আমার ঈদিপাস কমপ্লেক্স (ফ্রাঙ্ক ও’কনর) : অনুবাদ – প্রত্যয় হামিদ।

0
471

যুদ্ধের- অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের- পুরোটা সময় জুড়ে বাবা আর্মিতেই ছিলেন। সেজন্য আমার পাঁচ বছর বয়স অবধি তাকে খুব বেশি দেখিনি, আর যতটুকু দেখেছিলাম, ততটুকুতে তাকে নিয়ে ভাবার কোন কারণও ছিল না। কখনও সখনও ঘুম থেকে জেগে দেখতাম হালকা আলোয় একটা বিশালদেহী খাকি পোশাক আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন আমাকে গিলে ফেলবে। মাঝেমধ্যে কোন এক সকালে সশব্দে বাইরের দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনতে পেতাম। শুনতে পেতাম পাথুরে লেন থেকে ছুটে আসা বুট জুতার ধাতব শব্দ। এই ছিল বাবার গমন ও প্রস্থান। সান্তা ক্লজের মতই রহস্যময় ছিল উনার আসা-যাওয়া।
সত্য বলতে কী, তার এই আসা-যাওয়া আমার ভালোই লাগত, যদিও ভোর বেলায় বড় বিছানায় গিয়ে মা-বাবার মধ্যেখানটায় ঢোকা খুব অস্বস্তিকর ছিল। বাবা সিগারেট খেতেন, যা তাকে এক ধরনের ধোঁয়াটে আনন্দ দিত। তারপর শেভ করতেন। এ কাজটা করে তিনি অদ্ভুত মজা পেতেন। প্রতিবারই যাবার সময় তিনি কিছু না কিছু দিয়ে যেতেন- খেলনা ট্যাঙ্ক, বুলেটের খোসার হাতলওয়ালা গুর্খা চাকু, জার্মান হেলমেট, ক্যাপ ব্যাজ, বাটন স্টিকসহ নানান রকম মিলিটারি উপকরণ। এগুলো একটা বড় বাক্সে ভরে খুব সাবধানে রাখা হতো ওয়ার্ডরোবের মাথায়, যেন চাইবা মাত্রই সেগুলোকে হাতের নাগালে পাওয়া যায়। বাবা ছিলেন কিছুটা ম্যাগপাই স্বভাবের- যা পেতেন তা-ই সংগ্রহ করতেন। তিনি চাইতেন জিনিসগুলো যেন সব সময় তার হাতের নাগালেই থাকে। তিনি যখন চলে যেতেন, তখন এই গুপ্তধন পেড়ে সেগুলো নিয়ে খেলার সুযোগ আমাকে মা করে দিতেন। এসব জিনিসপত্র নিয়ে বাবা যতটা সিরিয়াস ছিলেন, মাকে ততটা মনে হয়নি।
আমার জীবনে যুদ্ধের ওই সময়টুকুই সবচে শান্তির ছিল। আমার ছোট্ট ঘরটার জানালা ছিল দক্ষিণ-পূর্বমুখী। মা জানালায় একটা পর্দার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা খুব একটা কাজের ছিল না। ভোরের আলো ফুটবার সাথে সাথেই আমি জেগে উঠতাম। সাথে জেগে উঠত আগের দিনের যাবতীয় কাজকর্ম। নিজেকে সূর্যের মতই মনে হতো- আলো ছড়ানো আর হৈহুল্লোড় করার জন্য প্রস্তুত। মনে হয় তখনকার মত এমন স্বাভাবিক, স্পষ্ট আর সম্ভাবনাময় জীবন কখনই আসেনি। আমার পা দুটোর আলাদা আলাদা নাম ছিল- মিসেস বাম ও মিসেস ডান। চাদরের নিচ থেকে তাদেরকে বের করে একটা নাটকীয় মুহূর্তে ঢুকে যেতাম। সারাদিনে কী কী সমস্যা আসতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করতাম। কেউ না করলেও মিসেস ডান কিন্তু করতই। সে ছিল খুব খোলামেলা। ওদিকে মিসেস বাম-এর উপর আমার একইরকম কন্ট্রোল ছিল না। সেজন্য বেশির ভাগ সময়ই মাথা ঝাঁকিয়ে সব কথায় সায় দিতেই সে ভালোবাসত।
ওরা আলোচনা করত- মা আর আমার সারাদিন কী কী করা উচিত, সান্টা ক্লজ তার ভক্তকে কী উপহার দিতে পারে, আর বাড়িটাকে আরও বেশি ঝলমলে করতে হলে কী কী করা যেতে পারে। নতুন কোন বাবু আসুক, সেটা নিয়ে তেমন কোন চিন্তাভাবনা ছিল না। মা আর আমি কখনই নতুন একটা বাবুর ব্যাপারে উৎসাহী ছিলাম না। এই তল্লাটে কেবল আমাদের বাড়িতেই কোন কচি বাবু ছিল না। মা বলেছেন, কচি বাবুতে অনেক খরচ হয়। তাই বাবা যুদ্ধ থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা আরেকটা বাবু নিতে পারব না।
মায়ের এই চিন্তাটা ছিল খুবই সাদামাটা। পাশের জিনি পরিবারেও তো একটা কচি বাবু ছিল। অথচ সকলেই জানত, একটা কচি বাবুর জন্য খরচ করার মত টাকা তাদের ছিল না। হতে পারে, তাদের বাবুটা খুব সস্তা ছিল! আর মা হয়তো চাইতেন, তিনি যেহেতু সবচে আলাদাই, সবচে ভালো বাবুটাই তার হোক। জিনিদের বাবুটাও কিন্তু আমাদের জন্য চলনসই হতো।
দিনের সবগুলো পরিকল্পনা করা হয়ে গেলে আমি উঠে পড়তাম। একটা চেয়ার টেনে আমার ঘরের জানালার ফ্রেমটা যতটা সম্ভব উপরে ঠেলে দিতাম। জানালা দিয়ে অবশ্য বাড়ির পেছনের বাগানটা দেখা যেত না, কিন্তু সুপরিসর উপত্যকার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত যে দীর্ঘ, লাল ইটের বাড়িগুলো ছিল, সেগুলো দেখা যেত। আমাদের এদিকের বাড়িগুলো রৌদ্রজ্জ্বল হলেও ওই বাড়িগুলো জুড়ে তখনও ছায়া খেলা করত। এই লম্বা ছায়াগুলো বাড়িগুলোকে কেমন অপরিচিত আর রুক্ষ্ম ও কৃত্রিম করে তুলত।
এরপর আমি মা-র ঘরে ঢুকে বড় বিছানায় উঠতাম। তিনি জেগে যেতেন আর তখন আমি তাকে আমার পরিকল্পনাগুলো জানাতাম। কখনও সেভাবে খেয়াল করা হয়নি যদিও, এরই মধ্যে আমি আমার নাইটশার্টের মধ্যে যেন জমে যেতাম। কথা বলতে থাকতাম যতক্ষণ না তাপে সব বরফ গলে যেত। আরাম লাগত, তাই তার পাশে আমি ঘুমিয়ে যেতাম। যখন আবার জেগে উঠতাম, তখন রান্নাঘরের শব্দ শুনে বুঝতাম, মা নাস্তা বানাচ্ছেন।
নাস্তা করা হয়ে গেলে আমরা শহরে যেতাম। সেন্ট অগাস্টিন চার্চের অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম আর সেখানে আমরা বাবার জন্য প্রার্থনা করতাম। তারপর কেনাকাটা। যদি বিকেলের আবহাওয়া ভালো থাকলে আমরা গ্রামের দিকে হাঁটতে যেতাম, কিংবা পাশের সন্যাসাশ্রমে মা-র কাছের বন্ধু মাদার সেইন্ট ডমিনিকের সাথে দেখা করতে যেতাম। মা সবাইকে বাবার জন্য প্রার্থনা করতে বলতেন। আর প্রতিরাতে ঘুমাতে যাবার সময় আমি গডকে বলতাম তিনি যেন আমার বাবাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেন। তখন আমি বুঝতামই না যে আমি আসলে কী প্রার্থনা করছি!
একদিন সকালে যখন আমি বড় বিছানাটায় গেলাম, বরাবরের মতই আমার সান্তা ক্লজ বাবাকে সেখানে দেখলাম। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে ইউনিফর্ম পরার পরিবর্তে বাবা তার সবচে ভাল নীল স্যুটটা পরলেন। আর মাকেও অন্য যে কোন দিনের চাইতে বেশি উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। আমি এত খুশি হবার মত কিছুই খুঁজে পেলাম না। কারণ, ইউনিফর্ম ছাড়া বাবাকে তেমন ভাল দেখাচ্ছিল না। কিন্তু মা যেন খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিলেন। বললেন যে গড আমাদের প্রার্থনা কবুল করেছেন। বাবাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেবার জন্য আমরা চার্চে গিয়ে গডকে ধন্যবাদ জানিয়ে এলাম।
নিয়তির কী পরিহাস! সেই রাতেই যখন তিনি খাবার টেবিলে এলেন, তিনি তার বুটজোড়া খুলে স্লিপার পরলেন, যে নোংরা পুরনো ক্যাপ তিনি ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য পরতেন তা পরলেন। পা ভাঁজ করে বসে মা-র সাথে মুখ গম্ভীর করে কথা বলতে লাগলেন। মাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। স্বভাবতই যা কিছু মাকে কষ্ট দেয়, তা আমার পছন্দ নয়। তাই আমি বাবার কথার মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
“তুমি থামো, ল্যারি।” মা খুব আস্তে করে বললেন। মা এই স্বরে কথা বলেন কেবল তখনই যখন কোন বিরক্তিকর কেউ বেড়াতে আসেন। কাজেই তার কথাকে পাত্তা না দিয়ে কথা বলতেই থাকলাম।
মা অধৈর্য্য হয়ে বললেন, “একদম চুপ করো, ল্যারি। শুনতে পাচ্ছ না, আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলছি?”
এই প্রথম আমি অশুভ কিছু একটা শুনলাম, “বাবার সাথে কথা”। আমার মনে হচ্ছিল, এই যদি হয় গডের প্রার্থনা-শোনা, তাহলে তিনি সব প্রার্থনা মনযোগ দিয়ে না শুনলেও পারেন।
আমি যতটা সম্ভব ভাবলেশহীনভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি বাবার সাথে কেন কথা বলছ?”
“কারণ, কিছু বিষয়ে তোমার বাবার সাথে আমার আলোচনা করার আছে। এখন আর কথা বোলো না।”
বিকেলে মা-র কথায় বাবা আমাকে নিয়ে হাঁটতে বের হলেন। এবার গ্রামে না গিয়ে আমরা শহরে গেলাম। আশান্বিত হয়ে আমি ভাবলাম, এ বুঝি বেশ ভালোই হলো। কিন্তু সে রকম কিছু হলো না। শহরে বাবা আর আমার এই আগমন একদম বিপরীত অনুভূতি নিয়ে এল। ট্রামগাড়ি, জাহাজ আর ঘোড়ায় তার কোন আগ্রহই ছিল না। যত আগ্রহ কেবল তার বয়সী সব মানুষজনদের সাথে কথা বলায়। যখন আমি তাকে থামাতে চাইতাম, তখনও তিনি আমার হাত চেপে ধরে টানতে টানতে কথা চালিয়ে যেতেন। আবার যখন তিনি আমাকে থামাতে চাইতেন, আমিও ঠিক সেটাই করতাম- না করে উপায় ছিল না। আমি লক্ষ্য করলাম, কোন দেয়ালে তার হেলান দেয়া মানেই হচ্ছে তিনি আমাকে বেশিক্ষণ ধরে থামিয়ে রাখবেন। পরের বার যখন আমি এই একই কাজটা করতে দেখলাম, আমি খুব ক্ষেপে গেলাম। মনে হলো তিনি তাতে কিছু মনেই করলেন না। আমি তার কোট আর প্যান্ট ধরে টানতে লাগলাম। মা এ ধরনের পরিস্থিতিতে রেগে গিয়ে বলতেন, “ল্যারি, ঠিকঠাক আচরণ না করলে আচ্ছামত থাপ্পড় খাবি”। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে উপেক্ষা করার এক অমায়িক, অসাধারণ ক্ষমতা বাবার মধ্যে ছিল। বাবার ব্যাপারে যা বোঝার তা বুঝে গেলাম। ভাবছিলাম, কান্নাকাটি করব কিনা। কিন্তু এর দ্বারাও তাকে কিছুমাত্র বিচলিত করা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে এ ছিল এক পর্বতের সাথে হাঁটতে বের হওয়ার মতোন! পর্বতটি হয় মোচড়ানো বা দুমড়ানোকে পাত্তাই দেয় না, নয়তো সেটা তার চূড়া থেকে আনন্দে অট্টহাসি হেসে তাকিয়ে থাকে নিচে। বাবার মতো এমন আত্মনিমগ্ন মানুষকে আমি আর কখনই দেখিনি।
চাবেলায় “বাবার সাথে কথা” কথা আবার শুরু হলো। এবার ঘটনাটা আরও জটিল রূপ নিল, কারণ তিনি সন্ধ্যায় যে পত্রিকা নিতেন তা থেকে একটু পর পরই নতুন কিছু পড়ে শোনাচ্ছিলেন। আমার মনে হলো, এটা একটা খুব বাজে খেলা। পুরুষের সাথে পুরুষের প্রতিযোগিতা। মা-র মনযোগ পাওয়ার জন্য আমি বাবার সাথে যে কোন সময় প্রতিযোগিতায় নামতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু তিনি যখন নিজের এই কাজের জন্য অন্যদেরকে কাজে লাগান, আমার তখন আর কিছু করার থাকে না। বেশ কয়েক বার তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন লাভ হলো না।
মা অধৈর্য্য হয়ে বললেন, “ল্যারি, বাবা যখন পেপার পড়বেন, তখন কোন কথা বলবে না।”
আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে, হয় মা আমার চেয়ে বাবার সাথে কথা বলতে বেশি পছন্দ করেন, আর নইলে মা-র ওপর বাবার কর্তৃত্ব এতটাই প্রখর যে মা ভয়ে তাকে সত্যটা বলতে পারেন না।
সে রাতে মা যখন আমার গায়ে কম্বল তুলে দিচ্ছিলেন, তখন মাকে বললাম, “আম্মু, আমি যদি খুব করে প্রার্থনা করি, তাহলে গড কি আব্বুকে আবার যুদ্ধে পাঠাবেন?”
তিনি একটুক্ষণ বিষয়টা নিয়ে ভাবলেন মনে হলো।
“না, সোনা। আমার মনে হয় না তিনি তা করবেন।” মা হাসতে হাসতে বললেন।
“কেন তিনি তা করবেন না, আম্মু?”
“কারণ, এখন আর কোন যুদ্ধ হচ্ছে না, সোনা।”
“কিন্তু আম্মু, গড কি চাইলে আরেকটা যুদ্ধ দিতে পারেন না?”
“তিনি তো তা চাইবেন না, সোনা। গড তো যুদ্ধ করেন না, যুদ্ধ করে দুষ্টু মানুষেরা।”
“হাহ্!” আমি খুবই মর্মাহত হলাম। আমি ভাবতে লাগলাম যে মানুষ গডকে যতটা ভালো বলে, তিনি আসলে ততটা নন।
পরের দিন সকালে যথা সময়েই ঘুম ভাঙল। নিজেকে শ্যাম্পেইনের বোতল মনে হচ্ছিল। আমি পা দুটো বের করলাম, আর তারা দুজন একটা দীর্ঘ আলাপ ফেদে বসল। মিসেস ডানের বাবা যতদিন বাড়িতে ছিল, ততদিন সে যে সমস্যায় পড়েছিল, সেটা নিয়েই সে কথা বলছিল। আমি ঠিক জানতাম না বাড়ি বলতে আসলে কী বুঝায়, কিন্তু বাবার জন্য এটাকে একটা উপযুক্ত জায়গা বলেই মনে হচ্ছিল। পায়েদের কথা শেষ হলে আমি চেয়ার টেনে নিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বেরিয়ে দিলাম। ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। একটা অনাবশ্যক পরিস্থিতির মধ্যে ঢুকে গেছি, এই অপরাধবোধ কাজ করছিল। মাথার মধ্যে গালগল্প গিজগিজ করতে লাগল। টলতে টলতে পাশের দরজাঅবধি পৌঁছে গেলাম। আর আলো-আঁধারির মধ্যেই ঝটপট সেই বড় বিছানায় উঠে গেলাম। মা-র পাশে কোন জায়গা ছিল না। তাই আমি মা আর বাবার মধ্যেখানে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের জন্য আমি বাবাকে যেন ভুলে গেলাম। পরের কয়েক মিনিটি আমি বসে বসে বুদ্ধি পাকাচ্ছিলাম, এই লোকটাকে নিয়ে কী করা যায়। উনি উনার জন্য বরাদ্দের বেশি সময় ধরে বিছানা দখলে রাখছেন। আমি স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। এজন্য তাকে কয়েকটা লাথি মারলাম। বাবার মুখ দিয়ে হালকা শব্দ হলো। তিনি সোজা হয়ে শুলেন। জায়গা বের হলো। মা জেগে গেলেন আর আমার জন্য তার খারাপ লাগল। বুড়ো আঙুল মুখে পুরে আমি আবার বিছানার উষ্ণতায় নিজেকে সঁপে দিলাম।
তৃপ্তির সাথে উচ্চকণ্ঠে সুর করে ডাকলাম, “আম্মু!”
“হুসসস! না সোনা, বাবাকে জাগিয়ো না।” মা ফিসফিস করে বললেন।
এটা একটা নতুন সংযোজন। “বাবার সাথে কথা”-র চাইতে এটাকে বেশি সাংঘাতিক মনে হলো। মা-র সাথে সকালবেলার এই আলাপচারিতা ছাড়া জীবনটাকে যেন আমি ভাবতেও পারি না।
আমি কঠিনকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
“কারণ, বেচারা বাবা খুব ক্লান্ত।” এই কারণটা আমার কাছে বেশ অপাঙ্ক্তেয় মনে হলো। তার এই “বেচারা বাবা” ধরনের আবেগ আমি নিতে পারছিলাম না। এই ধরনের আবেগ আমার পছন্দ নয়। আমাকে অবিবেচক মনে করে আঘাত দেয়া হলো।
আমি বেশ আস্তে করে বললাম, “ওহ!” তারপর সবচে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললাম, “আম্মু, তুমি জানো, আজ আমি তোমার সাথে কোথায় বেড়াতে যাব?”
মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “না, সোনা।”
“আজ আমরা গ্লেন-এর পাড়ে যাব এবং আমার নতুন জাল দিয়ে মাছ ধরব। তারপর আমরা ফক্স এন্ড হাউন্ডস্-এ যাব আর-“
“বাবা জেগে যাবেন!” মা রাগে আমার মুখে হাতচাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলন।
কিন্তু যা হবার তা হয়ে গেলো। বাবা জেগে গেছেন, বা জাগছেন। তিনি কিছু বললেন না। দেশলাই-এর জন্য হাত বাড়ালেন। তারপর তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন, যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না।
“চা খাবে নাকি গো?” মা বাবাকে খুব অমায়িক, শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন। মা-র এ রকম কণ্ঠ আমি আগে কখনও শুনিনি। মনে হচ্ছিল, যেন তিনি খুব ভয়ে আছেন।
“চা? তুমি কি জানো এখন কটা বাজে?” বাবা বেশ রূঢ় কণ্ঠে বললেন।
“আর তারপর আমি র‌্যাথকুনি রোড-এ যাব,” আমি বেশ জোরেশোরেই বললাম, কারণ আমার মনে হচ্ছিল তাদের কথার মধ্যে আমি কোন কিছু ভুলে যেতে পারি।
মা বেশ রুক্ষ্ম কণ্ঠে বললেন, “ল্যারি, এক্ষুণি ঘুমিয়ে পড়্।”
আমি ফুঁপাতে লাগলাম। আমার কোন কিছু ভাল লাগছিল না, বিশেষত তাদের কথাবলার ধরন। আমার ভোরবেলার পরিকল্পনাগুলোকে ধুলিস্যাৎ করাটা ছিল একটা পরিবারকে অঙ্কুরেই শেষ করে দেয়ার মতই। বাবা কিছুই বললেন না। তিনি তার পাইপ ধরিয়ে টানতে টানতে বাইরে ছায়া দেখতে লাগলেন যেন আমি বা মা কেউই তার সামনে নেই। আমি জানতাম, তিনি একজন উন্মাদ। যখনই আমি কিছু একটা বলছিলাম, মা আমাকে কেমন করে যেন থামিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি বেশ আহত হলাম। আমার মনে হচ্ছিল, যা হচ্ছে তা ঠিক নয়। এটা বেশ দুর্ভাগ্যজনকও। যতবার আমি মাকে বলতাম যে যখন আমরা দুজন এক বিছানায় শুতে পারি, তখন দুটো আলাদা বিছানা এক ধরনের অপচয়, ততবারই তিনি আমাকে বুঝিয়েছেন- এভাবে আলাদা শোয়া স্বাস্থ্যকর। আর এখন দেখুন, এই মানুষটা, এই আগন্তুকটা মা-র সঙ্গে ঘুমাচ্ছেন তার স্বাস্থ্যের বিষয়টা ন্যূনতম চিন্তা না করেই! তিনি হয়তো খুব ভোরে উঠলেন, চা বানালেন। কিন্তু মাকে চা দিলেও আমার জন্য কোন চা বানালেন না।
“আম্মু, আমিও চা চাই,” আমি চিল্লিয়ে বললাম।
“হ্যাঁ, সোনা। তুমি তোমার আম্মুর পিরিচ থেকেই খেতে পারো।” বেশ ধৈর্য্য নিয়ে বললেন মা।
তো হয়েই গেল। হয় বাবাকে নইলে আমাকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমি তো মা-র ভাগ থেকে চা খেতে চাই না। আমি আমার নিজের বাড়িতে আচরণের সমতা চাই। কাজেই, মাকে বিরক্ত করার জন্য ইচ্ছে করেই সবটুকু চা খেয়ে ফেললাম, একটুও বাদ রাখলাম না। এটাকেও তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই নিলেন। কিন্তু সে রাতে আমাকে বিছানায় দিয়ে আসার সময় খুব মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, “ল্যারি, কথা দাও, আমি যা বলব শুনবে।”
আমি জানতে চাইলাম, “কী, বলো?”
“এত সকালে আমাদের ঘরে আসবে না, আর বাবাকেও বিরক্ত করবে না। প্রমিজ?”
আবার সেই ‘বেচারা বাবা’! এই ধরনের একটা লোক যার সঙ্গে থাকা যায় না, তার ব্যাপারে আমার সন্দেহ ক্রমশই ঘনীভূত হতে লাগল।
মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
“কারণ, বেচারা বাবা পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত। আর ভালো ঘুম হয় না।”
“কেন হয় না, আম্মু?”
“হয়েছে কী, জানোই তো, বাবা যখন যুদ্ধে ছিলেন, তখন তোমার আম্মু পোস্ট অফিস থেকে টাকা তুলত, মনে নেই?”
“মিস ম্যাককার্থির কাছ থেকে তো?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। জানো তো, মিস ম্যাককার্থির কাছে এখন আর কোন টাকা নেই। কাজেই তোমার আব্বুকে বাইরে গিয়ে আমাদের জন্য টাকা জোগাড় করতে হয়। তুমি কি ভেবে দেখেছ, তিনি যদি আমাদের জন্য টাকা আনতে না পারেন, তাহলে আমাদের কী হবে?”
“না। ভাবিনি। বল তো।”
“আচ্ছা, শোনো। প্রত্যেক শুক্রবার যে বৃদ্ধা আসে ভিক্ষে করতে, আমার মনে হয়, তার মত আমাদেরকেও ভিক্ষে করার জন্য বের হতে হবে। আমাদের সেটা করতে ভালো লাগবে না, তাই না?”
“না। আমাদের ভালো লাগবে না।” আমি একমত হলাম।
“কাজেই প্রমিজ করো, তুমি এসে উনাকে জাগিয়ে দিবে না?”
“প্রমিজ।”
আমি কিন্তু সত্যিই সত্যিই প্রমিজ করলাম। আমি জানতাম, টাকাপয়সা একটা খুব দরকারী জিনিস। আর ওই বৃদ্ধার মতো আমি শুক্রবার শুক্রবার ভিক্ষে করার জন্য বের হবার ঘোর বিরোধী। মা আমার সকল খেলনা বিছানার চারিদিকে গোল করে রেখে গেলেন, যেন আমি যেদিক দিয়েই নামতে যাই না কেন, কোন না কোন খেলনার উপর গিয়ে আমি পড়ব। যখন আমার ঘুম ভেঙে গেল, আমার মনে পড়ল প্রমিজের কথা। আমি বিছানা ছাড়লাম। মেঝেতে বসে পুতুল নিয়ে খেললাম- মনে হলো যেন কত কত ঘণ্টা ধরে খেলে চলেছি। তারপর আরও কিছু সময় ধরে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। আমি খুব চাইছিলাম, বাবা জেগে উঠুন। আমি খুব চাইছিলাম, কেউ আমার জন্য এক কাপ চা বানান। নিজেকে কিছুতেই সূর্যের মতো উচ্ছ্বল মনে হচ্ছিল না। খুব বিরক্ত আর নিষ্প্রাণ নিষ্প্রাণ লাগছিল। আমার আকাঙ্খা জুড়ে ছিল উষ্ণ আর নরম পালকের বড় বিছানাটা। আমি আর ধৈর্য্য ধরতে পারলাম না। পাশের ঘরে ঢুকে পড়লাম। মা-র পাশে যেহেতু কোন জায়গা ছিল না, আমি তার গায়ের উপর উঠলাম। তিনি হতচকিয়ে জেগে উঠলেন। আমার হাত খুব শক্ত করে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন, “ল্যারি, কী প্রমিজ করেছিলে?”
“আমি তো মেনেছি, আম্মু। আমি অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ ছিলাম।” আমি এই অবস্থায় পড়ে কাঁদতে লাগলাম।
আমার জন্যই মাকে খুব বিষণ্ন মনে হলো, “ও লে বাবা। কী অবস্থা হয়েছে তোমার! আচ্ছা, এখন যদি তোমাকে থাকতে দিই, তুমি কোন কথা বলবে না তো?”
ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললাম, “কিন্তু আম্মু, আমি কথা বলতেই তো চাই।”
“এসব একদম করো না। বাবা ঘুমাবে। কথাটা কি বোঝা গেছে?” মা বেশ রূঢ়তার সাথে বললেন। এটা আমার জন্য নতুন কিছু।
আমি আচ্ছামতই বুঝলাম। আমি কথা বলতে চাই। তিনি চান ঘুমাতে- আসলে এইটা তাহলে কার বাড়ি?
আমিও একই দৃঢ়তার সাথে বললাম, “আমার মনে হয়, আব্বু যদি তার নিজের বিছানায় শোয়, তাহলে তা বেশি স্বাস্থ্যকর হবে।”
মা মনে হয় শক খেলেন, কারণ বেশ কিছুক্ষণ কিছুই বললেন না।
তারপর তিনি বলতে থাকলেন, “এবার শেষ বারের মতো শোনো। হয় তুমি একদম চুপ থাকবে, আর না হলে নিজের বিছানায় ফিরে যাবে। কোনটা চাও?”
এই অবিচার আমাকে শেষ করে দিল। মা নিজের মুখেই তার স্ববিরোধীতা ও যুক্তিহীনতাকে স্বীকার করে নিলেন। তিনি কোন প্রত্যুত্তরের চেষ্টাও করলেন না। প্রচ- আক্রোশে আমি বাবাকে একটা লাথি মারলাম। মা সেটা খেয়াল করলেন না বটে, কিন্তু বাবা আউচ করে শব্দ করে উঠলেন এবং ধরফর করে চোখ মেলে চাইলেন।
“এখন কটা বাজে?” মা-র দিকে না, দরজার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে বাবা জানতে চাইলেন, যেন ওখানে কেউ আছে।
মা মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, “এখনও খুব সকাল। বাবুটা এসেছে। ঘুমাও।… আর ল্যারি,” বিছানা ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “তুমি বাবাকে জাগিয়ে দিয়েছ। এখন তুমি অবশ্যই তোমার ঘরে যাবে।”
এইবেলা, মা-র ওমন শান্ত আচরণ বুঝিয়ে দিল, তিনি যা বলছেন, তা-ই চান। এবং আমি এও জেনে গেলাম যে আমি যদি এখনই দাবী করে না বসি, তাহলে এ বাড়ির যাবতীয় মৌলিক অধিকার আমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। মা যখন আমাকে উঠিয়ে নিলেন, বাবাকে মাথায় না রেখেই, এমন ভাবে গলাছেড়ে চিৎকার করে উঠলাম, যেন মৃতরাও জেগে উঠবে।
বাবা রাগে গড়গড় করতে লাগলেন, “বাজে ছেলে কোথাকার! এটা কি কখনই ঘুমায় না?”
“দীর্ঘদিনের অভ্যাস গো।” মা যদিও শান্তকণ্ঠে এটা বললেন, আমি তার বিরক্তি ঠিক বুঝতে পারছিলাম।
“এখন একে এসব অভ্যাস থেকে বের হতে বলো,” বিছানায় আবার নিজেকে এলিয়ে দিতে দিতে বাবা চিল্লিয়ে বললেন। তিনি হঠাৎই বিছানার সমস্ত কাপড় জড়ো করলেন, দেয়ালের দিকে ঘুরে গেলেন আর তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকালেন শূন্য দৃষ্টিতে- ঘৃণ্য, অন্ধকার ছোট ছোট চোখ। লোকটাকে শয়তান মনে হচ্ছিল। দরজা খোলার জন্য মা আমাকে নামিয়ে দিলেন। আর আমি মুক্ত হয়েই দৌড়ে ঘরের এক কোণে গিয়ে বিকট স্বরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম।
বাবা মেরুদন্ড সোজা করে বিছানায় বসে পড়লেন। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বললেন, “চুপ্, কুত্তার বাচ্চা।”
আমি এতটাই হতভম্ব হলাম যে আমি চিৎকার বন্ধ করে দিলাম। কখনো, আগে কখনোই কেউ আমার সাথে এই রকম করে কথা বলেনি। আমি উনার দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকালাম। দেখলাম, রাগে তার মুখাবয়ব পাল্টে যাচ্ছে। ঠিক তখনই আমি পুরোপুরি বুঝে গেলাম, এই দানবের নিরাপদ ফিরে আসার জন্য যে প্রার্থনা করেছিলাম, তাতে গড কী নির্মমভাবে সাড়া দিয়েছেন।
আমিও চিল্লিয়ে বললাম, “তুমি, তুমি চুপ করো।”
বাবা বিছানা থেকে ভয়ঙ্করভাবে লাফ দিয়ে বললেন, “কী বললি রে তুই?”
মা চিৎকার করে উঠলেন, “মিক, মিক! তুমি দেখতে পাচ্ছ না, ছেলেটা তোমাকে এখনও স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না।”
“হ্যাঁ, দেখতেই তো পাচ্ছি, তাকে শিক্ষা দেয়ার চাইতে খাবারই বেশি দেয়া হয়েছে।” বাবা রাগে গজগজ করতে করতে আর উন্মত্তভাবে হাত নাড়াতে নাড়াতে বললেন, “ওর পাছার ছাল তুলে ফেলতে হবে।”
আমাকে নিয়ে তার এই বিশ্রী কথার কাছে আগের সব চিৎকার চেঁচামেচি যেন কিছুই মনে হলো না। এই কথাগুলো আমার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিল।
“তোমার নিজের ছাল তোলো!” আমি উন্মত্তভাবে চিৎকার করে উঠলাম, “হ্যাঁ, তোমার নিজের ছাল! এহ, চুপ করো! চুপ করো!”
এক্ষণে তিনি তার ধৈর্য্য হারিয়ে আমার দিকে ছুটে এলেন। তিনি ছুটে এলেন কোনরকম হুঁশ ছাড়াই, কিন্তু থাকা উচিত ছিল একজন সন্ত্রস্ত মায়ের চোখের সামনে। একটা হালকা আঘাত দিয়ে বিষয়টির সমাপ্ত হলো ঠিকই, কিন্তু একজন আগন্তুকের এই আচরণ ছিল চরম অসম্মানের। হ্যাঁ, তিনি একজন আগন্তুকই যিনি আমার নিষ্পাপ প্রার্থনার কারণেই যুদ্ধ থেকে ফিরে ভালো মানুষ সেজে আমাদের বড় বিছানা পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। তার এই আচরণ আমাকে সম্পূর্ণ উন্মত্ত করে দিল। আমি চিল্লাতেই থাকলাম, নগ্ন পায়ে পাগলের মতো নাচতে লাগলাম। বাবার পরণে একটা ছোট্ট ধূসর আর্মি শার্ট ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি সেই কিম্ভূতকিমাকার ড্রেসে ভয়ঙ্কর চাহনি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন আমাকে খুন করে ফেলবেন। মনে হয় সেই সময়ই আমি বুঝতে পারলাম, বাবাও আমাকে হিংসে করছেন। মাকে দেখলাম নাইটড্রেস পরে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন- একদিকে বাবা, আর অন্য দিকে আমি। আমি চাইছিলাম, মা-র সত্যিই এমন একটা অবস্থা হোক। আমার মনে হচ্ছিল, এটাই তার প্রাপ্য।
সেদিনের সেই সকালের পর থেকে আমার জীবন যেন নরক হয়ে উঠল। বাবা আর আমি পরস্পরের প্রকাশ্য শত্রু বনে গেলাম। আমাদের মধ্যে পরপর অনেকগুলো খ-যুদ্ধ চলল; মা-র কাছ থেকে তিনি যেমন আমার সময় খেয়ে নিতেন, তেমনি আমিও তার সময়। যখন মা আমাকে আমার বিছানায় বসে আমাকে গল্প শোনাতেন, দেখা গেল তখন বাবা যুদ্ধের সময় বাসায় ফেলে যাওয়া পুরনো বুটজোড়া খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আবার বাবা যখন মা-র সঙ্গে গল্প করতেন, তখন আমি আমার পুতুলগুলো নিয়ে খুব চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে খেলছি, যেন তারা বুঝতে পারেন, আমি উপেক্ষিত।
একদিন সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে বাবা তো এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করলেন যখন তিনি দেখলেন যে আমি তার বাক্স থেকে রেজিমেন্টাল ব্যাজ, গুর্খা চাকু আর বাটন স্টিক বের করে নিয়ে খেলছি। মা কাজ থেকে উঠে এসে আমার কাছ থেকে বাক্সটা নিয়ে নিলেন।
মা ভর্ৎসনা করে বললেন, “ল্যারি, বাবা তোমাকে না দেয়া পর্যন্ত তুমি বাবার কোন খেলনা জিনিস নিয়ে খেলবে না। বাবা তো তোমার জিনিস নিয়ে খেলেন না।”
কেন জানি না, বাবা মা-র দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন মা তাকে আঘাত করে কথা বলেছেন। তারপর ভ্রু কুঁচকে ঘুরে তাকালেন।
রাগে গজগজ করতে করতে বললেন, “এগুলো খেলনা নয়।” বাবা আবার বাক্সটি নামিয়ে দেখলেন যে আমি কোন কিছু সরিয়েছি কিনা, “এগুলোর কোন কোনটা খুব দুর্লভ আর দামী।”
আমি লক্ষ্য করলাম সময়ের সাথে সাথে তিনি কিভাবে মা আর আমাকে আলাদা করে ফেললেন। সবচে বাজে বিষয়টা হলো, কিভাবে তিনি তা করলেন, তা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না। কিন্তু বুঝতে পারলাম, বাবার মধ্যে মা-র জন্য আকর্ষণীয় কিছু একটা আছে। অথচ সম্ভাব্য সব দিক থেকেই তিনি আমার চেয়ে কম যোগ্য। তার কথাবার্তা খুব সাদামাটা, আর চা খাওয়ার সময় কেমন শব্দ করেন। আমি ভেবে বের করলাম, মা-র আগ্রহ মনে হয় ওই সংবাদপত্রে। সেজন্য আমি নিজের মতো করে ছোট ছোট খবর তৈরি করলাম মাকে শোনাব বলে। তারপর আমার ধারণা হলো, ধূমপানও একটা কারণ হতে পারে। আমার নিজের ধারনা, ধূমপান খুব আকর্ষণীয় একটা বিষয়। আমি বাবার পাইপটা নিয়ে সারাবাড়ি ঘুরে ঘুরে একটু একটু করে টানতে লাগলাম। এটা চলল ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত। এমনকি শব্দ করে চা-ও খেতে লাগলাম। কিন্তু মা বললেন আমাকে নাকি বিশ্রী লাগছে। অবশেষে তাদের একসাথে ঘুমানোর সেই অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসকেই সবকিছুর জন্য দায়ী মনে হলো। কাজেই সিদ্ধান্ত নিলাম তাদের বেডরুমে ঢুকে ইতোস্তত ঘুরে বেড়াবো। আমি নিজের সাথেই কথা বলতে লাগলাম যেন তারা মনে না করে যে আমি তাদেরকে দেখছি। কিন্তু তাদেরকে কখনই এমন কিছু করতে দেখলাম না যা আমার চোখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিলাম। মনে হলো, বড় হতে হবে, লোকজনকে রিং পড়াতে হবে। আর মনে হলো, আমাকে আসলে ওয়েট করতে হবে। কিন্তু একই সাথে আমি চেয়েছি, বাবা যেন বুঝতে পারে, আমি কেবল ওয়েটই করছি, প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে আসিনি।
একদিন সন্ধ্যায় যখন বাবা মাথার কাছে বকরবকর করে আমাকে একদম বিরক্ত করে মারছিলেন, ঠিক তখনই আমি তাকে বিষয়টা জানালাম।
মাকে বললাম, “আম্মু, বড় হয়ে আমি কী করব, তুমি জানো?”
মা বললেন, “ না, সোনা। কী?”
আমি আস্ত করে বললাম, “আমি তোমাকে বিয়ে করব।”
বাবা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, কিন্তু তিনি আমাকে বিশ্বাস করলেন না। আমি জানতাম, এটা ছিল তার ভনিতা।
কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও মা খুশি হলেন। আমার মনে হলো, মা তখন একটু যেন হালকা বোধ করলেন যে একদিন বাবার হাত থেকে তার মুক্তি ঘটবে।
মা মুচকি হেসে বললেন, “এটা কিন্তু দারুণ হবে, না?”
আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বললাম, “হ্যাঁ, খুব ভালো হবে। কারণ, আমরা অনেক, অ-নে-কগুলো বাবু নেব।”
মা শান্তভাবে বললেন, “ঠিক আছে, সোনা। জানো তো, আমরা খুব শীঘ্রই একটা বেবি পেয়ে যাব। তখন তুমি সময় কাটানোর জন্যে একজনকে পেয়ে যাবে।”
এতে কোনভাবেই আমি খুশি হতে পারলাম না। কারণ, মনে হচ্ছিল, বাবার কাছে মা নিজেকে যেভাবেই সমর্পন করুন না কেন, তিনি আমার ইচ্ছেটাকেই প্রাধান্য দেবেন। নইলে তাদের অবস্থা জিনিদের মতই হবে। যদিও পুরোটাই তাদের মত হবে না। প্রথমত, মা খুবই আনমনা। আমি জানি না, তিনি কোথা থেকে অর্থ পাবেন। আর বাবা যদিও সন্ধ্যার পরও বাইরে থাকেন, কিন্তু সেটা আমার কোন কাজের না। মা আমাকে নিয়ে আর বাইরে বের হন না। অগ্নিগোলার মতো তেতে থাকেন। আর কারণ ছাড়াই মারেন। মাঝে মধ্যে মনে হয়, কেন যে এই অসহ্যকর বাবুটার কথা পাড়তে গেলাম। নিজের দুরবস্থা নিজেই ডেকে আনার মতো এমন জিনিয়াস আমি!
হ্যাঁ, দুরবস্থায়ই! সনি জঘন্যরকম হৈচৈ-এর মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এলো। শুধু হৈচৈটা নয়, গোলমালও। আর প্রথম থেকেই আমি ওটাকে অপছন্দ করতাম। বাবুটাকে সামলানো খুব কঠিন ছিল- আমি যতটা বুঝি, খুবই কঠিন। আর সব সময় সে মাকে কাছে পেতে চাইত। মা-ও ছিলেন তার ব্যাপারে বেশ যাচ্ছেতাই। মা জানতেও পারতেন না, কখনও কখনও বাবুটা ন্যাকামি করত! আর খেলার সাথী হিসেবে? আকামের চাইতে খারাপ! সারাদিন ও ঘুমাত। আর আমাকে সারাবাড়ি পা টিপেটিপে হাঁটতে হতো যেন তার ঘুম না ভাঙে। বাবার ঘুম ভাঙার বিষয়টা আর নেই! এখনকার স্লোগান হচ্ছে, “সনিকে জাগিও না!” আমিও ঠিক বুঝতাম না, বাবুটা কেন ঠিকঠাক সময়ে ঘুমাত না। কাজেই, মা আড়াল হলেই আমি তাকে জাগিয়ে দিতাম। ওকে জাগিয়ে রাখতে কখনও কখনও চিমটিও কাটতাম। মা তো একদিন হাতেনাতে ধরে ফেললেন আর নির্দয়ভাবে পিঠে ছড়ি ভাঙলেন।
একদিন সন্ধ্যায় আমি বাড়ির সামনের বাগানে ট্রেন নিয়ে খেলছিলাম আর বাবা তার কাজ থেকে ফিরলেন। আমি এমন একটা ভাব করলাম যেন তাকে খেয়াল করিনি। নিজের সাথে নিজেই কথা বলার অভিনয় করলাম। আর বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললাম, “আর কোন জঘন্য বাচ্চাকাচ্চা যদি এই বাড়িতে ঢোকে, তাহলে আমিই বাড়ি থেকে চলে যাব।”
বাবা মূর্তির মত দাঁড়িয়ে গেলেন আর কাঁধের উপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। কঠোরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “কী যেন একটা বললে?”
“আমি তো আমার সাথেই কথা বলছিলাম,” উত্তরে বললাম। ভীতিটা ঢাকার চেষ্টা করতে করতে বললাম, “এটা আমার একান্ত নিজের।”
তিনি আর একটা কথাও না বলে বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন।
বলে রাখি, এই ওয়ার্নিংটা কিন্তু মন থেকেই ছিল। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়াটা হলো পুরোই ভিন্ন। বাবা আমার সাথে খুব ভালো ব্যবহার শুরু করলেন। সেটা আমি বুঝতেও পারছিলাম। মা সনিকে নিয়েই মেতে থাকলেন। এমনকি খাবার খাওয়ার সময়ও তিনি উঠে যেতেন আর দোলনায় শোয়া বাবুটার দিকে অর্থহীন হাসি দিয়ে কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকতেন। আর বাবাকেও সে রকমটি করতে বলতেন। সনির বিষয়ে বাবা নম্রই ছিলেন। কিন্তু, জানেন তো, বাবাকে বেশ হতভম্ব দেখাত- মা আসলে কী বলতেন তা যেন তিনি ঠিক বুঝতেন না। রাতে সনির কান্নাকাটি নিয়ে বাবা অভিযোগ করতেন। কিন্তু মা অজুহাত দেখাতেন আর বলতেন যে, কিছু একটা কারণ না থাকলে বাবু কখনই কাঁদে না। এটা ছিল একটা চরম মিথ্যা। কারণ, সনির কিছু হতোই না। সে কেবল মায়ের মনযোগ পাওয়ার জন্যই কাঁদত। মা আসলে এতটাই সাদামনের ছিলেন যে- কী আর বলব।
বাবা খুব যে আকর্ষণীয় ছিলেন, তা নয়। কিন্তু তার বেশ বুদ্ধি ছিল। তিনি সনির মধ্য দিয়ে দেখতেন, আর এখন তিনি বুঝে গেছেন- আমিও তার মধ্য দিয়েই দেখতাম। এক রাত্রে কিছু একটা নড়াচড়ার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম, আমার বিছানায় কেউ একজন শুয়ে আছেন। কোন এক অস্বাভাবিক কারণে আমার মনে হলো, পাশে আমার মা-ই নিশ্চয়। তার বোধবুদ্ধি ফিরে এসেছে, আর বাবাকে ছেড়ে চিরতরে চলে এসেছেন। ঠিক তখনই আমি পাশের রুমে সনির কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। মা বলছেন, “না! না! না! এই যে আমি!” আমি বুঝে গেলাম, মা নন। আমার পাশে বাবা। বাবা-ই আমার পাশে শুয়ে আছেন। তিনি জেগে আছেন, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন, আর সাংঘাতিক ক্ষেপে আছেন। একটু পরেই বুঝলাম, কেন তিনি ক্ষেপে আছেন। এখন তার পালা। আমাকে তো তিনি ওই বড় বিছানা ছাড়া করেছেন। এখন নিজেই বিছানাছাড়া হয়েছেন। মা-র কাছে এখন ওই বিষাক্ত ছানা ছাড়া আর কারো জন্যই কোন সহানুভূতি নেই।
বাবার জন্য আমার দুঃখ হলো। এই রকম সময়ের মধ্যে দিয়েই তো আমি এতদিন গেছি। কিন্তু ওই অতটুকু বয়সেও আমি শত্রুর প্রতি ন¤্র ছিলাম। আমি বাবার গায়ে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, “এখন! কেমন!”
তিনি ঠিক উত্তর দেবার অবস্থায় ছিলেন না। রাগে গড়গড় করতে করতে বললেন, “তুমিও এখনো ঘুমাওনি?”
“আব্বু, থাক ওসব। আমাকে তুমি একটু জড়িয়ে ধরো তো। ধরবে না?” আমি বললাম। বাবা জড়িয়ে ধরলেন, যেমন তেমন করেই। আমার মনে হয়, আপনারা এটাকে প্রশ্রয়ই বলতে পারেন। তিনি খুব অনভ্যস্থ ছিলেন, কিন্তু একদম না পাওয়ার চাইতে এটাই ছিল আনন্দের।
সেবার ক্রিসমাসে বাবা আমাকে একটা বেশ সুন্দর আর বড় রেলওয়ে কিনে দেবেন বলে বাইরে গেলেন।

[ফ্রাঙ্ক ও’কনর একজন আইরিশ গল্পকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও নাট্যকার। জন্ম আয়ারল্যান্ডের কর্ক-এ, ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ সালে। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়ার কারণে তিনি বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেননি। ১৯১৮ সালে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিতে যুক্ত হন। প্রথমে কর্ক এবং পরে ডাবলিনে গ্রন্থাগারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কাজ করেছেন নাট্যশালায় নির্দেশক হিসেবেও। ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে সেখানকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করেন। তাঁর বেশিরভাগ গল্পই এই সময়ে লেখা। ডাবলিনে তিনি হার্ট এটাকে মারা যান ১৯৬৬ সালের ১০ মার্চ । গেস্টস অব দ্য নেইশন (১৯৩১), বোনস্ অব দ্য কনটেনশন (১৯৩৬), দ্য স্টরিজ অব ও’কনর (১৯৫২), ডোমেস্টিক রিলেশনস্ (১৯৫৭) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। তাঁর নামে প্রচলিত ‘ফ্রাঙ্ক ও’কনর ইন্টারন্যাশনাল শর্ট স্টরি অ্যাওয়ার্ড’ ছোটগল্পে সবচে দামী পুরস্কার হিসেবে গণ্য করা হয়।]আমার ঈদিপাস কমপ্লেক্স
ফ্রাঙ্ক ও’কনর
অনুবাদ: প্রত্যয় হামিদ

যুদ্ধের- অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের- পুরোটা সময় জুড়ে বাবা আর্মিতেই ছিলেন। সেজন্য আমার পাঁচ বছর বয়স অবধি তাকে খুব বেশি দেখিনি, আর যতটুকু দেখেছিলাম, ততটুকুতে তাকে নিয়ে ভাবার কোন কারণও ছিল না। কখনও সখনও ঘুম থেকে জেগে দেখতাম হালকা আলোয় একটা বিশালদেহী খাকি পোশাক আমার দিকে তাকিয়ে আছে যেন আমাকে গিলে ফেলবে। মাঝেমধ্যে কোন এক সকালে সশব্দে বাইরের দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনতে পেতাম। শুনতে পেতাম পাথুরে লেন থেকে ছুটে আসা বুট জুতার ধাতব শব্দ। এই ছিল বাবার গমন ও প্রস্থান। সান্তা ক্লজের মতই রহস্যময় ছিল উনার আসা-যাওয়া।
সত্য বলতে কী, তার এই আসা-যাওয়া আমার ভালোই লাগত, যদিও ভোর বেলায় বড় বিছানায় গিয়ে মা-বাবার মধ্যেখানটায় ঢোকা খুব অস্বস্তিকর ছিল। বাবা সিগারেট খেতেন, যা তাকে এক ধরনের ধোঁয়াটে আনন্দ দিত। তারপর শেভ করতেন। এ কাজটা করে তিনি অদ্ভুত মজা পেতেন। প্রতিবারই যাবার সময় তিনি কিছু না কিছু দিয়ে যেতেন- খেলনা ট্যাঙ্ক, বুলেটের খোসার হাতলওয়ালা গুর্খা চাকু, জার্মান হেলমেট, ক্যাপ ব্যাজ, বাটন স্টিকসহ নানান রকম মিলিটারি উপকরণ। এগুলো একটা বড় বাক্সে ভরে খুব সাবধানে রাখা হতো ওয়ার্ডরোবের মাথায়, যেন চাইবা মাত্রই সেগুলোকে হাতের নাগালে পাওয়া যায়। বাবা ছিলেন কিছুটা ম্যাগপাই স্বভাবের- যা পেতেন তা-ই সংগ্রহ করতেন। তিনি চাইতেন জিনিসগুলো যেন সব সময় তার হাতের নাগালেই থাকে। তিনি যখন চলে যেতেন, তখন এই গুপ্তধন পেড়ে সেগুলো নিয়ে খেলার সুযোগ আমাকে মা করে দিতেন। এসব জিনিসপত্র নিয়ে বাবা যতটা সিরিয়াস ছিলেন, মাকে ততটা মনে হয়নি।
আমার জীবনে যুদ্ধের ওই সময়টুকুই সবচে শান্তির ছিল। আমার ছোট্ট ঘরটার জানালা ছিল দক্ষিণ-পূর্বমুখী। মা জানালায় একটা পর্দার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা খুব একটা কাজের ছিল না। ভোরের আলো ফুটবার সাথে সাথেই আমি জেগে উঠতাম। সাথে জেগে উঠত আগের দিনের যাবতীয় কাজকর্ম। নিজেকে সূর্যের মতই মনে হতো- আলো ছড়ানো আর হৈহুল্লোড় করার জন্য প্রস্তুত। মনে হয় তখনকার মত এমন স্বাভাবিক, স্পষ্ট আর সম্ভাবনাময় জীবন কখনই আসেনি। আমার পা দুটোর আলাদা আলাদা নাম ছিল- মিসেস বাম ও মিসেস ডান। চাদরের নিচ থেকে তাদেরকে বের করে একটা নাটকীয় মুহূর্তে ঢুকে যেতাম। সারাদিনে কী কী সমস্যা আসতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করতাম। কেউ না করলেও মিসেস ডান কিন্তু করতই। সে ছিল খুব খোলামেলা। ওদিকে মিসেস বাম-এর উপর আমার একইরকম কন্ট্রোল ছিল না। সেজন্য বেশির ভাগ সময়ই মাথা ঝাঁকিয়ে সব কথায় সায় দিতেই সে ভালোবাসত।
ওরা আলোচনা করত- মা আর আমার সারাদিন কী কী করা উচিত, সান্টা ক্লজ তার ভক্তকে কী উপহার দিতে পারে, আর বাড়িটাকে আরও বেশি ঝলমলে করতে হলে কী কী করা যেতে পারে। নতুন কোন বাবু আসুক, সেটা নিয়ে তেমন কোন চিন্তাভাবনা ছিল না। মা আর আমি কখনই নতুন একটা বাবুর ব্যাপারে উৎসাহী ছিলাম না। এই তল্লাটে কেবল আমাদের বাড়িতেই কোন কচি বাবু ছিল না। মা বলেছেন, কচি বাবুতে অনেক খরচ হয়। তাই বাবা যুদ্ধ থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা আরেকটা বাবু নিতে পারব না।
মায়ের এই চিন্তাটা ছিল খুবই সাদামাটা। পাশের জিনি পরিবারেও তো একটা কচি বাবু ছিল। অথচ সকলেই জানত, একটা কচি বাবুর জন্য খরচ করার মত টাকা তাদের ছিল না। হতে পারে, তাদের বাবুটা খুব সস্তা ছিল! আর মা হয়তো চাইতেন, তিনি যেহেতু সবচে আলাদাই, সবচে ভালো বাবুটাই তার হোক। জিনিদের বাবুটাও কিন্তু আমাদের জন্য চলনসই হতো।
দিনের সবগুলো পরিকল্পনা করা হয়ে গেলে আমি উঠে পড়তাম। একটা চেয়ার টেনে আমার ঘরের জানালার ফ্রেমটা যতটা সম্ভব উপরে ঠেলে দিতাম। জানালা দিয়ে অবশ্য বাড়ির পেছনের বাগানটা দেখা যেত না, কিন্তু সুপরিসর উপত্যকার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত যে দীর্ঘ, লাল ইটের বাড়িগুলো ছিল, সেগুলো দেখা যেত। আমাদের এদিকের বাড়িগুলো রৌদ্রজ্জ্বল হলেও ওই বাড়িগুলো জুড়ে তখনও ছায়া খেলা করত। এই লম্বা ছায়াগুলো বাড়িগুলোকে কেমন অপরিচিত আর রুক্ষ্ম ও কৃত্রিম করে তুলত।
এরপর আমি মা-র ঘরে ঢুকে বড় বিছানায় উঠতাম। তিনি জেগে যেতেন আর তখন আমি তাকে আমার পরিকল্পনাগুলো জানাতাম। কখনও সেভাবে খেয়াল করা হয়নি যদিও, এরই মধ্যে আমি আমার নাইটশার্টের মধ্যে যেন জমে যেতাম। কথা বলতে থাকতাম যতক্ষণ না তাপে সব বরফ গলে যেত। আরাম লাগত, তাই তার পাশে আমি ঘুমিয়ে যেতাম। যখন আবার জেগে উঠতাম, তখন রান্নাঘরের শব্দ শুনে বুঝতাম, মা নাস্তা বানাচ্ছেন।
নাস্তা করা হয়ে গেলে আমরা শহরে যেতাম। সেন্ট অগাস্টিন চার্চের অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম আর সেখানে আমরা বাবার জন্য প্রার্থনা করতাম। তারপর কেনাকাটা। যদি বিকেলের আবহাওয়া ভালো থাকলে আমরা গ্রামের দিকে হাঁটতে যেতাম, কিংবা পাশের সন্যাসাশ্রমে মা-র কাছের বন্ধু মাদার সেইন্ট ডমিনিকের সাথে দেখা করতে যেতাম। মা সবাইকে বাবার জন্য প্রার্থনা করতে বলতেন। আর প্রতিরাতে ঘুমাতে যাবার সময় আমি গডকে বলতাম তিনি যেন আমার বাবাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেন। তখন আমি বুঝতামই না যে আমি আসলে কী প্রার্থনা করছি!
একদিন সকালে যখন আমি বড় বিছানাটায় গেলাম, বরাবরের মতই আমার সান্তা ক্লজ বাবাকে সেখানে দেখলাম। কিন্তু ঘুম থেকে উঠে ইউনিফর্ম পরার পরিবর্তে বাবা তার সবচে ভাল নীল স্যুটটা পরলেন। আর মাকেও অন্য যে কোন দিনের চাইতে বেশি উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। আমি এত খুশি হবার মত কিছুই খুঁজে পেলাম না। কারণ, ইউনিফর্ম ছাড়া বাবাকে তেমন ভাল দেখাচ্ছিল না। কিন্তু মা যেন খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিলেন। বললেন যে গড আমাদের প্রার্থনা কবুল করেছেন। বাবাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেবার জন্য আমরা চার্চে গিয়ে গডকে ধন্যবাদ জানিয়ে এলাম।
নিয়তির কী পরিহাস! সেই রাতেই যখন তিনি খাবার টেবিলে এলেন, তিনি তার বুটজোড়া খুলে স্লিপার পরলেন, যে নোংরা পুরনো ক্যাপ তিনি ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য পরতেন তা পরলেন। পা ভাঁজ করে বসে মা-র সাথে মুখ গম্ভীর করে কথা বলতে লাগলেন। মাকে বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল। স্বভাবতই যা কিছু মাকে কষ্ট দেয়, তা আমার পছন্দ নয়। তাই আমি বাবার কথার মধ্যে ঢুকে পড়লাম।
“তুমি থামো, ল্যারি।” মা খুব আস্তে করে বললেন। মা এই স্বরে কথা বলেন কেবল তখনই যখন কোন বিরক্তিকর কেউ বেড়াতে আসেন। কাজেই তার কথাকে পাত্তা না দিয়ে কথা বলতেই থাকলাম।
মা অধৈর্য্য হয়ে বললেন, “একদম চুপ করো, ল্যারি। শুনতে পাচ্ছ না, আমি তোমার বাবার সাথে কথা বলছি?”
এই প্রথম আমি অশুভ কিছু একটা শুনলাম, “বাবার সাথে কথা”। আমার মনে হচ্ছিল, এই যদি হয় গডের প্রার্থনা-শোনা, তাহলে তিনি সব প্রার্থনা মনযোগ দিয়ে না শুনলেও পারেন।
আমি যতটা সম্ভব ভাবলেশহীনভাবে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি বাবার সাথে কেন কথা বলছ?”
“কারণ, কিছু বিষয়ে তোমার বাবার সাথে আমার আলোচনা করার আছে। এখন আর কথা বোলো না।”
বিকেলে মা-র কথায় বাবা আমাকে নিয়ে হাঁটতে বের হলেন। এবার গ্রামে না গিয়ে আমরা শহরে গেলাম। আশান্বিত হয়ে আমি ভাবলাম, এ বুঝি বেশ ভালোই হলো। কিন্তু সে রকম কিছু হলো না। শহরে বাবা আর আমার এই আগমন একদম বিপরীত অনুভূতি নিয়ে এল। ট্রামগাড়ি, জাহাজ আর ঘোড়ায় তার কোন আগ্রহই ছিল না। যত আগ্রহ কেবল তার বয়সী সব মানুষজনদের সাথে কথা বলায়। যখন আমি তাকে থামাতে চাইতাম, তখনও তিনি আমার হাত চেপে ধরে টানতে টানতে কথা চালিয়ে যেতেন। আবার যখন তিনি আমাকে থামাতে চাইতেন, আমিও ঠিক সেটাই করতাম- না করে উপায় ছিল না। আমি লক্ষ্য করলাম, কোন দেয়ালে তার হেলান দেয়া মানেই হচ্ছে তিনি আমাকে বেশিক্ষণ ধরে থামিয়ে রাখবেন। পরের বার যখন আমি এই একই কাজটা করতে দেখলাম, আমি খুব ক্ষেপে গেলাম। মনে হলো তিনি তাতে কিছু মনেই করলেন না। আমি তার কোট আর প্যান্ট ধরে টানতে লাগলাম। মা এ ধরনের পরিস্থিতিতে রেগে গিয়ে বলতেন, “ল্যারি, ঠিকঠাক আচরণ না করলে আচ্ছামত থাপ্পড় খাবি”। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে উপেক্ষা করার এক অমায়িক, অসাধারণ ক্ষমতা বাবার মধ্যে ছিল। বাবার ব্যাপারে যা বোঝার তা বুঝে গেলাম। ভাবছিলাম, কান্নাকাটি করব কিনা। কিন্তু এর দ্বারাও তাকে কিছুমাত্র বিচলিত করা যাবে না। প্রকৃতপক্ষে এ ছিল এক পর্বতের সাথে হাঁটতে বের হওয়ার মতোন! পর্বতটি হয় মোচড়ানো বা দুমড়ানোকে পাত্তাই দেয় না, নয়তো সেটা তার চূড়া থেকে আনন্দে অট্টহাসি হেসে তাকিয়ে থাকে নিচে। বাবার মতো এমন আত্মনিমগ্ন মানুষকে আমি আর কখনই দেখিনি।
চাবেলায় “বাবার সাথে কথা” কথা আবার শুরু হলো। এবার ঘটনাটা আরও জটিল রূপ নিল, কারণ তিনি সন্ধ্যায় যে পত্রিকা নিতেন তা থেকে একটু পর পরই নতুন কিছু পড়ে শোনাচ্ছিলেন। আমার মনে হলো, এটা একটা খুব বাজে খেলা। পুরুষের সাথে পুরুষের প্রতিযোগিতা। মা-র মনযোগ পাওয়ার জন্য আমি বাবার সাথে যে কোন সময় প্রতিযোগিতায় নামতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু তিনি যখন নিজের এই কাজের জন্য অন্যদেরকে কাজে লাগান, আমার তখন আর কিছু করার থাকে না। বেশ কয়েক বার তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন লাভ হলো না।
মা অধৈর্য্য হয়ে বললেন, “ল্যারি, বাবা যখন পেপার পড়বেন, তখন কোন কথা বলবে না।”
আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম যে, হয় মা আমার চেয়ে বাবার সাথে কথা বলতে বেশি পছন্দ করেন, আর নইলে মা-র ওপর বাবার কর্তৃত্ব এতটাই প্রখর যে মা ভয়ে তাকে সত্যটা বলতে পারেন না।
সে রাতে মা যখন আমার গায়ে কম্বল তুলে দিচ্ছিলেন, তখন মাকে বললাম, “আম্মু, আমি যদি খুব করে প্রার্থনা করি, তাহলে গড কি আব্বুকে আবার যুদ্ধে পাঠাবেন?”
তিনি একটুক্ষণ বিষয়টা নিয়ে ভাবলেন মনে হলো।
“না, সোনা। আমার মনে হয় না তিনি তা করবেন।” মা হাসতে হাসতে বললেন।
“কেন তিনি তা করবেন না, আম্মু?”
“কারণ, এখন আর কোন যুদ্ধ হচ্ছে না, সোনা।”
“কিন্তু আম্মু, গড কি চাইলে আরেকটা যুদ্ধ দিতে পারেন না?”
“তিনি তো তা চাইবেন না, সোনা। গড তো যুদ্ধ করেন না, যুদ্ধ করে দুষ্টু মানুষেরা।”
“হাহ্!” আমি খুবই মর্মাহত হলাম। আমি ভাবতে লাগলাম যে মানুষ গডকে যতটা ভালো বলে, তিনি আসলে ততটা নন।
পরের দিন সকালে যথা সময়েই ঘুম ভাঙল। নিজেকে শ্যাম্পেইনের বোতল মনে হচ্ছিল। আমি পা দুটো বের করলাম, আর তারা দুজন একটা দীর্ঘ আলাপ ফেদে বসল। মিসেস ডানের বাবা যতদিন বাড়িতে ছিল, ততদিন সে যে সমস্যায় পড়েছিল, সেটা নিয়েই সে কথা বলছিল। আমি ঠিক জানতাম না বাড়ি বলতে আসলে কী বুঝায়, কিন্তু বাবার জন্য এটাকে একটা উপযুক্ত জায়গা বলেই মনে হচ্ছিল। পায়েদের কথা শেষ হলে আমি চেয়ার টেনে নিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বেরিয়ে দিলাম। ভোরের আলো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। একটা অনাবশ্যক পরিস্থিতির মধ্যে ঢুকে গেছি, এই অপরাধবোধ কাজ করছিল। মাথার মধ্যে গালগল্প গিজগিজ করতে লাগল। টলতে টলতে পাশের দরজাঅবধি পৌঁছে গেলাম। আর আলো-আঁধারির মধ্যেই ঝটপট সেই বড় বিছানায় উঠে গেলাম। মা-র পাশে কোন জায়গা ছিল না। তাই আমি মা আর বাবার মধ্যেখানে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণের জন্য আমি বাবাকে যেন ভুলে গেলাম। পরের কয়েক মিনিটি আমি বসে বসে বুদ্ধি পাকাচ্ছিলাম, এই লোকটাকে নিয়ে কী করা যায়। উনি উনার জন্য বরাদ্দের বেশি সময় ধরে বিছানা দখলে রাখছেন। আমি স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। এজন্য তাকে কয়েকটা লাথি মারলাম। বাবার মুখ দিয়ে হালকা শব্দ হলো। তিনি সোজা হয়ে শুলেন। জায়গা বের হলো। মা জেগে গেলেন আর আমার জন্য তার খারাপ লাগল। বুড়ো আঙুল মুখে পুরে আমি আবার বিছানার উষ্ণতায় নিজেকে সঁপে দিলাম।
তৃপ্তির সাথে উচ্চকণ্ঠে সুর করে ডাকলাম, “আম্মু!”
“হুসসস! না সোনা, বাবাকে জাগিয়ো না।” মা ফিসফিস করে বললেন।
এটা একটা নতুন সংযোজন। “বাবার সাথে কথা”-র চাইতে এটাকে বেশি সাংঘাতিক মনে হলো। মা-র সাথে সকালবেলার এই আলাপচারিতা ছাড়া জীবনটাকে যেন আমি ভাবতেও পারি না।
আমি কঠিনকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
“কারণ, বেচারা বাবা খুব ক্লান্ত।” এই কারণটা আমার কাছে বেশ অপাঙ্ক্তেয় মনে হলো। তার এই “বেচারা বাবা” ধরনের আবেগ আমি নিতে পারছিলাম না। এই ধরনের আবেগ আমার পছন্দ নয়। আমাকে অবিবেচক মনে করে আঘাত দেয়া হলো।
আমি বেশ আস্তে করে বললাম, “ওহ!” তারপর সবচে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললাম, “আম্মু, তুমি জানো, আজ আমি তোমার সাথে কোথায় বেড়াতে যাব?”
মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “না, সোনা।”
“আজ আমরা গ্লেন-এর পাড়ে যাব এবং আমার নতুন জাল দিয়ে মাছ ধরব। তারপর আমরা ফক্স এন্ড হাউন্ডস্-এ যাব আর-“
“বাবা জেগে যাবেন!” মা রাগে আমার মুখে হাতচাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠলন।
কিন্তু যা হবার তা হয়ে গেলো। বাবা জেগে গেছেন, বা জাগছেন। তিনি কিছু বললেন না। দেশলাই-এর জন্য হাত বাড়ালেন। তারপর তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন, যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না।
“চা খাবে নাকি গো?” মা বাবাকে খুব অমায়িক, শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন। মা-র এ রকম কণ্ঠ আমি আগে কখনও শুনিনি। মনে হচ্ছিল, যেন তিনি খুব ভয়ে আছেন।
“চা? তুমি কি জানো এখন কটা বাজে?” বাবা বেশ রূঢ় কণ্ঠে বললেন।
“আর তারপর আমি র‌্যাথকুনি রোড-এ যাব,” আমি বেশ জোরেশোরেই বললাম, কারণ আমার মনে হচ্ছিল তাদের কথার মধ্যে আমি কোন কিছু ভুলে যেতে পারি।
মা বেশ রুক্ষ্ম কণ্ঠে বললেন, “ল্যারি, এক্ষুণি ঘুমিয়ে পড়্।”
আমি ফুঁপাতে লাগলাম। আমার কোন কিছু ভাল লাগছিল না, বিশেষত তাদের কথাবলার ধরন। আমার ভোরবেলার পরিকল্পনাগুলোকে ধুলিস্যাৎ করাটা ছিল একটা পরিবারকে অঙ্কুরেই শেষ করে দেয়ার মতই। বাবা কিছুই বললেন না। তিনি তার পাইপ ধরিয়ে টানতে টানতে বাইরে ছায়া দেখতে লাগলেন যেন আমি বা মা কেউই তার সামনে নেই। আমি জানতাম, তিনি একজন উন্মাদ। যখনই আমি কিছু একটা বলছিলাম, মা আমাকে কেমন করে যেন থামিয়ে দিচ্ছিলেন। আমি বেশ আহত হলাম। আমার মনে হচ্ছিল, যা হচ্ছে তা ঠিক নয়। এটা বেশ দুর্ভাগ্যজনকও। যতবার আমি মাকে বলতাম যে যখন আমরা দুজন এক বিছানায় শুতে পারি, তখন দুটো আলাদা বিছানা এক ধরনের অপচয়, ততবারই তিনি আমাকে বুঝিয়েছেন- এভাবে আলাদা শোয়া স্বাস্থ্যকর। আর এখন দেখুন, এই মানুষটা, এই আগন্তুকটা মা-র সঙ্গে ঘুমাচ্ছেন তার স্বাস্থ্যের বিষয়টা ন্যূনতম চিন্তা না করেই! তিনি হয়তো খুব ভোরে উঠলেন, চা বানালেন। কিন্তু মাকে চা দিলেও আমার জন্য কোন চা বানালেন না।
“আম্মু, আমিও চা চাই,” আমি চিল্লিয়ে বললাম।
“হ্যাঁ, সোনা। তুমি তোমার আম্মুর পিরিচ থেকেই খেতে পারো।” বেশ ধৈর্য্য নিয়ে বললেন মা।
তো হয়েই গেল। হয় বাবাকে নইলে আমাকে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমি তো মা-র ভাগ থেকে চা খেতে চাই না। আমি আমার নিজের বাড়িতে আচরণের সমতা চাই। কাজেই, মাকে বিরক্ত করার জন্য ইচ্ছে করেই সবটুকু চা খেয়ে ফেললাম, একটুও বাদ রাখলাম না। এটাকেও তিনি খুব স্বাভাবিকভাবেই নিলেন। কিন্তু সে রাতে আমাকে বিছানায় দিয়ে আসার সময় খুব মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, “ল্যারি, কথা দাও, আমি যা বলব শুনবে।”
আমি জানতে চাইলাম, “কী, বলো?”
“এত সকালে আমাদের ঘরে আসবে না, আর বাবাকেও বিরক্ত করবে না। প্রমিজ?”
আবার সেই ‘বেচারা বাবা’! এই ধরনের একটা লোক যার সঙ্গে থাকা যায় না, তার ব্যাপারে আমার সন্দেহ ক্রমশই ঘনীভূত হতে লাগল।
মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
“কারণ, বেচারা বাবা পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত। আর ভালো ঘুম হয় না।”
“কেন হয় না, আম্মু?”
“হয়েছে কী, জানোই তো, বাবা যখন যুদ্ধে ছিলেন, তখন তোমার আম্মু পোস্ট অফিস থেকে টাকা তুলত, মনে নেই?”
“মিস ম্যাককার্থির কাছ থেকে তো?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। জানো তো, মিস ম্যাককার্থির কাছে এখন আর কোন টাকা নেই। কাজেই তোমার আব্বুকে বাইরে গিয়ে আমাদের জন্য টাকা জোগাড় করতে হয়। তুমি কি ভেবে দেখেছ, তিনি যদি আমাদের জন্য টাকা আনতে না পারেন, তাহলে আমাদের কী হবে?”
“না। ভাবিনি। বল তো।”
“আচ্ছা, শোনো। প্রত্যেক শুক্রবার যে বৃদ্ধা আসে ভিক্ষে করতে, আমার মনে হয়, তার মত আমাদেরকেও ভিক্ষে করার জন্য বের হতে হবে। আমাদের সেটা করতে ভালো লাগবে না, তাই না?”
“না। আমাদের ভালো লাগবে না।” আমি একমত হলাম।
“কাজেই প্রমিজ করো, তুমি এসে উনাকে জাগিয়ে দিবে না?”
“প্রমিজ।”
আমি কিন্তু সত্যিই সত্যিই প্রমিজ করলাম। আমি জানতাম, টাকাপয়সা একটা খুব দরকারী জিনিস। আর ওই বৃদ্ধার মতো আমি শুক্রবার শুক্রবার ভিক্ষে করার জন্য বের হবার ঘোর বিরোধী। মা আমার সকল খেলনা বিছানার চারিদিকে গোল করে রেখে গেলেন, যেন আমি যেদিক দিয়েই নামতে যাই না কেন, কোন না কোন খেলনার উপর গিয়ে আমি পড়ব। যখন আমার ঘুম ভেঙে গেল, আমার মনে পড়ল প্রমিজের কথা। আমি বিছানা ছাড়লাম। মেঝেতে বসে পুতুল নিয়ে খেললাম- মনে হলো যেন কত কত ঘণ্টা ধরে খেলে চলেছি। তারপর আরও কিছু সময় ধরে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। আমি খুব চাইছিলাম, বাবা জেগে উঠুন। আমি খুব চাইছিলাম, কেউ আমার জন্য এক কাপ চা বানান। নিজেকে কিছুতেই সূর্যের মতো উচ্ছ্বল মনে হচ্ছিল না। খুব বিরক্ত আর নিষ্প্রাণ নিষ্প্রাণ লাগছিল। আমার আকাঙ্খা জুড়ে ছিল উষ্ণ আর নরম পালকের বড় বিছানাটা। আমি আর ধৈর্য্য ধরতে পারলাম না। পাশের ঘরে ঢুকে পড়লাম। মা-র পাশে যেহেতু কোন জায়গা ছিল না, আমি তার গায়ের উপর উঠলাম। তিনি হতচকিয়ে জেগে উঠলেন। আমার হাত খুব শক্ত করে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন, “ল্যারি, কী প্রমিজ করেছিলে?”
“আমি তো মেনেছি, আম্মু। আমি অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ ছিলাম।” আমি এই অবস্থায় পড়ে কাঁদতে লাগলাম।
আমার জন্যই মাকে খুব বিষণ্ন মনে হলো, “ও লে বাবা। কী অবস্থা হয়েছে তোমার! আচ্ছা, এখন যদি তোমাকে থাকতে দিই, তুমি কোন কথা বলবে না তো?”
ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললাম, “কিন্তু আম্মু, আমি কথা বলতেই তো চাই।”
“এসব একদম করো না। বাবা ঘুমাবে। কথাটা কি বোঝা গেছে?” মা বেশ রূঢ়তার সাথে বললেন। এটা আমার জন্য নতুন কিছু।
আমি আচ্ছামতই বুঝলাম। আমি কথা বলতে চাই। তিনি চান ঘুমাতে- আসলে এইটা তাহলে কার বাড়ি?
আমিও একই দৃঢ়তার সাথে বললাম, “আমার মনে হয়, আব্বু যদি তার নিজের বিছানায় শোয়, তাহলে তা বেশি স্বাস্থ্যকর হবে।”
মা মনে হয় শক খেলেন, কারণ বেশ কিছুক্ষণ কিছুই বললেন না।
তারপর তিনি বলতে থাকলেন, “এবার শেষ বারের মতো শোনো। হয় তুমি একদম চুপ থাকবে, আর না হলে নিজের বিছানায় ফিরে যাবে। কোনটা চাও?”
এই অবিচার আমাকে শেষ করে দিল। মা নিজের মুখেই তার স্ববিরোধীতা ও যুক্তিহীনতাকে স্বীকার করে নিলেন। তিনি কোন প্রত্যুত্তরের চেষ্টাও করলেন না। প্রচ- আক্রোশে আমি বাবাকে একটা লাথি মারলাম। মা সেটা খেয়াল করলেন না বটে, কিন্তু বাবা আউচ করে শব্দ করে উঠলেন এবং ধরফর করে চোখ মেলে চাইলেন।
“এখন কটা বাজে?” মা-র দিকে না, দরজার দিকে তাকিয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে বাবা জানতে চাইলেন, যেন ওখানে কেউ আছে।
মা মোলায়েম কণ্ঠে বললেন, “এখনও খুব সকাল। বাবুটা এসেছে। ঘুমাও।… আর ল্যারি,” বিছানা ছাড়তে ছাড়তে বললেন, “তুমি বাবাকে জাগিয়ে দিয়েছ। এখন তুমি অবশ্যই তোমার ঘরে যাবে।”
এইবেলা, মা-র ওমন শান্ত আচরণ বুঝিয়ে দিল, তিনি যা বলছেন, তা-ই চান। এবং আমি এও জেনে গেলাম যে আমি যদি এখনই দাবী করে না বসি, তাহলে এ বাড়ির যাবতীয় মৌলিক অধিকার আমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। মা যখন আমাকে উঠিয়ে নিলেন, বাবাকে মাথায় না রেখেই, এমন ভাবে গলাছেড়ে চিৎকার করে উঠলাম, যেন মৃতরাও জেগে উঠবে।
বাবা রাগে গড়গড় করতে লাগলেন, “বাজে ছেলে কোথাকার! এটা কি কখনই ঘুমায় না?”
“দীর্ঘদিনের অভ্যাস গো।” মা যদিও শান্তকণ্ঠে এটা বললেন, আমি তার বিরক্তি ঠিক বুঝতে পারছিলাম।
“এখন একে এসব অভ্যাস থেকে বের হতে বলো,” বিছানায় আবার নিজেকে এলিয়ে দিতে দিতে বাবা চিল্লিয়ে বললেন। তিনি হঠাৎই বিছানার সমস্ত কাপড় জড়ো করলেন, দেয়ালের দিকে ঘুরে গেলেন আর তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকালেন শূন্য দৃষ্টিতে- ঘৃণ্য, অন্ধকার ছোট ছোট চোখ। লোকটাকে শয়তান মনে হচ্ছিল। দরজা খোলার জন্য মা আমাকে নামিয়ে দিলেন। আর আমি মুক্ত হয়েই দৌড়ে ঘরের এক কোণে গিয়ে বিকট স্বরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম।
বাবা মেরুদন্ড সোজা করে বিছানায় বসে পড়লেন। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বললেন, “চুপ্, কুত্তার বাচ্চা।”
আমি এতটাই হতভম্ব হলাম যে আমি চিৎকার বন্ধ করে দিলাম। কখনো, আগে কখনোই কেউ আমার সাথে এই রকম করে কথা বলেনি। আমি উনার দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকালাম। দেখলাম, রাগে তার মুখাবয়ব পাল্টে যাচ্ছে। ঠিক তখনই আমি পুরোপুরি বুঝে গেলাম, এই দানবের নিরাপদ ফিরে আসার জন্য যে প্রার্থনা করেছিলাম, তাতে গড কী নির্মমভাবে সাড়া দিয়েছেন।
আমিও চিল্লিয়ে বললাম, “তুমি, তুমি চুপ করো।”
বাবা বিছানা থেকে ভয়ঙ্করভাবে লাফ দিয়ে বললেন, “কী বললি রে তুই?”
মা চিৎকার করে উঠলেন, “মিক, মিক! তুমি দেখতে পাচ্ছ না, ছেলেটা তোমাকে এখনও স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না।”
“হ্যাঁ, দেখতেই তো পাচ্ছি, তাকে শিক্ষা দেয়ার চাইতে খাবারই বেশি দেয়া হয়েছে।” বাবা রাগে গজগজ করতে করতে আর উন্মত্তভাবে হাত নাড়াতে নাড়াতে বললেন, “ওর পাছার ছাল তুলে ফেলতে হবে।”
আমাকে নিয়ে তার এই বিশ্রী কথার কাছে আগের সব চিৎকার চেঁচামেচি যেন কিছুই মনে হলো না। এই কথাগুলো আমার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিল।
“তোমার নিজের ছাল তোলো!” আমি উন্মত্তভাবে চিৎকার করে উঠলাম, “হ্যাঁ, তোমার নিজের ছাল! এহ, চুপ করো! চুপ করো!”
এক্ষণে তিনি তার ধৈর্য্য হারিয়ে আমার দিকে ছুটে এলেন। তিনি ছুটে এলেন কোনরকম হুঁশ ছাড়াই, কিন্তু থাকা উচিত ছিল একজন সন্ত্রস্ত মায়ের চোখের সামনে। একটা হালকা আঘাত দিয়ে বিষয়টির সমাপ্ত হলো ঠিকই, কিন্তু একজন আগন্তুকের এই আচরণ ছিল চরম অসম্মানের। হ্যাঁ, তিনি একজন আগন্তুকই যিনি আমার নিষ্পাপ প্রার্থনার কারণেই যুদ্ধ থেকে ফিরে ভালো মানুষ সেজে আমাদের বড় বিছানা পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। তার এই আচরণ আমাকে সম্পূর্ণ উন্মত্ত করে দিল। আমি চিল্লাতেই থাকলাম, নগ্ন পায়ে পাগলের মতো নাচতে লাগলাম। বাবার পরণে একটা ছোট্ট ধূসর আর্মি শার্ট ছাড়া আর কিছু নেই। তিনি সেই কিম্ভূতকিমাকার ড্রেসে ভয়ঙ্কর চাহনি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন আমাকে খুন করে ফেলবেন। মনে হয় সেই সময়ই আমি বুঝতে পারলাম, বাবাও আমাকে হিংসে করছেন। মাকে দেখলাম নাইটড্রেস পরে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছেন- একদিকে বাবা, আর অন্য দিকে আমি। আমি চাইছিলাম, মা-র সত্যিই এমন একটা অবস্থা হোক। আমার মনে হচ্ছিল, এটাই তার প্রাপ্য।
সেদিনের সেই সকালের পর থেকে আমার জীবন যেন নরক হয়ে উঠল। বাবা আর আমি পরস্পরের প্রকাশ্য শত্রু বনে গেলাম। আমাদের মধ্যে পরপর অনেকগুলো খ-যুদ্ধ চলল; মা-র কাছ থেকে তিনি যেমন আমার সময় খেয়ে নিতেন, তেমনি আমিও তার সময়। যখন মা আমাকে আমার বিছানায় বসে আমাকে গল্প শোনাতেন, দেখা গেল তখন বাবা যুদ্ধের সময় বাসায় ফেলে যাওয়া পুরনো বুটজোড়া খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আবার বাবা যখন মা-র সঙ্গে গল্প করতেন, তখন আমি আমার পুতুলগুলো নিয়ে খুব চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে খেলছি, যেন তারা বুঝতে পারেন, আমি উপেক্ষিত।
একদিন সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে বাবা তো এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করলেন যখন তিনি দেখলেন যে আমি তার বাক্স থেকে রেজিমেন্টাল ব্যাজ, গুর্খা চাকু আর বাটন স্টিক বের করে নিয়ে খেলছি। মা কাজ থেকে উঠে এসে আমার কাছ থেকে বাক্সটা নিয়ে নিলেন।
মা ভর্ৎসনা করে বললেন, “ল্যারি, বাবা তোমাকে না দেয়া পর্যন্ত তুমি বাবার কোন খেলনা জিনিস নিয়ে খেলবে না। বাবা তো তোমার জিনিস নিয়ে খেলেন না।”
কেন জানি না, বাবা মা-র দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন মা তাকে আঘাত করে কথা বলেছেন। তারপর ভ্রু কুঁচকে ঘুরে তাকালেন।
রাগে গজগজ করতে করতে বললেন, “এগুলো খেলনা নয়।” বাবা আবার বাক্সটি নামিয়ে দেখলেন যে আমি কোন কিছু সরিয়েছি কিনা, “এগুলোর কোন কোনটা খুব দুর্লভ আর দামী।”
আমি লক্ষ্য করলাম সময়ের সাথে সাথে তিনি কিভাবে মা আর আমাকে আলাদা করে ফেললেন। সবচে বাজে বিষয়টা হলো, কিভাবে তিনি তা করলেন, তা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না। কিন্তু বুঝতে পারলাম, বাবার মধ্যে মা-র জন্য আকর্ষণীয় কিছু একটা আছে। অথচ সম্ভাব্য সব দিক থেকেই তিনি আমার চেয়ে কম যোগ্য। তার কথাবার্তা খুব সাদামাটা, আর চা খাওয়ার সময় কেমন শব্দ করেন। আমি ভেবে বের করলাম, মা-র আগ্রহ মনে হয় ওই সংবাদপত্রে। সেজন্য আমি নিজের মতো করে ছোট ছোট খবর তৈরি করলাম মাকে শোনাব বলে। তারপর আমার ধারণা হলো, ধূমপানও একটা কারণ হতে পারে। আমার নিজের ধারনা, ধূমপান খুব আকর্ষণীয় একটা বিষয়। আমি বাবার পাইপটা নিয়ে সারাবাড়ি ঘুরে ঘুরে একটু একটু করে টানতে লাগলাম। এটা চলল ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত। এমনকি শব্দ করে চা-ও খেতে লাগলাম। কিন্তু মা বললেন আমাকে নাকি বিশ্রী লাগছে। অবশেষে তাদের একসাথে ঘুমানোর সেই অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসকেই সবকিছুর জন্য দায়ী মনে হলো। কাজেই সিদ্ধান্ত নিলাম তাদের বেডরুমে ঢুকে ইতোস্তত ঘুরে বেড়াবো। আমি নিজের সাথেই কথা বলতে লাগলাম যেন তারা মনে না করে যে আমি তাদেরকে দেখছি। কিন্তু তাদেরকে কখনই এমন কিছু করতে দেখলাম না যা আমার চোখে পড়ে। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিলাম। মনে হলো, বড় হতে হবে, লোকজনকে রিং পড়াতে হবে। আর মনে হলো, আমাকে আসলে ওয়েট করতে হবে। কিন্তু একই সাথে আমি চেয়েছি, বাবা যেন বুঝতে পারে, আমি কেবল ওয়েটই করছি, প্রতিযোগিতা থেকে পিছিয়ে আসিনি।
একদিন সন্ধ্যায় যখন বাবা মাথার কাছে বকরবকর করে আমাকে একদম বিরক্ত করে মারছিলেন, ঠিক তখনই আমি তাকে বিষয়টা জানালাম।
মাকে বললাম, “আম্মু, বড় হয়ে আমি কী করব, তুমি জানো?”
মা বললেন, “ না, সোনা। কী?”
আমি আস্ত করে বললাম, “আমি তোমাকে বিয়ে করব।”
বাবা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন, কিন্তু তিনি আমাকে বিশ্বাস করলেন না। আমি জানতাম, এটা ছিল তার ভনিতা।
কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও মা খুশি হলেন। আমার মনে হলো, মা তখন একটু যেন হালকা বোধ করলেন যে একদিন বাবার হাত থেকে তার মুক্তি ঘটবে।
মা মুচকি হেসে বললেন, “এটা কিন্তু দারুণ হবে, না?”
আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বললাম, “হ্যাঁ, খুব ভালো হবে। কারণ, আমরা অনেক, অ-নে-কগুলো বাবু নেব।”
মা শান্তভাবে বললেন, “ঠিক আছে, সোনা। জানো তো, আমরা খুব শীঘ্রই একটা বেবি পেয়ে যাব। তখন তুমি সময় কাটানোর জন্যে একজনকে পেয়ে যাবে।”
এতে কোনভাবেই আমি খুশি হতে পারলাম না। কারণ, মনে হচ্ছিল, বাবার কাছে মা নিজেকে যেভাবেই সমর্পন করুন না কেন, তিনি আমার ইচ্ছেটাকেই প্রাধান্য দেবেন। নইলে তাদের অবস্থা জিনিদের মতই হবে। যদিও পুরোটাই তাদের মত হবে না। প্রথমত, মা খুবই আনমনা। আমি জানি না, তিনি কোথা থেকে অর্থ পাবেন। আর বাবা যদিও সন্ধ্যার পরও বাইরে থাকেন, কিন্তু সেটা আমার কোন কাজের না। মা আমাকে নিয়ে আর বাইরে বের হন না। অগ্নিগোলার মতো তেতে থাকেন। আর কারণ ছাড়াই মারেন। মাঝে মধ্যে মনে হয়, কেন যে এই অসহ্যকর বাবুটার কথা পাড়তে গেলাম। নিজের দুরবস্থা নিজেই ডেকে আনার মতো এমন জিনিয়াস আমি!
হ্যাঁ, দুরবস্থায়ই! সনি জঘন্যরকম হৈচৈ-এর মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে এলো। শুধু হৈচৈটা নয়, গোলমালও। আর প্রথম থেকেই আমি ওটাকে অপছন্দ করতাম। বাবুটাকে সামলানো খুব কঠিন ছিল- আমি যতটা বুঝি, খুবই কঠিন। আর সব সময় সে মাকে কাছে পেতে চাইত। মা-ও ছিলেন তার ব্যাপারে বেশ যাচ্ছেতাই। মা জানতেও পারতেন না, কখনও কখনও বাবুটা ন্যাকামি করত! আর খেলার সাথী হিসেবে? আকামের চাইতে খারাপ! সারাদিন ও ঘুমাত। আর আমাকে সারাবাড়ি পা টিপেটিপে হাঁটতে হতো যেন তার ঘুম না ভাঙে। বাবার ঘুম ভাঙার বিষয়টা আর নেই! এখনকার স্লোগান হচ্ছে, “সনিকে জাগিও না!” আমিও ঠিক বুঝতাম না, বাবুটা কেন ঠিকঠাক সময়ে ঘুমাত না। কাজেই, মা আড়াল হলেই আমি তাকে জাগিয়ে দিতাম। ওকে জাগিয়ে রাখতে কখনও কখনও চিমটিও কাটতাম। মা তো একদিন হাতেনাতে ধরে ফেললেন আর নির্দয়ভাবে পিঠে ছড়ি ভাঙলেন।
একদিন সন্ধ্যায় আমি বাড়ির সামনের বাগানে ট্রেন নিয়ে খেলছিলাম আর বাবা তার কাজ থেকে ফিরলেন। আমি এমন একটা ভাব করলাম যেন তাকে খেয়াল করিনি। নিজের সাথে নিজেই কথা বলার অভিনয় করলাম। আর বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললাম, “আর কোন জঘন্য বাচ্চাকাচ্চা যদি এই বাড়িতে ঢোকে, তাহলে আমিই বাড়ি থেকে চলে যাব।”
বাবা মূর্তির মত দাঁড়িয়ে গেলেন আর কাঁধের উপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। কঠোরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “কী যেন একটা বললে?”
“আমি তো আমার সাথেই কথা বলছিলাম,” উত্তরে বললাম। ভীতিটা ঢাকার চেষ্টা করতে করতে বললাম, “এটা আমার একান্ত নিজের।”
তিনি আর একটা কথাও না বলে বাড়ির ভিতরে চলে গেলেন।
বলে রাখি, এই ওয়ার্নিংটা কিন্তু মন থেকেই ছিল। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়াটা হলো পুরোই ভিন্ন। বাবা আমার সাথে খুব ভালো ব্যবহার শুরু করলেন। সেটা আমি বুঝতেও পারছিলাম। মা সনিকে নিয়েই মেতে থাকলেন। এমনকি খাবার খাওয়ার সময়ও তিনি উঠে যেতেন আর দোলনায় শোয়া বাবুটার দিকে অর্থহীন হাসি দিয়ে কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকতেন। আর বাবাকেও সে রকমটি করতে বলতেন। সনির বিষয়ে বাবা নম্রই ছিলেন। কিন্তু, জানেন তো, বাবাকে বেশ হতভম্ব দেখাত- মা আসলে কী বলতেন তা যেন তিনি ঠিক বুঝতেন না। রাতে সনির কান্নাকাটি নিয়ে বাবা অভিযোগ করতেন। কিন্তু মা অজুহাত দেখাতেন আর বলতেন যে, কিছু একটা কারণ না থাকলে বাবু কখনই কাঁদে না। এটা ছিল একটা চরম মিথ্যা। কারণ, সনির কিছু হতোই না। সে কেবল মায়ের মনযোগ পাওয়ার জন্যই কাঁদত। মা আসলে এতটাই সাদামনের ছিলেন যে- কী আর বলব।
বাবা খুব যে আকর্ষণীয় ছিলেন, তা নয়। কিন্তু তার বেশ বুদ্ধি ছিল। তিনি সনির মধ্য দিয়ে দেখতেন, আর এখন তিনি বুঝে গেছেন- আমিও তার মধ্য দিয়েই দেখতাম। এক রাত্রে কিছু একটা নড়াচড়ার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম, আমার বিছানায় কেউ একজন শুয়ে আছেন। কোন এক অস্বাভাবিক কারণে আমার মনে হলো, পাশে আমার মা-ই নিশ্চয়। তার বোধবুদ্ধি ফিরে এসেছে, আর বাবাকে ছেড়ে চিরতরে চলে এসেছেন। ঠিক তখনই আমি পাশের রুমে সনির কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। মা বলছেন, “না! না! না! এই যে আমি!” আমি বুঝে গেলাম, মা নন। আমার পাশে বাবা। বাবা-ই আমার পাশে শুয়ে আছেন। তিনি জেগে আছেন, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন, আর সাংঘাতিক ক্ষেপে আছেন। একটু পরেই বুঝলাম, কেন তিনি ক্ষেপে আছেন। এখন তার পালা। আমাকে তো তিনি ওই বড় বিছানা ছাড়া করেছেন। এখন নিজেই বিছানাছাড়া হয়েছেন। মা-র কাছে এখন ওই বিষাক্ত ছানা ছাড়া আর কারো জন্যই কোন সহানুভূতি নেই।
বাবার জন্য আমার দুঃখ হলো। এই রকম সময়ের মধ্যে দিয়েই তো আমি এতদিন গেছি। কিন্তু ওই অতটুকু বয়সেও আমি শত্রুর প্রতি ন¤্র ছিলাম। আমি বাবার গায়ে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, “এখন! কেমন!”
তিনি ঠিক উত্তর দেবার অবস্থায় ছিলেন না। রাগে গড়গড় করতে করতে বললেন, “তুমিও এখনো ঘুমাওনি?”
“আব্বু, থাক ওসব। আমাকে তুমি একটু জড়িয়ে ধরো তো। ধরবে না?” আমি বললাম। বাবা জড়িয়ে ধরলেন, যেমন তেমন করেই। আমার মনে হয়, আপনারা এটাকে প্রশ্রয়ই বলতে পারেন। তিনি খুব অনভ্যস্থ ছিলেন, কিন্তু একদম না পাওয়ার চাইতে এটাই ছিল আনন্দের।
সেবার ক্রিসমাসে বাবা আমাকে একটা বেশ সুন্দর আর বড় রেলওয়ে কিনে দেবেন বলে বাইরে গেলেন।

[ফ্রাঙ্ক ও’কনর একজন আইরিশ গল্পকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও নাট্যকার। জন্ম আয়ারল্যান্ডের কর্ক-এ, ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ সালে। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়ার কারণে তিনি বেশি দূর লেখাপড়া করতে পারেননি। ১৯১৮ সালে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মিতে যুক্ত হন। প্রথমে কর্ক এবং পরে ডাবলিনে গ্রন্থাগারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কাজ করেছেন নাট্যশালায় নির্দেশক হিসেবেও। ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে সেখানকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করেন। তাঁর বেশিরভাগ গল্পই এই সময়ে লেখা। ডাবলিনে তিনি হার্ট এটাকে মারা যান ১৯৬৬ সালের ১০ মার্চ । গেস্টস অব দ্য নেইশন (১৯৩১), বোনস্ অব দ্য কনটেনশন (১৯৩৬), দ্য স্টরিজ অব ও’কনর (১৯৫২), ডোমেস্টিক রিলেশনস্ (১৯৫৭) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। তাঁর নামে প্রচলিত ‘ফ্রাঙ্ক ও’কনর ইন্টারন্যাশনাল শর্ট স্টরি অ্যাওয়ার্ড’ ছোটগল্পে সবচে দামী পুরস্কার হিসেবে গণ্য করা হয়।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here