
শীতের সকাল। নদিয়ার ছোট্ট গ্রাম মাধবপুর তখন ঘন কুয়াশায় ঢাকা। ভোরের আলো উঠলেও সূর্যকে দেখা যায় না। রাস্তার দুপাশের গাছগুলো যেন সাদা চাদরের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।
গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি। সবাই সেটিকে বলত “কুয়াশাবাড়ি”।
বাড়িটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত।
কেউ সেখানে যেত না।
কারণ গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত, শীতের রাতে বাড়িটির দ্বিতীয় তলার জানালায় নাকি আলো জ্বলে।
কেউ কেউ আবার বলত, মাঝরাতে জানালার কাছে একজন বৃদ্ধাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
কিন্তু গ্রামের স্কুলের নতুন শিক্ষক সায়ন এসব বিশ্বাস করতেন না।
তিনি বলতেন,
— “ভূত বলে কিছু নেই। মানুষের ভয়ই অনেক সময় ভূতের গল্প তৈরি করে।”
একদিন তাঁর ছাত্র রুদ্র বলল,
— “স্যার, আপনি যদি এত সাহসী হন, তাহলে এক রাতে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখুন না!”
সায়ন হেসে বললেন,
— “ঠিক আছে।”
কুয়াশাবাড়ির পথে
পরদিন রাতে প্রচণ্ড ঠান্ডা।
সায়ন হাতে টর্চ নিয়ে বাড়িটির দিকে রওনা হলেন।
যত বাড়ির কাছে যাচ্ছিলেন, কুয়াশা তত ঘন হচ্ছিল।
হঠাৎ তাঁর টর্চের আলোয় দেখা গেল—
দোতলার একটি জানালায় সত্যিই ক্ষীণ হলুদ আলো জ্বলছে।
সায়নের বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠল।
তবু তিনি এগিয়ে গেলেন।
বাড়ির দরজা আশ্চর্যজনকভাবে খোলা ছিল।
ভেতরে ঢুকতেই নাকে এল পুরোনো কাঠ আর ধুলোর গন্ধ।
দেওয়ালে ঝুলছে বিবর্ণ ছবি।
একটি ঘরে পুরোনো আলমারি।
আর সিঁড়ির পাশে পড়ে আছে একটি ভাঙা লণ্ঠন।
সায়ন ধীরে ধীরে দোতলায় উঠলেন।
আলোটা আসছিল একটি ঘর থেকে।
দরজা ঠেলে খুলতেই তিনি থমকে গেলেন।
ঘরের মাঝখানে একটি টেবিল।
তার ওপর একটি জ্বলন্ত কেরোসিনের বাতি।
কিন্তু ঘরে কেউ নেই।
পুরোনো ডায়েরি
টেবিলের ওপর একটি ডায়েরি পড়ে ছিল।
সায়ন ডায়েরিটি খুললেন।
প্রথম পাতায় লেখা—
“আমার নাম সরলা। যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ে, তবে দয়া করে আমার কথাটা গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিও।”
সায়ন পড়তে শুরু করলেন।
সরলা ছিলেন এই বাড়ির মালিকের স্ত্রী। তাঁর স্বামী বহু বছর আগে মারা যান। তাঁদের একমাত্র ছেলে শহরে চলে যায়।
এক শীতের রাতে সরলা বাড়িতে একা ছিলেন।
সেই রাতেই গ্রামের এক বৃদ্ধা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে তাঁর বাড়ির সামনে এসে সাহায্য চেয়েছিলেন।
সরলা তাঁকে ঘরে আশ্রয় দেন।
কিন্তু বৃদ্ধার অবস্থা এত খারাপ ছিল যে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার ছিল।
সরলা সাহায্যের জন্য গ্রামের লোকজনকে ডাকতে বেরিয়েছিলেন।
কিন্তু ঘন কুয়াশায় পথ হারিয়ে তিনি আর বাড়ি ফিরতে পারেননি।
পরদিন গ্রামের মানুষ তাঁকে অনেক দূরে অচেতন অবস্থায় পায়।
তিনি বেঁচে গেলেও দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন।
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা—
“কুয়াশাকে ভয় পেও না। কুয়াশার আড়ালে পথ থাকে। শুধু আলো জ্বালিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।”
সায়ন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
রহস্যের উত্তর
ঠিক তখনই নিচ থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
সায়ন দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলেন।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ।
তিনি গ্রামেরই প্রবীণ বাসিন্দা গোপাল কাকা।
সায়ন অবাক হয়ে বললেন,
— “আপনি এখানে?”
গোপাল কাকা মৃদু হেসে বললেন,
— “আমি প্রতিদিন এখানে আসি।”
— “কেন?”
— “এই বাড়ির গল্পটা যেন কেউ ভুলে না যায়।”
তিনি জানালেন, সরলা দেবী মারা যাওয়ার আগে বাড়িটি গ্রামের মানুষের জন্য দান করে গিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বাড়িটি দেখাশোনার কেউ ছিল না।
তাই ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
আর গোপাল কাকা প্রতি শীতে এখানে এসে একটি বাতি জ্বালিয়ে রাখেন।
— “কেন?”
— “যেন পথ হারানো কেউ দূর থেকে আলোটা দেখে এখানে আসতে পারে।”
সায়ন স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
তাহলে গ্রামের মানুষ যে “ভূতের আলো” দেখত, সেটি আসলে একজন বৃদ্ধ মানুষের মানবিকতার আলো।
নতুন সিদ্ধান্ত
পরদিন সায়ন স্কুলে গিয়ে সব কথা ছাত্রদের বললেন।
রুদ্র অবাক হয়ে বলল,
— “তাহলে কুয়াশাবাড়িতে ভূত নেই?”
সায়ন হেসে বললেন,
— “না। আছে মানুষের একটা অসমাপ্ত ভালো কাজ।”
সেদিন থেকেই ছাত্ররা বাড়িটি পরিষ্কার করার উদ্যোগ নিল।
পুরোনো বই, আসবাবপত্র ও ডায়েরিগুলো সংগ্রহ করা হলো।
কয়েক মাসের মধ্যে বাড়িটি একটি গ্রামীণ পাঠাগার ও রাতের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হলো।
নাম দেওয়া হলো—
“সরলা আলো কেন্দ্র”।
শীতের রাতে পথ হারানো মানুষ সেখানে আশ্রয় পেতে লাগল।
একটি ঘরে বই রাখা হলো।
আর দোতলার সেই ঘরে, যেখানে পুরোনো বাতিটি জ্বলত, একটি ছোট্ট ফলক বসানো হলো।
তাতে লেখা—
“অন্ধকারকে অভিশাপ দিও না। একটি আলো জ্বালাও।”
বছর কেটে গেল।
কুয়াশাবাড়ির আর কোনো ভয় রইল না।
বরং শীতের রাতে গ্রামের মানুষ দূর থেকে বাড়িটির আলো দেখে নিশ্চিন্ত হতো।
একদিন রুদ্র, যে তখন বড় হয়ে ডাক্তার হয়েছে, বহু বছর পর গ্রামে ফিরে এল।
সায়নের সঙ্গে সেই বাড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
— “স্যার, মনে আছে? একদিন আমি আপনাকে এখানে আসতে বলেছিলাম।”
সায়ন হেসে বললেন,
— “আর তুই না বললে হয়তো এই বাড়ির গল্পটাও আমরা জানতাম না।”
দুজনেই জানালার পাশে দাঁড়াল।
বাইরে তখন ঘন কুয়াশা।
কিন্তু জানালার ভেতর থেকে একটি উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে আসছে।
রুদ্র মৃদুস্বরে বলল,
— “স্যার, এখন বুঝতে পারছি। কুয়াশার মধ্যে বাড়িটা ভয়ংকর ছিল না। ভয়ংকর ছিল আমাদের অজ্ঞতা।”
সায়ন বললেন,
— “ঠিক তাই।”
কুয়াশার মধ্যে সেই আলো আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
আর মাধবপুরের মানুষ ধীরে ধীরে বুঝে গেল—
সব রহস্যের পেছনে ভয়ের গল্প থাকে না।
কখনও কখনও অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকে—
একজন মানুষের অসমাপ্ত ভালোবাসা।











Leave a Reply