেই / কবিতা ক্ষত হৃদপিণ্ডের ” ।

হৃদপিণ্ডকে ভয় পাই আজকাল ঘুমের ঘোরে । মধ্যাহ্ন প্রহরে উঠে নিজের বুকের কাছে অসংখ্য ভূমির ক্ষেত্রফল অনুযায়ী সন্ধ্যামণি ফুলেরা অতিবৃষ্টির মতো ঝরে যায় নিজের সমাধি ক্ষেত্রের উপর । সমাধি আছে । শান্ত মরিয়ম আছে । বিয়োগান্তক শায়িত মানুষগুলোর মতো , সেখানে কোন নদী থাকেনা , থাকেনা চরাচর গোপন কথা , ইরাবতী নদীর মতো বয়ে যায় তাদের প্রতিটি শরীরে পরশুরাম থাকেন যারা একুশবার কোন ক্ষত্রিয় নগর ধ্বংস করে , পুষ্কর তীর্থে বিকেল আসে । আবার কখনও ওষুধি বৃক্ষগুলো একাকী আল পথে হেঁটে বেড়ায় তাদের কোন রমন চিহ্ন থাকে না । ভুল রমণের ডোর কবিতায় কবি বলেন” নৈঃশব্দের দেবযোণিতে সমস্ত রাত শব্দ খুঁজি/অলীক আঙ্গুল ছবি আঁকো মিথুন রাশিতে ” ।এমন অসাধারণ প্রতিটি শব্দের ভেতর কবি নিপুন চৈতন্য খুঁজে বেড়ান । পর্ণমোচী প্রোটাগনিস্ট নয় কবিতা সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের । উদ্ভিদকে ব্যক্ত করলেন চৈতন্য দিয়ে , রূপান্তর পাথরের মতো কবি বলেছেন ” পর্ণমোচী বৃক্ষ/
এসে বসি /
বসি আর বসেই থাকি/
নিঃশ্বাস গোনা কাজ করি /
বিষন্নতা চৈতন্যের রূপান্তর ক্রমশ ”

একি নিজস্ব শরীরের ভেতরের কথা , যেখানে আজন্মকাল কিছু শ্বেতপত্রের মেলা থাকে দ্রাঘিমা পারদের মতো তড়িতাহিত । সকলেই ছায়ার মতো দেখতে অথচ ছায়া রঙের কোন গোলাপ ফুল শরীরে গজিয়ে ওঠে না । অসংখ্য মানুষের বৃত্ত গুলো কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে অসংখ্য যৌগিক চিহ্ন হয়ে যায় ঠোঁটে সকলেই রসায়ন চিহ্ন ভিজিয়ে রাখে গর্ভজল দিয়ে
কবিতার ভেতর একটি সূক্ষ্মকোণে থাকা বাল্মিকী পুরুষের কথা বলে চলেন কবি নিজেই । আসলে একজন মুনি দরজার কাছে একটা মায়া গাছ রোপণ করেন । সেখানে একটা জানালা থাকে , একটা মিথোজীবীতার গন্ধ থাকে আর কিছু ফিরে আসা পূর্ব জন্মের পুরুষদের হাতে গড়া আজন্ম কবিতার শরীর আঁকা থাকে । যাপন ৩ কবিতায় কবি বলেন মহাজাগতিক অশরীরী কথা । এলিয়েন নয় , এলিয়েনের মতো আরো এক গ্রাম্য মানুষদের কথা ।যাদের শরীরের ভিতরে একটা ইউরেনিয়াম আর কিছু ছায়াময় উদ্ভিদ জ্বর মেখে নিয়েছে নিমজ্জিত রাখার জন্য । ছায়া ঘরের ভেতর স্মরণ চিহ্ন নেই , কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই , কোনো সান্তনু কথা নেই , শুধু নিজস্ব আক্ষেপ টুকু বাদ দিয়ে কবি বলেন ” দীর্ঘ গুহা জীবন , আগুন , আর রক্ত ক্ষয়মুখের মানুষ গুলো কিভাবে কৃষ্ণ রঙের হয়ে যাচ্ছে । মহেশ্বরের মতো কবি প্রতিটি অক্ষরকে সাধন ভূমিতে রেখে যাচ্ছেন অমরাবতীর জলে স্নান করিয়ে ।

” মহাজাগতিক অগ্ন্যুৎপাতের তাপ বিকিরণের তরঙ্গে তরঙ্গে কম্পন নিয়ে যে আলোর কণা ধেয়ে আসে , অন্ধকার নামক কিছু নয় খানিক বর্ণহীনতাকে ফাটিয়ে চুরমার করে আর তুমি অনায়াসে লাল ফুলকে লাল , সবুজ পাতাকে সবুজ , নীল পাহাড়কে ইনক্রেডিবল বলো ” । দীর্ঘশ্বাসের কথা ‌। দীর্ঘশ্বাস নিজের ভিতরে জমে থাকা শ্মশানের জীবাশ্ম কথা হয়ে উঠেছে হয়তো । শ্মশানের কাছে প্রতিটি মানুষ আবারো একবার ব্রাহ্মণ হয়ে যায় । কোন মানুষের শরণ চিহ্ন থাকে না । রত্নেশ্বর শ্মশানের দিকে কবিতাটি সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের । যেখানে একটি ধ্রুব সত্য কথার পাশাপাশি অজস্র বীজগণিত এবং তার পাশে কিছু পদার্থ বিজ্ঞানের সব ফ্রেন্ডস রিকোয়েস্ট গুলো একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে । শুধু জানালার কাছে নিমগ্ন হয়ে হেঁটে হেঁটে যায় রাতের দগদগে শ্মশানের যাত্রীরা । কবি বলেন” নিজেকে কাঁধে নিয়ে টানতে টানতে /
এগিয়ে গেছি রক্তদানের রত্নেশ্বর শ্মশানের দিকে/
ফাল্গুনী বাতাসে শুধু হরিধ্বনি অনুরণন….”

শ্মশানের মতো পবিত্র জায়গা নেই । সেখানে সব জোয়ারের কথা সেখানে সব ভাটার কথা । সেখানে সম্পৃক্ততার কথা । সেখানে যুগপুরুষ মানুষদের কথা । সব গর্ভকেশর কথা । সব অ্যালকোহলীয় কথা । আর কিছু পরিচয়ের অসংলগ্ন কথাগুলো পারস্পারিক শুয়ে আছে এক্রেলিক রং মেখে , তারা সকলেই মৃত্যু থেকে বাঁচার মর্মর ধ্বনি বুকে রাখে তারা সকলেই পরজীবীর মতো দেখতে । কবিতার কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় পর্বের নাম হৃদয় তান্ত্রিক ‌। এক লাইনের কবিতা গুচ্ছ । কবি দেওয়ালের নাম দিয়েছেন , তার বিস্তৃতি পড়তে পড়তে আমি কখনো কখনো নিজের থেকে হারিয়ে গেছি অন্য দূরের কোন এক অমোঘ আহ্বানের কাছে কবি বলেছেন ” ঝরে যাওয়ার অমোঘ নিয়মে ধূসর হয়ে পাতা , হেমন্ত শুধু আহ্বান মন্ত্র ” ।

এই নিরক্ষরেখার অপর নিশাচর ভ্রমণের নাম অলৌকিক পরাবাস্তবের চিত্রকল্পগুলো থরে থরে সাজিয়েছেন হ্যালুসিনেশন রাজপুত্রের মতো । শ্বেতাঙ্গ মানুষের জৈব কথাগুলো স্থানাঙ্ক জ্যামিতির ইতিহাস ভেবে ঝুলিয়ে রাখেন দেহান্তর পর্বমধ্যের অশৌচ সাগরে । কবি ভূমধ্যসাগর খুঁড়ে চলেন । আত্মহননের আনন্দ আছে । আত্মহনন শুধু যে দেহান্তর তা হয়তো নয় , ভেতরে জেগে থাকা অপার্থিব কন্ঠস্বর । বুকে জড়িয়ে জৌলুসহীন পরমাত্মাকে স্থাপন করার আপ্রাণ চেষ্টা । ” দাঁড়িয়েছিলাম তুমি চলে গিয়েছিলে বা বিপ্রতীপে মনে নেই দুজনেই কিনা ” । আসলে সোনালী কথাবার্তা কখনো কখনো অবিস্মরনীয় নটরাজ মুদ্রা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ‌ । তার নিচে আমরা সকলেই বর্ণহীন । ছায়াশরীর । নিজের মাকে খুঁজে বেড়ানো অত সহজ নয় । মায়ের মতো এক জটিল অস্তিত্ব প্রতিটি সুরধ্বনির নিচে প্রত্ন কথাকে পুঁতে রাখে । পাতা জড়ো করে বসে থাকি নিত্যদিন , ” পোড়াতে গেলে নিজেই পুড়ে যাই “এর থেকে বোধ হয় দীর্ঘতম কবিতা আর হতে পারে না ‌।

মৃত্যুকে বিন্দু দিয়ে আঁকতে পারে বাবা । মৃত্যু আসলে এক একটি সরলরেখার সঞ্চারপথ মাত্র । কবি বলেন ” সরলরেখা তুমি যতই ভাঙো বিন্দু পর্যন্ত – সরলরেখাই আমায় দ্যাখো ” । কবির ভেতর ভেতর অসংখ্য কবির মুখ থেকে বিমুগ্ধ উচ্চারণগুলি ধীরে ধীরে পাতা গজায় পর্ণমোচীর মতো । সকলের কাছে কাল্পনিক ইঙ্গিত আছে । নিজেকে যখন দুঃখী মনে করে সবাই পর্ণমোচীর হিমোগ্লোবিন ঝরে ঝরে পড়ে দরজাটির তলপেটের কাছে । অনুচক্রিকার ভেতর থেকে ইলোরা বেরিয়ে আসে তাজমহল বেরিয়ে আসে অশ্বগন্ধা নিয়ে । রাতের নক্ষত্রের মতো জোনাকিরা ভাঙ্গা ভাস্কর্য যেখানে কবি বলেন ” ভাস্করের মতো ডাকতে পারিনি , শীতকাল এসে গেছে সুপর্ণা”

শীতকাল কি ? শীতকালে নিজের ভেতর বসে থেকে অনন্ত সৃষ্টির গোপন স্থান খুঁজে বেড়ানো । ঈশ্বর প্রতিদিন আমাদের শরীরের উপর হেঁটে হেঁটে যায় কাল্পনিক অক্ষর খুঁজে নেওয়ার জন্য । ” পর্ণমোচী বৃক্ষ তুমি জানোই না বসন্তের আগাম ডাক এই পর্ণমোচনেই ” । পর্ণমোচী কথা আজও চিরহরিৎ হয়ে যাচ্ছে , তাদের গায়ে ব্রততী ফুলের গন্ধে বেরিয়ে আসছে অজস্র ক্যাকটাস ফুলের চারা গাছ , কবি তাদের রোপন করছেন , উর্বর করে তুলছেন । কবির এই কাব্যগ্রন্থ পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল আমি কোন একটা ডুয়ার্সের চিরহরিৎ ছায়া অঞ্চল থেকে অসংখ্য প্রতিবিম্বিত কমলালেবু চারা গাছ থেকে গর্ভকেশর ওয়ালা ফলবৃন্ত ছিঁড়ে নিচ্ছি , গাছেদের কোন কান্না নেই , তাদের কোন স্বরবর্ণ নেই অথচ তারা হঠাৎ করেই সবুজ রঙের পাতা ঝরিয়ে আমাদের ধূসর করে দিচ্ছে । আমরা আরো একবার ক্লোরোপ্লাস্ট হয়ে যাচ্ছি । কবির প্রতিটি অক্ষর আমাদের আর ও সজীব করে তুলেছে , কবি আরো দীর্ঘজীবী হন । আরো অনেক কবিতার অক্ষর আমাদের উপহার দেবেন। পাঠকের কাছে অনুরোধ কবির এই কবিতার বইটি পড়লে সমৃদ্ধ হবেন এটুকু কথা দিতে পারি । প্রতিটি কবিতা পাঠ করার পর পড়ে দেখেছি পর্ণমোচী বৃক্ষ তোমাকে কবিতাটির নামকরণ যথার্থ । নামকরণটি অসাধারণ এক মাত্রা এনে দিয়েছে । যেখানে আধ্যাত্মিকতার শরীর জুড়িয়ে প্রতিদিন ঈশ্বর ছুঁয়ে ফেলেন আরো এক হিমোসিল । আমরা সম্প্রদান কারক খুঁজছি । আমাদের তখন জ্বর জ্বর প্যারাসাইট ।

কাব্যগ্রন্থ ঃঃ পর্ণমোচী বৃক্ষ তোমাকে ,
কবি ঃঃ সুবর্ণ রায়
প্রকাশক ঃঃ পাঠক
মূল্য ১০০ টাকা ,
প্রচ্ছদ ঃঃ দয়াময় বন্দ্যোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *