আনাড়ি মহিলার উচ্ছৃঙ্খলতা (ধারাবাহিক উপন্যাস, দশম পর্ব) : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

0
435

রাত্রি তিনটের সময় ইমলিকে নিয়ে ইতাস ও রিতম বাবু বর্দ্ধমানের নার্সিং হোমে পৌঁছালেন । ডাক্তার বাবু অনেক আগেই নার্সিং হোমে পৌঁছে গিয়েছিলেন । রাস্তা থেকেই ইমলি প্রসব বেদনায় কাতর । ইমলির শারীরিক অবস্থা অবলোকন করে ডাক্তার বাবু আর ঝুঁকি নিলেন না । তিনি সঙ্গে সঙ্গে ইমলিকে প্রসূতি বিভাগে চেক করলেন । তারপর ডাক্তার বাবু বাইরে বেরিয়ে এসে রিতম বাবু ও ইতাসকে বললেন, “আপনারা একটু সময় ধৈর্য ধরে বসুন । কিছুক্ষণের মধ্যে নতুন অতিথির খবর পেয়ে যাবেন ।“
ভোর ৫টা ৩০মিনিটে ইমলির কন্যা সন্তানের জন্ম । কন্যা সন্তানের খবরে ইতাস ভীষণ উৎফুল্ল । ডাক্তার বাবু জানালেন, “বাচ্চা ও বাচ্চার মা দুজনেই ভাল আছেন । সম্পূর্ণ নর্মাল ডেলিভারি । কোনোরকম টেনশনের কারণ নেই । ঈশ্বরের অশেষ করূণায় সব ঠিকঠাক মতো সম্পন্ন হয়েছে । আপনারা এখানে বসুন, আমি ভিতরটা সামলাই ।“
রিতম বাবুর অফিস । আর তাছাড়া ইতাসকে অফিসে ঝাড়পোঁছ করতে হবে । সেই কারণে রিতম বাবু ও ইতাস, দুজনে সকাল সকাল বর্দ্ধমান থেকে রওনা দিলেন । ইমলি নার্সিং হোমে রয়ে গেল । ডাক্তার বাবু বলেছেন, ইমলিকে কয়েকটা দিন নার্সিং হোমে থাকতে হবে । নার্সিং হোমের ব্যবস্থাপনা ভাল । রোগীকে দেখাশোনা, রোগীর খাবার, রোগীকে ডাক্তার বাবুদের অ্যাটেন্ড করা সবকিছুই নিয়মনিষ্ঠ । যার জন্য নার্সিং হোমে ইমলির থাকার ব্যাপারে ইতাস টেনশনমুক্ত ।
ইতাস কুসুমগ্রামে ফিরে কাজে নেমে পড়লো । একটানা কাজ । কোনো বিরাম নেই । বর্দ্ধমানে রোজ যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব না । তবে ব্রাঞ্চ থেকে ননী বাবু একদিন নার্সিং হোমে ইমলি ও তার মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলেন । তারপর ইতাস দুদিনের মাথায় বর্দ্ধমানের নার্সিং হোমে গেল । তখন ডাক্তার বাবুর সঙ্গে দেখা । তিনি জানিয়ে দিলেন দুই থেকে তিন দিনের মাথায় ইমলিকে ছড়ে দেওয়া হবে । ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় নার্সিং হোম থেকে ইমলি ছাড়া পেলো । ব্যাঙ্ক থেকে কিছু আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছিল, আর বাকী টাকা ইতাস পকেট থেকে দিয়ে নার্সিং হোমের বিল মেটালো । ফুটফুটে ভারী সুন্দর মেয়ে । দেখতে ভীষণ মিষ্টি । ইতাসের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রয়েছে । সেই মুহূর্তে ইতাসের বাবা-মার কথা মনে পড়লো । তাঁরা কাছে থাকলে খুব খুশী হতেন । বাড়ির নতুন অতিথি পেয়ে আহ্লাদে মেতে উঠতেন । দেশ ভাগের ভয়ানক পরস্থিতির শিকার হয়ে তাঁরা ছিন্নমূল অবস্থায় দেশ ছাড়া, ছন্নছাড়া । ভাবতেই ইতাসের চোখে জল ।
মেয়েকে সামলাতে ইমলির দুর্বিষহ অবস্থা । খুব ভোরে ইতাস ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, দিনের মাঝখানে ঘরে ফেরার ফুরসত পায় না । তাদের বাড়িটা গ্রাম ছাড়িয়ে শেষ মাথায় । চাইলেও সব দিক সামলে ঘরে আসা ভীষণ ঝক্কি ঝামেলার । চায়ের দোকান ফাঁকা রাখলে খরিদ্দার চলে যাওয়ার সম্ভাবনা । একবার খরিদ্দার চলে গেলে তাঁদের ফিরিয়ে আনা বহুত সমস্যা ! চায়ের দোকানে কাউকে বসিয়ে রেখে বাড়িতে ঘুরে যাওয়ার উপায় নেই । কাকে বসাবে ? সবাই ব্যস্ত । অল্প সময়ের জন্য কাউকে রাখাও যাবে না । সেই ধরনের লোক পাওয়া মুশকিল ! সকালে বেরিয়ে ব্যাঙ্কের কাজ সেরে সোজা চায়ের দোকানে । তারপর মাঝখানে ব্যাঙ্কে গিয়ে ক্যান্টিনে রান্না । তবে রান্নার কাজ বেশির ভাগ দিন দোকানেই সারে । দুটোর সময় ব্যাঙ্কে গিয়ে বাবুদের খাইয়ে দিয়ে পুনরায় দোকানে ফেরা । ব্যাঙ্কের বাবুদের চা খাওয়ার ক্ষেত্রে নিকটবর্তী চায়ের দোকান থেকে তার বন্দোবস্ত ।
মেয়ে বড় হচ্ছে । কি নাম দেওয়া যায় ? নাম ঠিক করতে ইমলির কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম । ব্যাঙ্কের স্টাফেরা একটা নাম সাব্যস্ত করে ইমলির কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন । ভেবে দেখবার জন্য । সেই নামটা নিয়ে ইতাস ও ইমলি রাত্রিবেলায় আলোচনায় বসলো । ব্যাঙ্কের বাবুদের মতে, যেহেতু ইমলি ম্যাডামদের দুঃসময়ে মেয়ের আবির্ভাব তাই তার নাম রাখা হোক “আসান” । কতকটা মুশকিল আসানের মতো । মেয়ে হবে ইমলি ম্যাডামদের জীবনে মুশকিল আসানের শক্তিশালী অবলম্বন । ইমলি ও ইতাস ব্রাঞ্চের স্টাফদের রাখা নাম মেনে নিলো । ইমলির মেয়ের নাম রাখা হল “আসান” ।
তারপর অনেকদিন ইমলি ছুটিতে । তার বাড়িতে আর বসে থাকতে ভাল লাগছে না । সে অফিসে যোগ দিতে চায় । মেয়েটাও হামাগুড়ি দিচ্ছে । সমস্যা হচ্ছে আসানকে নিয়ে । তাকে কিভাবে, কোথায় রেখে ব্যাঙ্কের কাজকর্ম সারবে । সেটা নিয়েই ইমলি চিন্তিত । তবে যাই হোক তাকে শীঘ্রই অফিসে যোগ দিতে হবে । এদিকে ব্যাঙ্কের নিয়ম মোতাবেক ম্যাটারনিটি লিভ শেষ হওয়ার পথে । অল্প কয়েকদিন বাকী । মেয়েটা বড্ড মায়াবী । কখনও তার খিল খিল হাসি, আবার কখনও উচ্চ স্বরে কান্না ! মেয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ইমলির স্নান খাওয়া দাওয়া এমনকি ঘুম । অনেক সময় সন্ধ্যাবেলায় ঘুমিয়ে রাত্রি ১টার সময় উঠে তার খিল খিল হাসি । আর ঘুমাবার নাম নেই । শুয়ে শুয়ে হাত-পা ছোড়া । সেই সময় ইমলিকে মেয়ের সঙ্গে রাত জাগতে হয় । মেয়ের মায়ায় ইমলি আবিষ্ট ।
ব্যাঙ্কের কাজ সমান তালে চালিয়ে যাওয়ার জন্য ইতাসের চায়ের দোকান থেকে আয়ও কমে গেছে । তবে তার দোকানের মুড়ি ঘুগনি ইদানীং খুব জনপ্রিয় । কুসুমগ্রাম বাজারে মুড়ির দোকান আছে ঠিকই, কিন্তু একসঙ্গে মুড়ি ও ঘুগনি খাওয়ার ব্যবস্থাপনা নেই । দূরের গ্রাম থেকে যারা ঝুড়িতে কাঁচা সবজি যেমন ঝিঙে, পটল, লাউ, উচ্ছে, পুঁই শাক, কাঁচা কলা, ইত্যাদি নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে আসে, তারা ফিরে যাওয়ার সময় অথবা বিক্রি বাট্টার মাঝখানে ইতাসের দোকান থেকে মুড়ি ঘুগনি খেয়ে তাদের শান্তি । ঝুড়িতে সবজি বিক্রেতা মহিলারাই বেশী । সবজি বিক্রি করে একশ কিংবা দেড়শ টাকা লাভ । তাই তাদের অল্প পয়সায় পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ার দিকে ঝোঁক । পেট ভরে খাওয়া তাদের মূল উদ্দেশ্য । সাইকেলে বা ভ্যান রিক্সার সবজি বিক্রেতারাও ইতাসের দোকানের মুড়ি ও ঘুগনির খরিদ্দার । গ্রামীণ মানুষের রুচি, চাহিদা, আর্থিক সঙ্গতির কথা মাথায় রেখে ইতাসের মুড়ি ঘুগনি, পাউরুটি ঘুগনি, কলা পাউরুটির ব্যবস্থা । যার জন্য চা বিক্রিতে মন্দা হলেও অন্য খাবার বিক্রির মাধ্যমে ইতাসের পড়তায় পুষিয়ে যায় । এই ভাবে গতানুগতিক ভদ্রস্থ লাভের মুখ দেখছে ইতাস ।
সবজি বিক্রেতা জয়তী মাসি ইতাসের দোকানের নিয়মিত খরিদ্দার । মন্তেশ্বর থেকে তিন কিলোমিটার দূরের গ্রাম থেকে প্রতিদিন কুসুমগ্রাম বাজারে আসে । রোড থেকে হাঁটা পথে প্রায় চল্লিশ মিনিট তাদের গাঁ । অজ পাড়া গ্রাম । গ্রামে আদিবাসী মানুষ বেশী । কয়েক ঘর জেলে আর মাসির মতো জনা পাঁচেক বাড়ি ধোপাদের । মাসির কর্তার ধোপার ব্যবসা ছিল । তিনি গত হওয়ার পর মাসি ধোপার কাজ ছেড়ে ঝুড়িতে কাঁচা মাল নিয়ে কুসুমগ্রাম বাজারে বসে । তার বিক্রিবাট্টা ভাল । তবে লাভ সর্বসাকুল্যে আড়াইশ টাকা । তাতেই মাসি খুশী । আগের দিন বিকেলবেলা সবজি কিনে ঘরে রাখে । তারপর ভোরের বাস ধরে সোজা কুসুমগ্রাম বাজার । বাজারে ঢোকার মুখে তিন নম্বরে মাসি ঝুড়ি নিয়ে বসে । বাজারের দোকানদার ও খরিদ্দারেরা জয়তী মাসিকে খুব ভালভাবে চেনেন । দীর্ঘদিন থেকে বাজারে বসে । জয়তী মাসির কিছু বাঁধা খরিদ্দার মাসির কাছেই সবজি খোঁজ করেন ।
জয়তী মাসি ইতাসকে ধরলো, “বাছা ! তোমার মেয়ে হল । মেয়ের মুখে-ভাত অনুষ্ঠান কবে করছ ?
কি যে বলো মাসি । কেবল পাঁচ মাস চলছে । আর কিছুদিন যাক ।
আমি যেন নিমন্ত্রণ পাই ।
আচ্ছা মাসি । অন্নপ্রাশন হলে তোমার নিমন্ত্রণ আগে ।
“হলে” মানে ?
তুমি আমার আর্থিক সঙ্গতি জানো ? তারপর মাথা চুলকিয়ে ইতাস বললো, “তবে মেয়েটাকে নিয়ে একটা সমস্যায় পড়েছি মাসি” ।
কিসের সমস্যা বাছা !
“তোমার বৌমা ব্যাঙ্কের কাজটায় যোগ দেবে । তার ছুটি শেষ । মেয়েটাকে দেখাশোনা করার জন্য বয়স্কা মহিলা দরকার” ? খুব হতাশ ভাবে জয়তী মাসিকে ইতাস জানালো ।
এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই বাছা । আমাকে যখন বললে, আমিও দেখছি সুফলের মাকে পাওয়া যায় কিনা ?
সুফলের মা ! সে পারবে তো মেয়েকে আগলে রাখতে ?
আলবাত পারবে । একটা কথা বলি বাছা ।
বলো মাসি ।
মেয়ে রাখার জন্য তোমার দিনের বেলায় লোক দরকার । বিকেলে তোমার গিন্নির ছুটি হলে দিব্যি বাড়ি এসে মেয়েকে আদর-আহ্লাদ করতে পারবে ।
হ্যাঁ মাসি । সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত থাকলেই চলবে ।
ঠিক আছে । আমি দেখছি সুফলের মা কি বলে ? সুফলের মা খুব দায়িত্ববান । আমি তাকে খুব ভাল চিনি ও জানি । পয়সা কড়ি নিয়ে তার কচলাকচলি নেই । সুফল পরের বাড়িতে মুনিষ খাটে । টানাটানিতে তাদের সংসার । ন্যায্য মতো যা পারিশ্রমিক দেবে তাতেই সুফলের মা খুশী । সুফলের মা রাজি হলে তোমার মেয়েকে দেখাশোনা করার একটা ভদ্রস্থ হিল্লে হবে । তার কাছে মেয়েকে রেখে নিশ্চিন্তে তোমরা কাজকর্ম করতে পারবে । কেননা ইতিপূর্বে বামুনদের বাড়িতে নকড়ির ছেলেটাকে সুফলের মা দেখাশুনা করতো । বাবু-গিন্নি দুজনেই মাস্টার । নকড়ির বাড়িতে প্রায় তিন বছর ছিল । সেখানে কোনো সমস্যা হয়নি, বরং নকড়ির মুখে শোনা সুফলের মায়ের মতো মানুষ হয় না ।
ইতাস জয়তী মাসিকে বললো, “তুমি কথা বলে দেখো রাজি হয় কিনা ? রাজি হলে তাকে আমার গিন্নির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে হবে ।“
তারপর দুদিন বাদে জয়তী মাসি সুফলের মাকে নিয়ে ইতাসের চায়ের দোকানে হাজির । গদাই জয়তী মাসি ও সুফলার মাকে সঙ্গে নিয়ে সোজা ইমলিদের বাড়ি । ইমলি তখন মেয়েকে বুকের দুধ খাওয়াতে ব্যস্ত ।
সুফলের মা আসানকে কোলে নিয়ে খুব খুশী । নাদুস-নুদুস মিষ্টি চেহারা । সুফলের মায়ের কোলে একদম চুপচাপ ।
পরেরদিন থেকে সুফলের মা কাজে লেগে গেল । ইমলিদের পক্ষে লোক রাখা আর্থিক দিক দিয়ে যদিও ঝুঁকিবহুল, কিন্তু লোক রাখা ছাড়া মেয়েকে অন্য কোথাও রাখার উপায় নেই । সুতরাং লোক রাখার জন্য একটা বাড়তি খরচায় ঢুকে গেল ।
অফিসে জয়েন করলো ইমলি ।
মেয়েকে খাইয়ে সকাল আটটার মধ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে ইমলি । অফিসে অনেক কাজ । ঝাড়পোঁছ ছাড়াও চেয়ার টেবিল মোছা । এতকাল তার স্বামী বদলী কাজ চালিয়েছে, কিন্তু অনেক কিছু অগোছালো । সেগুলো ঠিক করতে ইমলির অতিরিক্ত খাটুনি । ইমলি অফিসের কাজে যোগ দেওয়ায় স্টাফেরা খুব খুশী । তাঁদের অন্তত টিফিন খাওয়া দাওয়া, সময় মতো চা পাওয়া এবার সম্ভব । বাড়িতে মেয়ের পরিচর্যা আর ঠিকমতো অফিস করা, ইমলির জীবনের এখন গুরুত্বপূর্ণ রুটিন । সুফলের মা থাকায় ইমলির অনুপস্থিতিতে মেয়ে নিয়ে টেনশন নেই । মায়ের জন্য বেশী পীড়াপীড়ি করলে সুফলের মা স্বয়ং আসানকে নিয়ে ব্যাঙ্কে হাজির হয় । তারপর মাকে পেয়ে মেয়ের শান্তি । তখন তার গাল ভরা হাসি ।
দেখতে দেখতে আসানের প্রায় এক বছর । মুখে ভাত দেওয়া হয়নি । দশ মাসের মাথায় কালী মন্দিরে পূজো দিয়ে মেয়েকে ভাত খাইয়ে দিয়েছে । ব্যাঙ্কের বাবুরা ইমলিকে ধরেছেন মেয়ের জন্মদিন ধুমধাম করে পালন করতে । ইমলি পড়ে গেল মহা ফাঁপড়ে । পয়সা কড়ি ঠিকমতো জমছে না । যেটুকু উপায় প্রায় সবটাই খরচ । জন্মদিন পালন করবে কীভাবে ? ব্যাঙ্কের স্টাফেরা নাছোড়বান্দা, বড় করে সম্ভব না হলেও স্টাফদের নিয়ে ছোটোখাটো আকারে জন্মদিন পালন হোক এবং সেটা ব্রাঞ্চেই হোক । সন্ধ্যাবেলায় কেক কাটা এবং তারপর খাওয়া দাওয়া সমস্ত অনুষ্ঠান ব্রাঞ্চে । ইমলি স্টাফদের আবদারে রাজি ।
আবার ননীবাবু ইমলিকে বললেন, “আমরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে থেকে কিছু টাকা চাঁদা তুলেছি । আশা করি চাঁদার টাকায় মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান ভালভাবে নিষ্পন্ন হবে ।“
ইমলি ননী বাবুকে প্রণাম জানিয়ে বললো, “আপনি আগের জন্মে আমার বড় দাদা ছিলেন । যার জন্য আপনি আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা আন্তরিকভাবে চিন্তা করেন । আপনার মহানুভবতা এবং উদারতা আমাদের কাছে কতোখানি গর্বের সেটা বলে বোঝাতে পারবো না ।“
ব্যাঙ্কের বাবুরা ছাড়া আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে গদাই ও জয়তী মাসি অতিরিক্ত । শুক্রবার সন্ধ্যায় আয়োজন । ব্রাঞ্চ বেলুন দিয়ে সাজানো ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের লাইটের বন্দোবস্ত থাকায় কেক কাটার জায়গাটা ভীষণ জমকালো । জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান । আসান লাইট, বেলুন, ফুল, লোকজন দেখে রীতিমতো বিস্মিত ! তার জন্মদিনের অনুষ্ঠান সেটা বুঝতে একটু সময় নিচ্ছে । তার চোখ চতুর্দিকে ঘুরছে । অবাক দৃষ্টিতে তার চাহনী ! স্টাফদের কোলে কোলে ঘুরছে আসান । কোলে থাকলে আসান একদম চুপচাপ । অন্যদিকে ইমলি ও সুফলের মা রান্নায় ব্যস্ত । সাদামাটা আয়োজন । ফ্রায়েড রাইস, মাংস, চাটনি এবং রাজভোগ । রান্না প্রায় শেষ । মাংসটা শুধুমাত্র কষানো চলছে । মাংস রান্না হয়ে গেলেই ইমলি কেক কাটার অনুষ্ঠানে যোগ দেবে । বড় একটা কেক অর্ডার দিয়ে আনা হয়েছে ।
ব্রাঞ্চের সকলে মিলে আসানের জন্য অনেক ভাল ভাল খেলনা, পুতুল, উপহার হিসাবে কিনেছে । রিমোটের মোটর গাড়ি দেখতে পেয়ে আসান কোল থেকে নেমে সোজা সেই গাড়ির সামনে । তারপর মোটর গাড়ি ধরে তার কি আনন্দ ! পুতুল নিয়ে ব্রাঞ্চের ভিতর আসানের ছোটাছুটি । আসানের হুল্লোরে ননী বাবুরা খুশীতে আহ্লাদিত । ইতিমধ্যে ইতাস দোকান বন্ধ করে ব্যাঙ্কে ঢুকলো । ম্যানেজার বাবু চেম্বার থেকে বেরিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, “এবার কেক কাটা যাক” ।
ঠিক সন্ধ্যা সাতটার সময় ইমলির কোলে আসান । আসান নতুন ড্রেসে খুব ভাল সেজেছে । নতুন জামা কাপড় পরে এত লোকজনের মধ্যে আসান খুব চনমনে । হাসি খুশিতে ছটফট । ইমলির কোলে থাকা অবস্থায় আসান কেক কাটলো । মোমবাতির পাশে রাখা আগুনের ফুলকি জ্বলে উঠলো । তখন সম্মিলিত স্টাফদের কন্ঠে “হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থ ডে টু আসান ।“ তারপর সবার হাততালি । সকলের হাততালি দেওয়া দেখে আসানের ছোট্ট হাতে হাততালি । তারপর কেক খাওয়ার পালা ।
প্রবল উৎসাহে হাতে হাত লাগিয়ে স্টাফদের মধ্যে কেক ও কোল্ড ড্রিঙ্ক খাওয়ার উন্মাদনা । তারপর একটু পরেই খাবার খেতে বসা । দুজন স্টাফ আছেন, যারা অনেক দূরে যাবেন । বাস পাওয়ার ব্যাপার রয়েছে । রাত্রি অনেক হলে বাস পাওয়া সমস্যা ! তাই বেশী রাত না করে সকলে খেতে বসলেন । জয়তী মাসি ও সুফলের মা খাবার পরিবেশন করছে আর গদাই তদারকি করছে । পরিবেশন করার থালা বাসন এগিয়ে দিচ্ছে ইতাস । ম্যানেজার বাবু ফ্রায়েড রাইস মুখে দিয়ে বললেন, “ফ্রায়েড রাইস অতীব সুন্দর হয়েছে । মাংস ছাড়া শুধুমাত্র ফ্রায়েড রাইস খেতেও ভীষণ সুস্বাদু । আমাদের ম্যাডামের হাতে যাদু আছে । যার জন্য তার হাতের রান্না খেতে বড্ড সুস্বাদু । ননী বাবু খাবার খেয়ে উচ্ছ্বসিত । সকল স্টাফেরা আসানের জন্মদিনের খাবার খেয়ে উৎফুল্ল । ইমলির রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ । রাত্রি ৯টার আগে ব্যাঙ্কের বাবুদের খাওয়া শেষ ।
এদিকে আসান ঘুমিয়ে পড়লো । সুফলের মা এবং জয়তী মাসি খাবার খেয়ে বেরিয়ে গেল । মাংস বাঁচেনি । ফ্রায়েড রাইস ও চাটনি খেয়ে ইমলি ও ইতাস থালা-বাসন, রান্না ঘর, খাওয়ার জায়গা, ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করলো । তারপর ব্যাঙ্কের দরজা জানালা বন্ধ করে রাত্রি ১১টা নাগাদ সোজা বাড়ি ।
পরের দিন সকালে বাড়ির দোরগোড়ায় জনপ্রতিনিধি হঠাৎ হাজির ।
ইমলি তাঁকে আপ্যায়ন করে বললো, “স্যার ভিতরে আসুন” ।
“শুনুন ম্যাডাম, একটা খবর দিতে এসেছি । আমাকে বসলে চলবে না । আমাকে বর্দ্ধমান ছুটতে হবে ।“
আপনাদের মতো গণ্যমান্য মানুষের পায়ের ধুলো বাড়িতে পড়লে আমরা সম্মানিতবোধ করতাম ।
ম্যাডাম, আপনাদের এই জায়গার মালিক আগামী রবিবার কুসুমগ্রামে আসছেন । তিনি জায়গাটা রেজিস্ট্রি করে দিতে চান ।
স্যার আমরা একেবারেই তৈরী নেই । আর কিছুদিন সময় পেলে আমাদের পক্ষে টাকাটা জোগাড় করা সুবিধা হত ।
তিনি নিজে স্বয়ং আসছেন । তাঁকে বুঝিয়ে বলবেন । তিনি যথেষ্ট উদার প্রকৃতির মানুষ । আপনাদের আর্থিক সমস্যার কথা তিনি নিশ্চয় বুঝবেন ।
ঠিক আছে স্যার ।
জনপ্রতিনিধি সোজা বর্দ্ধমানে বেরিয়ে গেলেন । তাঁর নাকি পার্টির মিটিং রয়েছে । এই জন্যেই তাঁর ব্যস্ততা ।
ইমলি ও ইতাস পড়ে গেল ফাঁপড়ে । কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না । তাদের একটার পর একটা খরচা । অথচ উপায়ের জায়গা দুর্বল । ইমলি ক্যান্টিনে খাওয়া ছাড়া তেমন কিছুই পায় না । পার্ট টাইম ঝাঁট দেওয়ার কাজ করে যেটা পায় সেটাও অতি সামান্য । পয়সা জমানোর সুযোগ কোথায় ? আচমকা আর্থিক বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে গেল ইমলিরা । সে আপাদমস্তক দুর্শ্চিন্তায় বিভোর । ইমলি ইতাসকে আশ্বস্ত করে বললো, “জমির মালিক আসছেন জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে । সুতরাং চুক্তি অনুযায়ী জমির দাম রেজিস্ট্রির আগে মালিককে পেমেন্ট করার কথা । কিন্তু তাদের সামর্থ এই মুহূর্তে একদম নেই । আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে অফিস সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করছি । তাঁরা কি পরামর্শ দেয় সেটা তোমাকে পরে জানাচ্ছি ।“
যে যার কাজে মন দিলো ।
সুফলের মা দুপুরবেলায় আসানকে কোলে নিয়ে ব্যাঙ্কে ঢুকলো । আসানের জ্বর । গা পুড়ে যাচ্ছে । হঠাৎ জ্বর । ইমলি কিংকর্তব্যবিমূঢ় । সে বুঝতে পারছে না, তার কি করা উচিত ? সুফলের মা যদিও মেয়েকে একবার মাথা ধুইয়ে দিয়েছে । তবুও জ্বরের তেজ ঊর্ধ্বগামী । ননী বাবু পরামর্শ দিলেন, “কুসুমগ্রামের হোমিওপ্যাথি ডাক্তার তপাদারকে একবার দেখাতে । তিনি খুব ভাল হোমিওপ্যাথির ডাক্তার । বাচ্চাদের চিকিৎসায় তিনি খুব পারদর্শী । তিনি আমাদের ব্যাঙ্কের একজন কাস্টোমার । তাঁকে দেখালে আশা করি আপনার মেয়ে শীঘ্র ভাল হয়ে উঠবে” ।
হোমিওপ্যাথি ডাক্তার বাবু আসানকে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন । বললেন, “ভয়ের কারণ নেই । ঔষধ দিচ্ছি ভাল হয়ে যাবে । বাচ্চাদের এই রূপ একটু আধটু ঠান্ডা, জ্বর লাগাটা অস্বাভাবিক নয় । তাতে ঘাবড়াবেন না । প্রয়োজনে আমাকে সব সময় পাবেন” ।
ডাক্তার বাবুর হোমিওপ্যাথি ঔষধ ভীষণ কাজ করলো । আসানের জ্বর খুব তাড়াতাড়ি নিয়ন্ত্রণে এসে গেল । মেয়েকে নিয়ে ইমলির যে টেনশন ছিল সেটা অনেকটাই কেটে গেছে । তপাদার ডাক্তার বাবুর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা ইমলির খুব মনে ধরলো । প্রয়োজনে ডাক্তার বাবুর স্মরণাপন্ন হওয়ার চিন্তা মাথায় রাখলো ইমলি । আসলে ননী বাবু তাদের জীবনে একজন মুশকিল আসান মানুষ । তাদের সাংসারিক সমস্ত ব্যাপারে তিনি একজন যোগ্য পরামর্শদাতা । যার জন্য ইমলির হৃদয়ের মাঝে ননীদা বড় ভাই হিসাবে বিরাজিত । ননীদাকে ইমলি ও ইতাস দুজনেই ভীষণ শ্রদ্ধা করে ।
পোড়োবাড়ির মালিক সোজা ইমলিদের বাড়ি । যদিও তিনি মেমারীতে তাঁর কাকা শ্বশুরের বাড়ি উঠেছেন । তিনি কোনো সাতপাঁচে গেলেন না । সরাসরি ইতাস ও ইমলিকে বললেন জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রি করে নিতে ।
আমতা আমতা করে দুবার ঢোক গিলে ইতাস ভদ্রলোককে বললো, “স্যার, আমরা টাকাটা জোগাড় করতে পারিনি” ।
তাতে কি হয়েছে । টাকার জন্য জমি বাড়ি রেজিস্ট্রি আটকাবে না । আমি খোঁজ খবর নিয়েছি । আপনারা এদেশে অনাথের ন্যায় । নিজেদের বাঁচার তাগিদে আপনাদের লড়াই । কটা টাকার জন্য আমি লালায়িত নই । আমি চাই, জায়গাটা রেজিস্ট্রি করে দিয়ে হাল্কা হতে । আমার ভাললাগার জায়গাটা হচ্ছে, “এতকাল পৈতৃক ভিটেটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল । সেখানে আপনারা বসবাস শুরু করেছেন, অর্থাৎ জায়গাটা কাজে লেগেছে । আপনারা না এলে পোড়োবাড়ি পড়েই থাকত । ভুতের আড্ডা আরও বাড়ত । সেদিক দিয়ে আমি খুব খুশী । জায়গাটা অন্তত কাজে লেগেছে” ।
আগামীকাল রেজিস্ট্রি করে দিয়ে যাব । তবে হ্যাঁ, আমারও একটা শর্ত আছে । রাস্তা ঘেঁষে এককাঠা জায়গা আমার জন্য রাখা থাকবে । রাস্তা ঘেঁষে কুড়ি মিটার পেলেই চলবে । ভবিষ্যতে একটা ঘর বানিয়ে রেখে যাব । প্রয়োজনে বেড়াতে এলে সেই ঘরেই থাকব, আর খাওয়া দাওয়া আপনাদের সঙ্গে । কী, রাজি ?
অবশ্যই রাজি স্যার । আমাদের পরম সৌভাগ্য, আপনার মতো মানুষের সান্নিধ্য মাঝে মাঝে পাব ।
পরের দিন তিন কাঠা জায়গা সমেত পোড়োবাড়ি রেজিস্ট্রি হয়ে গেল । তবে জায়গার মালিক বলে গেলেন পুরো জায়গাটাই ভোগ-দখল করতে । তাঁরা কবে এসে ঘর বানাবেন বা আদৌ বানাবেন কিনা সেসব মনস্থির করার পর জানিয়ে দেবেন । ঘর বানালেও তার দেখ-ভালের দায়িত্ব ইমলিদের উপরে বর্তাবে । অবশেষে ব্যাঙ্কের স্টাফদের সহযোগিতায় অল্প কিছু টাকা জমির মালিকের হাতে তুলে দিলো ইতাস । জমির মালিক তাতেই সন্তুষ্ট ।
ভোরবেলা দোকান খুলে ইতাসের প্রথমে এক কড়াই ঘুগনি রান্না । রাতে ভেজানো থাকে মটর । ইতাসের ঘুগনি রান্নাটা খুব সুস্বাদু । তার দোকানের ঘুগনি খেয়ে এলাকার খরিদ্দারেরা সুনাম করেন । মটরের সাথে ছোটো টুকরো করে কাটা চন্দ্রমুখি আলু, আদার কিমা, নারিকেল কুচির ছোটো টুকরো, কিসমিস, আরও আনুষঙ্গিক মসলাপাতি দিয়ে এত সুন্দর সুস্বাদু করে, যার ফলে কোনো খরিদ্দার একবার ঘুগনি খেলে দ্বিতীয়বার তাঁর খেতে মন চাইবে ।
ইমলি অফিসে জয়েন করার পর ভোর থেকে সমস্ত বাসগুলির প্যাসেঞ্জারদের ইতাস অ্যাটেন্ড করে । ভোরের দিকে চায়ের খরিদ্দার বেশী । দুটো বিস্কুট ও এক কাপ চা, বাসের খরিদ্দারদের ন্যুনতম চাহিদা । অনেকে নোনতা বিস্কুট ও চিনি ছাড়া চা পছন্দ করেন । এমনকি গরম চা কেটলিতে ভরে বাসের জানালার পাশে বসা প্যাসেঞ্জারদের হাতে পৌঁছে দেয় । চায়ের দোকানে ইতাস প্রচন্ড খাটে । মাঝে মাঝে উদাস হয়ে ভাবে, চায়ের দোকানে যেভাবে খাটাখাটুনি করছে সেটা ইতাস কোনোদিন স্বপ্নে ভাবেনি । নিয়তির কেমন নির্দয় পরিহাস ! তার দুর্দশাগ্রস্থ কপালের কথা যখন ভাবে তখন ইতাস মনোকষ্টে বিষন্নতায় ভোগে ।
ক্যান্টিনের বাজার করতে গিয়ে ইমলি তাজা লোকাল কই মাছ দেখতে পেল । ইতাসের আবার কই মাছ খুব পছন্দ । তাই বাড়ির জন্য ইমলি কই মাছ কিনলো । সাতটা কই মাছে সাড়ে সাতশ গ্রাম ওজন । কই মাছের দাম বেশী । ইমলিদের মতো পরিবারে কই মাছ খাওয়া বড় লোকদের ঠাটবাটের সমতুল্য । তবুও ইতাসের কথা ভেবে কই মাছ কিনলো । ক্যান্টিনের জন্য পাবদা মাছ । কাঁচা সবজি আলু, ডাটা, পটল, কাঁচা কলা, মিষ্টি কুমড়ো নিয়ে ইমলি ব্যাঙ্কে ফিরলো । কই মাছ বাড়িতে সুফলের মাকে পৌঁছে দিয়ে ইমলি বললো, “মেয়ে ঘুমালে তুমি তেল কই রান্না করে রেখো । ইতাস এসে খাবে । রান্না হয়ে গেলে তুমি আগে খেয়ে নেবে । ইতাসের জন্য দেরী করবে না । মেয়ে উঠে গেলে তাকে আবার সামলাতে হবে” ।
সুফলের মা ইমলিকে পেছনে ডেকে বললো, “দেখছি তুমি সাত পিস্‌ কই মাছ এনেছো । আমি একটা কথা বলবো” ?
বলো মাসি, কি বলবে ?
তেল কই রাঁধলাম, এটা ঠিক আছে । বাকী তিনটি কই দিয়ে আমি লাউ শাকের পাতা দিয়ে পাতুরি বানাচ্ছি ।
সেটা কীভাবে বানাতে হয় তুমি কি জানো ?
হ্যাঁ জানি । জানি বলেই তো পাতুরি বানাতে চাইছি । আজ কই মাছের পাতুরি খেলে বুঝতে পারবে কি রকম সুস্বাদু !
তুমি যেটা ভাল বোঝো সেটা রান্না করো । ইতাসকে তেল কইয়ের ঝোল থেকে দুটো কই মাছ দেবে । ইতাসের তেল কই ভীষণ পছন্দ । আমার মাছটা রাতে খাব ।
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সুফলের মা ।
আসানকে কোলে নিয়ে সুফলের মা লাউ শাকের পাতা জোগাড়ে গাঁয়ে বের হল । তারপর বাড়ি ফিরে রান্নায় মনোযোগ দিলো । আসান ঘরের উঠোন দিয়ে খেলাধুলায় মত্ত । প্রিয় পুতুল নিয়ে তার খেলা । তিনি আবার দুষ্টুমিতেও ওস্তাদ ! একটু চোখের আড়াল হলে তার দুষ্টুমি বেড়ে যায় । লাউ পাতা ভাল করে ধুয়ে রাখলো । এবার বিভিন্ন ধরনের মসলা বেটে এমনকি জিড়ে বেটে একটা থালায় রাখলো সুফলের মা । মসলা বাটাটার উপর নির্ভর করছে পাতুরির টেস্ট । এবার কইটা হাল্কা করে একটুখানি ভেজে কই মাছের বডিতে মসলা মাখালো সুফলের মা । মসলা সমেত কই মাছ, লাউ পাতা দিয়ে জড়িয়ে সাদা সুতো দিয়ে এমনভাবে বাঁধলো যাতে খুলে মসলা বেরিয়ে না যায় । তারপর অল্প আঁচে ভাপাতে বসালো । অনেকে কই মাছ না ভেজেও পাতুরি বানিয়ে থাকে । যেমন ইলিশ মাছের ক্ষেত্রে কাঁচা ইলিশের পিস্‌ দিয়ে পাতুরি বানায় । তারপর কই মাছের তেল-কই ও পাতুরি রান্না শেষ । এবার ভাত বসিয়ে দিলো ।
ইতিমধ্যে ইতাস বাড়িতে হাজির । বাবাকে দেখতে পেয়ে আসান খুশীতে ভরপুর । ছুটে গিয়ে বাবার কোলে । ইতাস মেয়েকে কোলে নিয়ে খানিকক্ষণ রাস্তা দিয়ে চক্কর খেলো । বাবার কোলে চেপে মেয়ের পাড়া ঘুরতে খুব মজা পায় ।
সুফলের মা বললো, “বাছা ! মেয়েকে রেখে স্নান সেরে এসো । রান্না রেডি “।
ইতাস স্নান সেরে খেতে বসলো । মেয়েও বাবার সাথে খেতে বসলো । মেয়ের খাবার রান্না অন্য রকমের । সেখানে ঝালের বালাই নেই । পাতুরি খেয়ে ইতাস অবাক ! জীবনে এই প্রথম তার কই মাছের পাতুরি খাওয়া ! পাতুরি ও তেল কই দিয়ে ভাত খেয়ে ইতাস আহ্লাদিত ।
মেয়েকে খাইয়ে দিয়ে সুফলের মাকে বলে গেল আসানকে ঘুম পাড়িয়ে দিতে ।
 ( চলবে )