ঝিঙে পটল (ধারাবাহিক, অষ্টাদশ পর্ব) : দিলীপ রায় (+৯১ ৯৪৩৩৪৬২৮৫৪)।

0
237

বিপদ বুঝতে পেরে রূপক প্রমাদ গুণলো, কীভাবে পেছনের আগন্তুকদের কাছ থেকে নিস্তার পাওয়া যায় । রাস্তা-ঘাট রূপকের চেনা । এলাকা সম্বন্ধে রূপক ভালভাবে অবগত । সে বুঝতে পারলো, এই অবস্থায় আগন্তুকদের হাত থেকে বাঁচতে গেলে শারীরিক শক্তির চেয়ে বেশী প্রয়োজন বুদ্ধির !
অন্যদিকে পেছন থেকে ঝিঙে অনবরত রূপককে তাগাদা দিচ্ছে, আরও জোরে বাইক ছোটাবার জন্য । কেননা দুর্বৃত্তরা সংখ্যায় পাঁচজন । সম্ভবত তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ! তারা কাছাকাছি এলে ঝিঙেদের বিপদ বেশী । দুর্বৃত্তরাও ঊর্ধ্বশ্বাসে বাইক ছোটাচ্ছে । এমনকি দুর্বৃত্তদের হুঙ্কার শোনা যাচ্ছে । ঝিঙে পুরোটাই ধন্দে, “তারা কারা ? তাদের উদ্দেশ্যেই বা কী ? তারা কী চায় । তবে কী আগের সেই নারী পাচারকারি চক্রের মানুষ !” কিছুই ব্যাপারটা অনুধাবন না করতে পেরে শুধু রূপককে চাপ দিচ্ছে, “বাইক জোরে চালাও !”
অন্য উপায় না পেয়ে রূপক লোহাদহের ঘাটের দিকে বাইক ঘোরালো । খেয়া ঘাটের কাছে সোনাইডাঙ্গা গ্রামে আসলাম আলীদের বাড়ি । রূপক সোজা আসলাম আলীদের বাড়ির সদর দরজায় কড়া নাড়লো, “আসলাম, শিগ্‌গির দরজা খোল্‌ । আমাদের বিষম বিপদ ।“
রূপকের গলা পেয়ে ততক্ষণে আসলামের বড় ভাই বিছানা ছেড়ে দরজা খুলে দিয়ে বলল, “বিপদ ! কীসের বিপদ !”
ভিতরে ঢুকে রূপক নিজেই সদর দরজা বন্ধ করে দিলো যাতে আন্তুকেরা ঢুকতে না পারে । ইতিমধ্যে আসলামের মা-বাবা ও বাড়ির সবাই হাজির । তাঁদের কৌতুহলি দৃষ্টি ! রূপকের সঙ্গে ঝিঙেকে দেখে আসলাম আরও অবাক !
“এত রাত্রিতে তোরা দুজন কোথা থেকে এলি ?” জানতে চাইলো আসলাম ।
“আমার জন্মদিনের পার্টিতে সব বন্ধুরা আমন্ত্রিত । সেখানে ঝিঙেও উপস্থিত ছিলো । রাত্রি বেশী হওয়ার দরুন ঝিঙেকে বাইকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়াই উদ্দেশ্য । কিন্তু পথে অস্ত্রধারী পাঁচজন দুর্বৃত্ত তাদের তাড়া করে । কেন তাড়া করলো, সেটা তার অজানা ! তাদের হাত থেকে বাঁচতে তোদের বাড়িতে ঢোকা ।“ রূপক উত্তরে সব খুলে বলল ।
ঘটনাটা শোনামাত্র আসলামের বড় ভাই রূপকের বাইক নিয়ে বড় রাস্তায় ছুটলো, কারা তাদের পেছনে ধাওয়া করেছে জানার জন্য । বড় রাস্তায় এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে, আসলামের বড় ভাই পুনরায় বাড়ির দিকে রওনা দিলো । হঠাৎ দূর থেকে আওয়াজ ভেসে এলো, “কাজটা ভাল করলি না । আমাদের হাত থেকে মেয়েটাকে ছিনিয়ে নিলি ?”
“সাহস থাকলে আমার সামনে আয় । আমিও বাঘের বাচ্চা । তোদের কীভাবে শায়েস্তা করতে হয়, আমি সেটা ভালভাবে জানি ।“ পাল্টা হুঙ্কার দিলো আসলামের বড় ভাই ।
আসলামের বড় ভাই এলাকার ডাকসাইটে জননেতা । যেমনি শারীরিকভাবে শক্তিশালী, তেমনি তাঁর দুর্দমনীয় সাহস । তাঁর মধ্যে ভয়ডর নেই । তা ছাড়া মানুষটি নিস্বার্থভাবে এলাকায় জনহিতকর কাজকর্মে জড়িত । প্রত্যেকের কাছে আসলামের বড় ভাই অত্যন্ত আপনজন । ইতিপূর্বে অনেক দুস্কৃতিদের তিনি নিজের হাতে শাস্তি দিয়েছেন । যার জন্য এলাকায় তাঁকে চটাতে কেউ সাহস পায় না । সম্ভবত দুস্কৃতিরাও সেটা জানে । রূপক আসলামের বড় ভাইয়ের খুঁটিনাটি জানে বলেই ঝুঁকি নিয়ে সোজা আসলামদের বাড়ি । অন্যদিকে আসলাম রূপকের একজন ভাল বন্ধু ।
তারপর আসলামের বড় ভাই লক্ষ্য করলো, আগন্তুকগুলি বাইক নিয়ে বহরমপুরের দিকে ফিরে যাচ্ছে ।
আসলামের বড় ভাই ও আসলাম দুজনে মিলে গাড়িতে ঝিঙেকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার জন্য রওনা দিলো ।
“এদিকে বোন বাড়ি ফিরছে না ।“ সেই টেনশনে পটলের মাথায় দুশ্চিন্তার একরাশ বোঝা ! রাত্রি বাড়ছে, অথচ বোনের দেখা নেই । অজানা দুশ্চিন্তায় একবার ঘরের ভিতর, আর একবার ঘরের বাইরে পটলের পদচারণা সমানে চলছে । কী করবে, কোথায় খুঁজবে, ঠিক ঠাহর করতে পারছে না পটল । বোনটাকে যাওয়ার সময় পটল পইপই করে বলে দিয়েছিলো, “রাত্রি না করতে !” কিন্তু বোনটার ফিরতে কেন রাত্রি হচ্ছে সেটাই পটলের মাথায় একদম ঢুকছে না । মোবাইলে যোগাযোগ করার কয়েকবার চেষ্টা করেও সে বিফল । কেননা, মোবাইলে সর্বক্ষণ “নট রিচেবল” আওয়াজ শোনাচ্ছে ।
পটল আর স্থির থাকতে পারলো না । পাঁচ ব্যাটারির টর্চ লাইট হাতে নিয়ে সোজা স্টেশন । স্টেশনে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো, খাগড়াঘাট থেকে এখন কোনো ট্রেন নেই । রাত্রি সাড়ে দশটার শেষ ট্রেন চলে গেছে । পরের ট্রেন অনেক রাত্রিতে । সেটা আবার এক্সপ্রেস । সব স্টেশনে দাঁড়ায় না । সুতরাং ঝিঙের ট্রেনে বাড়ি ফেরবার আর সুযোগ নেই । ট্রেনের খবর নেওয়ার পর পটলের মুখ আরও শুকিয়ে গেলো, “তবে কী বোনের আবার বিপদ !” বিপদের কথা ভাবলেই পটলের আতঙ্ক ! তার চোখ জলে ভরে ওঠে । বড় রাস্তায় বাস স্টান্ডে এসে দাঁড়ালো । একটা লরি তার দিকেই ধেয়ে আসছে । হাত দেখাতেই লরিটা দাঁড়িয়ে পড়লো । স্টোন চিপসের লরি । স্টোন চিপস নিয়ে লরিটা মানিক্যহার যাচ্ছে । পটল ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলো, “রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনার খবর আছে কিনা ?” মাথা নেড়ে ড্রাইভার জানালো, তাদের নজরে পড়েনি ।
এমন সময় চার চাকা গাড়ি ঠিক পটলের সামনে হাজির ।
গভীর আতঙ্কে পটলের তখন মনের মধ্যে ছটফটানি ! তাই পটল চার চাকা গাড়ির দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ।
ঝিঙে গাড়ি থেকে নেমে সোজা পটলের বুকে মাথা রেখে বলল, “দাদা, আমি এসে গেছি ।“
পটলের চোখে তখন বোনকে ফিরে পেয়ে আনন্দাশ্রু !
রূপক বাইক নিয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে । দাদা-বোনের মিলনের দৃশ্য দেখে রূপকও আবেগে ভেসে গেলো । তার চোখেও জল !
ঝিঙে রূপককে আলাপ করিয়ে দিয়ে বলল, “রূপকের জন্মদিনে সে চৌরিগাছা গিয়েছিলো ।“ তারপর ঝিঙে আবার বলল, “আসলাম রূপকের খুব ভাল বন্ধু ও আসলামের পাশে তার বড় ভাই ।“
সবাইকে আপ্যায়ন করে ঘরে বসালো পটল ।
আসলামের বড় ভাই বললেন, “আজ আমাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিন । অনেক রাত হয়ে গেছে । আপনি টেনশনে ছিলেন । বোন বাড়ি ফেরায় আপনিও টেনশনমুক্ত ! সুতরাং পরে এসে আপনার সঙ্গে অনেক গল্প করে বাড়ি ফিরবো ।“ রূপক পটলের দিকে তাকিয়ে বলল, “দাদা, আমি পরে আপনার সাথে দেখা করতে আসবো । আপনার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছা রইলো ।“
তারপর বেশ কিছুদিন কেটে গেলো ।
ঝিঙে পাশ করলো । সে এখন অনার্স স্নাতক ।
পটল খুব খুশী । বোনের পাশের খবরে উচ্ছ্বসিত । পড়াশুনার লক্ষে বোনটা ঠিকমতোই এগোচ্ছে । তার ইচ্ছা, বোনটা যতদূর চায় পড়ুক ।
ঝিঙে নিজেও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে চায় ! পড়াশুনায় তার থামার লক্ষণ নেই । চাকরির ব্যাপারে খোঁজ খবর নিচ্ছে । যদিও এতদিন চাকরির জন্য কোনো দরখাস্তের ফর্ম ভরেনি । একটাই কারণ, সে চায় সর্বভারতীয় পরীক্ষায় বসতে । সেক্ষেত্রে মিনিমাম গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি খুব দরকার । এবার সে ধীরে অথচ সঠিকভাবে পদক্ষেপ নিয়ে সর্বভারতীয় পরীক্ষায় বসতে চায় । ইতিমধ্যে ঝিঙে বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হল । সেই সঙ্গে চললো তার প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি । তার মূল টার্গেট, “আই-এ-এস” পরীক্ষায় সফল হওয়া । সে এখন মানসিক দিক দিয়ে অনেক চাঙ্গা ! পড়াশোনায় তার কোনো শিথীলতা নেই । সেখানে গভীর মনোযোগ ষোলোআনা ।
বিকেলের চা খাওয়ার সময় দাদার কাছে হঠাৎ ঝিঙের আবদার ! আহ্লাদে ঢলে পড়লো দাদার কোলে । দাদার কোলে মাথা রেখে ঝিঙে বলল, “দাদা, অনেকদিন থেকে ভাবছি, একটা দরকারি কথা বলবো ?”
নিশ্চয় বলবি । এবার তোর দরকারি কথা শুনি ।
আগেই কিন্তু “না” করলে চলবে না !
হেঁয়ালী ছেড়ে আসল কথা বল্‌ দেখি । তোর কথা শোনার জন্য আমি মুখিয়ে রয়েছি ।
“দাদা, এবার তুমি বিয়ে করো !” ঝিঙে সটান দাদাকে বলে দিলো ।
পটল কোল থেকে বোনের মাথা সরিয়ে বলল, “দূর পাগলি । আমি এখন বিয়ে করছি না । যতদিন তোর বিয়ে না হচ্ছে, ততদিন তুই আমার বিয়ে নিয়ে একটিও কথা বলবি না প্লিজ !”
 ( চলবে )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here