
………এদিকে রসিকানন্দ অত্যন্ত লজ্জিত বদন থাকেন শ্রীগুরুদেব শ্যামানন্দের সামনে। তিনি প্রায় নীরব থাকেন, মাথা হেঁট করে শ্যামানন্দের চরণের দিকে চেয়ে থাকেন , কারো সাথে কোন কথা বলেন না তাঁর সামনে। যদি গুরু বলতে নির্দেশ দেন তখন কথা বলেন আর চরণ খানা পর্যন্ত দেখতে দেন না নিজের, বস্ত্রে ঢেকে বসেন গুরুকে সম্মান জানাতে। মুখে থাকে মৃদু হাসি, কখনও বা অশ্রু ছলছল আঁখি , ভাব গদগদ গাম্ভীর্যময় চিত্ত তাঁর । গুরুচরণে নিবেদিত প্রাণ রসিকানন্দ নিজস্ব সত্ত্বাকে ভুলে শ্যামানন্দ পদে যেন পড়ে থাকেন ।
অথচ, শ্রীগুরু আজ্ঞা প্রধান বলবতী। তাই ব্যাখ্যা তো করতেই হবে। কিন্তু, শ্যামানন্দের সম্মুখে রসিকানন্দ অত্যন্ত লজ্জাশীল থাকেন যে! তিনি লজ্জাবনত মুখে খুব ধীর কণ্ঠে কৃষ্ণকথা বলতে শুরু করলেন। কী করবেন তাঁর যে অত্যন্ত শরম বোধ হয় , সংকুচিত ভাব চলে আসে আপনা থেকেই শ্রীগুরুদেব সামনে থাকলে ! রসিকেন্দ্র এমন ভাবে কথা বলতে শুরু করলেন যে তাঁর কন্ঠ কেউ যেন শুনতে না পায়। অথচ যতটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে এই বোধ জাগছে যে মধুভরা বাণী বর্ষিত হচ্ছে তাঁর শ্রীমুখ থেকে। পাষাণ দ্রবীভূত হয়ে যাবে সে বাণীতে । শ্রীগুরুদেব অনুধাবন করলেন শিষ্যের মনের গতিক। তিনি সামনে থাকলে রসিকেন্দ্রের কন্ঠ যে উচ্চ হবে না তা বেশ বুঝতে পেরে পরিশেষে শ্যামানন্দ তাঁকে কৃষ্ণকথা না থামিয়ে বলে যেতে নির্দেশ দিয়ে কোন কাজের অছিলায় বা অজুহাতে নিজেই উঠে চলে গেলেন সেখান থেকে। লাজ মুক্ত হলেন রসিক এতক্ষণে। এবার তিনি অপূর্ব পিক্ কণ্ঠে উচ্চঃস্বরে ভাগবত ব্যাখ্যা আরম্ভ করলেন । তাঁর রূপবৈভব, মহাতেজ এবং কন্ঠের ওজস্বীতায় মনে হতে লাগলো যেন স্বয়ং শুকদেব বা ব্যাসদেব বা দেবতাগুরু শ্রীবৃহস্পতি বসে কৃষ্ণকথা বলছেন। এক শ্লোকের কত প্রকার ব্যাখ্যা করছেন তিনি! কত প্রকার ছন্দ তাঁর কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে! আবার কৃষ্ণকথা বলতে গিয়ে কতবার তাঁর কন্ঠ হচ্ছে আবেগরুদ্ধ, নয়নের অশ্রু অবিরত ধারায় বয়ে চলেছে। তাঁর বাণী শুনে স্বয়ং বৃহস্পতিদেব বিস্মিত হচ্ছেন, উপস্থিত সভ্যজন চমৎকৃত হচ্ছেন। এমন কথা, এমন ব্যাখ্যা তো আগে কখনো শোনেননি তাঁরা ! সুপণ্ডিতরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে থাকলেন, এতকাল যা যা অধ্যয়ন করলাম সব মিথ্যা মনে হচ্ছে, ব্যর্থ মনে হচ্ছে। রসিকমুরারি যে সারোদ্ধার করেছেন শ্রীমদ্ ভাগবত থেকে, ব্যাসদেব-শুকদেবের যে অভিমত জানাচ্ছেন, শ্রীধর স্বামীর ভাগবত টীকার যেসব ব্যাখ্যা-প্রমাণ দিচ্ছেন তাতে তো দেখা যাচ্ছে যত পুরাণ-মহাপুরাণ আছে সবেতেই বলা হচ্ছে , নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, সিদ্ধান্ত প্রকাশ পাচ্ছে যে কৃষ্ণপদে মতিই সর্বশ্রেষ্ঠ ! তাহলে তো জ্ঞানব্যাখ্যা না করে , জ্ঞানপথে না গিয়ে শুদ্ধা ভক্তির পথ যাজন করাই শ্রেয় ! ভক্তিযোগই অবলম্বন করা উচিত , তা অনুসরণ করাই শ্রেষ্ঠ !
পণ্ডিতেরা রসিককেন্দ্রের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। তবে কেবল তাঁরা নন; হূন, পুলিন্দ, ম্লেচ্ছ, অন্ত্যজ প্রভৃতি জাতের লোকেরাও কৃষ্ণের শরণ নিলেন রসিকেন্দ্রের মুখে ভাগবত কথামৃতের অপূর্ব ব্যাখ্যা শ্রবণ করে। শ্যামানন্দ প্রীত হলেন, পরিতুষ্ট হলেন প্রিয় শিষ্য রসিকেন্দ্রের ব্যাখ্যা পারঙ্গমতায়। তিনি বেশ কিছুদিন সেই স্থানে অর্থাৎ ধারেন্দাতে রয়ে গেলেন। ইতিপূর্বে মহারাস যাত্রা মহোৎসব সম্পন্ন করিয়েছেন তিনি। বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েক দিন ধরে উদযাপিত হয়েছে সেই অনুষ্ঠান । সকলের মনেই তাই সে উৎসবের রেশ এখনো অক্ষুণ্ণ রয়েছে। আনন্দ ভরা হৃদয়দীঘি টইটম্বুর দশায় বিরাজ করছে। কিন্তু , হঠাৎই সে দীঘিতে যেন ঢিল পড়ল এক। রঘুনাথ পট্টনায়কের এক ভ্রাতা এসে উপস্থিত হলেন রাধানগর গ্রাম থেকে। তাঁকে রঘুনাথই পাঠিয়েছেন।……. (ক্রমশ)











Leave a Reply