প্রজাতন্ত্র.. : ডঃ অশোকা রায়।

    0
    177

    খড়্গপুরের লোক্যালে উঠেছি| প্রায় ভোর সকালের ট্রেন | শীতকালে সাতটার আশপাশের কোন ট্রেন কে ভোরের ট্রেন বলা চলে | কাক-ভোরের ট্রেন তো বলিনি | এই দেখুন আপনাদের সাথে শুধু শুধু কেমন কাজিয়া জুড়ে দিলাম সাতসকালে! আসলে মনের বিরুদ্ধে চলেছি মেদিনীপুর | খড়্গপুর থেকে বদল করব ট্রেন|
    মা কে রেখে এসেছি মাসীর বাড়ি দর্জিপাড়ায় | কারবালা ট্যাঙ্কের আমাদের মা- ছেলের বাসা বাড়ি তালাবন্ধ করে এসেছি | চোরে আর কি নেবে, কিছু জামাকাপড়,..
    মা আর ছেলের| আর কিছু বাসন পত্তর, আমার ভালোবাসার কিছু বই আর সেমি- দরকারি কিছু কাগজপত্র| সেমি দরকারি বললাম, এই কারণে, মায়ের মতে, কাগজ গুলো অদরকারি, আর তার বকবকানিতে কান না দিলে, সেগুলো যাবে পুড়তে…
    এই হুমকি আমি খাই নানান ভাবে, নানান পরিস্থিতিতে | যাক গে যাক, আপনাদের সাথে কথা বলতে বলতে ভেন্ডারের থেকে চা কিনেছি কড়কড়ে দশটাকার নোট দিয়ে | বলুন তো, বেকার ছেলের কেমন লাগে! তবে পকেটে আমার এখন একটা এ্যাপয়ন্টমেন্ট লেটার, মেদিনীপুরের এক হায়ার সেকেন্ডারী স্কুলের | নিন, নিন প্রশ্ন করুন আমাকে, চাকরি পেয়েছি তো, মাথাগরম কেন তবে? চায়ে চুমুক মারতে তো দিন, একবার… ভণিতা না করে বলে ফেলছি কারণটা | মেদিনীপুরে চাকরি আমার, পলিটিক্যাল সায়েন্সের টিচার | মেদিনীপুরে শহরের স্কুলে হলে হয়তো মা কে আনতাম, কিন্তু এ যে গ্রাম | চিরকালের শহরে থাকা মায়ের গ্রামে আসাতে আপত্তি | ভন্ডামি করছি না, মায়ের সাথে যত মনোমালিন্য হোক, মা ছাড়া আমি থাকতে পারি না | কখনো থাকিনি তো|হ্যাঁ আমি মেদিনীপুরের বালুটিয়া গ্রামের এক স্কুলে চাকরি পেয়েছি | স্কুলটা এই গ্রামে সরকারী অনুদানে এই প্রথম হায়ার সেকেন্ডারী সেকশন চালু করেছে | স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা দেওয়ার অনেক দিন পর্যন্ত চটির শুকতলা ক্ষয়াতে হয়েছে আমায় মেরিট লিস্টে মোটামুটি মাঝারি স্হানে নাম থাকা সত্ত্বেও | শেষে চাকরির নিয়োগ পত্র আমার পকেটে | খড়্গপুর আসছে, নেমে পড়ি,… কানেক্টিং ট্রেনটা ধরতে হবে | আপনারা রইলেন তো আমার সাথে, পরে কথা হবে |
    অনেক ঝামেলার পর পৌঁছেছি মেদিনীপুর | আসার আগে মেদিনীপুর সম্পর্কে অল্পবিস্তর পড়াশোনা করে এসেছি | আসলে ব্রেনী না হলেও স্টুডিয়াস আমি | তাই স্টুডেন্ট জীবনে পাশ – ফেলের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাইনি | এ্যাকাডেমিক কেরিয়ারে বছর – লসের রেকর্ড আমার নেই |
    এবার মেদিনীপুরের গল্প বলি শুনুন | পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ – পশ্চিমে কংসাবতী নদীর তীরে মেদিনীপুর | কংসাবতী কালিদাসের মেঘদূত – কাব্যে “কপিশা”| কিংবদন্তী, সমুদ্রের কাছে বাগদত্তা কংসাবতীকে দামোদর রূপে কৃষ্ণ আলিঙ্গন করতে এলে কংসাবতী দ্রুত অগ্রসর হয়ে সমুদ্রে লীন হয়ে যায় |অনেকে বলে, মাদানীশাহ নামে এক পীর এখানে বাস করতেন, তার নাম থেকেই মেদিনীপুর নামের উৎপত্তি | কেউ বলে, মেদিনীমাতার মন্দিরের অবস্হান থেকে মেদিনীপুরের নাম | আবার কারো মতে মেদ উপজাতির নামানুসারে মেদিনীপুর | মতান্তর থাকলেও মেদিনীপুরের একটা ঐতিহ্য রয়েছে | আইন – ই আকবরে মেদিনীপুরের উল্লেখ রয়েছে |
    ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে বোধহয় | সরাসরি এবার আমার গল্পে চলে যাই | আগের অংশটা উপক্রমনিকা হিসাবে ধরলে পরে গল্পের নির্যাস বুঝতে সুবিধা হবে |
    আমি সেদিন বালুটিয়া গ্রামে পৌঁছে আতান্তরে পৌঁছেছি | আমার আস্তানা সম্পর্কে এ্যাপয়ন্টমেন্ট লেটারে বা ভার্বালি কোন ইন্স্ট্রাকসন দেয়া হয় নি | চাকরি পাওয়ার আনন্দে আর মা সম্পর্কে দুশ্চিন্তায় সব তালগোল পাকিয়ে গেছে | শীতের আদুরে বিকেলের হাই উঠছে ঘন ঘন, চোখ বন্ধ হবো, হবো | ডাহুকের ডানায় ভর করে বালুটিয়ায় জানুয়ারির সন্ধ্যা নামবো- নামবো| দুশ্চিন্তায় আমার শীত শীত করছে | সাত – পাঁচ ভাবছি যখন, দৌড়ে দৌড়ে আসতে দেখলাম এক মেয়েকে, পরণে ধুপছায়া রঙের শাড়ি | পিঠে লম্বা এক বিনুনি | গায়ের রঙ শ্যামলা বললে প্রশংসা করা হবে | বলতে হয় মেয়েটা কালো |তবে কালো মেয়ের কালো হরিণ চোখে বর্ষার সজল মেঘের নিবিড় ছায়া | আমি বাক- রূদ্ধ | স্তম্ভিত ফিরে পাই, মেয়েটা শুধায়, ” রাষ্ট্র বিজ্ঞানের নতুন মাস্টার মশাই?” ছোট্ট উত্তর বের হয় আমার কন্ঠ থেকে,” হুম |” ছোট্ট সংযত উত্তর কি
    প্রশ্ন কর্ত্রী অপরিচিতা বিপরীত লিঙ্গ বলে? না গ্রামের গাঢ় শীতের কাছে আমার শহুরে শীত – পোশাক স্বল্প? নাকি আমি কাঁচপোকার মতো আটকে গেছি কাজল – নয়না হরিণীর সুললিত কণ্ঠ -সুধায়? মেয়েটা পরিচয় দেয় এবার, আমি সুধা, ঐ স্কুলে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী | সেক্রেটারি জ্যাঠা আমায় বললেন, আপনাকে আপনার আস্তানা দেখিয়ে দিতে | উনিই আসতেন, আমার প্রয়োজন হতো না, কিন্তু ওঁনার খুব জ্বর | ম্যালেরিয়া হবে হয়তো | আর প্রধান স্যার গেছেন ময়নাগড়ে, ওঁনার বাড়িতে, নাতির অন্নপ্রাশন | তবুও তো আজ রোববার | নইলে ওঁনার ছুটি ক্যানসেল হতো, আপনার আসার জন্যে| লক্ষ্য করছি, মেয়েটা বেশি কথা বলে, কিন্তু নির্লজ্জ প্রগলভ নয় | ইমপর্টেন্ট সব ইনফরমেশন দিচ্ছে, আর তা ছাড়া তার কথা শুনতে শুনতে অন্ধকারে জোনাকির আলোয় কখন যে, গেঁয়ো মেঠো পথ শেষ হয়ে গেল,… বুঝতেই পারলাম না | একটা পাকা বাড়ির সামনে এসে মেয়েটা হাঁক দিল, ও হরি কাকা, ও পদ্ম মাসী, তোমরা দেখছি দাঁড়িয়ে আছো গেটের সামনে, মাস্টার মশাই এসেছেন | সব ঠিকঠাক আছে তো? দুই স্বামী- স্ত্রী মাথা নাড়ে, “হ্যাঁ তুমি যেমনটা বলে গেছো, ঠিক তেমনটা করে রেখেছি |” ” তবে দাও, মরশুমী ফুলের স্তবক, মাস্টার মশাই কে দিয়ে এখান থেকে বিদেয় হই | বাব্বা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যটা ভালো ভাবে পালন করতে পারলাম | নাহলে জ্যেঠু কানমলা দিত |” তোড়াটা কোনক্রমে আমার হাতে ধরিয়ে “চলি মাস্টার মশাই,” …. বলে সুধা পগারপাড়| আমি ফ্রেশ হবার তোড়জোড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি | পদ্ম জিজ্ঞেস করে,” কি রান্না করব? ” হাওয়াই চটিটা বার করতে করতে বলি,” খিচুড়ি আর ডিমভাজা | এই ঠান্ডায় দারুণ জমবে |” পদ্ম হেসে ঘোমটা একটু বাড়িয়ে চলে যায় |
    ক্লান্ত দেহে রাতটা কেটে যায় নিটোল ঘুমে | বালুটিয়ায় আমার প্রথম সূর্যোদয় |ভালো লাগার সোনালী আলোয় হৃদয়ের একূল ওকূল.. দুকূল ভেসে যায় | পদ্ম ঘরে এককাপ চা নিয়ে ঢোকে | চায়ের উষ্ণতা আর বালুটিয়ার নৈসর্গিক দৃশ্যমানতার সৌন্দর্য .. দুয়ে মিলে বালুটিয়ায় আসা নিয়ে আমার দ্বিধা উধাও | বোধহয় বালুটিয়ার প্রেমে পড়ে গেলাম| কিন্তু প্রেম নিয়ে বিলাস করার সময় এখন নেই | দশটা থেকে স্কুল | আজ আমার জয়েনিং | তারিখটা চৌদ্দই জানুয়ারি, সোমবার | মাঝমাসে জয়েনিং,.. ওপর ওলার মর্জি | চটপট তৈরি হয়ে নিই | সুধার হরি কাকা কে জিজ্ঞেস করে জেনেছি, আমার এই আস্তানা থেকে স্কুলের দূরত্ব বড়ো জোর পায়ে হেঁটে দশমিনিট | দ.. শ.. মি.. নি.. ট | মেজাজ বিগড়েছে আমার | বয়েসে নবীন এবং আর সব কিছুতে আমার এনার্জি থাকলেও হাঁটাতে প্রচন্ড এ্যালার্জি | মনে পড়ে, একদিন কফিহাউসে আমাদের আড্ডার ঠেকে পোড়া নিকোটিনের বিষাক্ত কুন্ডলীতে আমাদের মুখগুলো আবছা ঢেকে নরক গুলজার করছি, তখন ছড়িয়েছে সেই খবর,.. কোন এক মাঝারি মাপের রাজনৈতিক নেতার বিপক্ষ দলের কর্মীদের হাতে শহীদ হওয়ার কারণে সারা কলকাতা টোট্যালি অচল | তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরা পোস্ট গ্রাজুয়েশনের ছাত্র | মাথায় আমার বাজ ভেঙে পড়েছিল, – ” বাড়ি যাব কি করে?” বন্ধু দের হাসির হররা উঠেছিল, “তোর বাড়ি কি যাদবপুর না হাওড়া? কলেজ স্ট্রিট থেকে কারবালা ট্যাঙ্ক হেঁটে যেতে এত কষ্ট?” ন্যায্য প্রশ্ন | লজ্জায় আমি অধোবদন | সেদিন সুব্রত আমায় বাঁচিয়েছিল, ” কখন বাস – ট্রাম বা ট্রেন চলবে জানি না| আজ আমার উত্তর পাড়ায় পৌঁছানো অসম্ভব | চল, সৌগত, তোর বাড়িতে শেল্টার নিই |” সুব্রত তড়িঘড়ি আমায় নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল পথে, ” তোকে নিয়ে আর পারা যায় না | নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করিস কেন? ” আমি সৌগত | বেশ মনে আছে সেদিনটা ছিল এক বিশেষ দিন, – ছাব্বিশে জানুয়ারি | ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস | সকালে কলকাতায় জ্যামজট হলেও, রেডরোডে কুচকাওয়াজ আর ট্যাবলো প্রদর্শনী শেষে সব অল ক্লিয়ার ছিল | তাই বন্ধুদের ফোনে ফোনে বার্তা বিনিময়, “চলে আয় কফি হাউস, বিকেল ঠিক চারটেয় |”
    আমি পদ্মর হাতে তৈরি ভাত আর পুকুরে ধরা টাটকা মাছের উপাদেয় ঝোল খেয়ে তৈরি স্কুলে যাবার জন্য | হরি কাকা একটা সাইকেল নিয়ে হাজির, ” মাস্টার মশাই এতে যান, কষ্ট হবে না |” আমি আড়চোখে তাকাই হরি কাকার দিকে,” যাঃ শালা, এ’ ও কি বুঝে ফেললো হাঁটার ব্যাপারে আমার দুর্বলতা!” পরে মনকে সান্তনা দিই, এটা মাস্টার মশাইের স্পেশাল সম্মান | আরোপিত গাম্ভীর্যে হরি কাকা কে বলি, “সাইকেল খানা যোগাড় হলো কোত্থেকে?” বিনয়ের অবতার হরি কাকা বলে, ” আজ্ঞে, এটা আমার | ” ভাগ্যিস হরি কাকা সাইকেলটা দিয়েছে | সাইকেলেই স্কুলে পৌঁছতে লাগলো আমার দশ মিনিট তেরো সেকেন্ড | সাইকেলে আসতে আসতে ভেবেছি, আচ্ছা সুধা কেন হরি কাকা কে কাকা আর তার বৌ কে পদ্ম মাসী বলে? পরে জেনেছি, হরি আর পদ্ম দুজনেই গ্রামের বাসিন্দা | ওরা প্রেম করে বিয়ে করেছে | স্বাধীন ভারতের স্বাধীন নাগরিক | এ’ অধিকার তাদের আছে | আচ্ছা ব্যামো আমার, কথায় কথায় পলিটিক্যাল সায়েন্সের রেফারেন্স টেনে আনা | পরাধীন ভারতে কম হলেও প্রেমজ- বিয়ের উদাহরণ বিরল নয় | আজ সকালে জেনেছি হরি কাকা আর পদ্ম মাসীকে আমার দেখভালের জন্য বহাল করেছে সেক্রেটারি বাবু | মাইনেটা আমায় দিতে হবে| অসুবিধা নেই, আমার পক্ষে এ্যাফোর্ডেবল |
    এগারো ক্লাসে সংবিধানের প্রস্তাবনা পড়াচ্ছি | আজ জানুয়ারির কুড়ি তারিখ | ছাত্র – ছাত্রীদের দের সাথে এই অল্প দিনেই আমার আলাপ জমে গেছে | ওরা আমাকে পছন্দ করছে, আমার পড়ানো ওদের মনে গেঁথে যাচ্ছে.. আমার সিক্সথ সেন্স কাজ করছে | আমি বই খুলে পড়াই না, গল্প বলার ঢঙে পাঠ্য বিষয় বস্তু পেশ করি | কোন ছাত্র – ছাত্রীকে অন্যমনস্ক হবার স্কোপ দিই না | কিন্তু প্রথম বেঞ্চে বসা সুধার চোখে যেন পলক পড়ে না | সন্দেহ হয় আমার, ও কি সত্যি সত্যি পড়ানো শোনে আমার, না কি আমার মুখের দিকে নিষ্পলকে তাকিয়ে অন্য কিছু ভাবে? আজ ঠিক করেছি, পড়াতে পড়াতে থেমে গিয়ে ওকে পড়ার বিষয়ে প্রশ্ন করবো|
    আমি পড়ানো শুরু করেছি | ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা হলো ভারতীয় সংবিধানের মুখবন্ধ বা ভূমিকা |
    ঊনিশো ছেচল্লিশ সালের তেরোই নভেম্বর গণপরিষদে জওহরলাল নেহরু ভারতীয় সংবিধানের লক্ষ্য সম্বলিত যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, তারই পরিবর্তিত রূপ হলো আজকের ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনা | ভারতীয় সংবিধানের রচয়িতা বি. আর আম্বেদকর | বণিকের মানদন্ডের রাজদন্ড রূপে দুশো বছরের শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে বিভক্ত হয়েই ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ঊনিশশো সাতচল্লিশের পনেরোই আগস্ট | ঊনিশো ঊনপঞ্চাশের ছাব্বিশে নভেম্বর চূড়ান্ত ভাবে ভারতীয় সংবিধানের খসড়া গৃহীত হয় আর ঊনিশো পঞ্চাশের ছাব্বিশে জানুয়ারি থেকে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হয় | সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ” আমরা ভারতের জনগণ ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র রূপে গড়িয়া তুলিতে এবং উহার সকল নাগরিক যাহাতে সামাজিক, অর্থনৈতিক, এবং রাজনৈতিক ন্যায়বিচার ; চিন্তার, অভিব্যক্তির, বিশ্বাসের, ধর্মের ও উপাসনার স্বাধীনতা ; প্রতিষ্ঠা ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত ভাবে লাভ করেন ; এবং তাঁহাদের সকলের মধ্যে ব্যক্তি মর্যাদা ও জাতীয় ঐক্য ও সংহতির আশ্বাসক ভ্রাতৃভাব বর্ধিত হয়, তজ্জন্য সত্যনিষ্টার সহিত ছাব্বিশে নভেম্বর, ঊনিশো ঊনপঞ্চাশ তারিখে এতদ্দ্বারা এই সংবিধান গ্রহণ, বিধিবদ্ধ এবং আমাদিগকে অর্পন করিতেছি | ” ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রথমে
    ” সমাজ তান্ত্রিক” আর
    ” ধর্মনিরপেক্ষ ” শব্দ দুটো ছিল না | ঊনিশো ছিয়াত্তর সালে বিয়াল্লিশ তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই দুটো শব্দ যোগ হয় |ঊনিশো পঁয়ত্রিশের
    ভারত – শাসন আইনের ইতি |স্বাধীন ভারত জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের শাসন | আমি সার্বভৌম, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতন্ত্রের মানে বুঝিয়ে কিছুটা পজ্ দিয়েছি | হঠাৎ সুধা কে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করেছি, “বলতো, প্রজাতন্ত্রের মানে কি হতে পারে?” বিহ্বল সুধার উত্তর, ” আমরা সবাই রাজা আমাদেরি রাজার রাজত্বে |” এবার আমার বিহ্বলতার পালা| পিরিয়ড শেষের ঘন্টায় নিজেকে ফিরে পেয়েছি | বলেছি,” সুন্দর বলেছো | তবে আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলি, প্রজাতন্ত্র হল এমন এক সরকার ব্যবস্থা, যেখানে সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করে জনগণ | সাধারণত রাজশক্তি বিহীন রাষ্ট্র কেই প্রজাতন্ত্র বলা হয় | জনগণই রাজা এই ধরণের রাস্ট্র ব্যবস্থায় |” আমি ক্লাস রূম থেকে বেরিয়ে স্টাফ রূমের পথে| কানে বাজছে,” আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে |”
    একুশ – বাইশে জানুয়ারিতে এগারো ক্লাসে সংবিধানের প্রস্তাবনা সম্পর্কে ডিটেইলসে আলোচনা করেছি|তেইশে জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন উপলক্ষ্যে স্কুল ছুটি | চব্বিশ তারিখ স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস | সুতরাং ঐ দিনও স্কুল ছুটি | পর পর দুদিন ছুটির পর পঁচিশ তারিখ এগারো ক্লাসে ভারতীয় সংবিধানের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সামান্য আলোচনা করেছি | তারপর ছুটি দিয়েছি ওদের ছাব্বিশে জানুয়ারির ফাংশনের ফাইন্যাল মহড়ার জন্যে | হেড মাস্টার মশাই স্টাফ রূমে এসে আমাদের সেই রকম ভার্বাল ইন্সট্রাকশন দিয়ে রেখেছেন | সুতরাং আমরা কয়েকজন টিচার এরপর স্টাফ রুমে বসে নির্ভেজাল আড্ডা মেরেছি | কাল ছাব্বিশে জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবস |
    সকাল নটায় আমরা স্কুল প্রাঙ্গণে | স্কুল সেক্রেটারি পরিতোষ বাবু চলে এসেছেন | তাঁর জ্বর সেরে গেছে | ম্যালেরিয়া নয়, ভাইরাল ফিভার হয়েছিল | মাস্টার মশাই – ছাত্র নির্বিশেষে সবার পরণে আজ ধুতিপান্জাবী | ছাত্রীরা লাল পাড় সাদা শাড়ি পরেছে | আমাদের স্কুলে মহিলা শিক্ষিকা নেই বলে অনেক মাস্টার মশাই ইয়ার্কি মেরে স্কুলটার নাম দিয়েছে ‘মরুভূমি বিদ্যালয়’ | কেমিস্ট্রির টিচার সৌমেন চট্টোপাধ্যায় কথায় কথায় কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন কবে যে দেখা পাবো ওয়েসিসের, কে জানে! সৌমেন বাবু আসছে জানুয়ারিতে রিটায়ার করবেন | হেড স্যার আর দায়িত্ব প্রাপ্ত স্যারেরা ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যস্ত | খাবারের প্যাকেট এসেছে মিষ্টির দোকান থেকে | নাকের ডগায় চশমা ঝুলিয়ে অঙ্কের স্যার অবনীবাবু বার বার প্যাকেট গুনছেন| ” প্যাকেটের গুনতি যাতে পারফেক্ট হয়, অবনী বাবুকে তাই তো দায়িত্ব দিয়েছি.. হেঁ হেঁ বাবা, দোকানীর কর্ম নয়, আগের বারের মতো প্যাকেটের হিসেবের গরমিল করা |”… হেড স্যার নিবারণ বাবুর রসিকতা | অবনীবাবুর পিছনে লেগে নির্মল আনন্দ পাওয়া আর অন্যদের বিতরণ করা | ছাত্র – ছাত্রীরা কাজ ও গল্প – গুজব.. দুয়ে মত্ত | কেউ ক্লাস রুমে নিভৃতে বসে কাগজে লেখা নিজের বক্তব্য ঝালিয়ে নিচ্ছে শেষ বারের মতো | উঠোনের মাঝখানে লম্বা ডান্ডির নীচে গোটানো ভারতীয় পতাকা পেটে ফুল নিয়ে অপেক্ষা করছে.. সময় হলে শঙ্খ ধ্বনির মধ্যে দিয়ে পতপত করে উড়বে আকাশ পানে | আমি এই স্কুলে নবাগত | তাই দায়িত্ব হেডস্যার দিতে এলে সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছি-” এবার দেখে নিই, আসছে বার থেকে দায়িত্ব নেবো|” স্কুলের সামনে বিশাল মাঠে সুশোভিত মঞ্চ | কিছু কারিগর ফিনিশিং টাচ দিচ্ছে | ইতিহাসের স্যার শোভন বাবু হাঁকডাক করে তদারকি করছেন | আমি আনমনা হয়ে কলকাতায় থাকা আমার মায়ের কথা ভাবছি.. পাগলিটারও কি আমার জন্যে মন খারাপ করছে? আদর করে আমি আমার মাকে ” আমার পাগলি মেয়ে” বলে ডাকি |কখনো কখনো শর্ট ফর্মে শুধু “পাগলি” |
    চোখের কোণা জ্বালা করছে | অশ্রু – বৃষ্টি ঝরার পূর্বাভাস | সামলাই নিজেকে | কোন ছাত্র বা ছাত্রী দেখে ফেললে হয়তো বলে বসবে, ” এ মা, স্যার, আপনি এত বড়ো হয়েও কাঁদছেন!!!” ছিঃ ছিঃ সে বড়ো লজ্জার | হেড স্যার ডাকছেন, “সৌগত বাবু, চলুন ওদিকে, পতাকা উত্তোলনের পর্বটা শেষ করি |তারপর ফাংশন | চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ি, হেডস্যার কে অনুসরণ করে এগিয়ে যাই পতাকার দিকে |
    শঙ্খের আওয়াজের সাথে সেক্রেটারির হাতে রশির টানে ভারতের ত্রিবর্ণ পতাকা উড়ল উর্ধ্বে | ফুল গুলো ছড়িয়ে পড়লো | ছাত্র – ছাত্রীদের সমবেত সঙ্গীত,.. “হে মোর চিত্ত, পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে, এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে |”
    ছাব্বিশে জানুয়ারির সকাল সাড়ে দশটা | মঞ্চে অনুষ্ঠান চলছে | সুধা গাইছে,
    ” যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে |”
    এরপর সমবেত সঙ্গীত,.. ” বুক বেঁধে তুই ধর না…” এরপর সেক্রেটারি মশাইের ভারতের প্রজাতন্ত্র সম্পর্কে নাতি দীর্ঘ বক্তৃতা | লিখে দিয়েছি আমি | তাঁর দায়িত্ব পাঠের | কেউ জানে না | বৃদ্ধ মানুষের অনুরোধ ফেলি কি করে? হেড মাস্টার মশাই মঞ্চে উঠেছেন | স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা বলেছেন | মাস্টার দা সূর্য সেনের বিপ্লবী কার্যকলাপের কথা বলেছেন | আরো অনেকের কথা বলে সুভাষ বসুর কথা বলতে গিয়ে সুভাষের উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন, ” আমায় রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো|” যদিও তেইশে জানুয়ারি নয় আজ, তবুও ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে নেতাজির নাম উল্লেখ আমার মতে একশো বার প্রয়োজন | যদি নেতাজি না নিরুদ্দেশ হতেন, তবে হয়তো ভারতের প্রজাতন্ত্র আরো ভালো ভাবে অর্থবহ হতো | হঠাৎ লক্ষ্য করি, তিন – চারজন বয়স্ক পুরুষ মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সুধাকে উত্তেজিত ভাবে কিছু বলছে | তাদের কথা আমি যেখানে বসে, সেখান থেকে শোনা যাচ্ছে না, মাইক্রোফোনের জন্য | সুধা সংবাদদাতাদের সাথে ঊর্ধশ্বাসে দৌড় লাগিয়েছে | তার বডিল্যাংগুয়েজ দেখে বুঝতে পেরেছি, কিছু একটা বিপদের বার্তা সে পেয়েছে | কৌতুহল ও চিন্তা দুটোই আমার হয়েছে | ওদের অনুসরণ করে পৌঁছেছি এক চকমিলানো বাড়ির সামনে|
    আমি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে যে ঘটনা ঘটছে ভেতরে, সেটা দেখে যাচ্ছি | সুধারা এগোচ্ছে বিশাল চত্বরে |স্হির সিদ্ধান্ত আমার সুধার কোন বিপদ হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে এন্ট্রি নেব | সুধাকে প্রথম থেকেই এমব্রারাস করতে চাই নি | এটা ওদের পারিবারিক কোন ব্যাপার হতে পারে | সে ক্ষেত্রে আমার নাক গলানো সুধার পছন্দ নাও হতে পারে |
    আমি দেখি, এক ফর্সা পানা লোক বিশাল চত্বরের শেষ সীমানায় খাটিয়ায় বসে| তার হাতের দশ আঙ্গুলে দশটা আঙটি | এক মোটাসেটা পালোয়ান গোছের লোকের কাছ থেকে মালিশ খেতে খেতে চিৎকার করছে সপ্তম স্বরে…” কি রে, ছোলা – গুড় কম পড়ছে নাকি তোর নিত্যকার বরাদ্দে ?যেন ননীর গায়ে হাত বোলাচ্ছিস!!” পর মুহূর্তেই মোলায়েম স্বরে সামনে ধুতির ওপর বিবর্ণ সোয়েটার পরা এক দরিদ্র লোকের উদ্দেশ্য করে বলছে, ” বুঝেছ উপেন, তোমার দেড়বিঘা জমি এখন আমি কিনে নিয়েছি | দশহাজার টাকা কর্জ করেছিলে সেই গত বছর, সুদে- আসলে কত হয়েছে খেয়াল আছে? উপেন বলে,” হ্যাঁ বাবু সব হিসেব আমার আছে | আজ এই দুহাজার টাকা এনেছি, আমার সব টাকা শোধ সুদ সমেত | দয়া করে দলিলটা ফেরত দেন বাবু | ” বাবু বলেন, “তা টাকা শোধের কিস্তির কাগজ গুলো দেখা”| ” বাবু, কাগজ কোথায়? কর্জ নেবার সময় তো বললেন, আপনার মুখের কথাই যথেষ্ট |দলিলটা আনতে বলুন বাবু দয়া করে|” বাবু কানটা একবার চুলকে নেন কড়ে আঙ্গুল দিয়ে| বিশাল হুঙ্কার বাবুর,” এই কেউ আমার চাবুকটা আন তো|” মুহূর্তে হুকুম তামিল | বাবুর চাবুকের শব্দ হাওয়ায়…..
    সপাৎ | উপেনের হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে |মালিশকারি উপেনের সোয়েটার আর ফতুয়া খুলতে উদ্যোগ নিয়েছে | বাবুর চাবুক দুলছে উপেনের পিঠে পড়বে বলে | চত্বরের মাঝ বরাবর থেকে সুধা তার বাবা উপেনের কাছে পৌঁছে গেছে | শক্ত হাতে ধরেছে বাবুর হাত… ” খবরদার বাবু, আমার বাবার গায়ে যদি দ্বিতীয় ঘা চাবুক পড়ে, তবে দেখে নেব তোমাকে |” ” আরে কি দেখবি তুই? চোর-জোচ্চরের মেয়ের বড়ো বড়ো কথা!” বাবুর এক ঝটকায় সুধা পড়েছে ছিটকে উঠোনের এক কোণে | উপেনের পিঠে দ্বিতীয়বার পড়েছে চাবুক|
    রক্ত বেরোচ্ছে এবার পিঠ থেকে|সুধা উঠে দাঁড়িয়েছে| খোলা চুলের কিছু অংশ মুখের চারপাশে | হাতে কাস্তে | উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে | চোখে আগুন | উঠোনে গাদা করা বিচুলির পাশে কাস্তেটা পড়েছিল | কাস্তে উঁচিয়ে সুধা যেনো মাতঙ্গিনী হাজরা..
    হিস হিস করে বলেছে, “আর এক ঘা চাবুক মেরে দেখো, কাস্তে দিয়ে তোমার গলা নামিয়ে দেব | এটা স্বাধীন ভারত| ঊনিশো পঞ্চাশে তোমাদের জমিদারী গেছে | ন্যায় বিচারের জন্য আইন- আদালত আছে | সংবিধান আমাদের সাম্য দিয়েছে | গণতন্ত্র আর সাধারণ তন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে, তোমাদের প্রভুত্ব, তোমাদের সৃষ্টি করা বৈষম্য মানবো কেন? যেখানে বিদেশি দের তাড়িয়ে আমরা ভারতের সব জনগণ নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছি, সেখানে দেশীয় এক মহাজনের কাছে নতি স্বীকার করবো? শিগ্গির ফেরত দাও আমাদের দলিল, আর নাও তোমার ন্যায্য টাকা “| বর্তমান মহাজন ওরফে প্রাক্তন জমিদার থতিয়ে গেছে সুধার রণরঙ্গিনী মূর্তি দেখে আর জ্বালাময়ী ভাষণ শুনে| কিছুক্ষণের মধ্যেই জমির দলিল সুধার কব্জায় | সুধা এ যুগের উপেন কে বাঁচিয়েছে | তাকে ধরে ধরে বাইরে বেরিয়ে এসে আমাকে দেখতে পেয়েছে | আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে, “সাবাস | ছাত্রী না হলে তোমাকে সেলাম করতাম |” সুধা আমায় প্রনাম করে বলেছে, ” স্যার, সব আপনার অবদান | প্রজাতন্ত্র দিবস এতদিন পালন করেছি| কিন্তু প্রজাতন্ত্রের সংজ্ঞা জানতাম না|”

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here