
শীতের সকাল। পাহাড়ি গ্রামের ছোট্ট বাসস্ট্যান্ডে নেমে চারদিকে তাকাল অর্ক। শহরের কোলাহল থেকে বহু দূরে এই জায়গাটির নাম—ধারাপাহাড়। চারদিকে সবুজ পাহাড়, কুয়াশা আর ঘন জঙ্গল।
অর্ক পেশায় ফটোগ্রাফার। অজানা জায়গার ছবি তোলাই তার নেশা। গ্রামের চায়ের দোকানে বসে চা খেতে খেতে সে জানতে পারল, পাহাড়ের ওপরে একটি পুরোনো জঙ্গল আছে, যেখানে বহু বছর ধরে কেউ যায় না।
দোকানের বৃদ্ধ মালিক বললেন, “ওই জঙ্গলে গেলে সাবধানে যাবেন। একটা লাল দরজা আছে সেখানে। দরজাটা কোনো বাড়ির নয়, অথচ একেবারে জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।”
অর্ক হেসে বলল, “দরজার ওপাশে কী আছে?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “সেটাই তো কেউ জানে না।”
পরদিন ক্যামেরা, জল আর কিছু শুকনো খাবার নিয়ে অর্ক রওনা দিল।
প্রায় তিন ঘণ্টা হাঁটার পর জঙ্গল আরও ঘন হয়ে উঠল। পাখির ডাকও কমে গেল। হঠাৎ অর্কের চোখে পড়ল অদ্ভুত একটি জিনিস।
দুটি বিশাল গাছের মাঝখানে সত্যিই একটি লাল দরজা দাঁড়িয়ে আছে।
দরজার চারপাশে কোনো দেওয়াল নেই। শুধু দরজা। তার নিচে মরচে ধরা লোহার চৌকাঠ।
অর্ক ক্যামেরা বের করে ছবি তুলল।
তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দরজার হাতল ঘোরাল।
দরজা খুলে গেল।
অর্ক অবাক হয়ে দেখল—ওপাশে কোনো ঘর নেই। বরং কয়েক ধাপ নিচে নেমে গেছে পাথরের সিঁড়ি।
কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে গেল নিচে।
সিঁড়ি শেষ হতেই দেখা গেল ছোট্ট একটি সুড়ঙ্গ। দেওয়ালে পুরোনো লণ্ঠন ঝোলানো। মাটিতে মানুষের পায়ের ছাপও রয়েছে।
“তাহলে এখানে কেউ আসে!”
অর্ক নিজের মনেই বলল।
সুড়ঙ্গের শেষে একটি ছোট ঘর। ঘরের মধ্যে কাঠের টেবিল, পুরোনো মানচিত্র এবং একটি লোহার বাক্স।
অর্ক বাক্সটি খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটি পুরোনো ছবি।
ছবিগুলো প্রায় ত্রিশ বছরের পুরোনো। সেখানে গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কয়েকজন বনকর্মী দাঁড়িয়ে আছে।
একটি ছবির পেছনে লেখা—
“ধারাপাহাড় সংরক্ষণ প্রকল্প—১৯৯৬।”
হঠাৎ বাইরে শব্দ হল।
কেউ যেন দ্রুত হাঁটছে।
অর্ক আলো নিভিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
দুজন মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
“ও নিশ্চয়ই এখানে এসেছে।”
“ছবিগুলো পেয়ে গেলে সব শেষ।”
অর্ক বুঝতে পারল, সে একা নয়।
কিছুক্ষণ পর শব্দ দূরে সরে গেল। অর্ক দ্রুত ছবিগুলো ব্যাগে নিয়ে সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে এল।
জঙ্গল থেকে ফিরে সে সরাসরি গ্রামের বৃদ্ধের কাছে গেল।
ছবিগুলো দেখাতেই বৃদ্ধের মুখ বদলে গেল।
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তাহলে এত বছর পর সত্যিটা আবার সামনে এল!”
তিনি জানালেন, ত্রিশ বছর আগে এই পাহাড়ে একটি বড় বন সংরক্ষণ প্রকল্প শুরু হয়েছিল। কিন্তু কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বেআইনিভাবে জঙ্গল কেটে কাঠ পাচার করত। গ্রামের কয়েকজন মানুষ এবং বনকর্মী তার প্রতিবাদ করেছিলেন।
এক রাতে প্রকল্পের নথি এবং প্রমাণ গায়েব হয়ে যায়। তারপর প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়।
“কিন্তু এই দরজা?”
অর্ক জানতে চাইল।
বৃদ্ধ বললেন, “একজন বনকর্মী সব প্রমাণ লুকিয়ে রাখার জন্য ওই গোপন ঘর তৈরি করেছিলেন। লাল দরজাটি ছিল তার চিহ্ন।”
অর্ক বুঝতে পারল, সে যে ছবিগুলো পেয়েছে সেগুলো শুধু পুরোনো ছবি নয়—একটি পুরোনো অপরাধের প্রমাণ।
পরদিন অর্ক ছবিগুলো নিয়ে প্রশাসনের কাছে গেল। তদন্ত শুরু হল। পুরোনো নথি মিলিয়ে দেখা গেল, ছবিতে থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে সত্যিই বহু বছর আগে অভিযোগ উঠেছিল।
তদন্তের পর জঙ্গলের একটি বড় অংশ বেআইনি দখল থেকে উদ্ধার করা হল।
কয়েক সপ্তাহ পরে অর্ক আবার সেই জঙ্গলে গেল।
লাল দরজাটি তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে।
তবে এবার দরজার পাশে একটি ছোট ফলক লাগানো হয়েছে—
“এই বন মানুষের নয়, প্রকৃতিরও অধিকার আছে এখানে।”
অর্ক ক্যামেরা তুলে শেষবারের মতো ছবি তুলল।
সেদিন সে বুঝেছিল, সব রহস্যের ওপাশে ভূত থাকে না।
কখনও কখনও সেখানে লুকিয়ে থাকে এমন একটি সত্য, যাকে মানুষ বছরের পর বছর মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখতে চায়।
কিন্তু সত্যেরও একটা দরজা থাকে।
আর সেই দরজা একদিন না একদিন খুলবেই।












Leave a Reply