সংক্রমণ : টিটো।

0
1401

অন্ধকারে চোখের দৃষ্টি খানিকটা সয়ে আসতেই বুঝতে পারলাম আওয়াজটা কোত্থেকে আসছে,
দেখলাম আরো গভীর ঘন অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসছে একটা আস্ত কঙ্কাল,নর কঙ্কাল।
হাড়ে হাড়ে খট্ খট্ শব্দ তুলে এগিয়ে আসছে আমার কাছে, তখন অব্দি আমি খুব একটা ভয় পাইনি, মাইরি বলছি, তখন একটুও ভয় করছিল না আমার, বরং ইচ্ছে করছিল ঘরের কোণে পড়ে থাকা বিল্টুর ক্রিকেট ব্যাটটা সজোরে বসিয়ে দেই ওর মাথায়, ঘুরিয়ে বাড়ি মেরে ভেঙে দেই ওর কোমরের জোড়।
কিন্তু তার জন্য ওটাকে আর একটু সময় দিতে হবে, নাগালের মধ্যে আনতে হবে।দমবন্ধ করে এক,দুই,তিন গুনছিলাম আমি সময় দেব, আরও একটু সময় যাক তারপর দেখাবো কত ধানে কত চাল।

কঙ্কাল টা একই গতিতে এগিয়ে আসছিলো আমার দিকে,
স্পষ্ট চোখে পরছিল ওর শুকনো হলদেটে হাড় গুলোর জায়গায় জায়গায় সবজেটে ছ্যাৎলা, ওর হাড়ে হাড়ে খটাখটির শব্দ রীতিমত কানে লাগছিল আমার।
হঠাৎ ঘরের কোন ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া যেন কাঁপিয়ে দিল আমায়, ওই হওয়ার দমকে ফুলে উঠলো কঙ্কালটার পাঁজর জোড়া মাকড়সার জাল, ঠিক তখনই লাফিয়ে উঠে ক্রিকেট ব্যাট টা তুলতে গেলাম আমি,কিন্তু কই পারলাম নাতো!
লাফিয়ে ওঠা তো দূরের কথা বিন্দুমাত্র নড়তে পারলাম না। আমার পুরো শরীরটা যেন শিষার মত ভারী আর ঠান্ডা, বুকের ভেতর ততক্ষনে যেন বরফ গুলে দিয়েছে কেউ।
এবার আমি ভয় পেয়ে গেলাম ,ভীষণ ভয়। জীবনে এত ভয় আমি কখনো পাইনি জানিস।
কংকালটা তখন আমার খুব কাছে এসে হঠাৎ থমকে গেল,একদম স্থির আর পেছনের জমাট অন্ধকারটা যেন ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভাঙল।

বুঝলাম কঙ্কাল নয় আমার আসল ভয় ওই অন্ধকার থেকে, ওই কঙ্কালটা অন্ধকারকে রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে এসেছে আমি অবধি। একটা অদ্ভুত ব্যাপার জানিস আমি কিন্তু ততক্ষণে ভালই বুঝে গেছি যে আমি স্বপ্ন দেখছি কিন্তু জেগে উঠতে পারছিনা ,আমি চিৎকার করতে চাইছি কিন্তু গলা দিয়ে এক ফোঁটা আওয়াজ বেরোচ্ছে না। দুঃস্বপ্ন দেখলে তো এমনটাই হয় তাইনা, দুঃস্বপ্ন তো আগেও দেখেছি সবাই দেখেছে কিন্তু আমি যেন তখন হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারব ঐ স্যাঁতস্যাঁতে পেছল অন্ধকার টা আর বুঝতে পারছিলাম একটু পরেই আমার বুকের উপর উঠে আসবে ওটা…

দ্যখ, বলতে বলতে এখন আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে দ্যাখ্…
একটানা এতটা বলে টেবিলে রাখা জলের বোতলটা থেকে অসীম অনেকটা জল খেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এবার ওর মরা মাছের মতো চোখ দুটো তুলে আমার দিকে তাকাল তারপর নামিয়ে নিল।
থাক, একটানা অনেকক্ষণ কথা বলেছে ও এবার একটু জিরিয়ে নিক আমি ততক্ষণে ভালো করে আর একবার ওর পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিলাম ওকে।
না,অসীমকে দেখে আজ আমার মোটেও ভালো লাগছেনা , সন্ধ্যেবেলা যখন ও আমার জন্য পাড়ার মোড়ে রতনের চায়ের দোকানে বসে ছিল তখনও ওকে দেখে আমার ভালো লাগেনি।
প্রায় দেড় মাস পরে ওর সঙ্গে দেখা এর মধ্যে যেন অসীমের বয়স দশ বছর বেড়ে গেছে ,কাঁচাপাকা দাড়ি তে ভর্তি মুখ,দাড়ির নিচে গাল ভেঙে উঁচু হয়ে রয়েছে চোয়ালটা, মাথার পাতলা চুল গুলোর উপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেছে ,চোখের নিচে কালি।

একদৃষ্টে উল্টো দিকের ড্রেনের দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে বসেছিল চায়ের দোকানের বাইরের বেঞ্চের একটা কোনায়।
অন্য জায়গায় ,ভিড়ের মধ্যে ওকে দেখলে আজ আমি কোনোমতেই চিনতে পারতাম না।

আরো একটা ব্যাপার লক্ষ করেছিলাম একটা আবছা অন্ধকার যেন সেঁটে রয়েছে ওর পুরো শরীর জুরে, ওর গোটা অস্তিত্বের সাথে।

চায়ের দোকানের ষাট পাওয়ারের বাল্বের আলোটাও যেন আর ছুঁতে পারছে না ওকে।
কাছে গিয়ে ডাকতেই ওর মরা মাছের মতো চোখ তুলে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে ,এমন মরা মাছের মতো চোখ ওর আগেও ছিল কিন্তু আজ যেন ওর চাউনিও পাল্টে গেছে, চোখের নিচের কালশিটে দেখে বুঝতে দেরি হয়নি ভালোই সমস্যায় পড়েছে ও কিন্তু তা বলে এই…

-সবই তো বুঝলাম কিন্তু এত প্যানিক খাওয়ার কি আছে সেটাই তো বুঝতে পারছি না ,দুঃস্বপ্ন কি জীবনে প্রথম দেখলি নাকি!

ইচ্ছে করেই কিছুটা হালকা গলায় বলেছিলাম আমি।

-তা বলে রোজ এমন ভয়ঙ্কর স্বপ্ন! -তুই শিওর ?রোজই …. -একদম আমায় দেখে বুঝতে পারছিস না?কত রাত ভালো করে ঘুমোইনি আমি।

হিস্ হিসিয়ে বলে উঠেছিল অসীম। যদিও সেটা ওকে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারত তবুও আমি উত্তরটা এড়িয়ে গেছিলাম।

-কই আমি তো সেরকম কিছু বুঝতে পারছিনা,

বলে টেবিলের ওপর পুরনো পূজাবার্ষিকী চাপা দিয়ে রাখা কাগজটা খানিকটা অবহেলার ভান করে তুলে নিয়েছিলাম আমি,

– আর যদি দুঃস্বপ্ন দেখে থাকিস তার সঙ্গে এটার কি সম্পর্ক? এটা পেলি কোথায় বলতো? – ছাদে হাওয়ায় উড়ে এসে পড়েছিল। যখন আমার চোখে পড়ল তখন গোটা ছাদ জুড়ে লাট খাচ্ছিল, আমি দেখতে পেয়ে তুললাম…কি ভুলই করেছিলাম ,
তারপর থেকেই শালা লাইফটা হেল হয়ে গেল আমার।

অসীমের আক্ষেপটা একেবারেই নির্ভেজাল।

-কি বেকার বকছিস?একটা কাগজ তোর লাইফ হেল করে দিল!
– ওটা যে জাস্ট একটা কাগজ নয় তুই বুঝতে পারছিস না?
-হ্যাঁ এটা একটা সুইসাইড নোট তো?

কাগজটা বাস্তবিকই বছর পাঁচেক আগের তারিখে লেখা একটা সুইসাইড নোট।

-তুই কোনদিন শুনেছিস এভাবে কোন সুইসাইড নোট মাঠে-ঘাটে পড়ে থাকতে? তাও আবার বছর পাঁচেক আগের!

রীতিমতো উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল অসীম।

– তুই এটাকে এতটা সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন ?তোর কি মনে হয় এটা সত্যি বছর পাঁচেক আগে লেখা! আমার তো এটাকে একটা সিম্পল প্র্যাঙ্ক বলেই মনে হচ্ছে যেটা ঘটনাচক্রে তোর হাতে এসে পড়েছে তাছাড়া কেউ কোনদিন মরার আগে এমন কাব্যি করতে পারে বলে তো শুনিনি।

না ,অসীমকে সান্তনা দেওয়ার জন্য নয় এটা আমার সত্যিই মনে হচ্ছিল।

-তুই নিজেই এবার ঠান্ডা মাথায় ভাব তো পাঁচ বছর আগে লেখা একটা সুইসাইড নোট যদি এভাবে হাওয়ায় উড়ে উড়ে বেড়াতো তবে কি এটা এতদিন আস্ত থাকতো?

অসীম একটু চুপ মনে হয় কনভিন্সড করানো গেছে ।

-এরকমও তো হতে পারে, এতদিন কাগজটা কোথাও যত্নে রাখা ছিল তারপর কোনভাবে…

দৃঢ়স্বরে বলে উঠেছিল অসীম।

– সে তো অনেক কিছুই হতে পারে…

বলে থমকে গেছিলাম আমি, এই যুক্তিটাও তো ফেলে দেওয়ার মতো নয় ।
পকেট হাতড়ে বিড়ির প্যাকেট বের করলো অসীম,
যাক্ বোধহয় স্বাভাবিক হচ্ছে নইলে এতক্ষন একটাও বিড়ি না খেয়ে থাকার লোক অসীম মিত্তির নয় ,যদিও বিড়ির গন্ধ আমার সহ্য হয় না তাও বারণ করলাম না উঠে গিয়ে জানালাটা খুলে দিয়ে এলাম সঙ্গে সঙ্গে একটা সোঁদা গন্ধ নাকে এলো ,কাছে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে, বাতাসে ভেজা ভেজা ভাব, আকাশটা লাল সেখানে পশ্চিম দিক থেকে ভেসে আসছে ঘন কালো মেঘ।

– বৃষ্টি আসছে তুই বরং থেকে যা আজকে, রতনদার দোকানে রুটি আর ডিমের কারি বলে দিচ্ছি।

অসীম নিঃশব্দে মাথা নাড়লো, এর আগে অসীম আমার এখানে অনেক অনেকবারই রাতে থেকেছে কিন্তু সত্যি বলতে আজ ও না থাকতে চাওয়ায় আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত হলাম, এই ভুলভাল তর্ক-বিতর্কে সারা রাত কাটাতে আমি একেবারেই রাজি নই।

-কিন্তু জোর বৃষ্টি আসছে তো এরপর যাবে কি করে?
– একটা ছাতা দে বেরিয়ে পড়ি।

এরপর জাস্ট দু মিনিটের জন্য পাশের ঘরে গেছিলাম আমি, ছাতা আনতে যদিও দুমিনিট ও লাগার কথা ছিল না কিন্তু যেহেতু ঐদিন অসীমের অবস্থা দেখে আমার ভালো ছাতাটা দিতে ভরসা পেলাম না, কোথায় না কোথায় পেলে আসবে ফেলে না এলেও কবে ফেরত পাব তার ঠিক নেই তাই পুরনো একটা শিক ভাঙ্গা ছাতা অসীমের জন্য খুঁজছিলাম আমি, পেয়েওছিলাম। তারপর ঠিক দু মিনিট পর ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি অসীম নেই ,বাথরুমের দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ ।

প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে পড়েছিলাম আমি ,আমাদের পাড়ার সরু গলির বাঁকে অসীমের ছায়াটাকে মিলিয়ে যেতে দেখেছিলাম।
না, আমি আর ওকে ধরার জন্য দৌড়ইনি মনে মনে বেশ বিরক্ত হয়ে ঘরে ফিরে এসেছিলাম, ফোন করেছিলাম ততোক্ষণে ওর মোবাইল সুইচড অফ।
তখন সারাদিনের পরিশ্রমের পর এসব উটকো ঝামেলা আর সত্যিই পোষাচ্ছিল না আমার।
জানলা দিয়ে চলকে আসা বেয়াক্কেলে জোলো হাওয়ায় আমার টেবিলের ওপর পুরনো পূজাবার্ষিকী চাপা অবস্থায় তখনও ফড়ফড় করে ডানা ঝাপটাচ্ছে অসীমের আনা ওই সুইসাইড-নোট ।
আমি আরো একবার হাত বাড়িয়ে তুলে নিলাম কাগজটা,ভাঁজ খুললাম ,কাগজের জায়গায় জায়গায় ময়লার দাগ পেনের কালি কিছুটা আবছা হলেও এখনও স্পষ্ট।

উপরে লেখা নয়ই সেপ্টেম্বর দু হাজার পনের,
কাগজের ঠিক মাঝামাঝি বড় বড় করে অতি সাধারন হাতের লেখায় কয়েকটা লাইন।

“আজকে দাদা যাবার আগে
বলবো যা মোর চিত্তে লাগে,
নাই বা তাহার অর্থ হোক
নাইবা বুঝুক বেবাক লোক।”

“না কোন দুঃখ নেই, কোন কষ্ট নেই, উচ্চাশা নেই তাই পূরণ না হওয়ার হতাশাও নেই। কিন্তু আর ভালো লাগছে না সত্যি ভালো লাগছেনা… তাই চললাম।”…
এরপর একটা বুড়ো আঙ্গুলের ছাপ।সুইসাইড নোট টা সত্যিই অদ্ভুত।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রেখে দিলাম কাগজটা ।
আমি তখনো খেয়াল করিনি ওই কাগজের সঙ্গেই অসীম ফেলে গেছে ওর শরীর জুড়ে থাকা সেই আবছা অন্ধকার যা তখন ধীরে ধীরে জরো হচ্ছে আমার ঘরের কোনায়।

****************২***************

অনেকক্ষণ ধরেই ঘস্ ঘস্ শব্দ টা কানে আসছিলো ধীরে ধীরে আমার তন্দ্রার জাল কেটে থাবা বসাচ্ছিল আমার স্বপ্নে, অনেকটা মেঝের ওপর বালি ভর্তি বস্তা টানলে যেমন হয় তেমন।
শুরুতে অস্বস্তি হলেও এক সময় কানে সয়ে এসেছিল শব্দ টা চোখ-কান বন্ধ করে মটকা মেরে পড়ে ছিলাম যদি এভাবেই আবার ঘুম এসে যায় সেই আশায়।
যদিও শব্দটা এখন আর নেই হঠাৎ করেই সব শান্ত চুপচাপ কিন্তু এই নিস্তব্ধতা যেন আরো বেশি অস্বস্তির,আরো বেশি দমবন্ধ করা।

চোখ বন্ধ অবস্থায় পাশ ফিরে হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম বিছানার পাশেই মেঝেতে রাখা জলের বোতলটার দিকে। একটু গলা ভেজালে হয়তো ভালো লাগবে, এই হাঁফ ধরা ভাবটা কাটবে।
কিন্তু, কই! বোতলটা তো হাতে ঠেকল না!
এখানেই তো রেখেছিলাম ,রোজ রাতে এখানেই রাখা থাকে ।
তাই বাধ্য হয়েই চোখটা খুলতেই হলো, আর চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গেই টের পেলাম ব্যাপারটা, আড়চোখে দেখলাম আমার ঘরের কোনা কাঞ্চিতে জমে থাকা সমস্ত অন্ধকার যেন একটু একটু করে জমা হচ্ছে আমার সামনে ,আমার বুকের ওপর।

মিশমিশে নিকষ কালো জমাট অন্ধকার,এত অন্ধকারও আমার ঘরে ছিল!
কিন্তু অন্ধকার তো এর আগেও দেখেছি, এমন ঘন থকথকে অন্ধকারের সামনে তো কখনো পড়িনি!
মনে হচ্ছে রাতের আকাশ থেকে অদৃশ্য তুষারপাতের মত সমস্ত অন্ধকার ঝরে পরে জরো হচ্ছে আমার ঘরে, আমার সামনে।
কানে স্পষ্ট ভেসে আসছে ঐ বিকট অন্ধকারের শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ, আওয়াজ এর তালে তালে অল্প অল্প নড়ছে ঐ বিকট স্যাঁতস্যাঁতে পেছল অবয়ব টা আর তার সামনেই আচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে রয়েছি আমি,কতক্ষণ? জানা নেই।
চটকা ভাঙ্গলো আর একটা আওয়াজে
…বল হরি হরি বল, বল হরি হরি বল…
মনে হয় গলির মুখ থেকে ভেসে আসছে এই হরিধ্বনি, যদিও এই আওয়াজটা পরিচিত কিন্তু এমন রাতে এই আওয়াজই আমার আতঙ্ক বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

শবযাত্রীরা এখন আমার বাড়ির খুব কাছে ওই আওয়াজে যেনো হঠাৎই একটু নড়েচড়ে উঠলো আমার সামনের কুচকুচে কালো পিন্ডটা,

অন্ধকারের মধ্যে আচমকা ফুটে উঠল একটা সরু কিন্তু তীব্র উজ্জ্বল লালচে আলোর রেখা, ওখানটায় কি ওর মুখ?
জন্তুটা কি হাসল আমায় দেখে ?

ততক্ষণে ওই শবযাত্রীরা এসে পড়েছে আমার জানালার একদম পাশটাতে,কানফাটানো “বল হরি হরি বল “এর সঙ্গে নাকে আসছে ধুপ, চন্দন আর বাংলা মদের ঝাঁঝালো গন্ধ।
ঠিক তখনই আবার নড়েচড়ে উঠলো আমার সামনের জন্তুটা আরও চওড়া আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওর মুখের হাসি আর একইসঙ্গে ঘটাং শব্দে আমার সামনে খুলে গেল একটা গনগনে ইলেকট্রিক চুল্লি মুখ…….

ঘুম যখন ভাঙলো তখন শেষ রাত, গলা বুক সব ঘামে ভিজে সপ্ সপ্ করছে, হাত-পা একেবারে ঠান্ডা। শরীরে আর বিন্দুমাত্র জোর অবশিষ্ট নেই।
ওভাবেই আরো বেশ কিছুক্ষন পড়ে থাকার পর চোখের সামনেই একটু একটু করে জানালার বাইরের আকাশটাকে ফর্সা হতে দেখলাম, কানে এল কাকের ডাক।
মনে হল এতক্ষণে যেন আমার হাত পা গুলোয় সার ফিরে এসেছে, টের পেলাম তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে আমার।
কোনমতে শরীরটাকে পাশ ফিরিয়ে খাটের পাশে মেঝেতে রাখা জলের বোতল টার দিকে হাত বাড়ালাম, এবারেও কিছু হাতে এসে ঠেকল না। অনেক কষ্টে মাথা তুলে দেখলাম খাটের পাশ থেকে বেশ কিছুটা দূরে আমার নাগালের বাইরে গড়াগড়ি খাচ্ছে জলের বোতলটা,
কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে বোতলটা খাটের পাশেই রাখা ছিল ঠিক রোজ যেমন রাখা থাকে।

অফিস ফেরতা অসীমের বাড়ির দিকে গিয়েছিলাম, ওর ফোন এখনো সুইচড অফ।
এবার বেশ দুশ্চিন্তা হচ্ছে আমার, আবার রাগও হচ্ছে।
মালটাকে সামনে পেলে খিস্তি দিয়ে গুষ্ঠি উদ্ধার করে দেবো।
ওর ওই বিদঘুটে সুইসাইড নোট আর বিকট স্বপ্নের জন্যই কাল রাতের ঘুম নষ্ট হয়েছে আমার।
মাথার মধ্যে এখনো ঘুরে ফিরে বেজে চলেছিল অসীমের গলা
…” তারপর থেকে শালা লাইফটা হেল হয়ে গেল আমার”।
তাই আজ ভোর হতেই আর দেরি করিনি, প্রথমে ওই সুইসাইড নোট টা দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে ছিলাম ঘরের কোণে রাখা জঞ্জালের বালতিতে কিন্তু তাতেও ঠিক নিশ্চিত হওয়া গেল না।
আর সত্যি বলতে কি রাগের সঙ্গে ভয় হচ্ছিলো, সত্যিই যদি ওই কাগজটা আমার নিরুপদ্রব জীবনে এরকম একটা উপদ্রব নিয়ে এসে থাকে তবে এভাবে ফেলে দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়।
সোজা বাড়ির ছাদে উঠে গেলাম কাগজটা নিয়ে অন্য হাতে দেশলাই সিঁড়ির ঘরের কোনায় যেখানে হাওয়া কম সেখানে দাঁড়িয়ে দেশলাই জ্বালিয়ে বেশ যত্ন করে ধরিয়ে দিলাম কাগজটার একটা কোনা,
প্রথমে আগুনটা ছোট্ট করে জ্বলে উঠলো, আগুনের ছ্যাঁকায় সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে যেতে থাকল কাগজের ওই কোনটা,
আগুনটা চর্ বর্ করে বড় হতে হতে গিলে খাচ্ছিল ওই আঁতেল মার্কা হতচ্ছাড়া শব্দগুলোকে।
তারপর আস্তে করে কাগজ টা কে পায়ের কাছে ফেলে দিয়েছিলাম আমি, পায়ের কাছে পোষা বিড়ালের মত পড়ে থেকে পুড়ে গেল গোটা কাগজটা আর ঠিক তখনই একটা মিষ্টি ফুরফুরে হাওয়া এসে পোড়া কাগজ টা কে উড়িয়ে নিয়ে গেল আমার পায়ের কাছ থেকে।
গোটা ছাদ জুরে ফেলে ছড়িয়ে লাট খেতে থাকলো কাগজটা, ঠিক এভাবেই হয়তো ওইদিন ওটা লাট খাচ্ছিল অসীম দের ছাদে।
বেশ হালকা লাগলো নিজেকে, ভোরের ওই মিষ্টির হাওয়ায় দিব্বি মুছে গেল গত রাতের আতঙ্ক।

….”অসীম টা সত্যিই একটা মাথামোটা,এতদিন ধরে কাগজটাকে জমিয়ে না রেখে ফেলে বা উড়িয়ে দিলেই তো হতো বোধহয় মাথাটাই খারাপ হয়ে গেছে ওর”।
আজ সারাদিন অফিসের কাজ কর্মের মধ্যে পুরোপুরি ভুলেই গেছিলাম কাল রাতের ওই স্বপ্নের কথা কিন্তু অসীমের ফোন লাগাতার সুইচড অফ পাওয়ার বিষয়টা যথেষ্টই খচখচ করছিল মনের ভেতর।
ঐ খচখচানি থেকে মুক্তি পেতেই সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন থেকে মেট্রো ধরে গিরীশ পার্ক নামলাম আমি তারপর অটো ধরে ফুলবাগান।
এর আগেও বেশ কয়েকবার অসীমের বাড়ি এসেছি আমি কিন্তু এমন অভ্যর্থনা আগে কখনো পাইনি।

আমায় দেখে অসীমের বৌদি মুখে আঁচল দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, ওর ভাইপো বিল্টু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল আমার দিকে,অসীমের দাদা বাইরের ঘরের সোফায় ঘাড় গুঁজে বসে শুধু মাথাই নেড়ে গেলেন

আর অসীম? নিজের ঘরের বিছানায় গুটিসুটি হয়ে বসে আপন মনে শুধু বিড়বিড় করে গেল।
আমার ডাক শুনে একবার তাকাল দেখলাম শুধু চাউনি নয় ওর চোখও যেন বদলে গেছে ,
এমন অসম্ভব উজ্জ্বল চোখ তো ওর ছিলনা চোখের মণিতে এত অস্থিরতা ও ছিল না।

পাগল হয়ে গেছে এক রাতের মধ্যে, বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে আমার দীর্ঘদিনের এই বন্ধু।
অসীমের বিছানার একপাশে কিছুক্ষন থম্ মেরে বসে ছিলাম আমি, বসে ভাবছিলাম এরম একটা নিম্নবিত্ত পরিবারে এহেন পাগলমি কতটা বিরম্বনার কতটা সমস্যার।

বসে থাকতে থাকতেই যেন অসীমের বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছিল আমার কানে। আরো একটু ভালোভাবে শোনার জন্য এগিয়ে গেলাম ওর দিকে,এইতো,হ্যাঁ ,আমি ঠিকই শুনছি, অসীমের অস্পষ্ট উচ্চারণে প্রতিটা শব্দ ওর মুখ থেকে ছিটকে ধাক্কা মারছে আমার বুকে ,
আর ঐ ধাক্কার অভিঘাত সামলাতেই যেন নিজেকে একরকম ঠেলেই বের করে দিলাম ঐ বাড়ি থেকে ।

তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে ওদের বাড়ির গলি পেরিয়ে এসে কিছুটা শান্ত হলো আমার স্নায়ু, রাস্তার চাপা কল থেকে জল খেলাম খানিকটা ,কিন্তু এ আমি কি শুনলাম!অসীম যা আশঙ্কা করছিল তাই কি তাহলে সত্যি হলো!

তাহলে কি কোনো ধ্বসে যাওয়া সৌধের ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের মতোই ওর বাকি জীবন জুড়ে অনড় অচল হয়ে পড়ে থাকবে আবোল তাবোলের ওই চারটে লাইন!

****************৩***************

বারবার জল সাবান দিয়ে ধুয়েও বিশেষ কাজ কিছু হল না, মুখ থেকে কালচে ছাপটা উঠছেই না। সকালে কি ছিল এই ছাপটা! হয়তো ছিল, কাজে-কর্মে খেয়াল করিনি।

নাহ্, কাল একটা ভালো দেখে ফেসওয়াশ কিনে আনতে হবে আর একটা ফেয়ারনেস ক্রিম, এই হালকা ছায়ার মত ছাপটা একেবারেই ভাল লাগছে না।
বলতে নেই অসীমের বাড়ি থেকে মন ভার করে ফিরে এলেও পাড়ার মুখে এসে কিন্তু মেজাজটা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেছিল আমার।

হয়েছে কি,আমাদের পাড়ার অটো স্টপেজে নেমে গলির ভেতরে ঢুকে একটু এগিয়েই ডানদিকের কোনা ঘেঁষে যে রাস্তাটা সোজা গঙ্গার দিকে চলে যাচ্ছে সেখানেই, মানে ওই ঘোষালদের বাড়ির সামনে আজ একটা পাগলকে বসে থাকতে দেখেছি আমি।
দেখে ভাবলাম “এটা আবার কোত্থেকে আমদানি হল আগে তো দেখিনি…”

ভাবতে ভাবতে পাগল টার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, এমনিতে ওই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো পাগলরা যেমন হয় এটা ঠিক তেমনই কিন্তু আমার যেন কেমন একটা সন্দেহ হলো।

পাগলটার চোখ দুটো যেন একটু অন্য কথা বলছে। কিছুক্ষণ ওর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পর পাশে গোবিন্দর ছোট্ট স্টেশনারি দোকান থেকে একটা ছোট বিস্কুটের প্যাকেট কিনে দিলাম পাগলটাকে।

তারপরেই একটা দারুণ মজার ব্যাপার ঘটল, পাগলটার বিস্কুটের প্যাকেট ছেঁড়া দেখেই আমি বুঝে গেলাম এটা কোন সাধারন পাগল নয় হয়তো বা পাগলই নয়।
এবার পাগল টার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম আমি,পাগলটা আমার দেখাদেখি দাঁত বের করল নোংরা চূল,নোংরা মুখ,নোংরা দাড়ি-গোঁফ কিন্তু দাঁত গুলো একদম পরিষ্কার ঝকঝকে,আর কোন সন্দেহ রইল না আমার।
কোন মতে হাসি চেপে আবার গোবিন্দর দোকান থেকে একটা জলের বোতল কিনলাম।
সে সময় বোধহয় একটু হেসে ফেলেছিলাম,
গোবিন্দ খানিকটা অবাক হয়ে আমার দিকে জলের বোতলটা এগিয়ে দিলো আমিও বোতলটা নিয়ে পাগলটাকে দিলাম। আর পাগলই বা বলি কেন, ওর পরিচয় ততক্ষনে আমার কাছে ফাঁস হয়ে গেছে।

আমি নিশ্চিত পাগল পাগল কিছু নয় এ ব্যাটা নির্ঘাত ক্রাইম ব্রাঞ্চ অথবা সিবিআইয়ের কোন বড় অফিসার।

নিশ্চয়ই এই এলাকায় কোন হেভি ওয়েট ক্রিমিনালের সন্ধান পেয়েছেন তাই তাকে হাতেনাতে ধরার জন্য এমন পাগল সেজে বসে আছে।

যাই হোক, বিস্কুট খেয়ে নিশ্চয়ই গলা শুকিয়ে গেছে একটু জল খাওয়ানো উচিত, আমাদেরও তো কর্তব্য বলে একটা ব্যাপার আছে নাকি!

ওই ছদ্মবেশী অফিসার ভদ্রলোক জলের বোতলটা হাতে নিয়ে ছিপিটা খোলার চেষ্টা করলেন, উনি ঠিক বুঝেছেন যে আমি ওনাকে ধরে ফেলেছি, তাই এবার আমার সামনে অভ্যস্ত হাতে বোতলটা খুলতে ইতস্তত করছেন।
আমি বরং এখন কেটে পরি, ধরা পরে এমনিতেই ভদ্রলোক বেশ চাপে আছেন, ওনাকে আর টেনশন দিয়ে কাজ নেই।
এখন কিন্তু ভদ্রলোককে দেখে আমার বেশ মজাই লাগছে, ধরা পরে গিয়ে চোখে মুখে কেমন একটা বিপন্নতা ফুটে উঠেছে ওনার।

হুঁ হুঁ বাবা, আমার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়, আমার সঙ্গে চালাকি! অনেক কষ্টে হাসি চেপে ওখান থেকে সরে গেলাম আমি।

গোবিন্দ তখনও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে,চোখাচোখি হওয়ায় আমার বাম চোখটা একটু টিপে দিলাম আমি।

বাড়ি ফিরে পেটের ভেতর বুড়বুড়ি কেটে ওঠা হাসির বুদবুদগুলো কে ছেড়ে দিলাম আমি, প্রাণভরে হাসলাম কিছুক্ষন। তারপর নিজের মুখের উপর কালশিটে দেখে আবার মুডটা অফ হয়ে গেল যাই হোক কালকে ফেসওয়াশটা কিনে মেখে দেখি কি হয়।

দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ, রতনদা রাতের খাবার পাঠিয়েছে, রুটি আর ডিম তরকা।খাবারের প্যাকেট টা নিয়ে রতনদার দোকানের ছেলেটা কে চুপিচুপি বললাম “…ঘোষাল দের বাড়ির সামনে পুলিশের একজন খুব বড় অফিসার বসে আছেন, দেখে চিনতে পারবি না পাগল সেজে রয়েছেন। ওনাকেও চারটে রুটি আর তরকারি দিয়ে আয় টাকা আমি দিয়ে দেবো,…..”
কথাটা শুনে ছেলেটা কিছুক্ষন ড্যাবড্যাবিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর চলে গেল।

দরজা বন্ধ করে প্যাকেটটা টেবিলের উপর রাখতেই মনে পড়ল এই ভদ্রলোকের আসল পরিচয় ছেলেটাকে বলা উচিত হয়নি, এবার এই ব্যাটা যদি কথাটা পাঁচকান করে ফেলে তখন,না না এখনই বারণ করতে হবে।
তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে বের হলাম, ওই তো ছেলেটা ফিরে যাচ্ছে, চেঁচিয়ে ডাকলাম,
” ঐ ভাই শোন একবার”
ছেলেটার নামটাও ছাই মনে পড়ছে না, ছেলেটা আমার ডাক শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল ,
পিছন ফিরে দেখল, তারপর আবার হনহনিয়ে চলে গেল।
“ওই ছেলে শোন না”
কিন্তু ছেলেটা আর দাঁড়ালোই না, যা ব্বাবা, ছেলেটা এমন করল কেন! এরো কি মাথায় ছিট হলো নাকি!

****************৪***************

মুখের কালচে ছাপটা আজ আর একটু গাঢ় লাগছেনা! এত আচ্ছা মুশকিল হলো।
নাহ্, মনে হয় আর ফেসওয়াশ বা ফেয়ারনেস ক্রিমে কাজ হবে না সেলুনে গিয়ে ওই ফেসিয়াল টেসিয়াল ওইসব করে আসতে হবে। এখন আর এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে ইচ্ছে করছে না।
কাল রাতে একটা ভারী মজার স্বপ্ন দেখেছি, মনে করে এখনো হাসি পাচ্ছে।
দেখলাম, অসীমের স্বপ্নের ওই ছ্যাৎলা পড়া মাকড়শার জাল মাখা কংকালটা তন্ন তন্ন করে আমার ঘরে ওই সুইসাইড নোট টা খুঁজছে, আর তাই দেখে রতনদার দোকানে বসে আমি অসীম আর ছদ্মবেশী পাগল চিকেন কষা আর রুটি খেতে খেতে খুব হাসছি।
কংকাল টার চোখের অন্ধকার গুলো যেন কেমন ফ্যাকাসে ফ্যাকাসে লাগছে, বুঝলাম বেচারা খুব হতাশ হয়েছে।
এদিকে আমাদের হাসি আর থামতেই চাইছে না। যদিও সব থেকে বেশি হাসছে অসীম।
আঁতিপাতি করে খুঁজেও কংকালটা সুইসাইড নোট খুঁজে পেল না, কিন্তু কোথা থেকে আমার কালকের কেনা বিস্কুটের প্যাকেটটা পেয়ে গেল, আমি দেখে চমকে গিয়ে অফিসার ভদ্রলোককে বললাম
” কি হলো ,ওটা এখানে এলো কি করে”? ভদ্রলোক মুখে রুটি নিয়ে আমার কথার উত্তর দিতে গিয়ে জোর বিষম খেলেন, তারপর শুরু হল বেদম কাশি , কাশির দমকে দুচোখ দিয়ে জল বেরিয়ে পড়ল আর বেআক্কেলে অসীমটা তখনও হেসেই চলেছে। আমার অবস্থা তখন দেখে কে!

একদিকে নকল পাগল কাশছে আর অন্যদিকে আসল পাগল হাসছে ভাগ্যিস ওই সময় রতনদা নিজেই একটা জলের বোতল এগিয়ে দিলো,

ও হরি! দেখি আমার সেই কালকের কেনা জলের বোতলটা, এখনো সিল ভাঙেনি…. এরম মজার স্বপ্ন দেখার পর কারোর মন ফুরফুরে না হয়ে পারে!

নাহ্,সত্যি, আজ নিজেকে বেশ ফ্রেশ লাগছে। ভালো করে মাথায় শ্যাম্পু ঘষে অনেকক্ষণ ধরে চান করলাম আজ,গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে ইস্ত্রি করা ধোপদুরস্ত জামা কাপড় গায়ে চড়ালাম, আজ বিশেষ যত্ন নিয়ে চুল আঁচড়ালাম এবার রতনদার দোকানের ডবল ডিমওয়ালা এগটোস্ট আর চা খেয়ে অফিস।
কিন্তু দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই আক্কেলগুরুম,একি দেখছি আমি!

আমাদের গোটা পাড়াটাকে যেন একটা স্বচ্ছ কালো চাদরে মুড়ে দিয়েছে কেউ আর সেই চাদরের ছায়া ঢেকে রেখেছে পাড়ার প্রতিটা ইঞ্চি প্রতিটা কোন।

রতনদার দোকান, বাগচিদের বাড়ির সামনে দাঁড় করানো ওদের ধবধবে সাদা সান্ট্রো গাড়ি তার উল্টো দিকের করবী গাছ কিছুই আর বাদ পড়েনি আজ,ড্রেনের ঘোলা জলও আজ যেন পিচ কালো।
এদিকে মানুষগুলোকেও দেখো, কারোর এতটুকুও ভ্রুক্ষেপ নেই, এই দিনে দুপুরে মুখে মাথায় অন্ধকার মেখে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে একেকটা জম্বির মতন।
কিন্তু যেটা সবথেকে বিপদের কথা সেটা হলো আমার বাড়ির সামনে দিয়ে গলির মুখ অবধি খোয়া বাঁধানো রাস্তায় পড়ে লাট খাচ্ছে গুচ্ছ গুচ্ছ সুইসাইড-নোট।

ওই নোটের প্রতিটা শব্দ আমার খুব চেনা, ভয়ঙ্কর ভাবে চেনা।

আর দেরি না করে লাফিয়ে পড়লাম রাস্তায়, দুহাত দিয়ে পড়িমড়ি করে কুড়িয়ে নিতে থাকলাম কাগজগুলো।

আমি বুঝতে পেরেছি এই সব কিছুর জন্য আমিই দায়ী, কাল ছাদে উঠে ওই কাগজটা পুড়িয়ে ফেলা একেবারেই উচিত হয়নি আমার।

ওই পোড়া ছাই ভাইরাসের মত ছড়িয়ে পড়েছে পাড়ার আনাচে-কানাচে।
হে ভগবান, কি ভুল করলাম আমি। না, ভাবার সময় নেই, এই সমস্ত কাগজ এখনই পুড়িয়ে ফেলতে হবে আমায় কিন্তু একা একা এভাবে আর কতটা….
“রতনদা দোকান বন্ধ করে কাগজগুলো কুড়োও…”
চিৎকার করে বললাম আমি, কিন্তু রতনদা কি কিছুই শুনতে পেল না! এমন হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? ওর কি বোধ বুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে ?

বুঝেছি, রতনদার মাথা আর কাজ করছে না, পাগল হয়ে যাওয়ার আগের ধাপ। কিন্তু আমার আশেপাশে তো আরও লোকজন রয়েছে ওরাও তো কেউ আমার কথা শুনল না,
কেউতো কাগজগুলোতে কুড়োতে হাত লাগাল না।
সবাই ওই রতনদার মতোই…..! তাহলে কি ওরাও…….!
ঠিক আছে, দায় যখন আমার তখন আমাকে এইসব সামলাতে হবে। সামলাবই।

কিন্তু হঠাৎ অসীমের গলা শুনলাম যেন!
হ্যাঁ, ঠিক তাই। স্পষ্ট শুনলাম ওর বিড়বিড়ানি,
কিন্তু কোথাও দেখতে তো পাচ্ছি না ওকে।
যাক্ গে,আমার এখন অনেক কাজ। আচ্ছা,ওই কাগজ পোড়া ছাই যদি কোন ভাবে কোন বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়! যদি বাড়ির ভেতরে কোন কোনায় ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে ওই সুইসাইড-নোট!
না, এ হতে দেওয়া যায় না ।দুম্ দুম্ করে ধাক্কা মারলাম আমার সামনের বাড়ির দরজায় চিৎকার করে বললাম
“…আপনার ঘরে কোথাও কোন সুইসাইড-নোট আছে কিনা দেখুন, থাকলে কিন্তু সর্বনাশ”।

একটা- দুটো-তিনটে.. একের পর এক বাড়ির দরজায় ধাক্কা মারলাম আমি,কেউ দরজা খুললো না। বুঝলাম সর্বনাশ যা হওয়ার হয়ে গেছে। কিন্তু আমায় তো এত সহজে হার মানলে চলবেনা, চেষ্টা করতে হবে,চেষ্টা।
“…আরে কেউ দেখুন না ঘরে কোথাও কোন সুইসাইড নোট খুঁজে পান কিনা যেমন-তেমন নোট নয়… আবোল-তাবোল থেকে নেওয়া লাইন লেখা আছে ওতে ”
“ভালো করে খুঁজুন পাবেন,খুঁজে পেতেই হবে… দেখবেন শুরুতেই লেখা আছে ….”

কি যেন লাইনগুলো বেশ?
হ্যাঁ এইতো, মনে পড়েছে,
অসীমের বিড়বিড়ানি আবার মনে করিয়ে দিলো আমায়….

“আজকে দাদা যাবার আগে, বলবো যা মোর চিত্তে লাগে ….”
**************সমাপ্ত*************