গ্রামের হারিয়ে যাওয়া খেলাগুলি কি ফিরতে পারে? লাঠিখেলা, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, কাবাডি ও দেশজ খেলাধুলার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশেষ সাক্ষাৎকার।

লাঠিখেলা, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, কাবাডি ও দেশজ খেলাধুলার ভবিষ্যৎ নিয়ে ক্রীড়া-গবেষক সায়ন্তন মুখার্জির সঙ্গে মুখোমুখি

বিশেষ সাক্ষাৎকার | সম্পূর্ণ কাল্পনিক

একসময় গ্রামের বিকেল মানেই ছিল মাঠে ছুটে যাওয়া। স্কুল ছুটির পর বই-খাতা বাড়িতে রেখে ছেলেমেয়েরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ত মাঠের দিকে। কোথাও গোল্লাছুট, কোথাও দাঁড়িয়াবান্ধা, কোথাও ডাংগুলি, আবার কোথাও কাবাডি বা লাঠিখেলার আসর। খেলাধুলার জন্য আলাদা দামি সরঞ্জামের প্রয়োজন ছিল না। একটি খোলা মাঠ, কয়েকজন বন্ধু এবং একটু সময়—এই ছিল আনন্দের মূল উপকরণ।

সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামের জীবনেও স্মার্টফোন, ভিডিও গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের প্রভাব বেড়েছে। মাঠের সংখ্যা কমেছে বহু জায়গায়, আবার কোথাও মাঠ থাকলেও নিয়মিত খেলতে যাওয়া শিশু-কিশোরের সংখ্যা কমেছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—বাংলার বহু পুরনো দেশজ খেলা কি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে? গোল্লাছুট, ডাংগুলি, দাঁড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, লাঠিখেলা কিংবা গ্রামীণ কাবাডির মতো খেলাগুলিকে কি নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনা সম্ভব? ঐতিহ্য রক্ষা করার পাশাপাশি এই খেলাগুলি কি শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও সামাজিক বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে?

এই বিষয়গুলি নিয়ে আমাদের প্রতিবেদকের মুখোমুখি হলেন কাল্পনিক ক্রীড়া-গবেষক ও দেশজ খেলাধুলার ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সায়ন্তন মুখার্জি


প্রতিবেদক: সায়ন্তনবাবু, আজকের সাক্ষাৎকারের শুরুতেই জানতে চাই—দেশজ খেলা বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?

সায়ন্তন মুখার্জি: দেশজ খেলা বলতে সাধারণভাবে সেইসব খেলাকে বোঝানো যায়, যেগুলি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। এগুলির অনেকগুলির জন্য আধুনিক ক্রীড়া সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না।

গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, ডাংগুলি, লুকোচুরি, কাবাডি, লাঠিখেলা—এগুলির প্রত্যেকটির নিজস্ব নিয়ম, কৌশল এবং সামাজিক ইতিহাস রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলি শুধু খেলা ছিল না। এগুলি ছিল মানুষের একসঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যম।


প্রতিবেদক: তাহলে কি বলা যায়, দেশজ খেলা একটি অঞ্চলের সংস্কৃতির অংশ?

সায়ন্তন: নিঃসন্দেহে।

আমরা যখন কোনো এলাকার সংস্কৃতির কথা বলি, তখন সাধারণত গান, নাচ, পোশাক, খাবার বা উৎসবের কথা মনে করি। কিন্তু খেলাধুলাও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একটি খেলা কীভাবে খেলা হয়, কারা খেলেন, কোন সময়ে খেলা হয়, কী ধরনের শব্দ বা ছড়া ব্যবহার করা হয়—এসবের মধ্যে একটি অঞ্চলের সামাজিক জীবনের ছাপ থাকে।

তাই একটি দেশজ খেলা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি খেলা হারিয়ে যাওয়া নয়; তার সঙ্গে একটি সামাজিক স্মৃতিও হারিয়ে যেতে পারে।


প্রতিবেদক: আপনার গবেষণায় কি মনে হয়েছে যে গ্রামের পুরনো খেলাগুলি সত্যিই কমে যাচ্ছে?

সায়ন্তন: অনেক অঞ্চলে অবশ্যই কমেছে। তবে সব জায়গার পরিস্থিতি এক নয়।

কিছু গ্রামে এখনও কাবাডি, ফুটবল বা ক্রিকেট খুব জনপ্রিয়। কোথাও আবার উৎসবের সময় ঐতিহ্যবাহী খেলা আয়োজন করা হয়।

সমস্যা হচ্ছে, অনেক খেলা নিয়মিত জীবনের অংশ থেকে সরে গিয়ে শুধুমাত্র বিশেষ অনুষ্ঠানের খেলায় পরিণত হয়েছে।

যেমন আগে কোনো কোনো খেলা প্রতিদিন বিকেলের বিনোদন ছিল। এখন সেটি বছরে একবার অনুষ্ঠানে দেখা যায়।


প্রতিবেদক: এর প্রধান কারণ কী?

সায়ন্তন: একাধিক কারণ রয়েছে।

প্রথমত, শিশুদের অবসর সময়ের ধরন বদলেছে। দ্বিতীয়ত, অনেক জায়গায় খেলার মাঠের অভাব হয়েছে। তৃতীয়ত, ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো জনপ্রিয় আধুনিক খেলাগুলি অনেক বেশি প্রচার পায়।

চতুর্থত, স্মার্টফোন ও ডিজিটাল বিনোদনের আকর্ষণও বড় কারণ।

আর একটি বিষয় হলো—অনেক অভিভাবক দেশজ খেলাকে ভবিষ্যতের পেশা হিসেবে দেখেন না। ফলে তাঁরা সন্তানকে এমন খেলায় উৎসাহ দেন যেটি প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।


প্রতিবেদক: মোবাইল ফোন কি তাহলে দেশজ খেলাধুলার শত্রু?

সায়ন্তন: আমি একেবারেই এভাবে দেখব না।

মোবাইল একটি প্রযুক্তি। সেটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই আসল বিষয়।

একজন শিশু যদি দিনের বেশিরভাগ সময় মোবাইলে ভিডিও দেখে এবং বাইরে খেলতে না যায়, তখন সমস্যা হতে পারে। কিন্তু একই মোবাইল ব্যবহার করে সে দেশজ খেলার ইতিহাস জানতে পারে, খেলার নিয়মের ভিডিও দেখতে পারে কিংবা নিজের এলাকার পুরনো খেলার তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে।

তাই প্রযুক্তিকে শত্রু বানানোর বদলে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই খেলাগুলিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।


প্রতিবেদক: গোল্লাছুটের মতো খেলার মধ্যে কী বিশেষত্ব রয়েছে?

সায়ন্তন: গোল্লাছুট অত্যন্ত সহজ সরঞ্জামে খেলা যায়, কিন্তু এর মধ্যে গতি, কৌশল, দলগত পরিকল্পনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় রয়েছে।

একটি দলকে অন্য দলের সদস্যদের এড়িয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছতে হয়। ফলে খেলোয়াড়দের শুধু দৌড়ানোর ক্ষমতা নয়, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দরকার।

এ ধরনের খেলায় শরীর ও মস্তিষ্ক একসঙ্গে কাজ করে।


প্রতিবেদক: ডাংগুলি নিয়ে আপনার মত কী?

সায়ন্তন: ডাংগুলি বাংলার বহু অঞ্চলের পরিচিত দেশজ খেলা। ছোট কাঠি ও বড় কাঠির সাহায্যে খেলা হয়।

তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—ছোট শিশুদের জন্য এই খেলা আয়োজন করলে নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

যেখানে কাঠি দিয়ে আঘাত লাগার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে বড়দের তত্ত্বাবধান, পর্যাপ্ত দূরত্ব এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার।

ঐতিহ্য রক্ষা করতে গিয়ে নিরাপত্তা উপেক্ষা করা উচিত নয়।


প্রতিবেদক: কাবাডি তো এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিত। তাহলে এটিকে দেশজ খেলার তালিকায় রাখবেন?

সায়ন্তন: অবশ্যই।

কাবাডি দেশজ শিকড় থেকে উঠে আসা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলগত খেলা। এখন এটি সংগঠিত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনেক বড় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এখান থেকে আমরা একটি শিক্ষা নিতে পারি—দেশজ কোনো খেলা যদি সঠিক নিয়ম, প্রশিক্ষণ, সংগঠন এবং প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়, তাহলে সেটি আধুনিক ক্রীড়ার জগতেও নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে।


প্রতিবেদক: লাঠিখেলার ক্ষেত্রে কি একই কথা বলা যায়?

সায়ন্তন: লাঠিখেলা শুধু বিনোদন নয়, ঐতিহ্যবাহী শারীরিক কৌশলেরও একটি উদাহরণ।

তবে বর্তমান সময়ে এটি শেখানোর ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের প্রয়োজন রয়েছে। লাঠি হাতে নিয়ে নিজের মতো করে অনুশীলন করা নিরাপদ নয়।

নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা রেখে এই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

এটিকে কেবল প্রদর্শনী হিসেবে নয়, ইতিহাস ও শারীরিক দক্ষতার একটি ঐতিহ্য হিসেবেও দেখা উচিত।


প্রতিবেদক: শিশুদের শারীরিক বিকাশে দেশজ খেলাগুলির ভূমিকা কতটা?

সায়ন্তন: যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

দৌড়, লাফ, শরীরের ভারসাম্য, দ্রুত দিক পরিবর্তন, দলগত খেলা—এই বিষয়গুলি বহু দেশজ খেলায় স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে।

তবে আমি বলব, দেশজ খেলাকে কোনো চিকিৎসা বা স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখার দরকার নেই। এগুলি মূলত আনন্দ, শারীরিক সক্রিয়তা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যম।

শিশু যদি আনন্দের সঙ্গে বাইরে খেলতে শেখে, সেটিই বড় বিষয়।


প্রতিবেদক: দলগত খেলাগুলি শিশুদের সামাজিক শিক্ষা কীভাবে দেয়?

সায়ন্তন: খুব স্বাভাবিকভাবে।

একটি দলে খেললে জয়-পরাজয় ভাগ করে নিতে হয়। নিজের ভুল স্বীকার করতে হয়। অন্যের ভালো খেলাকে স্বীকার করতে হয়। নিয়ম মানতে হয়।

আবার কখনও বন্ধুর সঙ্গে মতবিরোধও হয়। সেটি কীভাবে সামলাতে হয়, সেটিও শিশুরা শিখতে পারে।

অর্থাৎ মাঠ একটি ছোট সামাজিক বিদ্যালয়ের মতো কাজ করতে পারে।


প্রতিবেদক: আগে তো অনেক খেলায় ছেলেমেয়ে একসঙ্গে অংশ নিত। এখন কি সেই সুযোগ কমেছে?

সায়ন্তন: কিছু জায়গায় কমেছে, আবার অনেক জায়গায় নতুন করে তৈরি হচ্ছে।

আমার মতে খেলাধুলায় অংশগ্রহণের সুযোগ ছেলে ও মেয়ে—সবার জন্য থাকা উচিত।

কোনো খেলা যদি নিয়ম পরিবর্তন করে আরও বেশি শিশু-কিশোরের জন্য উপযোগী করা যায়, তাহলে সেটি করা যেতে পারে।

ঐতিহ্য সংরক্ষণ মানে পুরনো সব নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে ধরে রাখা নয়। মূল চরিত্র বজায় রেখে সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করাও সংরক্ষণের অংশ।


প্রতিবেদক: গ্রামের মাঠ কমে যাওয়ার বিষয়টি কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

সায়ন্তন: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

খেলার জন্য মাঠ দরকার। শুধু দেশজ খেলা নয়, ফুটবল, ক্রিকেট, দৌড় বা যেকোনো বহিরাঙ্গন খেলাই মাঠের ওপর নির্ভরশীল।

একটি গ্রামের শিশু যদি বাড়ির বাইরে নিরাপদে খেলার জায়গা না পায়, তাহলে তাকে শুধু ‘বাইরে খেলো’ বললে হবে না।

তাই গ্রাম পরিকল্পনার ক্ষেত্রে খেলার মাঠকে সামাজিক পরিকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা দরকার।


প্রতিবেদক: ছোট গ্রামের জন্য বড় স্টেডিয়াম কি জরুরি?

সায়ন্তন: না। প্রত্যেক গ্রামের জন্য বড় স্টেডিয়াম দরকার নেই।

একটি খোলা, পরিষ্কার এবং নিরাপদ মাঠ অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট।

সেখানে দৌড়ানো, কাবাডি, গোল্লাছুট, ফুটবলসহ নানা ধরনের খেলা হতে পারে।

সবচেয়ে জরুরি হলো মাঠটি যেন সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য থাকে।


প্রতিবেদক: স্কুলের ভূমিকা কী হতে পারে?

সায়ন্তন: স্কুলের ভূমিকা খুব বড়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরে একটি ‘দেশজ খেলা সপ্তাহ’ আয়োজন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পুরনো খেলার সঙ্গে পরিচয় করানো যেতে পারে।

শিক্ষকেরা শুধু খেলা করাবেন না; সেই খেলার ইতিহাসও আলোচনা করতে পারেন।

যেমন একটি খেলা কোন অঞ্চলে প্রচলিত ছিল, কীভাবে খেলা হতো, তার স্থানীয় নাম কী—এসব তথ্যও শিক্ষার্থীরা সংগ্রহ করতে পারে।


প্রতিবেদক: এতে কি পড়াশোনার ক্ষতি হবে না?

সায়ন্তন: সঠিকভাবে পরিকল্পনা করলে নয়।

শিক্ষার অর্থ শুধু বই পড়া নয়। শারীরিক কার্যক্রম, দলগত আচরণ, সৃজনশীলতা ও সামাজিক দক্ষতাও শিক্ষার অংশ।

বরং দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার পাশাপাশি নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে ভারসাম্য আনতে পারে।


প্রতিবেদক: বাবা-মায়েরা কীভাবে ভূমিকা নিতে পারেন?

সায়ন্তন: প্রথম কাজ হলো সন্তানকে বাইরে খেলতে উৎসাহ দেওয়া।

সব সময় পড়াশোনা বা মোবাইলের মধ্যে শিশুকে আটকে রাখলে তার স্বাভাবিক খেলাধুলার সুযোগ কমে যায়।

অভিভাবকরা নিজের শৈশবের খেলার গল্প সন্তানকে বলতে পারেন। এমনকি নিজের জানা কোনো পুরনো খেলা সন্তানকে শেখাতে পারেন।

এতে প্রজন্মের মধ্যে একটি সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়।


প্রতিবেদক: দাদু-ঠাকুমাদের ভূমিকা কি এখানে গুরুত্বপূর্ণ?

সায়ন্তন: অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের অনেক শিশু জানেই না, তাদের বাবা-মা বা দাদা-ঠাকুমারা ছোটবেলায় কী খেলতেন।

একদিন বাড়িতে বসে একজন প্রবীণ মানুষ যদি নিজের শৈশবের খেলার গল্প বলেন, সেটিও ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি উপায়।

তরুণরা চাইলে সেই গল্প লিখে রাখতে পারে বা অনুমতি নিয়ে অডিও-ভিডিও রেকর্ড করতে পারে।


প্রতিবেদক: তাহলে কি দেশজ খেলাধুলার একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা সম্ভব?

সায়ন্তন: অবশ্যই।

প্রতিটি জেলার বিভিন্ন পুরনো খেলার নাম, স্থানীয় নাম, নিয়ম, মাঠের ধরন, ব্যবহৃত সরঞ্জাম, ছড়া বা খেলার সঙ্গে যুক্ত গল্প—এসব সংগ্রহ করা যেতে পারে।

একটি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি হলে আগামী প্রজন্ম জানতে পারবে, তাদের এলাকার মানুষ কী কী খেলতেন।

এটি শুধু খেলাধুলার নয়, স্থানীয় ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল হতে পারে।


প্রতিবেদক: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কি এই কাজে ব্যবহার করা যায়?

সায়ন্তন: খুব ভালোভাবে ব্যবহার করা যায়।

একটি গ্রামের তরুণরা নিজেদের এলাকার পুরনো খেলার ভিডিও তৈরি করতে পারে। প্রবীণ মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে পারে। পুরনো মাঠের ছবি সংগ্রহ করতে পারে।

তবে তথ্য প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই করা দরকার। কারও ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রেও অনুমতি নেওয়া উচিত।


প্রতিবেদক: দেশজ খেলাগুলিকে জনপ্রিয় করতে কি প্রতিযোগিতা আয়োজন করা দরকার?

সায়ন্তন: প্রতিযোগিতা একটি উপায়, তবে একমাত্র উপায় নয়।

যদি সবকিছু জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে খেলার আনন্দ কমে যেতে পারে।

তাই প্রদর্শনী ম্যাচ, পারিবারিক খেলা, শিশুদের জন্য আনন্দের খেলা এবং প্রতিযোগিতা—সবকিছুর সমন্বয় দরকার।


প্রতিবেদক: গ্রামীণ উৎসব বা মেলার সঙ্গে দেশজ খেলাকে যুক্ত করা যায়?

সায়ন্তন: অবশ্যই। বরং এটি খুব কার্যকর হতে পারে।

যে উৎসবে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই একত্রিত হন, সেখানে নির্দিষ্ট সময়ে দেশজ খেলাগুলির আয়োজন করা যেতে পারে।

শিশুদের জন্য সহজ খেলা, কিশোরদের জন্য দলগত খেলা এবং বড়দের জন্য ঐতিহ্যবাহী প্রদর্শনী—বয়সভেদে আলাদা ব্যবস্থা করা যায়।

তাহলে খেলাটি শুধু প্রদর্শনী হবে না, মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন।


প্রতিবেদক: দেশজ খেলা কি পর্যটনের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে?

সায়ন্তন: হ্যাঁ, তবে খুব সতর্কভাবে।

কোনো গ্রামের নিজস্ব খেলা যদি স্থানীয় পরিচয়ের অংশ হয়, তাহলে পর্যটকদের সামনে সেটি প্রদর্শন করা যেতে পারে।

কিন্তু শুধু পর্যটকদের দেখানোর জন্য খেলাটিকে কৃত্রিমভাবে বদলে ফেলা উচিত নয়।

স্থানীয় মানুষকে সম্মান দিয়ে এবং তাঁদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এটি করা দরকার।


প্রতিবেদক: দেশজ খেলাগুলি থেকে কি ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে?

সায়ন্তন: সরাসরি এবং পরোক্ষ—দুইভাবেই কিছু সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রশিক্ষক, সংগঠক, অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপক, ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া গবেষক, তথ্যচিত্র নির্মাতা, ক্রীড়া-শিক্ষক—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে কোনো দেশজ খেলাকে শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে দেখলে তার সাংস্কৃতিক দিকটি হারিয়ে যেতে পারে।


প্রতিবেদক: অনেকেই বলেন, ক্রিকেট বা ফুটবলের যুগে গোল্লাছুট কিংবা ডাংগুলির মতো খেলায় শিশুদের আগ্রহ থাকবে না। আপনি কী বলবেন?

সায়ন্তন: আমি এই ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই।

শিশুরা নতুন জিনিস শিখতে আগ্রহী। সমস্যা হলো—আমরা তাদের সামনে সেই খেলাগুলি কতটা তুলে ধরছি?

একটি স্কুলে যদি একদিন গোল্লাছুট শেখানো হয়, একজন শিক্ষক যদি খেলার গল্প বলেন এবং সবাইকে খেলতে দেন, তাহলে অনেক শিশুই আনন্দ পেতে পারে।

নতুন প্রজন্ম পুরনো জিনিস প্রত্যাখ্যান করে না; তারা সেটিকে নিজেদের ভাষায় ও নিজেদের পরিবেশে পেতে চায়।


প্রতিবেদক: দেশজ খেলাকে আধুনিক করার নামে কতটা পরিবর্তন করা উচিত?

সায়ন্তন: মূল কাঠামো ও পরিচয়কে সম্মান করে পরিবর্তন করা যায়।

যেমন খেলার মাঠ ছোট হলে নিয়ম কিছুটা পরিবর্তন করা যেতে পারে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমানো যেতে পারে। শিশুদের জন্য নিরাপদ সরঞ্জাম ব্যবহার করা যেতে পারে।

কিন্তু এমনভাবে পরিবর্তন করা উচিত নয় যাতে খেলার মূল বৈশিষ্ট্যই হারিয়ে যায়।


প্রতিবেদক: আজকের শিশুদের জন্য আপনি কোন দেশজ খেলাগুলি দিয়ে শুরু করতে বলবেন?

সায়ন্তন: এমন খেলা দিয়ে শুরু করা ভালো যেগুলি সহজ, কম খরচে এবং নিরাপদ পরিবেশে আয়োজন করা যায়।

গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, লুকোচুরি, দড়িলাফ, বিভিন্ন ধরনের দৌড়ের খেলা—এসব সহজে শুরু করা যায়।

এর পাশাপাশি কাবাডি বা অন্যান্য দলগত খেলাও শেখানো যেতে পারে।

আর ডাংগুলি বা লাঠিখেলার মতো খেলায় নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।


প্রতিবেদক: শহরের শিশুরাও কি এই খেলাগুলি শিখতে পারে?

সায়ন্তন: অবশ্যই পারে।

বরং শহরে দেশজ খেলার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য স্কুল, আবাসন এলাকা বা কমিউনিটি সেন্টারে বিশেষ কর্মসূচি করা যেতে পারে।

একটি শিশুর কাছে গোল্লাছুট হয়তো সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা হতে পারে।

এতে শুধু খেলার আনন্দ নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি সম্পর্কেও তার ধারণা তৈরি হবে।


প্রতিবেদক: আপনি কি মনে করেন ভবিষ্যতে দেশজ খেলাধুলা আবার জনপ্রিয় হতে পারে?

সায়ন্তন: আমি আশাবাদী।

ইতিহাসে অনেক বিষয়ই একসময় হারিয়ে যাওয়ার পথে গিয়েছে, পরে নতুনভাবে ফিরে এসেছে।

দেশজ খেলাও ফিরতে পারে। তবে তার জন্য স্মৃতি দিয়ে বসে থাকলে হবে না। খেলাগুলিকে মাঠে ফিরিয়ে আনতে হবে।

শিশুদের খেলতে দিতে হবে, শিক্ষকদের যুক্ত করতে হবে, পরিবারকে উৎসাহ দিতে হবে এবং স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করতে হবে।


প্রতিবেদক: শেষ প্রশ্ন। একজন ক্রীড়া-গবেষক হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কী?

সায়ন্তন: আমার উদ্বেগ হলো—আমরা অনেক সময় ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার পরে তার মূল্য বুঝতে পারি।

কোনো খেলা যদি আজও একজন প্রবীণ মানুষের স্মৃতিতে থাকে, সেটি সংরক্ষণের সময় এখনই।

আগামী দশ বছর অপেক্ষা করলে হয়তো সেই মানুষটির কাছ থেকে নিয়মগুলো আর জানা যাবে না।

তাই আমাদের এখনই স্থানীয় খেলাগুলির তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।


প্রতিবেদক: আর আপনার সবচেয়ে বড় আশা?

সায়ন্তন: আমার আশা হলো, একদিন আবার গ্রামের কোনো মাঠে সন্ধ্যার আগে শিশুদের দলবেঁধে খেলতে দেখা যাবে।

একজন হয়তো গোল্লাছুট খেলছে, অন্যরা কাবাডি খেলছে। পাশে কয়েকজন প্রবীণ মানুষ বসে পুরনো দিনের গল্প বলছেন।

আর কোনো শিশু হয়তো তার দাদুর কাছে জিজ্ঞেস করছে—“তোমরা ছোটবেলায় কী খেলতে?”

সেই প্রশ্নটাই আসলে ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখবে।


প্রতিবেদকের শেষ কথা

দেশজ খেলাধুলা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে—খেলার পরিবর্তন স্বাভাবিক। একটি প্রজন্ম যে খেলা খেলেছে, পরের প্রজন্ম একইভাবে খেলবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কোনো অঞ্চলের নিজস্ব খেলাধুলার স্মৃতি পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া কাম্য নয়।

গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, ডাংগুলি, লাঠিখেলা বা গ্রামীণ কাবাডি—প্রতিটি খেলার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের শৈশব, বন্ধুত্ব, প্রতিযোগিতা, আনন্দ এবং সামাজিক যোগাযোগের গল্প।

এই খেলাগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে বড় পরিকাঠামো সবসময় দরকার হয় না। অনেক সময় দরকার একটি খোলা মাঠ, কিছুটা সময়, কয়েকজন আগ্রহী মানুষ এবং পুরনো খেলা শেখানোর একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি।

সবচেয়ে বড় কথা, শিশুদের খেলতে দিতে হবে।

কারণ একটি মাঠে শিশুরা যখন একসঙ্গে দৌড়ায়, হাসে, হারে, জেতে এবং আবার পরের দিন একই বন্ধুর সঙ্গে খেলতে আসে—তখন সেখানে শুধু একটি খেলা হয় না। সেখানে তৈরি হয় বন্ধুত্ব, সামাজিকতা এবং স্মৃতি।

সম্ভবত আধুনিক প্রযুক্তির যুগে দেশজ খেলাধুলার ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নয়। বরং মাঠের আনন্দকে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই তার ভবিষ্যৎ।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই সাক্ষাৎকারের চরিত্র, বক্তব্য ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পূর্ণ কাল্পনিক। তথ্যভিত্তিক ফিচারধর্মী উপস্থাপনার উদ্দেশ্যে এটি রচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *