প্রেমের কোন ধর্ম নেই : চায়না খাতুন।

0
338

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আকাশে রঙের আরতি দেখতে দেখতে তুলিকা শুনতে পায় মসজিদের আজান।
নাট মন্দিরে কাঁসর ঘন্টাধ্বনি শুনে মিজান তুলিকাকে বলে – কই রে, ঠাকুর দেখতে যাবি না ?
তুলিকা রাগ দেখিয়ে বলে সেই কখন থেকেই তো অপেক্ষা করছি, কিন্তু তুমি তো বিড়ি টেনেই যাচ্ছ।
মিজানের হাতে বিড়ির শেষ অংশটুকু তখনও জ্বলছে,
তুলিকার দিকে এক পলক দেখেই মিজান আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ওড়না মাথায় ওকে কি সুন্দরীই না লাগছে,
ও মনে মনে লোভ সংবরণ করে বলে – এটা তোর ঠাকুর দেখার সাজ হয়েছে?
তুলিকা বিব্রত হয়ে বলে তোমাকে খুশি করতে আমার বয়েই গেছে।
তুলিকাকে দেখতে আজ নতুন কোনে বৌ – এর মতো লাগছে,
তবুও মিজান বুঝতে দেবে না তুলিকার প্রতি তার ভালো লাগা ভালোবাসার কথা ।
তুলিকা রাগ দেখিয়ে বন্ধুদের বলে – তোদের আড্ডা যদি শেষ হয়ে থাকে তাহলে যাবি কি ঠাকুর দেখতে?
উচ্ছ্বসিত হয়ে ওরা বলে মিজান গেলে আমাদের আপত্তি নেই।
মিজান উঠে বিড়ির জলন্ত অংশটা পায়ে পিষে ফেলে
বলে – ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ —-‘।

ছোট থেকেই তুলিকা মুসলিম পরিবেশেই বড়ো হয়েছে। সেই নিয়ে কখনও কোন সমস্যায় পড়েনি তুলিকার পরিবার। কবি নজরুলের ‘একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু মুসলমান’ ওদের অস্তিত্বে মিশে গেছে এতোদিন।
একদিন মিজানকে তুলিকা বলেছিল মিজানদা তুমি ভালোবাসো না কাউকে ?
কথা শুনে মিজান প্রাণ খুলে হেসেছিল সেদিন।
মিজানের‌ এক মুখ খোলা হাসিতে কেঁপে উঠেছিল আকাশ,
তারপর তুলিকাকে রবিঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল বাসি তো, ভীষণ ভালোবাসি, আমার মন প্রাণ জুড়ে শুধু রবিঠাকুর।
তুলিকা রেগে গিয়ে বলেছিল সে তো জানি কিন্তু আর কোনো কিছু ?
আর, আর – বাংলাদেশের নদী, পাখি, ফুল।

মিজানের ভালোবাসার হেঁয়ালিতে তুলিকা আর কোনদিন জানতে চায়নি ভালোবাসার কথা।
তুলিকা সেদিন শুনতে চেয়েছিল মিজান তুলিকাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলুক কেন তুই বুঝিস না আমি যে তোকেই–
অমিত আর লাবণ্যর থেকেও অনেক অনেক বেশি।
ঐ যে নীল আকাশ দেখছিস ? ঠিক তার মতো !
না না ঠিক বলছি না ঐ নীল পাহাড়ের মতো,
দূর সে আর কতোটুকু?
একেবারে তুই আমার অথই সমুদ্র
এটাও বোধহয় ঠিক হলো না বুঝলি?
এবার সঠিক বলি- তুই তো আমার এক পৃথিবী। তারপর দেখতে দেখতে কুড়িটা বসন্ত কেটে গেল ,
আজও তুলিকাকে ভালোবাসার কথা স্বীকার করেনি মিজান।

খুনসুটির মধ্যেই বেড়ে চলেছিল ওদের অব্যক্ত ভালোবাসা।
আজ অষ্টমীর সন্ধ্যায় তুলিকা দু চোখ বন্ধ করে যখন
মা দূর্গার কাছে সকলের মঙ্গল কামনায় ব্যস্ত,
ঠিক তখন কয়েকজন মুখ ঢাকা জোব্বা পড়া লোক মন্ডপে ভাঙচুর শুরু করল।
হঠাৎ এমন ঘটনায় সবাই আতঙ্কে এদিক ওদিক ছুটতে লাগলো,
মিজান ছুটে গিয়ে বাধা দিয়ে বলল তোমরা ভাঙচুর করছো কেন?
ওদের কন্ঠে উত্তেজনা পুড়িয়ে দাও ,‌ভেঙে দাও, শেষ করে দাও সব ।
মিজান দুষ্কৃতিদের বাধা দিয়ে চিৎকার করে বলল কেন ভাঙছো, পোড়াচ্ছ কেন ?
এই সবই তো আমাদের,‌ আমরা যে সবাই ভাই ভাই।
মানুষের চেয়ে বড়ো ধর্ম যে কিছু নাই।
হিংসার আগুনে জ্বলে ছাই হয়ে যাবে সব বাঁচবে না কিছুই, না মানুষ,না পুঁথি – ধর্ম।
শোনেনি মিজানের কোনো কথাই তারা,
দূর থেকে একটা বড়ো ইটের টুকরো লাগলো মিজানের মাথায়,
রক্তে ভেসে যাচ্ছে মিজানের দেহ।
তুলিকার ওড়নায় আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছে ওর শরীর, যন্ত্রণায় চিৎকার করে বলছে মিজানদা বাঁচাও, বাঁচতে চাই আমি।
ধোঁয়া ধূসরিত চারিদিক,
মিজান রক্তাক্ত দেহে ঝাঁপিয়ে পড়ে তুলিকাকে বাঁচাতে, লেলিহান শিখা তার লকলকে জিভ দিয়ে পুড়িয়ে দেয় মন্ডপের ভিতর বাহির।
দুটো দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেল চোখের সামনে।
পুড়ে যাওয়া মন্ডপের কালো ছাই দুষ্কৃতিদের চোখে মুখে !
পোড়া মাংসের গন্ধ তখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে দূর দূরান্তে,
দুটি নিষ্পাপ প্রেমিক প্রেমিকার আত্মাহুতি আর বেঁচে থাকার আকুতির কান্না মাথা খুঁড়ছে বাতাসের প্রাণে
যদি মানুষের চেতনা ফেরে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here