ব্যবধান : তরুণ মজুমদার।

0
607

সে আজ অনেকদিন আগের ঘটনা । সত্তর দশকের হবে । সে সময় আর এখনকার সমাজের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান আছে । তখন এলাকার সকলের সঙ্গে মেলামেশায় অন্তরের টান ছিল । যখন তখন পাড়ার কোন বন্ধুর বাড়িতে চলে যেতে পারতাম ।আগাম জানাবার প্রয়োজন ছিল না । একজনের বিপদে অন্য সকলের ঝাঁপিয়ে পরা কোন নতুন কিছু ছিল না । আবার পরনিন্দা পরচর্চা ও ছিল বেশ রসালো ।
পাড়ার বড় স্কুলেই সবাই পড়াশোনা করেছে । স্কুলের শিক্ষকরা ও ছাত্র কোন অন্যায় করলে বাড়িতে এসে অভিযোগ করতে দ্বিধা করতেন না ।
স্কুল ছুটির পরেই পাড়ার খেলার মাঠে হৈহৈ ব্যাপার ।
আমাদের পাড়ায় এক নতুন পরিবার এসেছে । তিন কাঠা জমিতে নতুন বাড়ি করেছেন । রমেন মেসো ও প্রতিমা মাসি ও তাদের তিন সন্তান আমাদের নতুন প্রতিবেশী । মিতা দি, রিতা দি পাড়ার গার্লস স্কুলে ক্লাস নাইন ও সেভেন এ ভর্তি হয়েছে । আর ছোটছেলে অমিত ক্লাস ফাইভে আমাদের স্কুল মানে অরবিন্দ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় । অমিত আমার সঙ্গে পড়ে ।
অমিতের সঙ্গে ভাব করবার খুব চেষ্টা করতাম । কিন্তু ও খুব একটা মিশুকে ছিল না । খেলাধুলায় ও সেরকম আগ্রহ দেখি নি । কিন্তু অমিত পড়াশোনাতে অত্যন্ত মেধাবী । দেখতে ও খুব সুন্দর । গায়ের রং ধবধবে ফর্সা । রমেন মেসো রেলে কাজ করেন । আগে আসামে থাকতেন । ভারত ভাগের সময় রমেন মেসো ও সব আত্মীয়রা আসামে চলে যান । ওনাদের আদিবাড়ি সিলেটে ছিল । ওখান থেকে আসাম কাছেই ছিল , তাই মনে হয় আসামে চলে এসেছিলেন । রমেন মেসোর মামারা অবশ্য কলকাতায় চলে এসেছিলেন ।
এর মধ্যে রমেন মেসো পাকাপোক্ত ভাবে ইস্টার্ন রেলের কলকাতা অফিসে চলে আসেন । কলকাতায় কিছুদিন ভাড়ায় অন্যত্র থাকার পরে আমাদের পাড়াতে বাড়ি করেন ।
কয়েক মাসের মধ্যেই রমেন মেসোদের সঙ্গে পাড়ার সকলে বেশ অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠেন । পাড়ার ক্লাবে সব অনুষ্ঠানে যেমন সরস্বতী পুজা , রবীন্দ্র জয়ন্তী , দুর্গাপূজা , কালী পুজা বা বাৎসরিক খেলাধুলাতে মুখার্জী পরিবারের অংশগ্রহন বেশ আকর্ষণীয় ছিল ।
রমেন মুখার্জী খুব ভালো নাটক , আবৃত্তি করতেন । প্রতিমা মাসিমার গানের গলা ছিল অত্যন্ত সুন্দর । মিতা দি ও রিতা দি রা গান ও নাচ খুব ই ভাল করতো ।
এভাবে বেশ ভাল কেটেছিল আমাদের ছোটবেলা । অমিত প্রতি বছর প্রথম হত। সব শিক্ষকদের ও বেশ প্রিয় । ক্রমে ক্রমে অমিত আমার বন্ধু হয়ে উঠল । কিন্তু ও বেশী কথা বলত না । মাঝে মাঝে দেখতাম খুব চুপচাপ কি যেন ভাবছে । প্রশ্ন করলে একটু ম্লান হেসে বলত কিছু না । কেন যেন মনে হতো ওর মধ্যে কিছু ব্যথা লুকিয়ে আছে ।
এবারে দুর্গাপূজা বেশ বড় করে হচ্ছে । রমেন মেসো অনেক স্পনসরসিপ যোগাড় করেছেন । পূজার প্রতিদিন সন্ধ্যায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয় । প্রতিমা মাসির পরিচালনায় গানের জলসা , অমিতের সুন্দর তবলা বাজানো , মিতা ও রিতা দি দের নাচ ও গান । তারপরে দশমীর রাতে দেবীবরণ ও প্রতিমা নিরজ্ঞন । দশমীর পরের দিন সকলের বাড়ি গিয়ে ধপাস করে প্রনাম করে কিছু মিষ্টি খাওয়ার জন্য প্রতীক্ষা । প্রতিমা মাসির ঘুগনি ও নিমকি খুব ই লোভনীয় ছিল।
অমিতের এত প্রতিভা ঠিক বুঝতে পারি নি । এখন আমরা ক্লাশ টেন এ পড়ি । প্রতি বছর আমাদের স্কুলে একটা ম্যাগাজিন বেরোয়  অরুনোদয় নামে । অমিতের লেখা কবিতা , আঁকা ছবি প্রকাশ হতো । ওর মধ্যে একটা জিনিষ আমাকে আকর্ষন করতো , তা হলো ওর কোন অহঙ্কার ছিল না । কারোর সঙ্গে কোনদিন ঝগড়া হয় নি । তাই বলে প্রতিবাদ করার ক্ষমতা ছিল না বললে খুব ভুল হবে । কারন স্কুল ডিবেটে ওকে কেউ হারাতে পারতো না ।
মাধ্যমিক পরীক্ষা দোরগোড়ায় । মার্চ মাসে পরীক্ষা । টেষ্ট হয়ে গেছে । এডমিট কার্ড এসে গেছে । একদিন অমিতের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম । উদ্দেশ্য ছিল অঙ্কের কিছু চ্যাপ্টার বুঝে নিতে । মাসিমা অমিত আছে ? হ্যাঁ , উপরের চিলেকোঠার ঘরে । সিঁড়ি ভেঙে উঠে দেখি , অমিত পিছন হয়ে বসে আছে । আমাকে দেখতে পায় নি । কি রে একা একা বসে কি করছিস ? মুখ ফেরাতে দেখি ওর চোখে জল । কি রে কাঁদছিস কেন ? কি হয়েছে আমাকে বল্ ! অমিত দেখলাম খুব সন্তর্পনে নিজেকে সামলে নিল । বলল না তো , কাঁদবো কেন? তবে চোখে যে জল দেখছি । না ঐ আসামের কথা মনে আসছিল ,তাই একটু আবেগে জল আসতে পারে , ও কিছু না । বল্ কি জন্য এসেছিস ? বুঝলাম কিছু গোপন করছে । কিন্তু ওর পেট থেকে কথা বের করা যাবে না । সেদিন কিছু অঙ্কের চ্যাপ্টার বুঝে নিলাম । কি সুন্দর বোঝায় । আমাদের সময়ে প্রাইভেট টিউশন তখন ও তেমন জাঁকিয়ে বসে নি । নিজেদের মধ্যে বুঝে নিতাম বেশির ভাগ ।
মাধ্যমিকে অমিত খুব ভাল নম্বর পেয়েছিল । আমাদের স্কুলে গত দশ বছরে এত নম্বর কেউ পায়নি । স্কুলে ও পাড়ায় ওকে সংবর্ধনা করা হয় । অমিত ক্লাশ ইলেভেন এ বিজ্ঞান নিয়ে এই স্কুলেই ভর্তি হয় । আমি ও বিজ্ঞান নিয়ে ওর সাথে ভর্তি হলাম । অমিত এখন আমার বেস্ট বন্ধু । দ্বাদশ শ্রেণীতে ও সাতশর বেশী  নাম্বার পায় ।
জয়েন্টে মেডিকেল  ও ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভাল যায়গায় ছিল । কিন্তু ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়ে । জিজ্ঞাসা করেছিলাম মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং এ গেলি না কেন ? কিছু উত্তর দেয়নি , কিন্তু মুখটা শুকিয়ে গেলো । এ নিয়ে আর প্রশ্ন করিনি , ওকে দুঃখ দিতে চাইছিলাম না । এরপরে আমি জলাপাইগুরিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে যাই ।
আমাদের বন্ধুত্ব কিন্তু অটুট ছিল ।
তারপরে অনেক বছর কেটে গেলো , আমি কলকাতায় একটা চাকরি পাই । অমিত প্রেসিডেন্সী থেকে মাস্টার্স করে IISC তে ব্যাঙ্গালোরে PHD করতে চলে যায় ।
রিতা দি ও মিতা দি রা খুব ভালোমতন প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন । মিতা দি এখন তার স্বামীর সঙ্গে আমেরিকাতে । রিতা দি দিল্লী তে ।
দেখতে দেখতে পনেরো বছর চাকরি জীবন হলো ।প্রতিমা মাসি আর নেই ! রমেন মেসো অবসর নিয়েছেন । অমিতের সঙ্গে এখন সেরকম যোগাযোগ হয় না ।
একদিন বাজারে রমেন মেসোর সঙ্গে দেখা । সকলের খোঁজ নিলেন । অমিতের প্রসঙ্গ উঠলো । বললেন IISC তে এখন ও কিসব নিয়ে রিসার্চ করছে । অমিত বিয়ে করেনি! আমি এখন একসন্তানের পিতা । পাপাই ক্লাশ সেভেনে পড়ে ।
এভাবে আরো কয়েক বছর যেন কিভাবে কেটে গেলো । পাপাই মেডিকেল পড়ছে । রমেন মেসো মারা গেছেন । একদিন কাগজে দেখলাম অমিতের ছবি নিয়ে খুব বড় খবর বেড়িয়েছে । ও নাকি কি আবিস্কার করেছে ।অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি ওকে সম্মান প্রদান করেছে । রাস্ট্রপতির সম্মান ও পেয়েছে ।
আজ অফিস ফেরত  বাড়িতে এসে একটা খামবন্ধ চিঠি পেলাম । গিন্নি দিল । দেখলাম অমিতের চিঠি ।
চিঠিটা এই রকম ।
প্রিয় বন্ধু প্রবাল ,
আমি অমিত লিখছি । ভেবেছিলাম তোর মোবাইলে কথা বলব । যদি ও অনেক চেষ্টার পরে তোর নাম্বার যোগাড় করলাম , তারপরে আর সেটা করলাম না । কারন গলায় খুব ব্যাথা , ডাক্তার কথা বলতে একদম বারন করেছে ।
গত বছর থেকে শুস্ক কাশী হচ্ছিল । খুব একটা গুরুত্ব দিয়েছিলাম না । টুকিটাকি চালু ওষুধে কাজ চলছিল । মাঝে মাঝে কমে ও যাচ্ছিল । গত তিন মাস থেকে কাশীর সাথে গলায় ব্যাথা ও হচ্ছিল । কাজের ও খুব চাপ । তাই শরীরের দিকে তেমন নজর দেওয়া হয় নি ।
সহকর্মীদের চাপে গত মাসে ব্যাঙ্গালোরে ডাক্তারের পরামর্শ নিলাম । অনেক টেস্ট করিয়েছিল , কিছু ধরা পরে নি । ডাক্তারের সন্দেহ হলো , তারপরে একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের রেফার করলেন । রিপোর্ট এসেছিল । গলার ক্যান্সার ধরা পরে । একদম তৃতীয় পর্যায়ে । তিন মাসের ছুটি নিয়ে গত সপ্তাহে টাটা ক্যান্সার হাসপাতালে মুম্বাইয়ে ভর্তি হয়েছি । অনেক কেমো দিয়েছে । খুব যন্ত্রনা ! তোর সঙ্গে খুব দেখা করবার ইচ্ছা ছিল । যদি আসতে পারতিস শান্তি পেতাম ।
ভালোবাসা নিস । তোকে হয়ত বিরক্ত করলাম ।
ইতি অমিত ।
চিঠি পড়ে চোখ দিয়ে জল পরতে লাগলো । নমিতা মানে গিন্নি ও পাপাই জানতে চায় কার চিঠি । ওদের সব বললাম । ঠিক করে নিলাম আগামীকাল সন্ধ্যায় ফ্লাইটে মুম্বাই যাবো । পাপাই , নমিতা ও অাসতে চেয়েছিল কিন্তু মানা করলাম ।
পরের দিন অফিসে একমাসের ছুটির আবেদন করলাম । কারন জানতে পেরে অফিস ছুটি মজ্ঞুর করে দেয় ।
রাত দশটায় ছত্রপতি শিবাজী বিমান বন্দরে নামলাম । ট্যাক্সি নিয়ে সোজা হাসপাতালে ।
১১০ নাম্বার বেডে অমিত । ঘুমিয়ে ছিল । নার্সদের বলায় ওকে ডাকা হলো । চোখ মেলে আমায় দেখে মৃদু হেসে ইসারায় বসতে বলল পাশের চেয়ারে। কি চেহারা হয়েছে ! মাথায় চুল একদম ফাঁকা । গলায় ব্যান্ডেজ । কথা বলতে চেষ্টা করছিল কিন্তু কোন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না ! বুজতে পারছিলাম খুব কষ্ট হচ্ছে , তাই চুপ করে থাকতে বলি । মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম । একঘন্টা ওর সঙ্গে কাটালাম । রাত সারে বারো হয়ে গেছে । ওকে জানালাম আগামীকাল সকাল সকাল আসবো । ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানালো ।
হোটেলে রাত দেড়টায় পৌঁছালাম । পরের দিন দশটায় হাসপাতালে পৌঁছালাম । অমিতের দুই দিদি ও এসেছে । ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে জানলাম একদম শেষ পর্যায়ে । চান্স নেই বললেই হয় । তবু ও আমাদের তো চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে ।
এভাবে সাতদিন হোটেল হাসপাতাল করতে লাগলাম ।  কয়েকদিন থেকে দেখছি অমিত কিছু বলতে চাইছে আমাকে , কিন্তু দিদিরা থাকায় বলতে পারছিল না । আজ আমি একা , অমিতের দিদিরা বিকালে আসবেন । অনেকক্ষন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে কি একটা খুঁজছিল , পরে পাশে ওর একটা ব্যাগ দেখিয়ে আনতে বলে । অবাধ্যের মতন শুনলাম । একটা পুরানো ডায়েরী দিল । কাছে রাখতে বলে । কয়েক ঘন্টা পরে ডাক্তারের প্রেসক্রাইব করা ওষুধ কিনে দিয়ে অমিতকে জানিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম ।
গভীর রাতে ফোন এল হাসপাতাল থেকে , অমিত আর নেই !
অমিতের শেষকৃত্য মুম্বাইতে করা হলো । মিতা দি ও রিতা দি রা কান্নায় ভেঙে পরেছে । ভাগ্যিস মাসিমা ও মেসোমশাই দেহ রেখেছেন তাই তাদের আর এই পুত্রশোক পেতে হলো না ।
পরের দিন সকালের ফ্লাইটে কলকাতায় নেতাজী বিমান বন্দরে নামলাম । পনেরো দিনের মধ্যেই সব শেষ , অমিতকে বাঁচানো গেলো না । পনেরো দিন ঘরেতেই ছিলাম । নিজেকে মানিয়ে নিতে তো সময় লাগবে !
আজ অমিতের ডায়েরীর পাতা গুলো পড়ছিলাম ।
আমার জন্ম ভগবানের আশীর্বাদ না অভিশাপ জানিনা । দুই দিদির পরে মা বাবা ভেবেছিলেন হয়ত তাদের সংসারে কোন পুত্র সন্তান আসবে । দিদির কাছে জেনেছিলাম মা নাকি কামাক্ষা মন্দিরে মানত রেখেছিল । আমি তৃতীয় লিঙ্গ হয়ে জন্মেছিলাম ।
আমি পৃথিবীতে আসায় মা বাবাকে অনেক অমার্জিত কথা শুনতে হয় নিকট আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের কাছে । সকলে বলতে থাকে একে এদের যে সমাজ আছে সেখানে দিয়ে দিতে । কিন্তু মা বাবা এ ব্যাপারে কঠোর মনোভাব নিয়েছিলেন । আমাকে অন্যত্র যেতে হয় নি । কিন্তু সমাজ তো নিষ্ঠুর ! মা বাবা কে প্রতি পদক্ষেপে এরা হেনস্থা করতে ছাড়তো না । একরকম সামাজিক বয়কট যাকে বলে । সমাজ এখনো শিক্ষিত হয় নি । তারা বোঝে না যে আমার জন্মের জন্য তো আমি দায়ী নই !
বাবা বুঝেছিলেন এভাবে এখানে থাকা মুশকিল ! তাই বদলির জন্য আবেদন করেন । আমার বয়স এখন দশ , বাবা কলকাতায় বদলি হয়েছে । মামা বাড়ির সঙ্গে ও আমার জন্য সম্পর্কের অবনতি হয় । বাবা মা ও দিদিরা আমার লিঙ্গ গোপন করেছিল । কলকাতাতে অরবিন্দ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম । ছোট বেলা থেকে মা বাবা দিদিদের আমার জন্য হেনস্থা হতে দেখে তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখতাম । খেলার ইচ্ছা খুব ছিল কিন্তু পরিচয় গোপনীয়তা রাখতে হবে তাই অংশ নিতে দ্বিধা ছিল । কারোর সঙ্গে মিশতে ও ভয় পেতাম , পাছে ওরা কিছু বুঝতে পারে ।এর মধ্যে  প্রবাল গায়ে এসে বন্ধুত্ব করতে চায় । মন চায় সকলের সঙ্গে মিশতে কিন্তু নিজেকে গুটিয়ে রাখি ভবিষ্যৎ এর বিপদের কথা ভেবে । বাবাকে একদিন প্রবালের কথা বলেছিলাম । বাবা সম্মতি দিলে ও মায়ের মুখ কেমন যেন ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছিলো । পরে মা সম্মতি দিয়েছিল ।
স্কুলে অনেকদিন প্রকৃতির ডাককে উপেক্ষা করতে হতো !  টিফিনে বাড়িতে এসে টয়লেট করে নিতাম । স্কুলে জল কম খেতাম ।
সকলের জীবনে পনেরো বয়স নাগাদ কিছু পরিবর্তন আসে । ছেলেদের ওটাকে বয়সা বলে ! আমার মধ্যে তা বিলক্ষন আসে নি । এভাবে মরা বসন্তের সঙ্গে বছরের পর বছর লড়াই করতাম । গোঁফের রেখা কোনদিন আসে নি । গালার স্বরের মধ্যে ও কিছুটা মেয়ে ও পুরুষের সংমিশ্রন ছিল । পিছনে অনেকে হয়ত এই নিয়ে মস্করা করতো । একমাত্র প্রবাল কোনদিন এই নিয়ে কোন প্রশ্ন করে নি । হয়ত ও বুঝেছিল , পাছে আমি বিপদে পরি তাই আমাকে বুঝতে দেয় নি । তখন থেকেই প্রবালকে খুব ভালো লেগেছিল । একদিন প্রবাল আমার চোখে জল দেখে কি হয়েছে জানতে চায় । ওকে কি করে বলব যে আমি ও সাধরন মানুষের মতন বাঁচতে চাই !
আমি মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি নি যদি ও খুব ভাল পজিসন ছিল । ভয় ছিল স্কুল থেকে তো নিজেকে গোপন করতে পেরেছি । এখানে হয়ত পারবো না । মা বাবা ও সেটা উপলব্ধি করেছিল , তাই প্রেসিডেন্সি তে পড়ি ।
IISC তে যখন রিসার্চ করি তখন আমার তৃতীয় লিঙ্গের কথা প্রকাশ হয়ে যায় , কিন্তু এখানকার সবাই আমাকে কিছুই বুঝতে দেয় নি বরং আমাকে অনেক সাহস দিয়েছেন ।
অনেক পেয়েছি আমি IISC তে । এখান থেকে রিসার্চ করে অনেক সম্মান পেয়েছি । আমার রিসার্চ এখন বিদেশে ও সমাদৃত ।
মা বাবা গত হয়েছেন আজ অনেক বছর হয়ে গেল । দিদিরা মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে । আমি ও যাই ওদের সঙ্গে দেখা করতে ।
কয়েক দিন ধরে গলায় খুব ব্যাথা । প্রথমে গুরুত্ব না দিয়ে ভুল করেছিলাম । তাই মাশুল দিতে হচ্ছে । এক একটা কেমোর যে কি যন্ত্রণা ! অনেক দিন পরে প্রবালের কথা মনে হচ্ছিল । ওকে ডেকেছি । এই ডায়েরীটা ওকে যে দিতে হবে , না হলে যে ওর সাথে খুব অন্যায় করা হবে ! বিদায় বন্ধু ! তোর এই অন্য লিঙ্গের বন্ধু কে ভুলিস না ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here