গঙ্গার একটি শাখানদীর ধারে ছোট্ট গ্রাম নবগ্রাম। গ্রামের মানুষদের জীবনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক ছিল খুব গভীর। বাজার, হাসপাতাল, স্কুল—সবকিছুর জন্যই নদী পার হতে হতো।
নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা ছিল মধু মাঝির নৌকা।
বয়স ষাটের কাছাকাছি হলেও মধু মাঝির শরীর ছিল শক্তপোক্ত। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত তিনি মানুষ পারাপার করতেন।
তাঁর নৌকার নাম ছিল “আশা”।
মধু মাঝি বলতেন,
— “নৌকা শুধু মানুষ বহন করে না, মানুষের আশা বহন করে।”
একটি প্রতিশ্রুতি
মধুর একমাত্র মেয়ে মৌসুমি শহরে নার্সিং পড়ত।
মেয়ে যখন প্রথম শহরে যায়, মধু বলেছিলেন,
— “যেদিন তুই নার্স হয়ে ফিরবি, সেদিন নদীর ওপারে আমি নিজে তোকে নিয়ে আসব।”
মৌসুমি হেসে বলেছিল,
— “বাবা, তখন তো তোমার নৌকা বুড়ো হয়ে যাবে!”
মধু উত্তর দিয়েছিলেন,
— “নৌকা বুড়ো হবে, মাঝি হবে না।”
সেই ঝড়ের রাত
এক বর্ষার সন্ধ্যায় হঠাৎ নদীতে প্রচণ্ড ঝড় উঠল।
সব নৌকা ঘাটে ফিরে এল।
মধু মাঝিও নৌকা বেঁধে বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন।
ঠিক তখন ঘাটে একজন যুবক দৌড়ে এসে বলল,
— “মাঝিদা! ওপারে একজন গর্ভবতী মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হাসপাতালে নিতে হবে।”
মধু আকাশের দিকে তাকালেন।
নদী তখন উত্তাল।
সবাই বলল,
— “এখন গেলে বিপদ হবে।”
মধু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
— “মানুষের জীবন অপেক্ষা করে না।”
তিনি নৌকা খুলে দিলেন।
নদীর সঙ্গে লড়াই
বাতাসে নৌকা দুলছিল।
বৃষ্টি চোখে-মুখে আঘাত করছিল।
মধু দাঁড় শক্ত করে ধরে বললেন,
— “ভয় পেও না। পৌঁছে যাব।”
নৌকায় থাকা মহিলাটি কষ্টে কাতরাচ্ছিলেন।
তার স্বামী কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন,
— “দাদা, আমার স্ত্রীকে বাঁচান।”
মধু উত্তর দিলেন,
— “আমি যতক্ষণ আছি, চেষ্টা চালিয়ে যাব।”
প্রায় এক ঘণ্টার সংগ্রামের পর নৌকা ওপারের ঘাটে পৌঁছাল।
সেখান থেকে মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
কয়েক ঘণ্টা পর জানা গেল—
মা ও সন্তান দুজনেই নিরাপদ।
একটি অপ্রত্যাশিত সংবাদ
পরদিন সকালে মধু ঘাটে বসে ছিলেন।
একজন ডাকপিয়ন এসে একটি চিঠি দিল।
চিঠি খুলে মধুর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
মৌসুমি লিখেছে—
“বাবা, আমার নার্সিং কোর্স শেষ হয়েছে। আগামী শুক্রবার বাড়ি ফিরছি। তুমি কি আমাকে নিতে আসবে?”
মধুর চোখে জল এসে গেল।
তিনি বললেন,
— “অবশ্যই আসব।”
শুক্রবার সকাল।
মধু তাঁর পুরোনো নৌকা “আশা” সাজিয়ে রাখলেন।
মৌসুমির ট্রেন আসার কথা বিকেলে।
কিন্তু দুপুরের পর নদীতে আবার ঝড় শুরু হলো।
সবাই মধুকে বলল,
— “আজ নৌকা নিয়ে বেরোবেন না।”
মধু বললেন,
— “আজ আমার মেয়ে ফিরছে।”
তিনি নৌকায় উঠে দাঁড়ালেন।
কিছুদূর গিয়েই ঝড় আরও বেড়ে গেল।
নৌকার পুরোনো কাঠ কেঁপে উঠল।
মধু বুঝলেন, নৌকাটি আর বেশিক্ষণ টিকবে না।
তিনি দ্রুত তীরে ফিরে এলেন।
সেদিন মেয়েকে আনতে যেতে পারলেন না।
মৌসুমি ঘাটে এসে বাবাকে না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখল—
বৃদ্ধ এক মাঝি একটি ছোট নৌকা নিয়ে তাকে আনতে এসেছে।
মৌসুমি জিজ্ঞেস করল,
— “বাবা কোথায়?”
মাঝি বলল,
— “তোমার বাবা আজ নদীর সঙ্গে লড়াই করে এক জীবন বাঁচিয়েছেন। নৌকা ভেঙে গেছে।”
মৌসুমির চোখ ভিজে উঠল।
শেষ যাত্রা
কয়েক বছর পর মধু মাঝি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
নৌকা চালানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হলো না।
মৌসুমি তখন গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নার্স হিসেবে কাজ শুরু করেছে।
বাবাকে আর নৌকায় যেতে দেয় না।
একদিন সন্ধ্যায় মধু বললেন,
— “মা, আমার নৌকাটা কি এখনও আছে?”
— “আছে।”
— “একবার নদীর ধারে নিয়ে চল।”
মৌসুমি বাবাকে নিয়ে ঘাটে গেল।
পুরোনো নৌকা “আশা” তখনও বাঁধা।
মধু নৌকার গায়ে হাত বুলিয়ে বললেন,
— “তুই অনেক মানুষকে পার করে দিয়েছিস।”
তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “এবার তুই মানুষ পার করিস—নৌকায় নয়, চিকিৎসার মাধ্যমে।”
মৌসুমি বাবার হাত ধরে কাঁদতে লাগল।
কয়েকদিন পর মধু মাঝি মারা গেলেন।
গ্রামের মানুষ তাঁর স্মৃতিতে নদীর ঘাটে একটি ছোট ফলক বসাল—
“মধু মাঝি—যিনি শেষ নৌকাটিও মানুষের জন্য চালিয়েছিলেন।”
মৌসুমি বাবার নৌকাটি বিক্রি করেনি।
বরং সেটিকে ঘাটের পাশে রেখে একটি ছোট জরুরি উদ্ধার নৌকা হিসেবে সংরক্ষণ করল।
আজও বর্ষাকালে যখন নদী ফুলে ওঠে, সেই নৌকা মানুষের কাজে লাগে।
আর নৌকার গায়ে বড় অক্ষরে লেখা—
“আশা”।
মৌসুমি যখনই নদীর দিকে তাকায়, তার মনে হয়—
বাবা যেন এখনও দাঁড় হাতে নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
আর বলছেন—
“নদী যতই বড় হোক, মানুষের জীবন তার চেয়েও বড়।”











Leave a Reply