মহিলা ঢাকির ঝাঁঝ ( ধারাবাহিক উপন্যাস; চতুর্থ পর্ব ) : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

0
486

খেমটির মায়ের ডাকে কুহক হকচকিয়ে গেল । কেননা এতক্ষণ বাবা ও মেয়ের অর্থাৎ খেমটির বাবা ও খেমটির আবেগমাখা কথাবার্তাগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিলো । হঠাৎ খেমটির মায়ের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে কুহক বললো, “আমি এখনি আসছি কাকীমা ।“
খেমটির মা কফি তৈরী করে কুহককে এগিয়ে দিয়ে বললো, “বাবা, আমরা গরীব । তার উপর আমরা সমাজে নিম্নবর্গের মানুষ । তোমার বাবা কিছুতেই চাইছেন না, তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তান আমার মেয়ের সঙ্গে মেলামেশা করুক এবং তিনি সেটা আমাদের বাড়ি স্বয়ং এসে সোজাসুজি জানিয়ে গেলেন । এমতাবস্থায় আমি তোমার কাছে একটা কথা বলতে চাই ?”
হ্যাঁ কাকীমা, বলুন ।
তুমি তোমার বাবা ও মাকে খেমটির সঙ্গে তোমার ভাব ভালবাসার কথা খোলাখুলি বলো । তাঁদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করো এবং খেমটির সঙ্গে মেলামেশার পরিণতির কথা তাঁদের বোঝাও । তুমি এযুগের শিক্ষিত ছেলে । তুমি আমার চেয়ে ভাল জানো, কিভাবে বাবা-মাকে তোমাদের সম্পর্কের কথা খুলে জানাবে ।
“কাকীমা, পরিণতির কথাটা বুঝলাম না । আপনি কোন্‌ পরিণতির কথা বলছেন ?” কুহক কৌতুহলি ভঙ্গিতে খেমটির মাকে জিজ্ঞাসা করলো ।
তুমি বড় হয়েছো । পরিণতির কথাটা একটু ধরিয়ে দিলেই তুমি সহজেই বুঝতে পারবে । আমি তোমাদের একে অপরের ভালবাসার সম্পর্কের কথা বলছিলাম । তুমি অন্তর দিয়ে খেমটিকে ভালবাসো এবং তাকে বিয়ে করতে চাও । আমি মা হয়ে এর বেশী বোঝাতে পারছি না ।
খেমটির মায়ের কথা একরকম কেড়ে নিয়ে কুহক বললো, “কাকীমা, ইতিমধ্যে বাড়িতে বাবা ও মাকে আমি এই কথাটাই ভালভাবেই বুঝিয়ে বলেছি । মা আমাদের সম্পর্কের কথা শুনে খুব খুশী, কিন্তু বেঁকে বসেছেন স্বয়ং বাবা । তিনি কিছুতেই আমাদের সম্পর্ককে ভাল চোখে দেখছেন না । তাঁর একটাই কথা, তিনি বায়েন বাড়ির মেয়েকে পুত্রবধু হিসাবে কিছুতেই মেনে নেবেন না । খেমটিকে বিয়ে করলে, তিনি আমাকে ত্যাজ্য পুত্র করতে পিছপা হবেন না“ ।
মায়ের আশীর্বাদ যখন তোমার উপর রয়েছে, তখন মাকে সঙ্গে নিয়ে বাবাকে বোঝাও । নতুবা ………………।
নতুবা কী কাকীমা ?
নতুবা আখেরে আমাদের বিপদ ! কেননা বাড়ি এসে তাঁর শাসানো এখন থেকেই শুরু হোলো । ভবিষ্যতে তিনি আমাদের উপর আরও উত্ত্যক্ত করবেন, সেবিষয়ে নিঃসন্দেহ । রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় নানান রকম অশান্তি ঘটাতে পারেন । এমনকি আমাদের ভিটে ছাড়ার বন্দোবস্ত করতে তিনি সর্বান্তকরণে প্রয়াস চালাতে পিছপা হবেন না । সেটা হবে আরও যন্ত্রণাদায়ক । সেই কারণে আমরা মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন ।
খেমটির বাবা এতক্ষণ চুপচাপ ছিলো । এবার কুহকের দিকে তাকিয়ে তিনি বললো, “তোমার কাকীমা ঠিক কথা বলেছে । আমি অসুস্থ মানুষ । আমাদের দৈন্যদশা তুমি তো জানো । তার উপর আমরা বায়েন সম্প্রদায়ের । অন্যদিকে তুমি বড় বংশের ছেলে । বাবার একমাত্র সন্তান । অনেক ধন সম্পত্তির মালিক । তাছাড়া তোমার বাবা গাঁয়ের একজন স্বনামধন্য মোড়ল । সমাজে তোমাদের গৌরবোজ্জ্বল খ্যাতিপ্রতিপত্তি । সেখানে আমাদের মতো মামুলি ঘরের মেয়েকে তোমার ভালবাসা কতোটা ফলপ্রসূ হবে সেটা ভেবেই আমার রক্তচাপ ক্রমশ বাড়ছে । ভবিষ্যতে অশান্তির আগুনে আমরাও দাউ দাউ করে জ্বলবো কিনা, তাতেও আমরা সন্দিহান ?”
খেমটির বাবা ও মায়ের কথা শুনে কুহক গভীর চিন্তায় নিমজ্জিত । দৃশ্যতই দুশ্চিন্তায় কুহক আনমনা । কী উত্তর দেবে সে ভেবে পাচ্ছে না । খেমটি তার আগামীদিনে জীবনসঙ্গিনী, এই বিষয়ে কুহক দৃঢ়সংকল্প । পৃথিবীর কোনো অশুভ শক্তি তাকে সেখান থেকে টলাতে পারবে না । নিজের ব্যাপারে তার চিন্তাভাবনা সম্পূর্ণ পরিস্কার । সে খেমটিকে ভালবাসে এবং তাকেই বিয়ে করবে, এব্যাপারে সিদ্ধান্ত পাকা । কিন্তু এখনও পর্যন্ত তার সিদ্ধান্ত বাড়িতে বিশেষ করে বাবাকে মানাতে পারেনি । তার মা বলেছেন, বিয়ের ব্যাপারে সে যেটা সিদ্ধান্ত নেবে তাতেই তিনি মত দেবেন । তবে আরও একটা কথা জোর দিয়ে বলেছেন, বিয়ের আগে অবশ্যই আমি যেনো কোনো চাকরি জোটাই । বিয়ের আগে চাকরিটা খুব জরুরি । কিন্তু সমস্যা তৈরী হচ্ছে তার বাবাকে নিয়ে ! তিনি কিছুতেই রাজী হচ্ছেন না, বরং উল্টে আমাদের দুজনের মধুর সম্পর্ক ভাঙ্গার জন্য মরিয়া । নানানভাবে খেমটির বাবাকে অপমান করছেন । বিপদে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন । বিপজ্জনক আক্রমন করে খেমটির বাবাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করছেন । কুহক নিজেও পুরোমাত্রায় সন্দিহান, তাদের সম্পর্ক ভাঙ্গার জন্য প্রয়োজনে বাবা আরও কঠিন ষড়যন্ত্র করবেন । এহেন দুশ্চিন্তায় কুহক ভীষণ চিন্তিত । মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ।
“তুমি কিসব উলটপালট ভাবছো, আমি কী জানতে পারি ?” খেমটি কুহকের ঘাড়ে ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো । তারপর আবার খেমটি কুহককে বললো, “আমার বাবা-মা তোমার দিকে উদগ্রীবভাবে তাকিয়ে রয়েছেন তুমি কিছু একটা বলবে, অথচ তুমি উদাসীন ! গভীর ভাবনার জগতে ডুবে রয়েছো ।“
আজ আমি উঠি খেমটি ।
আরে ! বাবা-মায়ের কথায় তুমি রেগে গেলে নাকি ?
“রাগার প্রশ্নই উঠে না । তারা যথার্থ বলেছেন । তাদের বক্তব্যের যুক্তি একদম সঠিক ।“ খানিকটা বেজার মুখে রসকসহীনভাবে কুহক খেমটিকে বললো । তারপর আবার খেমটিকে বললো, এবার আমি আসছি ।
তাহলে হঠাৎ উঠছো ?
“অনেকক্ষণ ধরে তোমাদের বাড়িতে রয়েছি । এবার আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে, নতুবা মা চিন্তা করবেন ।“ চিন্তান্বিত মুখে এমনকি গম্ভীরভাবে কথাটা বলেই কুহক আর সময় নষ্ট করলো না । সোজা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো ।
খেমটিদের বাড়িতে সকলে চুপচাপ । খেমটির মা ভাবছে, “কুহক তাদের কথায় বিরক্ত হোলো কিনা ?” পুনরায় তিনি ভাবছেন, তাদের উপর শিবদাস মোড়লের আক্রমনাত্মক রুপকে স্বাভাবিক করার দায়িত্ব কুহকের । কুহক ও তার মা ছাড়া শিবদাস মোড়লকে স্বাভাবিক করা অন্য কারো সাধ্য নেই । তিনি যেভাবে বায়েনদের অবজ্ঞা করে চলেছেন, সেটা এক কথায় নিন্দনীয় । ব্রাম্মণ বংশে জন্মগ্রহণের জন্যেই তাঁর বায়েনদের উপর বেশীমাত্রায় আস্ফালন ! অথচ তার মেয়ে সমাজে আর দশটা মেয়ের মতো শিক্ষিত । খেমটির শরীর স্বাস্থ্য গর্ব করার মতো । দর্শনসই স্লীম চেহারা । আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে বড় হলে খেমটির গায়ের দুধে-আলতা রঙ ঝকমক করতো । এছাড়া তার বুদ্ধি আর দশটা মেয়ের চেয়ে অনেক বেশী উন্নত এবং আধুনিকসম্মত । গুছিয়ে সংসারের রাশ ধরাতে তার জুড়ি মেলা ভার । সংসারের ভাল মন্দের দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর । সুতরাং কুহক যদি সত্যিই খেমটিকে ভালবাসে তাহলে তাকেই দায়িত্ব নিয়ে তার বাবা-মাকে বোঝাতে হবে, “খেমটিই তার ভবিষ্যতের যোগ্য জীবনসঙ্গিনী ।“
“শুন্‌ছো ?” খেমটির বাবার ডাক ।
খেমটির মায়ের উত্তর না পেয়ে পুনরায় তিনি খেমটির মাকে শুনিয়ে জোরে জোরে বললো, “এত বেশী চিন্তা করে শরীর খারাপ করার কী দরকার । একটিবার কী এদিকে আসবে ?”
আসছি ।
আমাকে পাশের গ্রাম হরিদাসপুরে যেতে হবে ।
সেখানে আবার কেন ?
ঐখানে গোবর্ধন বাবু ডেকেছেন । তাঁদের বাড়ি শিব রাত্রিতে শিব পূজো ।
“তোমার শরীরের অবস্থা এখনও স্থিতিশীল নয় । খুক্‌ খুক্‌ কাশি অনবরত । বিকেলে বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলায় তোমার জ্বর আসছে । সাইকেল চালিয়ে হরিদাসপুরে যাওয়ার সময় ঠান্ডা হাওয়া লাগার সম্ভাবনা । তাতে তোমার শরীরের ক্ষতি । রাত্রিতে কাশিটা আবার বাড়তে পারে ।‘ খেমটির মা তার উদ্বিগ্নতার কথা শিবু বায়েনকে জানালো ।
“এছাড়া আর উপায় নেই । পরশুদিন শিব পূজা । আজই দেখা না করলে গোবর্ধন বাবু উতলা হয়ে উঠবেন । তুমি অযথা চিন্তা করো না । আমি আজ-কালের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠবো ।“
হরিদাসপুর ঘোড়াডাঙা গ্রামের বায়েন পাড়া থেকে প্রায় চার কিলোমিটার । তবে পুরোটাই কাঁচা রাস্তা । ঝড় বৃষ্টি না থাকায় এখন সাইকেল চালিয়ে যেতে অসুবিধা নেই । শিবু বায়েন ছুটলো হরিদাসপুর । তার শরীরটা দুর্বল । উপরন্ত আর্থিক দিক দিয়েও তাদের সংসারের অবস্থা খুবই হতাশাজনক । জাত পেশা তাদের ঢাক বাজানো, সেটা বন্ধ করলে বা কোথাও থেকে ডাক পেয়ে সেই ডাকে সাড়া না দিলে আখেরে শিবু বায়েনের নিজের ক্ষতি । ভবিষ্যতে বায়না থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা । আর তাছাড়া সংসারে টানাটানি, চিকিৎসার খরচ, ইত্যাদির জন্য এই মুহূর্তে টাকার ভীষণ দরকার । বাবলা নদী বরাবর হরিদাসপুর । সোজা রাস্তা । গোবর্ধন বাবু ঐ গ্রামে প্রভাবশালী ব্রাম্মণ মানুষ । এবার তিনি জাকজমকভাবে শিব পূজা করতে চান । তাঁর মানত ছিলো, ছেলের ঘরে নাতি হলে তিনি ঘটা করে শিব পূজা দেবেন । গোবর্ধন বাবুর ঘর আলো করে ফুটফুটে সুন্দর নাতির আগমনে তিনি উৎফুল্ল । তাই এলাকার খ্যাতনামা ঢাকি শিবু বায়েনকে তলব ।
রাস্তার বাদিকে কয়েকটা জমির পরে এলাকার বিখ্যাত বাবলা নদী । আর রাস্তার ডানদিকে চাষের জমির বিশাল মাঠ । মাঠে তখন গ্রীষ্মকালীন ধান চাষের ক্ষেত । রাস্তা ধরে শিবু বায়েন এগিয়ে চলেছে । যদিও রাস্তায় লোকজন কম । সাইকেলে চলাকালীন শিবু বায়েনের হঠাৎ মনে পড়লো, “শিবের স্ত্রী সতী দক্ষযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে কালীতে রুপান্তরিতা হয়েছিলেন ।“ সেই মহাকালের ঘন্টা ধ্বনিকে সুমধুর করে তোলার জন্য গান্ধর্বলোক থেকে ডাক পড়েছিলো ঢাক-ঢোল বাদকদের । তাঁরা সংহারকর্ত্রীর তালে তালে ঢোল সঙ্গতে রত হওয়ার সময় দেখতে পান শিব মহাকালীর পায়ের তলায় কখন যেনো শব হয়ে পড়ে আছেন । সেই ঢোল বাদকেরা আবার গান্ধর্বলোকে ফিরে যান । চন্ডী গ্রন্থেও নাকি উল্লেখ আছে, “অশুভ শক্তির পতন ঘটলে আনন্দ হিসাবে ঢাক-ঢোল বাজাবার রীতি রয়েছে ।“ এই ঘটনা থেকে শিবু বায়েন জানেন, “ঢাক-ঢোল একটা পুরানো বাদ্যযন্ত্র । কবি গান, পালা গান, তরজা, মহরম, ছাড়াও বিবাহ অনুষ্ঠান, ছৌ-নাচ, জন্ম-মৃত্যু, ইত্যাদি অনুষ্ঠানে ঢাক-ঢোল বাজাবার রীতি ইদানীং বহুল প্রচলিত । বংশপরস্পরায় তারা বায়েন । তার পুত্র সন্তান নেই । তাই শিবু বায়েন সন্দিহান, তাদের পারিবারিক ঢাক বাদ্যির স্থায়িত্ব নিয়ে ? যদিও খেমটি বাবার কাছ থেকে ঢাকের বাজনা সম্পর্কীয় অনেক তাল, বোল শিখেছে । শিবু বায়েন ভাবছে, খেমটি মেয়ে সন্তান । সে ঢাক বাজনা শিখছে । কিন্তু বাজনা শিখলে কী হবে ? তাকে সেই শ্বশুর বাড়ি গিয়ে সংসারের ঘানি টানতে হবে । তারপর আবার তার গভীরভাবে ভাবনা, তাদের পরিবারের ঢাক বাজানোর খ্যাতি বংশ পরম্পরা । শিবু বায়েনের দুই মেয়ে । বড় মেয়ে বাদ্যি বাজনা থেকে অনেক দূরে । ঘর সংসারে তার অত্যধিক মতিগতি । এই মুহূর্তে শিবু বায়েনের একটাই আপশোশ, তার অবর্তমানে পারিবারিক ঢাক বাজানোর হাল কে ধরবে ?
সাইকেল চালাতে চালাতে শিবু বায়েনের ভাবনার শেষ নেই । সে আবার ভাবছে, “সাধারণত শিবের গাজন আর নীল পূজায় সে অনেক ঢাক বাজিয়েছে । কিন্তু সাক্ষাৎ শিবরাত্রির শিব পূজায় কবে বাজিয়েছে শিবু বায়েনের ঠিক মনে নেই । যদিও ছোটবেলায় শিবু ঢাকি তার বাবার সঙ্গে শিবের গাজনে ঢাক বাজাতে গেছে । তখনই শিব ঠাকুরকে তুষ্ট করার ঢাকের বোল বাবার কাছ থেকে শেখা । যার জন্য শিবকে সন্তুষ্ট করার ঢাক বাজনার প্রক্রিয়া তার ভালভাবেই জানা । তবে অনেক দিনের আগের ঘটনা । তাই শিবু বায়েনের চিন্তাটা বেশী । কেননা শিব ঠাকুরকে সন্তুষ্ট করার নিরিখে সম্ভ্রান্ত ব্রাম্মণ পরিবার থেকে তার ঢাক বাজানোর ডাক পড়েছে । চড়ক পূজার প্রাক্কালে শিবের গাজনের বাজনার চেয়ে এই পূজার বাজনার তাল-রাগ-ধ্বনি সম্মপূর্ণ আলাদা । গাজনের বাজনার সাথে মিল থাকলেও শিবরাত্রির শিব পূজার বাজনা অবশ্যই অন্যরকম এবং কঠিন । বিশেষ করে সন্ধ্যাবেলার সন্ধ্যারতির নৃত্যের সময় পুরোহিত ঠাকুরের তালে তালে ঢাক বাজানো বেশ কঠিন । শিবু বায়েনের বাবার মুখে শোনা, সন্ধ্যারতির বাজনা বাজাতে হবে খুব নিষ্ঠার সঙ্গে । সেই নিষ্ঠার সঙ্গে কোনোরকম আপোস করা চলবে না । শিব ঠাকুরকে তুষ্ট করাই তখন ধ্যান ও জ্ঞান ।
এইসব ঢাকের বাদ্যির রকমফের ভাবতে ভাবতে পৌঁছে গেল হরিদাসপুরের গোবর্ধন বাবুর বাড়িতে । অনেক বড় বাড়ি । গাঁয়ের মধ্যে বর্ধিষ্ণু পরিবার । গোবর্ধন বাবুর পুত্র, পুত্রবধু, নাতি, অবিবাহিত দুই মেয়ে নিয়ে ভরা সংসার ।
কাছাড়ী বারান্দায় বসে গোবর্ধন বাবু গাঁয়ের প্রতিবেশীদের সাথে গল্পে মশগুল । তখন হুঁকো খাওয়ার তোড়জোড় চলছিলো । অনেকদিন বাদে শিবু বায়েন গেরস্তের বাড়ি গোবর্ধন বাবুর বাড়িতে হুঁকো খাওয়ার প্রচলণ লক্ষ্য করলো । গড়গড়ার কল্কেতে গোবরের ঘুটের আগুন দিয়ে পাইপের সাহায্যে হুঁকো খাওয়ার ব্যবস্থাপনা । গড়গড়া হচ্ছে এক ধরনের নলওয়ালা বড় হুঁকো । নল দিয়ে তামাকের ধোঁয়া টানবার সময় জল থেকে ওঠা গড়গড় শব্দের জন্য নাম হয়েছে গড়গড়া । প্রতিবেশী নস্কর মশায় হুঁকোতে টান দিতে গিয়ে বুঝতে পারলেন কল্কেতে তামাক শেষ । তাই পুনরায় গড়গড়ায় কল্কেতে তামাক দিয়ে গোবর্ধন বাবু হুঁকো নস্কর মশায়কে দিয়ে বললেন, “এবার টানুন ।“ তার আগে কল্কেতে তামাক দিয়ে তার উপর গোবরের ঘুটে ধরানো টুকরো দিয়ে হুঁকোতে টান দিতে গিয়ে গোবর্ধন বাবু শিবু বায়েনকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেমন আছো শিবু ?”
“ভাল আছি বাবু । হঠাৎ আপনার তলব পেয়ে ছুটে এলাম । কিন্তু আমাকে ডেকে পাঠানোর হেতু জানতে পারিনি ?” বলেই গোবর্ধন বাবুর দিকে তাকিয়ে রইলো শিবু বায়েন উত্তর শোনার জন্য ।
“হ্যাঁ ! বাড়িতে এবার শিব পূজা করছি । পুরোহিত মশায়ের বিধান, পূজোতে তুমিই ঢাক বাজাবে । তোমার ঢাক বাজানোর কদর সর্বত্র । তাই তোমাকে তলব ।“ গোবর্ধন বাবু শিবু বায়েনকে বললেন ।
যথা আজ্ঞা বাবু ।
কতো পারিশ্রমিক নেবে শিবু, এখন বললে ভাল হোতো ।
যেটা ন্যায্য সেটাই দেবেন । আমি আর কী বলবো ।
তবুও তুমি বললে আমরা প্রস্তুত থাকতাম ।
বাবু আমি আপনার বাড়ির শিব পূজায় ঢাক বাজাবো, এটা আমার পরম সৌভাগ্য । আর আমার দায়িত্ব হচ্ছে, ঢাকের বাজনায় শিব ঠাকুরকে তুষ্ট করা । সুতরাং আমি নিষ্ঠার সঙ্গে আমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করবো । পারিশ্রমিক দেওয়ার ভার আপনার উপর । আমি জানি, আপনি গ্রামের গণ্যমান্য ব্রাম্মণ মানুষ । আপনি কখনই অন্যায্য দিতে পারবেন না । সেই বিশ্বাস আপনার উপরে সর্বক্ষণ রয়েছে । তাছাড়া আপনাকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি ।
শিবু একটা কথা বলবো ?
বলুন বাবু ।
তোমার এই সুন্দর ব্যবহার আমাকে ভীষণ আত্মসন্তুষ্টিতে ভরিয়ে দেয় । যার জন্য আমার বাড়ির এমনকি গাঁয়ের পূজা পার্বনে তোমার ডাক পড়ে । আজ পর্যন্ত কোনোদিনও তুমি মুখ ফুটে পারিশ্রমিক চাইলে না । অথচ পারিশ্রমিক নেওয়ার পরে তোমার মুখটা কোনোদিন ভার দেখিনি । এটাই তোমার জীবনের বৈশিষ্ট্য । যাই হোক তোমার মেয়েরা কী করছে শিবু ।
বড়টা তো উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হোলো না । আর ছোটটা আপনাদের আশীর্বাদে এম-এ পাশ করেছে । এখন ভাবছে, লোক সংস্কৃতির উপর গবেষণা করবে ।
খুব ভাল খবর শোনালে শিবু । খেয়ে না খেয়ে মেয়ে দুটিকে মানুষ করেছো । আমাদের গাঁয়ের মানুষের আবার মেয়েদের স্কুলে পড়াতে অনীহা । গ্রামবাসীদের বক্তব্য হচ্ছে, মেয়েদের তো সেই বিয়ে দিতে হবে । পরের বাড়ি গিয়ে গতরে খাটবে । সুতরাং মেয়ে পড়িয়ে কী লাভ ? এই ভাবেই আমার মেয়ে দুটি আর স্কুলেই গেল না । গাঁয়ের মধ্যে লেখা পড়ার পরিবেশ না থাকলে মেয়েদের কী পড়ার আগ্রহ জন্মায় ? আমার মেয়েদের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই । পড়াশুনা না করে মুর্খই থেকে গেল । আর তাছাড়া গাঁয়ের মোড়ল মাতবর আবার মেয়ে পড়ানোর বিপক্ষে । কোনো গ্রামবাসী তাঁর মেয়েকে স্কুলে পাঠালে মোড়ল মাতবর গ্রামে বিচার সভা ডেকে স্কুলে পাঠানোর বাবাকে ভৎসর্না করতেও ছাড়েন না । মোড়লদের কথা শুনে আমিও বেকুব বনে মেয়েদের আর স্কুলে পাঠালাম না । সেই জন্য ভাল পাত্র খুঁজছি । ভাল পাত্র পেলে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেবো ।
তারপর গোবর্ধন বাবু আবার বললেন, “অনেক কথা হয়ে গেল । যেটা বলছিলাম শিবু ?”
হ্যাঁ বলুন বাবু ।
পূজার সময় দুইদিন ও এক রাত এখানে থাকতে হবে । শিব পূজা ঘটা করে অনুষ্ঠিত হবে । সুতরাং পুরোহিত ঠাকুরের সব কাজেই ঢাকের বাজনা লাগবে । ঢাক বাজানোর ব্যাপারে আমি কী বললাম, বুঝতে পারলে শিবু ?
মাথা নেড়ে সায় দিয়ে শিবু বায়েন বললো, “যথা আজ্ঞা বাবু ।“ তারপর বাড়ির দিকে রওনা দেবে, এমন সময় গোবর্ধন বাবুর গিন্নি চায়ের কাপ এগিয়ে ধরে বললেন, “তোমার জন্য চা বানিয়ে এনেছি । চা খেয়ে যাও ।“
গোবর্ধন বাবুর গিন্নির দিকে তাকিয়ে হেসে শিবু বায়েন বললো, “অবশ্যই গিন্নিমা । চা খেয়েই বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছি ।“
তারপর চায়ের কাপ গোবর্ধন-গিন্নি বারান্দার জলচৌকির উপর রেখে বললেন, “চায়ের কাপটা এখান থেকে নিয়ে যাও শিবু ভাই ।“
শিবু বায়েন বুঝতে পারলো, জাত পাতের ছুতমার্গ সমানভাবে এখানে বিদ্যমান । নতুবা গিন্নিমা নিজেই চায়ের কাপ তার হাতে তুলে দিতে পারতেন । সেটা না করে, বারান্দায় জলচৌকির উপর চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে তাকে চায়ের কাপটা হাতে নিতে ডাকলেন । শিবু বায়েনের সেই মুহূর্তে তার ছোট মেয়ে খেমটির কথা মনে পড়লো । এইরকম অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখলেই খেমটি রাগে জ্বলে উঠে । প্রয়োজনে সামনাসামনি অপ্রিয় কথা বলে দিতেও কুন্ঠাবোধ করে না । যার জন্য ছোট মেয়েটাকে অহরহ বেদনাদায়ক কথা শুনতে হয়, “ছোট জাতের মেয়ে, ইত্যাদি ।“ এসব কথা ভেবে শিবু বায়েনের মুখে এক চিলতে ব্যঙ্গপূর্ণ হাসির উদ্ভাস । তাছাড়া শিবু বায়েন এটাও জানে, এই সামাজিক অসামঞ্জস্যের ক্রিয়াকলাপ সহজে বন্ধ হওয়ার নয় । তার মতে, এইজন্য জনমত তৈরি হওয়া ভীষণ জরুরি । খেমটি আধুনিক মনস্ক শিক্ষিত মেয়ে । রুচিসম্মত তার ব্যবহারিক আচরণ । বুকে তার প্রচন্ড সাহস । বাস্তবিকভাবে চিন্তাভাবনা করলে খেমটির ভয়ডর কম । যার জন্য বৈষম্যমূলক সামাজিক আচরণ, জাতপাতের ধুমধড়াক্কা সহজে মেনে নিতে পারে না । ফলে তার চলমান জীবনে প্রায়শই অশান্তি । সেই অশান্তির রেশ বাড়ি পর্যন্ত গড়ায় । কিন্তু শিবু বায়েন জানে, তার ছোট মেয়ে ন্যায্য কথার মানুষ এবং সততার ধারক ও বাহক ।
অগত্যা, গোবর্ধন গিন্নির সাথে অনর্থক কথা না বাড়িয়ে শিবু বায়েন চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিলো । তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে শিবু বায়েন তার চলমান দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে ভাবতে শুরু করলো !
ছোট মেয়েকে নিয়ে শিবু বায়েনকে মাঝে মধ্যে বিষম ঝামেলায় পড়তে হয় । নীচু জাত নিয়ে খেমটিকে কেউ কিছু বললে তাৎক্ষণিক উত্তম মধ্যম তাঁকে অনেক কথ শুনিয়ে দেয় । কাউকে সে ছেড়ে কথা বলে না । তাকে বুঝিয়েও বোঝানো যায় না, তুই একা সমাজটাকে বদলাতে পারবি না । সুতরাং অযথা ঝামেলায় যাবি না । এসব শুনে খেমটির উত্তর, “তার জন্য অন্যায়টাকে আমি হজম করে নেবো । বায়েনের জাত বলে আমাদের কোনো সামাজিক সম্মানবোধ থাকবে না । এটা আমার পক্ষে মানা সম্ভব না । দেশের অন্যান্য মানুষ যে মর্যাদায় বাস করে সেই মর্যাদায় তাদেরও বাস করার মৌলিক অধিকার । এটা নাকি তার মুখের কথা নয়, ভারতীয় সংবিধান স্বীকৃত ।
এই প্রসঙ্গে শিবু বায়েনের হঠাৎ মনে পড়লো, মাস ছয়েক আগে ঘোড়াডাঙ্গা গাঁয়ের গণপতি গাঙ্গুলি নালিশ জানিয়েছিলেন তার ছোট মেয়ের নাকি আস্পর্ধা দিন দিনকে বেড়ে যাচ্ছে । বয়স্কদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা পর্যন্ত শেখেনি । সাথে সাথে এটাও তিনি বললেন, “শিখবে কেমন করে, বায়েন পাড়ার ছোটজাতের মেয়ে ! কে তাকে শেখাবে ? সবাই তো মুর্খ । ঢাক পেটানো যাদের কাজ তারা ভদ্রতা শিখবে কোথা থেকে ? যতোসব চামারের দল !”
পুনরায় শিবু বায়েনের দিকে তাকিয়ে গণপতি গাঙ্গুলি বলেছিলেন, “তোমার ছোট মেয়ের অনেক বয়স হোলো । এবার তাকে বিয়ে দিয়ে বিদায় করো । নতুবা শেষে পস্তাতে হবে । একেই ধাড়ি মেয়ে তার উপর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ !”
শিবু বায়েন মেয়ের অপরাধ জানতে চাইলে গণপতি গাঙ্গুলি ক্রোধে ফেটে পড়লেন । কর্কশ স্বরে অশালীন ভাষায় তখন বলেছিলেন, “শনি মন্দিরে তিনি পূজোয় বসেছিলেন । অনেক লোকজন । পূজার অঞ্জলির সময় সকলেই ধ্যানমগ্ন । অতোগুলি মানুষের মধ্যে ঢুকে শনি মন্দিরে ঠাকুরের সামনে তোমার মেয়ে মোমবাতি জ্বালালো । বলিহারি তার সাহস ! নীচু জাতের মেয়ে পূজোর মধ্যে ঢুকে শনিবারের শনি পূজোটাই পন্ড করে দিলো । সেটা বলতে গিয়েই তোমার ছোট মেয়ের চোটপাট্‌ । সে চিল্লিয়ে বললো, “শনি মন্দিরে ঢুকে সবার সঙ্গে পূজো দেওয়ার তারও সমান অধিকার ।“ ভবিষ্যতে বাধা দিলে তোমার মেয়ে আমাদের পুলিশের ভয় পর্যন্ত দেখিয়েছে । তবে আমরাও স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, “তুমি মেয়েটাকে সাবধান না করলে গাঁয়ের ছেলেপুলের হাতে তোমার মেয়ের সম্ভ্রমের বিনাশ ঘটতে বাধ্য ।“ পরে জানা গেছে, গণপতির জন্য পুনরায় নতুন করে ঐ সন্ধ্যায় শনি পূজা সংঘটিত হয়েছিলো । সুতরাং গাঁয়ে গঞ্জে জাতপাত প্রথা আজও প্রকট ।
কয়েকদিন পর গণপতি গাঙ্গুলি হঠাৎ শিবু বায়েনের বাড়ি নিজের দরকারে উপস্থিত । গণপতি গাঙ্গুলিকে দেখতে পেয়েই খেমটি সোজা তাঁর সম্মুখে এসে বললো, “বেরিয়ে যান । আমার বাড়ি থেকে এক্ষুণি বের হন । আর শুনুন, গাঁয়ের ছেলেপুলেদের বলবেন আমার সঙ্গে অশালীন ব্যবহার করার আগে তারা যেনো দশবার ভাবে । তারা নিজেরা বরং আগে নিজেদের কথা ভাবে । নতুবা আমার শক্ত হাতে গণ ধুলাই খেতে বাধ্য ।“
“দেখছো শিবু, তোমার ছোট মেয়ের আস্পর্ধা । ঔদ্ধত্যের একটা সীমা থাকা দরকার ! আমাকে কিনা তাড়িয়ে দিচ্ছে । এর ফল কিন্তু একেবারেই ভাল হবে না ।“ গণপতি গাঙ্গুলির তখনও হুঙ্কার ।
“আপনি কী লেজ গুটিয়ে পালাবেন । নতুবা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবো । আপনার দৌড় আমার জানা আছে । ‘কুত্তার মতো ঘেউ ঘেউ করা, তারপর লেজ গুটিয়ে পালানো’ আপনাদের স্বভাব । সব জায়গায় মাতব্বরি । শনি ঠাকুর কী আপনার কেনা, যার জন্য আমরা পূজো দিলে সেই পূজো শনি ঠাকুর গ্রহণ করবেন না । কোন্‌ শাস্ত্রে লেখা রয়েছে, বায়েন সম্প্রদায়ের পূজো শনি ঠাকুর গ্রহণ করবেন না । তাই বলছি, এখনি বেরিয়ে যান । আমি রেগে গেলে, সেদিনকার পূজা মন্ডপের অপমান সুদে আসলে আদায় করে নিয়ে তারপর আপনাকে ছাড়বো । জানেন তো, একটা ফোন করলে থানার বড় বাবু থানার ফোর্স নিয়ে হাজির হবেন । তখন কিন্তু দৌড়িয়েও কূল পাবেন না ।“
তারপর গণপতি গাঙ্গুলি সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচে । এসব কথা মনে পড়লে শিবু বায়েন একান্তে ভাবে, “বায়েন পাড়ায় এরকম সাহসী দশটা যুবক ছেলে থাকলে বায়েন পাড়ার মানুষেরা সমাজে যথেষ্ট কদর পেতো । বুক ফুলিয়ে সমাজের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপে অংশ নিতে পারতো । জাত পাতের ঘেরাটোপে বন্দী থাকতে হতো না ।“
এতক্ষণ গোবর্ধন বাবুর বারান্দায় দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চা খেতে খেতে এতসব অতীত কাহিনী ভাবছিলো শিবু বায়েন ।
গিন্নিমা শিবু বায়েনকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করলেন, “বাছা ! তোমার চায়ে কী চিনি কম ছিলো ?”
চিনিই দেন নি গিন্নিমা । চিনি ছাড়াই চা খাচ্ছি ।
কী ভুলোমন আমার । চায়ের কাপটা নীচে জলচৌকিতে রাখুন । আমি পুনরায় আর এক কাপ চা বানিয়ে আনছি । একটু বসো বাছাধন ।
গোবর্ধন বাবুর সঙ্গে গড়গড়া টানার দলের মজলিশ থেকে আর এক প্রতিবেশী ভদ্রলোক হঠাৎ বলে উঠলেন, “বৌদি চা বানানোর কী দরকার । ঐ কাপেই চিনি মিশিয়ে দিন । তাহলেই শিবু বায়েন চিনি দেওয়া চা খেতে পারবে । আমাদের বুড়োদের চিনি ছাড়া চা খাওয়াতে খাওয়াতে আপনার অভ্যাসটা “চিনি ছাড়া চা তৈরীর প্রতি” সতত বর্তমান । সুতরাং চিনি ছাড়া চা তৈরি করেছেন, এইজন্য অস্বস্তি হওয়ার কোনো কারণ নেই ।“
“না ভোলাদা, আমি বরং আর এক কাপ চা বানিয়ে এনে দিচ্ছি । এতে আমার কোনো কষ্ট হবে না ।“ গোবর্ধন গিন্নি চা বানাতে বাড়ির ভিতরে ঢুকলেন ।
কিন্তু ভোলাদার খটকা কাটছে না । ইতিমধ্যে হুঁকোয় টান দিয়ে দু-দুবার মাথা চুলকানো হয়ে গেছে । অন্যদিকে গোবর্ধন বাবু লক্ষ্য করছেন, তাঁদের নিত্য দিনের সাথী ভোলা বাবু কিছু বলার জন্য উশখুশ করছেন ।
“আচ্ছা গোবর্ধন !” ভোলাবাবু ও গোবর্ধন বাবু দুজনেই বয়সে সমসাময়িক । কিন্তু ভোলা বাবু কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন রায়পুরের বাসিন্দা ছিলেন । ভাল চাকরি করতেন । রায়পুর থেকে ফিরে আসার পর, গাঁয়ের সমসাময়িক হওয়ার সুবাদে দুজন দুজনের অভিন্ন বন্ধু । একসঙ্গে ওঠাবসা ।
“কিছু বলবে ভোলা ?” জিজ্ঞাসা করলেন গোবর্ধন বাবু ।
হ্যাঁ । বলছি কী, বৌদি চিনি কেন ঐ কাপে ঢেলে দিলেন না বলতে পারবি ?
“ছেড়ে দে ঐসব । অন্য প্রসঙ্গে আয় । চায়ের ডিপার্টমেন্ট গিন্নির দখলে । তাই আমি নাক গলাই না ।“
“না ভাই, ডাল মে কুছ কালা হ্যায় ?” ভোলা বাবু দুদে সরকারি আধিকারিক ছিলেন । অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট । তাই তিনি কৌতুহলি ভঙ্গিতে কথাটা বললেন ।
“বুঝলে না ভাইয়া । শিবু বায়েন রবি দাসের ভক্ত । জাতিতে মুচি । ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার রয়েছে ।“ ভোলা বাবুকে উদ্দেশ্য করে তাঁদের মজলিশের অন্য আর একজন প্রতিবেশী বললেন ।
“মুচি, তাতে কী ? আমি তো শূদ্র । খাচাঞ্চি আবার সদ্গোপ । তেঘড়ি একমাত্র চাষা মন্ডল । আর তিনজন ব্রাম্মণ । অথচ গড়গড়ার হুঁকোর পাইপে আমরা এখানে উপস্থিত ছয় বন্ধু মুখ লাগিয়ে তামাক টানি । মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়ছি । এতে কী আমাদের জাত গেছে । আমি শূদ্র, সেইজন্য কী তোমাদের জাত গেছে । এইসব অবান্তর কথাবার্তা না বলাটাই বাঞ্ছনীয় । এখন আধুনিক যুগ । ডিজিটাল যুগ । এখনকার মানুষ চাঁদে যাচ্ছে । কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সারা পৃথিবীর খবর হাতের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে । সেখানে দাঁড়িয়ে জাত-পাত, ছোঁয়াছুঁয়ি, এইসব কেন, আমার মাথায় ঢুকছে না ।
উপস্থিত সকলেই তখন চুপচাপ ।
শিবু বায়েন কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ।
ইতিমধ্যে গিন্নিমা পুনরায় চা বানিয়ে জল চৌকির উপর রেখে শিবু বায়েনকে ডেকে বললেন, “বাছাধন ! তোমার চা নিয়ে যাও ।“
ভোলা বাবু প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উঠে জলচৌকি থেকে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে শিবু বায়েনের দিকে এগিয়ে হাসিমুখে বললেন, “এবার চিনি দেওয়া চা খান ।“
“এটা কী করলে ভোলাদা ?” গোবর্ধন গিন্নি ভোলা বাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন ।
কোনটা ?
চায়ের কাপ কেন তাকে তুলে দিলেন ?
এটাই তো ভদ্রতা । অতিথি আপ্যয়নের নমুনা । শিবু বায়েন যে কারণেই আপনার বাড়িতে আসুক না কেন, তাকে আপনি চা খাওয়ার সম্মোধন জানিয়েছেন । সুতরাং অতিথি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন । সেইক্ষেত্রে চায়ের কাপ সোজাসুজি তার হাতে তুলে দেওয়াটাই গেরস্ত বাড়ির মানুষ হিসেবে শোভনীয় ।
গিন্নিমা বেজার মুখে ঘরের ভিতর ঢুকে গেলেন । চা খেয়ে শিবু বায়েন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলো । আর অন্যদিকে গোবর্ধন বাবুর দাওয়ায় বসে হুঁকো খাওয়ার মজলিশ ভাঙ্গলো ।
রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় পোড় খাওয়া ভোলা বাবু ভাবছেন, পরদিন থেকে গোবর্ধন বাবুর বাড়ির লোকজন নির্ঘাত তাঁকে অন্য চোখে দেখবেন । ভোলা বাবু এসব ভেবে একটু হাসলেন । তারপর নিজেকে হাল্কা করার জন্য নিজেই আওয়াজ তুললেন, “ধ্যৎ ! অবান্তর চিন্তা !”
তারপর শিবু বায়েন ধীরে ধীরে সাইকেল চালিয়ে বাড়ির পথে ফিরছে । ঘোড়াডাঙ্গা পৌঁছাতে তখনও প্রায় এককিলোমিটার রাস্তা বাকী । রাস্তার দুধারে খেজুর গাছ । খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহরের পালা প্রায় শেষ । খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে খেজুরের গুড় তৈরী গ্রামবাংলায় কিছু মানুষের জীবিকা । শিউলিরা খেজুর গাছে হাড়ি লাগিয়ে রস সংগ্রহ করেন । রস জাল দিয়ে দুই ধরনের গুড় তৈরী হয় – পাটালি গুড় ও ঝোলা গুড় । পাটালি গুড় আবার এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে । খেজুরের গুড়ে পৌষ মাসে পিঠে পুলি খাওয়ার ধুম পড়ে গ্রাম বাংলায় । শীত প্রায় শেষ । দুদিন আগে বৃষ্টি হওয়ার জন্য হাল্কা শীতের আমেজ । তবে পড়ন্ত বেলায় বসন্তকালের ফুরফুরে হাওয়ার ধামাকা । সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের মধ্যে দিয়ে শিবু বায়েন বাড়ি ফিরছে ।
রাস্তার উপরে হঠাৎ সামনে গণপতি গাঙ্গুলি । তিনি রাস্তার মাঝখানে ঠিক শিবু বায়েনের সাইকেলের সম্মুখে ।
“এই যে শিবু কোথায় যাওয়া হয়েছিলো ?”
আজ্ঞে, হরিদাসপুর ।
“তা হঠাৎ হরিদাসপুরে কেন গো ? সেখানেও তোমার ছোট মেয়ে ঝামেলা পাকিয়ে এসেছে নাকি ?” বাঁকা চোখে গণপতি গাঙ্গুলি জিজ্ঞাসা করলো ।
“আপনার মতলবটা কী, একটু খোলসা করে বলবেন ?” শিবু বায়েন কিছুটা রাগের সুরে জিজ্ঞাসা করলো ।
“অতো চটছো কেন ভাইয়া ? শুনলাম, তোমার মেয়েকে একহাত নিয়েছে গাঁয়ের মোড়ল ।“
কার কথা বলছেন ?
“গাঁয়ের মোড়ল মানেই তো আমরা জানি, শিবদাস মোড়ল । তাঁর ছেলের সাথে তোমার মেয়ে ফস্টিনস্টি বাধাতে গিয়েছিলো, যার জন্য শিবদাস মোড়ল তোমার ডানপিটে মেয়েটার মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে ।“ বলেই গণপতি গাঙ্গুলি উত্তর শোনার জন্য শিবু বায়েনের দিকে তাকিয়ে রইলো ।
মুখ সামলিয়ে কথা বলুন গণপতি বাবু । নতুবা…!
নতুবা কী করবেন ?
নতুবা আপনার সম্মান আমি রক্ষা করতে পারবো না ।
গাঁয়ের মানুষের মধ্যে ঢি-ঢি পড়ে গেছে । কুহকের সাথে খেমটির ফষ্টিনষ্টিতে গাঁয়ের মানুষেরা ছি-ছি করছেন । তোমার ছোট মেয়ে কুহকের সাথে ঢলাঢলি করতে পারবে, আর আমরা সেটা বললেই দোষ !
তারপর বিড় বিড় করতে করতে দ্রুতগতিতে স্থান ত্যাগ করলেন ।
শিবু বায়েন গণপতি গাঙ্গুলির কথায় প্রচন্ড রেগে গেছে । রীতিমতো হাঁপাচ্ছে । গণপতি গাঙ্গুলি সেই সময় না পালালে শিবু বায়েন নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতো না । একটা কিছু অঘটন ঘটে যেতো । ছোট মেয়ে কোনো দোষ করলো না, অথচ তাকে বদনাম ! উপযাজক হয়ে তাকে ফাঁকা পেয়ে মেয়ের নামে যা-নয়-তাই বলা ! শিবু বয়েনের ধৈর্য তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিলো । এখনও সে উত্তেজনায় কাঁপছে । রাস্তা-ঘাটে প্রতি পদে জাত-পাত নিয়ে যদি তাদের হেনস্থা হোতে হয়, অমানসিক জ্বালা যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় তাহলে জীবনে বাঁচার স্পৃহা স্বাভাবিকভাবে কমে যেতে বাধ্য । জাতিতে মুচি, এটাই তাদের অপরাধ । সততা নিয়ে জীবন যাপনের কোনো মূল্য নেই ! মেয়েটা এত শিক্ষিত, অথচ গণপতি গাঙ্গুলির মতো মানুষের কাছে সেটা তুচ্ছ । তাঁদের কাছে মুখ্য, মুচি জাতি । শিবু বায়েনের মনে হচ্ছে, সমাজের মানুষ ভাবেন “মুচি জাতির আবার শিক্ষা কী” ! তাই গ্রাম বাংলার সমাজে তাদের অবস্থান নিয়ে যতো ভাবে, ততোই শিবু বায়েন মনোকষ্টে ভোগে ।
মেয়ের নামে অপ্রীতিকর কথা শোনার পর উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপছে । কাশিটা ক্রমশ বাড়ছে । একেই শরীর ভাল নেই, তার উপর গণপতি গাঙ্গুলির অহেতুক উত্তেজক কথাবার্তা । মানসিকভাবে নাজেহাল শিবু বায়েন । ধীরে চালাচ্ছে সাইকেল ।
বাড়ি ফিরে হাত-মুখ না ধুয়েই শিবু বায়েন কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়লো । শোওয়ার সাথে সাথেই তার তুমুল জ্বর । খেমটি ঔষধের বাক্স থেকে পাইরাজেসিক ট্যাবলেট খাইয়ে দিলো, যাতে রাত্রিতে বাবাকে জ্বরে কাহিল করতে না পারে । রাত্রিবেলায় খেমটির মা হাল্কা করে খিচুড়ি রান্না করলো । তাই খেয়ে শিবু বায়েন ঘুমিয়ে পড়লো ।
পরেরদিন বাবার শারীরিক দুর্বল অবস্থা দেখে খেমটি খুব চিন্তিত । বাবা হরিদাসপুর থেকে শিব পূজায় ঢাক বাজানোর জন্য বায়না নিয়ে এসেছে । সেখানকার গেরস্ত বাড়ির মানুষেরা শিবু বায়েনের মুখ দেখেই বায়না দিয়েছেন । অথচ বাবা শিব পূজায় উপস্থিত হোতে না পারলে মান-সম্মানের প্রশ্ন ? বায়না নিলে ঢাক বাজাতে যেতেই হবেই । এটাই এখানকার প্রচলিত প্রথা এবং শিবু বায়েন সেটা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে । আশে পাশের গাঁয়ের লোকজন পূজা-অর্চনায় শিবু ঢাকিকেই খোঁজেন । সেই নামডাক কিছুতেই নষ্ট করা যাবে না । বাবার জ্বর ছাড়া হার্টের অবস্থাও খুব খারাপ । ডাক্তার বাবু খেমটির বাবাকে খুব সাবধান মতো থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন । হার্টে নাকি বেশ কিছুটা ব্লক বর্তমান । তবে চিকিৎসাতেই নিরাময় সম্ভব । সেই ক্ষেত্রে ডাক্তার বাবুর নির্দেশ মানাটা খুব জরুরি । এমনকি ঢাক না বাজানোতেও নিষেধাজ্ঞা । ডাক্তারের মতে, ঢাক না বাজালে খেমটির বাবার শারীরিক স্থিতি আরও মজবুত হবে ।
বাবার কাশিটা বড্ড বেড়েছে । মাঝে মাঝেই বুকে ব্যাথা অনুভব করছে শিবু বায়েন । তেমনি তার জ্বর । কমবার নাম করছে না । বাবার শারীরিক স্থিতি লক্ষ্য করে খেমটি মাকে জানালো, “শিব পূজায় বাবাকে যেতে দেওয়া যাবে না । সেখানে ঢাক বাজাতে গেলে বড় বিপদ অনিবার্য । সুতরাং খেমটি নিজে যাবে হরিদাসপুরের শিব পূজায় ঢাক বাজাতে । বাবার দেওয়া কথা রাখতে ।“
শিবু বায়েন ছোট মেয়ের উদ্বিগ্নতা লক্ষ্য করে বললো, “অযথা টেনশন নেবে না মা । আমি ভাল হয়ে উঠবো । তুই গেলে বরং অশান্তি বাড়বে । ঐ গাঁয়ের মানুষ আরও প্রাচীনপন্থি । আধুনিক সভ্যতার আলো থেকে অনেক দূরে । গ্রামবাসীরা মহিলা ঢাকিকে শিবের পূজায় কিছুতেই ঢাক বাজাতে অনুমতি দেবেন না । তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা । আমি না গেলে ভবিষ্যতে আর কোনো গ্রাম থেকে ঢাক বাজনার অর্ডার পাবো না । তাই চিন্তা করিস্‌ না মা, আমি ঠিক ভাল হয়ে উঠবো ।“
অগ্রিম কথা অনুসারে শিবু বায়েন শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই ঢাক কাঁধে তুলে নিলো । তারপর হাঁটা শুরু করলো হরিদাসপুরের উদ্দেশ্যে । জমির আইল ধরে কোনাকুনি হরিদাসপুরের গোবর্ধন মশায়ের বাড়ি ঠিক সময়ে পৌঁছে গেল শিবু বায়েন ।
শিবরাত্রির উপোস বড্ড কঠিন । নির্জলা উপোস । তারপর ভোর রাত্রে শিবের মাথায় জল ঢালা । তবে শিব চতুর্দশীর রাতে শিব ও পার্বতীর পূজো । রাত্রিবেলায় চার প্রহরে চার বার পূজো । শিবরাত্রি হচ্ছে হিন্দুদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। এই মহাশিবরাত্রি ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয় । মহাশিবরাত্রি হল হিন্দুধর্মের সর্বোচ্চ আরাধ্য দেবাদিদেব মহাদেব ‘শিবের মহা রাত্রি’। অন্ধকার আর অজ্ঞতা দূর করার জন্য এই ব্রত পালিত হয়। অগণিত ভক্ত এইদিন শিবলিঙ্গে গঙ্গাজল, দুধ, বেলপাতা, ফুল দিয়ে পূজা করে থাকে। অনেক জায়গায় সন্ধ্যাবেলায় জল ঢালার প্রচলণ রয়েছে । কিন্তু ভোর রাত্রিতে জল ঢালাটাই জনপ্রিয় । ফাল্গুনের এই শিব চতুর্দশীর তিথি মানুষের কাছে ভীষণ পবিত্র । গোবর্ধন মশায় গাঁয়ের গেরস্ত মানুষ । আবার শিবের উপাসকও বটে । তাই তিনি এই পবিত্র দিনটিতে শিব পূজা করে ধন্য হতে চান ।
গোবর্ধন মশায় গাঁয়ের গণ্যমান্য ব্রাম্মণ মানুষ । পূজাচারে তাঁর প্রচন্ড নিয়মনিষ্ঠা । তাই সন্ধ্যার সময় পুরোহিত ঠাকুর মশায়কে ডেকে ঠিক সময়ে পূজোয় বসতে ও ঠিকঠাক পুজো করতে বললেন । তিনি নিজেও উপোস । অন্যদিকে পুরোহিত মশায় পূজোর সময় শিবু বায়েনকে ডেকে পূজোর সময় ঠিকঠাক ঢাক বাজাতে বললেন । সাথে সাথে শিবু বায়েন “যথা আজ্ঞা” বলে পুরোহিত ঠাকুরের কথায় মাথা নাড়লো ।
শিবু বায়েনের শরীরে জ্বর নেই । তবে কাশিটা কিছুতেই কমছে না । খেমটির মা আদা চাক চাক করে কেটে শিবু বায়েনের পকেটে দিয়ে বলে দিয়েছে, একটু পরে পরে আদা খেতে । তাতে কাশিটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে । বুকটার ধড়ফড়ানি কমছে না । অথচ বায়না নিয়েছে, পূজোতে তাকে ঢাক বাজাতেই হবে । সে ভেবেছিলো, তার শরীরটা ইতিমধ্যে ভাল হয়ে যাবে । কিন্তু ভাল হওয়ার লক্ষণ কম, বরং খারাপের দিকে । শিবের পূজোটাই রাত জাগার । রাত জাগাটায় শিবু বায়েনের কাছে শরীরের পরিস্থিতির নিরিখে ঝক্কি ঝামেলার । তবুও শিবু বায়েনের মানসিক স্থিতি শক্ত । সে নিজেও চিন্তা করছে, পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা তারও কর্তব্য ।
ভোর চারটে । পূজা মন্ডপের পাশে অস্থায়ীভাবে একটা শিব লিঙ্গের ব্যবস্থা করা হয়েছে যেখানে গাঁয়ের মহিলারা এবছর ঐখানে জল ঢালবে এবং শিব পূজা করবে ।
পূজা ঠিকঠাকভাবে এগোচ্ছে । শেষ প্রহরের পূজা শেষ হওয়ার পথে । অন্যদিকে শিব লিঙ্গের উপর জল ঢালা সমানে চলছে । সূর্য ওঠার সাথে সাথে শিব লিঙ্গে মহিলাদের জল ঢালার লম্বা লাইন । ঢাক সমানে বাজছে ।
সকাল বেলায় রক্তিম আভা নিয়ে সূর্য কেবল আকাশে উঠেছে, শিবু বায়েন ঢাক বাজাতে বাজাতে হঠাৎ মাটিতে ধপাত করে পড়ে গেল । বুকে ভীষণ যন্ত্রণা । তার হাত-পা কাঁপছে । বাজনা বন্ধ হওয়ায় পুরোহিত ঠাকুর পেছন ফিরে দেখেন শিবু বায়েন মাটির উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে । গোবর্ধন বাবু ছুটে এলেন । শিবু বায়েনকে দেখে তাঁর ভাল ঠেকছে না । খবর দিলো খেমটিকে । গাঁয়ের হাতুড়ে অভয় ডাক্তারকে ডেকে আনা হোলো । অভয় ডাক্তার শিবু বায়েনকে দেখে ঔষুধ দিলেন । তবে বিশ্রামে থাকতে বললেন ।
খবর পাওয়া মাত্র খেমটি সাইকেল নিয়ে ছুটতে ছুটতে সোজা হরিদাসপুর । খেমটি বাবার অসুখের কথা শুনে পাগলের মতো সাইকেল নিয়ে ছুটছিলো । পৌঁছে দেখে বাবাকে একটা ঘরে শুইয়ে রাখা । ঔষুধ খাওয়ার পর সে অনেকটাই সুস্থ । তবে খেমটি বুঝতে পারছে, বাবাকে সত্বর হাসপাতালে নেওয়া দরকার । বড় ডাক্তার দেখালে চিকিৎসা বরং ভাল হবে । যেটুকু বোঝা গেল, কাশিটার জন্য বাবার শারীরিক অবনতি !
“বাবা, তুমি বিশ্রাম নাও । আমি এসে গেছি । ঢাকের বাজনার ব্যাপারে তোমাকে কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না । আমি ঐদিকটায় সামলাচ্ছি ।“ খেমটি তার বাবাকে আস্বস্থ করলো ।
ঢাকের বাজনা শুরু করলো খেমটি । ঢাকের বাজনা শুনে শিবু বায়েন ঘরে শুয়ে থাকতে পারলো না । খুক খুক কাশি নিয়েই মেয়ের ঢাক বাজানো দেখতে বেরিয়ে এলো । এতদিন শিবু বায়েন মেয়েকে ঢাক বাজানো শিখিয়েছে, আজ সেটা গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করছে । দুচোখ ভরে মেয়ের ঢাকের বাদ্যি শুনছে । অভূতপূর্ব তার তাল জ্ঞান । বেত্রদন্ডের অর্থাৎ কাঠি দিয়ে ঢাক বাজানোর কায়দা কানুন সম্পূর্ণ আলাদা । তার মেয়ে শিক্ষিত । শিক্ষিতদের পক্ষেই সম্ভব ধৈর্য সহকারে এবং পূজোর নির্ঘন্ট অনুসারে ঢাক বাজানো ।
শিবু বায়েন তার বাবার কাছ থেকে যতোটুকু ঢাক বাজানোর শিক্ষা পুরোটাই সে তার ছোট মেয়েকে উজার করে দিয়েছে । মেয়েটা আগে যে তাল, বোল তুলতো সেগুলি যেমন তিনতাল – ১৬ মাত্রা, চৌতাল – ১২ মাত্রা, একতাল – ১২ মাত্রা, দাদরা – ৬ মাত্রা, ঠুংরী – ৮ মাত্রা, ইত্যাদি ।
আজ যে বোলগুলো সুন্দরভাবে উপস্থাপনা করছে, সেটাও তার কাছে শেখা > যেমন ঃ –
(১) হরে হরে দুর্গা (১) ব্যোম ব্যোম ভোলানাথ
(২) হরে হরে দুর্গা (২) অগ্রদ্বীপের গোপীনাথ
উপস্থিত মহিলা – পুরুষ, বসন্তের সকালে খেমটির মিষ্টি মধুর ঢাক বাজনা মনোযোগ দিয়ে উপভোগ করছেন । এখানকার মানুষ মহিলার কাঁধে ঢাক দেখে অতীষ্ঠ হননি, বরং খেমটিকে ঢাক বাজাতে উৎসাহ দিচ্ছেন । মানুষের উৎসাহে খেমটি আরও যত্ন সহকারে ঢাক বাজাতে অনুপ্রাণিত ।
পুরোহিত ঠাকুর খেমটির ঢাক বাজানো অবলোকন করে খুব খুশী । তিনি পূজা শেষে বলছিলেন, “অনেকদিন বাদে সুন্দর অনুভূতিমাখানো ঢাক বাজনার সাথে শিব পূজা সমাপন করলাম । মেয়েটার বয়স অল্প হলে কী হবে, ঢাক বাজানোতে ভীষণ পারদর্শী ।“ শিবু বায়েনের দিকে তাকিয়ে পুরোহিত ঠাকুর বললেন, “আমি ঢাকের বাদ্যের শিল্পী হিসাবে মর্যাদা পাক্‌ ।“
চুক্তি অনুযায়ী দুইদিন ও একরাত ঢাক বাজিয়ে বিদায় নিলো শিবু বায়েন ও তার ছোট মেয়ে খেমটি ।
অন্যদিকে কুহক সহসা হরিদাসপুরে এসে হাজির । সে নাকি খেমটিদের নিতে এসেছে । কিন্তু খেমটি জানে তার আগমনের আসল উদ্দেশ্য, “মেয়ে বাদ্যিকার” অজুহাতে গন্ডগোল বাধলে সেই গন্ডগোলের মোকাবিলা করা । সায়নদের বাড়িতে যে ধরনের উৎপাত হয়েছিলো, তার সাক্ষী কুহক নিজে স্বয়ং । তাই ঝুঁকি না নিয়ে, তড়িঘড়ি হরিদাসপুরে কুহকের আগমন ।
তিনজনে একসঙ্গে রাস্তা ধরে এগোচ্ছে । খেমটির কাছ থেকে ঢাকটা কুহক নিজের কাঁধে নিয়ে প্রায় গ্রামে ঢোকার সম্মুখে পৌঁছে গেছে, তখন হঠাৎ সোনা মাসির সঙ্গে দেখা । সোনা মাসি গাঁয়ে শাক সবজি বিক্রি করে । ঝুড়িতে শাক সবজি সাজিয়ে মাথায় নিয়ে এ-গাঁয়ে সে-গাঁয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করা সোনা মাসির দৈনন্দিন কাজ । ঘোড়াডাঙ্গার মানুষ তাঁকে সোনা মাসি সম্মোধনে ডাকে । সোনা মাসি কুহকের কাঁধে ঢাক দেখতে পেয়ে হাসিচ্ছ্বলে মজা করে বললো, “এখন বামুনরাও কী পূজা অর্চনায় ঢাক বাজাচ্ছে ?”
কুহকও তেমনি উত্তর দিয়ে বললো, “বামুনেরা যদি ঢাক বাজায় তাতে ক্ষতি কী ? আরও বললো,”গাঁয়ে গঞ্জে এমনকি শহরে গানের আসরে আচ্ছা আচ্ছা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষেরা গানের তালে তালে ঢুলি বাজাচ্ছে । টিভিতে আমরা অহরহ দেখছি । তাঁরা নেচে নেচে গানের সাথে ঢোল বাজাচ্ছেন । সুতরাং আমি ঢাক বাজালে ক্ষতি কী ? মহাভারত কী অসুদ্ধ হয়ে যাবে ?”
ঢাক-ঢোল ভাটিয়ালি গানের সঙ্গে বাজাতে শুনেছি ।
ঠিক শুনেছো । তবে আজকাল ভাটিয়ালি ছাড়াও অন্যান্য গানের ক্ষেত্রেও ঢোল বাজানোর প্রচলণ অলিখিত সংস্কৃতি ।
সোনা মাসি আর কথা না বাড়িয়ে বললো, “এখনকার আধুনিক যুগে আরও কতো কী শুনবো ! কদিন পরে হয়তো শুনবো, বিয়ে বাড়িতে ব্যান্ড পার্টির জায়গায় ঢাকের বাদ্যির পার্টি ।“
“সেটা শীঘ্রই শুনবে । গাঁয়ে গঞ্জে চালু হতে সময়ের অপেক্ষা । শহরাঞ্চলে ইদানীং কিছু কিছু জায়গায় শোনা যাচ্ছে, ঢাকিদের দল বিভিন্ন মিটিং-মিছিলে, বিয়ে বাড়িতে বর বা কনে আনা-নেওয়ার সময় ঢাক বাজাচ্ছে ।“ কুহক বললো ।
সোনা মাসি গাঁয়ের দক্ষিণ দিকে হাঁটা দিলো । সে হাঁকছে, “সবজি নেবে গো ! ডাটা, কুমড়ো, উচ্ছ্বে, সিম, বেগুন, গাজর আরও হরেক রকমের সবজি ।“
খেমটি কুহকের দিকে তাকিয়ে বললো, “আরও জোরে পা চালাও । তা না হলে সোনা মাসির মতো আরও অনেকের মুখে “কুহক বায়েন” মিষ্টি নামটি শুনতে পাবে ।“ দুজনের মধ্যে চোখ চাওয়া চাওয়ি । তারপর প্রচন্ড হাসি । তারপর…?
তারপর অনেকদিন কেটে গেল ।
বর্ষাকালের মরসুম । ভারী বর্ষণে বাবলা নদী জলে থইথই । বৃষ্টির জল ছাড়াও উপর থেকে অর্থাৎ ফরাক্কা বা ময়ূরাক্ষী ব্যারেজ থেকে জল ছাড়লে বাবলা নদী ভয়াবহ আকার ধারণ করে । নদীর জল বের হতেও সময় লাগে । নদীর কূল ছাপিয়ে বন্যার প্রকোপ দেখা দেয় । বর্ষাকালে নদীর ভয়ংকর রূপের কারণে নদী তীরবর্তী মানুষ খুব ভয়ে ভয়ে থাকে । বন্যার আশঙ্কা তাঁদের মাথায় ঘুরপাক খায় । ভরা বর্ষায় নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যায় না বললেই চলে ।
বর্ষাকালে বায়েন পাড়ার মানুষেরা মাছ ধরতে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকে । ইদানীং রথযাত্রার সময় ঢাকি বাদ্যির চাহিদা বাড়ছে । ঢাকিদের বাজনার ডাক আসছে । যার জন্য রথযাত্রার কটা দিন পাড়ার কয়েকজনকে বাদ দিলে বাকী সমস্ত ঘরের বায়েনরা মাছ ধরাটাকে জীবিকা হিসাবে বেছে নেয় । বর্ষার মরসুমে যেমন নদী ভর্তি তেমনি নদীর স্রোতও তীব্রগতি । সেই সময় বিভিন্ন ধরনের মাছের আনাগোনা । বিভিন্ন ধরনের মাছ খেপলা জালে ওঠে । অবশ্য ঐ সময় মাছ ধরার প্রক্রিয়া খেপলা জালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না । অনেকে নদীর কিনারে জলে নেমে ত্রিকোনা বাঁশ বেঁধে তাতে জাল লাগিয়ে মাছ ধরে । কয়েকজন আয়তক্ষেত্রের কায়দায় বাঁশ দিয়ে জাল বেঁধে খুব সন্তর্পণে সূর্য ওঠার আগে মাছ ধরতে ছোটে । এছাড়া বাঁশের সাহায্যে লিভারের প্রক্রিয়ায় ভেসাল জাল ফেলে মাছ ধরে । বাঁশের তৈরি বৃত্তি, সাগরা (স্থানীয় ভাষায় মাছ ধরার সরঞ্জাম), ইত্যাদির মাধ্যমেও মাছ ধরার প্রচলণ বায়েন পাড়ার মানুষের মধ্যে বর্তমান । মাছ ধরার হরেক রকম যন্ত্র প্রচলিত যেমন জুতি, পলুই (বাঁশের তৈরি), ইত্যাদি ।
শোনা যায় বর্ষাকালের মাছ নাকি সুস্বাদু । চিংড়ি, ট্যাংরা, পুটি, বোয়াল, বাচা, আর, রুই, কাতলা, চিতল, ফলুই, ইত্যাদি মাছের প্রাচুর্য চোখে পড়ার মতো । জ্যান্ত ট্যাংরা একটু আঙ্গুলের মতো বড় হলেই তার দাম আকাশ ছোঁয়া । বায়েন পাড়ার মানুষের মাছ ধরার প্রক্রিয়া বিভিন্ন রকম । কিছুটা এলাকা ভিত্তিক মাছ ধরার সরঞ্জাম বা প্রক্রিয়া বর্তমান । বাঁশ দিয়ে তৈরি বৃতিতে সাধারণত ছোট ছোট চিংড়ি ঢোকে । এইসব ছোট ছোট চিংড়ি সন্ধ্যাবেলায় অন্ধকারে নদীর কিনার দিয়ে স্রোতের উজানে যাওয়ার সময় বৃতিতে ঢোকে । সকালে বৃতিতে ছোট ছোট চিংড়ি মাছের ছটফটানি বা লাফানো দেখলে বায়েনেদের খুব মজা । তাছাড়া জাল দিয়ে বাঁধা বাঁশের ত্রিকোনায় ওঠে ছোট ছোট পুটি, চ্যাপলা, খয়রা, চিংড়ি, ইত্যাদি মাছ । সুতরাং বর্ষার সময় বায়েন পাড়ার মানুষেরা নদীতে মাছ ধরে খুব আনন্দ পায় ।
শিবু বায়েনের শরীরে ঠান্ডা লাগার ধাচ থাকায় বাড়ি থেকে তাঁকে ভোরে জাল দিয়ে নদীতে মাছ ধরতে বারণ । তবুও সংসারের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে বাড়ির নিষেধ অমান্য করে নদীতে মাছ ধরতে ছুটবেই । মাছ ধরা শিবু বায়েনের এক ধরনের নেশা । এবারেও ভরা বর্ষায় পাড়ার অন্যান্যদের সাথে ভোর চারটেয় উঠে খেপলা জাল দিয়ে বাবলা নদীতে মাছ ধরে ঠিক সাতটার মধ্যে বাজারে সেই মাছ নিয়ে বসা । বিক্রিবাট্টা করে পুনরায় ঘরে ঢোকা । খেমটির মায়ের নিষেধের তোয়াক্কা না করে শিবু বায়েন উৎফুল্ল হয়ে ভোর বেলায় মাছ ধরতে ছোটার জন্য তার শরীরের হাল আরও অবনতির দিকে । কয়েকদিনের মধ্যে সর্দি-কাশিতে জড়িয়ে পড়লো শিবু বায়েন । সন্ধ্যাবেলায় তার নিত্য জ্বর । প্রথম প্রথম কয়েকদিন শরীরের অবনতির কথা চেপে রেখেছিলো খেমটির বাবা । কিন্তু খেমটির চোখে শিবু বায়েনের শারীরিক অবনতি চটজলদি ধরা পড়ে যাওয়ায় সে একরকম জোর করে তার বাবাকে স্থানীয় হাতুড়ে ডাক্তার সুফলবাবুকে দেখালো । ডাক্তার বাবু একটি সিরাপের বোতল ও গুটি কয়েক ক্যালপল ট্যাবলেট দিয়ে বললেন, “শীর্ঘই ভাল হয়ে উঠবে ।“ অথচ তিন দিনের মাথায় শিবু বায়েনের আবার জ্বর । বলা চলে লাগাতর জ্বর । বিছানা থেকে উঠা দায় ! তেমনি শারীরিক দুর্বলতা ।
অগত্যা কুহককে ডাকলো খেমটি ।
দুজনে শিবু বায়েনকে চৌরিগাছা স্টেশনে পাশ করা ডাক্তার বাবুকে দেখালো । ডাক্তার বাবু বললেন, “আমি আন্দাজ করছি টাইফয়েড ।“ তিনি রক্ত পরীক্ষা দিলেন, আর চেস্টের এক্স-রে করতে বললেন । ঐ ডাক্তার বাবুর সুচিকিৎসায় টানা আট দিনের মাথায় শিবু বায়েন সুস্থ হয়ে উঠলো । খেমটির মায়ের এই কটা দিন ঘুম হয়নি বললেই চলে । নিয়ম করে ঔষধ খাওয়ানো, খাবার খাওয়ানো, প্রয়োজনে কপালে জলপট্টি দেওয়া, এগুলি ছিলো তার রোগীকে সেবার খুঁটিনাটি ।
জ্বর সারলে কী হবে, শরীর দুর্বল । মুখে তেমন রুচি নেই । খেমটি বাজার থেকে শিং মাছ আনলো বাবার জন্যে । শিং মাছগুলি মাটির হাঁড়িতে জল দিয়ে সযত্নে এমনভাবে রাখলো যাতে মাছগুলি মারা না যায় । প্রতিদিন সংখ্যায় দুটি করে শিং মাছ কেটে রান্না করে খাওয়াচ্ছে তার মা । অন্যদিকে কুহক তাজা ফল কিনে সোজা খেমটিদের বাড়ি । ঠিকমতো ঔষধ খাওয়া এবং নিয়মিত খাদ্য-খাবার খাওয়ার জন্য শিবু বায়েন অনেকটাই সুস্থ ।
অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের শেষ নেই । তিনদিন ধরে সমানে বৃষ্টি । মৃদু মন্দ ঝড়ো হাওয়ার সাথে এক নাগাড়ে বৃষ্টি । আকাশে সর্বক্ষণ কালো মেঘ । বাবলা নদীতে জলে থইথই । তীর ছাপিয়ে নদীর জল গ্রামে ঢোকার উপক্রম । বায়েন পাড়া অনেক নীচু । বাড়ির উঠোন বাদ দিলে অন্যত্র নদীর জল ক্রমশ ঢুকছে । কুহক বেশ কয়েকদিন খেমটির বাবাকে নিয়ে নাজেহাল । তাই কুহক ভাবলো, এবার বৃষ্টি থামুক বা না-থামুক সে খেমটিকে নিয়ে বহরমপুর যাবেই । সেখানে একটা জরুরি কাজ অনেক দিন থেকে পড়ে রয়েছে । শ্রাবণ মাসের প্রথম দিকে খেমটির আবার বহরমপুরে যাওয়ার কথা রয়েছে । তাদের ঢাকের অবস্থা ভাল না । ভাদ্র মাসের শেষে বিশ্বকর্মা পূজো এবং সেই বিশ্বকর্মা পূজোতে ঢাক বাজানোর বায়না খেমটির বাবা ইতিমধ্যে নিয়ে নিয়েছে । অথচ ঢাকের যা অবস্থা যে কোনো মুহূর্তে ঢাকের চামড়া ছিঁড়ে যেতে পারে । কদিন আগে খেমটির ঢাক বাজানোর সময় শিবু বায়েন বুঝতে পেরেছে, তাদের ঢাক অতি সত্বর সারানো দরকার । নতুবা ঢাকের চামড়া নষ্ট হতে বাধ্য । তাই খেমটির সাথে ঢাক নিয়ে বহরমপুরে যাওয়া দরকার । চৌরিগাছা চত্বরে ঢাক-ঢোল তৈরীর ভাল দোকান নেই । একমাত্র বহরমপুরের খাগড়ার কাসা-পিতল পট্টিতে ঢাক ও ঢোল তৈরীর ভাল একটা পুরানো দোকান রয়েছে । দোকানটা দীর্ঘদিনের । যার জন্য ঢাকের কাজকর্ম নিখুঁত । তাছাড়া ন্যায্য দামের দোকান । ঠকবার ভয় নেই ।
এদিকে কুহককে একবার সালার যাওয়া দরকার । তাই কুহক বহরমপুরে যাওয়ার আগে খেমটিকে নিয়ে সালারে যেতে চায় । সেখানে কুহকের বন্ধু ইব্রাহিম বেশ কয়েকবার তাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে । কিন্তু সময়ের দোহাই দিয়ে এতদিন ইব্রাহিমদের বাড়ি যাওয়া হয়নি । ইব্রাহিম ইতিমধ্যে তাদের ঘোড়াডাঙ্গা কয়েকবার এসেছে । সেই ইব্রাহিমদের বাড়ি যাওয়ার জন্য খেমটিকে তাগাদা দিলো কুহক । রবিবার দিন সালার যাওয়ার সিদ্ধান্ত হোলো । তাই রবিবার সকালে খেমটিদের বাড়ি এসে কুহক খেমটিকে সালার যাওয়ার জন্য তৈরী হতে তাগাদা দিলো । অন্যদিকে খেমটির মা কুহককে সকাল সকাল দেখতে পেয়ে বললো, “জলখাবার খেয়ে বের হবে বাবা ।“
এখন কিছু খাবো না কাকীমা । তাছাড়া খাবারও সময় নেই ।
তা বললে হবে না । আমি রুটি সবজি বানিয়েছি । ঐদিকে তনিমা খাবারগুলি থালায় সাজিয়েছে । সুতরাং খেয়ে বের হওয়াটাই যুক্তিযুক্ত ।
“ঠিক আছে কাকীমা । তাড়াতাড়ি খাবার দিন। বৃষ্টিটা থেমেছে । এখন বের হওয়ার মোক্ষম সময় ।“ তাগাদা দিলো কুহক ।
খেমটির মা ভিতরে ঢুকলেন ।
খেমটির বড়দি তনিমা রুটি ও সবজির থালা কুহকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে নরম সুরে বললো, “তোমরা কী দুজনে একসঙ্গে কোথাও যাচ্ছো ?”
“হ্যাঁ” ।
কিন্তু …………!
কিন্তু কী ?
আজ দুপুরের পরে ভূপতিদের বাড়ি থেকে কয়েকজন লোক আমাদের বাড়িতে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনার জন্য আসছে । একটু আগেই ফোন এসেছিলো ।
ফোনটা কে করলো ?
“ভূপতি নিজেই করেছে ।“ তারপর তনিমা কুহকের দিকে তাকিয়ে বললো, “যেখানেই যাও না কেন দুপুরের পরে তোমাকে থাকতে হবে । ঐ সময়ে তুমি ও খেমটি না থাকলে তাঁদের সাথে কথাবার্তা কে বলবে ?
“তুমি চিন্তা করো না । আমরা থাকবোই । ভূপতি আসতে চেয়েছে, অথচ আমি থাকবো না এটা হতে পারে না ।“ তারপর তনিমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “তাঁদের খাওয়ানোর ব্যাপারে আয়োজন কতোদূর ?”
সেটা আমি কিছুই ভাবি নি । ভূপতির ফোনটা একটু আগেই এসেছে ।
চিন্তিত মুখে কুহক বললো, “তবে কী তাঁরা বিয়ের কথা পাকা বলতে আসছে ? যদিও বিয়েটা অগ্রহায়ণ মাসে হওয়ার কথা ছিলো ।“
আমি সেসবের কিচ্ছু জানি না ।
তনিমার সাথে কথোপকথনের সময় কুহকের মোবাইলে ফোন বেজে উঠলো । ফোনের নম্বরের দিকে তাকিয়ে দেখে ভূপতির ফোন ।
এরপর কুহক তনিমার দিকে তাকিয়ে রসিকতা করে বললো, ”তোমার হৃদয়ের ভূপতির ফোন ।“
“ভূপতি আমার এখনও নয় মশায়, সে তোমার বন্ধু ।“ তারপর মোবাইলের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বললো, “তার ফোনটা আগে রিসিভ করো ।“
হ্যালো ভূপতি ।
আজ বাড়ি আছিস্‌ কুহক ?
কেন বল্‌ তো ?
বাবা ও মাকে নিয়ে আমি তনিমাদের বাড়ি যাচ্ছি । তোকে কিন্তু ঐসময়ে অবশ্যই থাকতে হবে ।
“আমি কোথায় থাকবো, বলবি তো ?” জিজ্ঞাসা করলো কুহক ।
তনিমাদের বাড়ি ।
কখন তোরা আসছিস্‌ ?
বেলা তিনটে নাগাদ পৌঁছাবো ।
“ঠিক আছে । আমি থাকবো । এবার ফোনটা রাখছি ।“ ফোনটা ছেড়ে দিয়ে কুহক তনিমার দিকে তাকিয়ে দেখলো, বেচারার চোখ-মুখ খুশীতে উজ্জ্বল । আকাশে সাদা-কালো মেঘের আনাগোনা থাকলেও তনিমার সরল সোজা শান্ত মেয়ের লক্ষীশ্রী মুখটা আনন্দে ভরপুর । খেমটিরা দুই বোন । তনিমা বড় । উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে সে বাড়িতে বসে রয়েছে । মাঝখানে ছয় মাসের বেশী সময় ধরে কান্দি শহরে গিয়ে লেডিস্‌ টেলারিংয়ের কাজটা শিখেছে । লেডিস্‌ টেলারিং অনেকটাই তার রপ্ত । কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেকবার বলা সত্বেও শিবু বায়েন পয়সার অভাবে বড় মেয়েকে একটা সেলাই মেসিন কিনে দিতে পারেনি । যদিও কুহক তনিমাকে আস্বস্ত করেছিলো, স্থানীয় গ্রামীণ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে তার সেলাই মেসিনের সুরাহা করবে । ব্যাঙ্কের চিন্তাভাবনার ঠিক পরেই ভূপতির সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব । ভূপতিরা বিয়ের জন্য কিছুদিন সময় চেয়ে নিয়েছিলো । সময় চাওয়ার পেছনে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ভূপতির দিদির বিয়েতে খরচ খরচার জন্য তাদের নিঃস্ব হাত । তাই কিছুদিন সময় চাওয়া । তারপর ভূপতির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর কুহক বুঝতে পেরেছিলো, তনিমা একজন যোগ্য আদর্শবান পুরুষকে স্বামী হিসাবে পাচ্ছে ।
ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটা সম্বন্ধ তনিমার জন্য এসেছিলো । যেহেতু তারা বায়েন সম্প্রদায়ের অর্থাৎ জাতিতে মুচি, জুতো সেলাইয়ের দোকানদার বা জুতোর ব্যবসায়ী মূলত “পাত্র”র তালিকায় ছিলো । গাঁয়ের চাষি পরিবার থেকেও সম্বন্ধ এসেছিলো । কিন্তু খেমটির আপত্তিতে তনিমার বিয়ের সম্বন্ধ একটাও ধোপে টেকেনি । তার কথা, “আমার দিদি উচ্চ মাধ্যমিক পাশ । দেখতে অনেক সুন্দর । উপরন্ত হাতের কাজ জানে । নিজের প্রতি দিদির আত্মবিশ্বাস ষোলোআনা । প্রয়োজনে টেলারিং ব্যবসা খুলে রোজগারের ঝুঁকি নিতেও সক্ষম । সুতরাং সে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াবে কেন ? জুতোর ব্যবসায়ী নয় অথচ জুতো সেলাইয়ের দুজন দোকানদার দিদিকে পছন্দ করেছিলো বটে, কিন্তু তাদের উপার্জনের পথটা স্থিতিশীল নয় । তাছাড়া বয়সের ফারাক বড্ড বেশী । পুরোটাই বেমানান । সেইকারণে খেমটির বাধা দেওয়া । তারপর ভূপতির আগমন । এখন বলা চলে ভূপতির সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধটা রাজযোটক ।
ভূপতিদের আগমনের খবর পাওয়ার জন্য তাদের আর সালার যাওয়া হোলো না । কুহকের কাছে খেমটির দিদির বিয়ের গুরুত্ব বেশী । তাই সালারে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত ইব্রাহিমকে জানিয়ে দিলো । আগের রাত্রে টেলিফোনে কুহককে সালার যেতে আবদার করার পেছনে ইব্রাহিমের আরও একটা কারণ ছিলো, ঐদিন তার চাচার মেয়ের সাদী । তাই কুহক ভেবেছিলো, ইব্রাহিমদের বাড়ি গিয়ে তাদের আত্বীয় স্বজনদের সাথে দুপুরের খাবার একসঙ্গে খেয়ে বাড়ি ফিরবে । যদিও বিয়ের রিসেপশন্‌ ছিলো সন্ধ্যাবেলায় । অগত্যা কুহক “না যাওয়ার সিদ্ধান্তটা” ইব্রাহিমকে জানিয়ে বললো,”পরবর্তী সময়ে সে সালারে গিয়ে তার চাচার মেয়েকে দোয়া জানিয়ে আসবে ।“
তারপর কথামতো ভূপতি তার বাবা-মাকে নিয়ে বিকাল ঠিক চারটের মধ্যে খেমটিদের বাড়ি পৌঁছালো । প্রকৃতির একটা মজার ব্যাপার । সকাল থেকে মোটামোটি বৃষ্টি নেই বললেই চলে । ভূপতি যখন খেমটিদের বাড়ি ঢুকলো, তখন আকাশ পরিস্কার । সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে । অথচ আগের রাত্রিতেও বৃষ্টি ছিলো । যাই হোক কুহক অনেক আগে থেকেই খেমটিদের বাড়িতে ভূপতিদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য বসেছিলো । ভূপতিদের খাতির যত্নের যেনো অভাব না ঘটে সেদিকটা সরেজমিনে তদারকি করছিলো ।
চা ও সামান্য জল খাবার খাওয়ার পর ভূপতির বাবা শিবু বায়েনকে বললেন, “আমাদের ইচ্ছা, আপনার বড় মেয়েকে আমাদের ঘরের লক্ষ্মী করে অগ্রহায়ণ মাসে তুলবো । কিন্তু আমাদের মতের পরিবর্তন ঘটেছে । যদি সাহস দেন, তবে আমাদের ইচ্ছা আপনাদের কাছে ব্যক্ত করতে পারি ।“
উপস্থিত সকলের দৃষ্টি ভূপতির বাবার উপর ।
“দাদা, ইতঃস্তত করছেন কেন ? আমাদের পরম সৌভাগ্য, আপনারা আমার বড় মেয়েকে আপনাদের ঘরের লক্ষ্মী হিসাবে মেনে নিয়েছেন । এটাই আমাদের পরম পাওয়া ।“ হাসিমুখে শিবু বায়েন কথাগুলো বললো । শিবু বায়েনের পাশে বসে রয়েছে কুহক ও খেমটি । অদূরে দাঁড়িয়ে খেমটির মা, তার পাশে তনিমা ।
“আমি গতমাসে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছি । আপনারা জানেন আমি বেলডাঙ্গা ব্লক অফিসে ছোটখাটো গ্রুপ-ডি পদে চাকরি করতাম । অবসরকালীন কিছু টাকা পয়সা পেয়েছি । ভূপতির মা বললেন, সেখান থেকে কিছু খরচ করলে ছেলের বিয়ে মিটে যাবে । আপনার বড় মেয়েকে ঘরের লক্ষ্মী করে তুলে আনার এইটাই উপযুক্ত সময় । সেইজন্যেই সপরিবারে আমাদের আর্জি জানাতে আপনাদের বাড়ি আসা । এবার আপনাদের মতামত পেলে পরবর্তী দিনক্ষণের জন্য এগোতে পারি ।“ কথাগুলি বলে ভূপতির বাবা শিবু বায়েনের দিকে তাকালেন ।
শিবু বায়েন আবেগে ভরপুর হয়ে ভূপতির বাবার হাত দুটি ধরে বললো, “এটি একটা উত্তম প্রস্তাব । তবে………!”
তবে কী দাদা ?
“তবে আপনি তো জানেন, আমরা গরীব । গরীব ঘরেই আমার মেয়েরা মানুষ । সাধ্য বা সামর্থ দুটোই কম ।“ শিবু বায়েন নিজের স্বপক্ষে কথাগুলি বললো ।
ওসব সাধ্য বা সামর্থ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন । আপনার মেয়ে আমার কন্যাসম । আমার একমাত্র পুত্রের সঙ্গে আপনার কন্যার বিয়ে ! সুতরাং আপনার মেয়েকে আমরা আমাদের নিজের মেয়ের মতো আগলে বাখবো ।
শিবু বায়েনের চোখে জল । ভূপতির বাবা উচ্চ মনের মানুষ । তাঁর ব্যবহারে শিবু বায়েন যারপরনাই আনন্দে বিহ্বল । তবুও শিবু বায়েনের চোখে জল । নিজেকে কোনোরকমে নিয়ন্ত্রণে এনে আবার বললো, “এবার বিয়ের দিন-তারিখে আসা যাক্‌ ।“
খেমটি ঘর থেকে পঞ্জিকা বের করে আনলো । শ্রাবণ মাসের পচিশ তারিখ সবদিক দিয়ে শুভ দিন । বারটাও আবার বুধবার । কথায় আছে, “মঙ্গলে ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা ।“
কুহক এবার সকলের দিকে তাকিয়ে বললো, “শ্রাবণ মাসের পচিশ তারিখ উভয় পক্ষের সম্মতি থাকলে, আজই পাকা কথা সেরে ফেলা ভাল । তাহলে বারবার বৃষ্টির দুর্যোগ মাথায় নিয়ে আপনাদের কোনো পক্ষের অসুবিধার সম্মুখীন হতে হবে না । তাছাড়া সময়ও কম ।“
ভূপতির বাবা বললেন, “আজ ঘরের মা লক্ষ্মীকে আশীর্বাদ করার জন্য একদম প্রস্তুত হয়ে আসিনি ।“
“তাতে কী হয়েছে ! কয়েকটা টাকা দিয়ে অথবা এক টাকার কয়েন দিয়ে আশীর্বাদ করলেই যথেষ্ট । উভয় পক্ষের মিল থাকলে এইসব ছোটখাটো ব্যাপারে অনায়াসে উতরানো সম্ভব ।
কুহকের কথার রাশ টেনে ভূপতির বাবা সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, “তুমি সঠিক কথা বলেছো বাবা । উভয় পক্ষ মিল থাকলে এইসব ছোটখাটো সমস্যা সহজেই উতরানো সম্ভব । তোমরা যথেষ্ট শিক্ষিত । বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি তোমাদের অনেক উন্নত । তোমার পরামর্শমতো আমরা আমাদের মা লক্ষ্মীকে আশীর্বাদ করেই বাড়ি ফিরবো ।
এইকথার পরে ভূপতির মা উঠে খেমটির মাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “এবার থেকে আপনারা আমাদের পরম আত্নীয় ।“
খেমটির মা তখন শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছছেন । জাতিতে দেখলে ভূপতিরা তাদের চেয়ে উঁচু বর্ণের । অথচ অমায়িক তাঁদের ব্যবহার । উঁচু সম্প্রদায়ের মানুষের এত সুন্দর ব্যবহার অতীতে তারা কখনও পেয়েছে কিনা খেমটির মা সেটা মনে করতে পারছে না । যার জন্য মর্যাদাপূর্ণ ব্যবহারে খেমটির মা আনন্দে উদ্বেলিত । খুশীতে তার চোখে জল । খেমটির মায়ের বিশ্বাস, এহেন শ্বশুর শাশুড়ির সান্নিধ্যে তার বড় মেয়েটা সুখে-শান্তিতে সংসার করতে পারবে ।
তারপর বহু প্রতীক্ষিত শ্রাবণ মাসের পচিশ তারিখ । বর্ষাকালের বর্ষার কথা ভেবে উঠোনেই প্যান্ডেল । মাথার উপরে এবং প্যান্ডেলের চতুর্দিকে ত্রিপল টাঙানো । যাতে ভারী বর্ষণেও প্যান্ডের ভিতর জল ঢুকতে না পারে । ভূপতির বাবা বলেই গেছেন, সর্বসাকুল্যে গোটা পনের জন বরযাত্রী আর বোন-ভগ্নিপতি । এদিকে শিবু বায়েনের পাড়ায় চল্লিশ ঘর মানুষ । তাঁদের খাওয়ানো শিবু বায়েনের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে । কেননা বাড়িতে প্রথম অনুষ্ঠান । বড় মেয়ের বিয়ে । এতকাল পাড়ার মানুষের বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তারা নিমন্ত্রিত থাকতো । সুতরাং পাড়ার সকলকেই নিমন্ত্রণ করাটা বাঞ্ছনীয় । শিবু বায়েন অনেক কষ্টে পঞ্চাশ হাজার টাকা জমিয়েছিলো । শত দরিদ্রতার মধ্যে ঐ টাকাটা খরচ করেনি । এই মুহূর্তে তার ঐ পঞ্চাশ হাজার টাকা অনেক ভরসা । বাকীটা কুহক ও খেমটি সামলাচ্ছে । প্যান্ডেল, তাসা-পার্টির বাজনা, খাদ্য-খাওয়া সব কিছুই তাদের দুজনের জিম্মায় । অন্যদিকে ভূপতি তাদের গাঁয়ের পুরোহিত ঠাকুরকে পাঠিয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে । ঘোড়াডাঙ্গা গ্রামে যেসব পুরোহিত মশায় রয়েছেন তাঁদের নিয়ে সমস্যা তৈরী হওয়ার কথা ভেবে কুহক ও ভূপতি যুক্তি করে বাইরে থেকে পুরোহিত ঠাকুর আনার সিদ্ধান্ত । কেননা তার বাবা ব্রাম্মণ সমাজের একজন বিশিষ্ট মাথা । তাঁর দূরভিসন্ধিমূলক কান্ড-কারখানার জন্য শেষ মুহূর্তে বিয়ের অনুষ্ঠান বানচাল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কুহক উড়িয়ে দিতে পারছিলো না । তাই কুহক ঝুঁকি না নিয়ে পুরোহিত ঠাকুর বাইরে থেকে আনার সিদ্ধান্ত ।
রান্নার ঠাকুর আসছে কর্ণসুবর্ণ থেকে । আমিষের আয়োজন । তাই মাছ ও মাংস দুটোই থাকছে । কান্দি থেকে আসছে জলভরা সন্দেশ ও রসগোল্লা । ছোট আয়োজন, অথচ উৎকৃষ্ট জিনিসের খামতি নেই । সুন্দরভাবে অনুষ্ঠানটির নিবৃতি ঘটাতে সমস্ত আয়োজনের উপর কুহকের শকুণের দৃষ্টি । একটুও নড়চড় হওয়ার জো নেই ।
“তুমি এদিকে, অথচ আমি সারা বাড়ি তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি !” খেমটি রান্নার জায়গায় কুহককে দেখতে পেয়ে তার অভিযোগ জানালো ।
“খোঁজার হেতু কী জানতে পারি ?”
অতিথিদের খাওয়ার পর পান-সুপারির কী ব্যবস্থা ?
ভাবছি পান-সুপারি দেবো না ।
তাহলে, বিকল্প কী দেবে ?
বিকল্প, হজমলার প্যাকেট ।
হজমলা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেটার ব্যাবস্থার কী খবর ?
এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না ।
আমি না ভাবলে কে ভাববে, শুনি ?
আমি ভাববো । আমি একটি জলজ্যান্ত সুপুরুষ । এইসব ভাববার জন্য আমি যথেষ্ট । তুমি বরং তনিমার বিয়ের প্রস্তুতি দেখো, যেমন গায়ে-হলুদ, ছাদনা তলা তৈরী, বিয়ের সরঞ্জাম, ইত্যাদি ।
অতিথি আপ্যয়ন কার দায়িত্বে ?
গ্রামের মানুষদের তোমার বাবা সামলাবে । বরযাত্রীদের আমি নিজে সামলাচ্ছি ।
কুহক ও খেমটির কথার মাঝখানে হঠাৎ মায়ের ডাক আসায় খেমটি স্থান ত্যাগ করলো । অন্য কাজের জন্য অন্যত্র ছুটলো ।
বর্ষাকাল । তাই বর ও বরযাত্রীরা সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে এসে হাজির । বর ও বরযাত্রীদের আনার জন্য ঘোড়াডাঙ্গা গ্রামের খেমটির কাছের একজন বান্ধবী, দ্বীপশিখা গিয়েছিলো । দ্বীপশিখার সৌজন্যে বরের ও বরযাত্রীদের যথাযথ মর্যাদায় ঘোড়াডাঙার বায়েন পাড়ায় আনয়ন সম্ভব হয়েছে । দ্বীপশিখা পৌঁছে সে নিজেও বিয়ের আনুসঙ্গিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লো । বাড়িতে বিয়ের তোড়জোর ষোলোআনা । পাড়ার নিমন্ত্রিত মানুষও উপস্থিত ।
সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মহাধুমধামে তনিমা ও ভূপতির শুভবিবাহ সুসম্পন্ন হলো । ভূপতি ও তনিমা বিয়েতে দুজনেই ভীষণ খুশী । কুহকের চিন্তাভাবনায় সত্যিই এটা রাজযোটক । ভূপতি উঁচু বর্ণের ছেলে হয়ে একজন নীচু বর্ণের মেয়েকে বিয়ে করার মাধ্যমে কুহকের ধারণা, সে সমাজকে একটা বার্তা দিলো । বোঝাতে চাইলো, “নীচু বর্ণের মানুষেরা কোনোদিক দিয়ে অবহেলিত নয় । তারাও সমাজে আর দশটা মানুষের মতো সমান মর্যাদাসম্পন্ন ।“ (চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here