
স্টেশনের পাশে ছোট্ট একটি ডাকঘরে কাজ করত নীলয়। প্রতিদিন অসংখ্য চিঠি তার হাত দিয়ে যেত। চিঠির সঙ্গে মানুষের কত গল্প জড়িয়ে থাকে, তা সে জানত।
কিন্তু এক বর্ষার দুপুরে পাওয়া একটি চিঠি তার নিজের জীবনটাকেই বদলে দিল।
খামটির ওপর লেখা—
প্রাপক: মেঘলা রায়
ঠিকানা: পুরোনো বটতলা, শালবনি
প্রেরকের নাম দেখে নীলয়ের বুক কেঁপে উঠল।
নীলয় দত্ত।
এটা তার নিজের নাম।
কিন্তু সে চিঠিটি লেখেনি।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ডাকের সিল অনুযায়ী চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল পাঁচ বছর আগে।
নীলয় খামটি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
তারপর হঠাৎ তার মনে পড়ল মেঘলার কথা।
কলেজজীবনের প্রেম।
একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য বিকেল।
বটগাছের নিচে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
তারপর একদিন মেঘলা বলেছিল,
“আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
নীলয় কিছু বলতে পারেনি।
মেঘলা চলে গিয়েছিল অন্য শহরে।
তারপর আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
পাঁচ বছর ধরে নীলয় ভেবেছিল, মেঘলা তাকে ভুলে গেছে।
কিন্তু আজ তার হাতে মেঘলার নামে নিজের লেখা একটি চিঠি।
সে শেষ পর্যন্ত খাম খুলল।
চিঠিতে লেখা—
“মেঘলা,
তুমি যখন এই চিঠি পাবে, তখন হয়তো আমি তোমার জীবনে আর থাকব না। কিন্তু একটা কথা না বলে থাকতে পারলাম না।
সেদিন তুমি যখন বলেছিলে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে, আমি তোমার ওপর রাগ করিনি। শুধু ভেবেছিলাম, তুমি আমাকে সত্যিটা বললে না কেন।
পরে জানতে পেরেছি, তোমার বাবার অসুস্থতার জন্য তুমি সেই বিয়েতে রাজি হয়েছিলে।
আমি তোমাকে আটকাতে পারিনি।
তবে যদি কোনোদিন তুমি মনে করো, আমাদের গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে গেছে, তাহলে বটগাছটার নিচে একবার এসো।
আমি অপেক্ষা করব।
—নীলয়”
চিঠি পড়ে নীলয় স্তব্ধ হয়ে গেল।
সে এই চিঠি লেখেনি।
অথবা লিখেছিল?
তার মনে পড়ল—পাঁচ বছর আগে মেঘলার বিয়ের আগের রাতে সে সত্যিই একটি চিঠি লিখেছিল। কিন্তু কখনও পাঠায়নি।
পরদিন সকালে সে চিঠিটি নিয়ে ডাকঘরে এসেছিল। তারপর শেষ মুহূর্তে ভয় পেয়ে খামটি ছিঁড়ে ফেলেছিল।
তাহলে এই চিঠি এল কীভাবে?
নীলয় খামের ভেতর আবার হাত ঢোকাল।
একটি ছোট কাগজ বেরিয়ে এল।
তাতে লেখা—
“যদি এখনও দেরি না হয়ে থাকে, আজ বিকেল চারটায় বটতলায় এসো।”
নীলয়ের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
বিকেল চারটায় সে বটগাছের নিচে পৌঁছল।
বৃষ্টি পড়ছিল।
গাছের নিচে কেউ নেই।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে একটি ছাতা হাতে একজন মহিলা এগিয়ে এল।
নীলয় তাকিয়ে রইল।
মেঘলা।
পাঁচ বছর পর।
দুজনেই কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না।
শেষ পর্যন্ত মেঘলা বলল,
“চিঠিটা পেয়েছ?”
নীলয় মাথা নাড়ল।
“তুমি পাঠিয়েছিলে?”
মেঘলা মৃদু হেসে বলল,
“না।”
“তাহলে?”
“আমিও জানি না।”
নীলয় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
মেঘলা বলল,
“পাঁচ বছর আগে বিয়ের দিন আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি আমাকে একবার হলেও আটকাবে। তুমি আসোনি।”
নীলয় ধীরে বলল,
“আমি এসেছিলাম।”
“কোথায়?”
“তোমাদের বাড়ির সামনে। কিন্তু তোমাকে দেখে ফিরে গিয়েছিলাম।”
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না।”
“আমি ভেবেছিলাম তুমি আমাকে চাও না।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
কিছু সম্পর্ক ভেঙে যায় ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে নয়, বরং দুজন মানুষ একই সত্যকে ভিন্নভাবে বুঝে নেওয়ার কারণে।
মেঘলা বলল,
“আমার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু এক বছর পর ভেঙে যায়। আমরা কেউ কাউকে ভালোবাসতাম না।”
নীলয় চুপ করে রইল।
“তারপর আমি তোমাকে অনেকবার খুঁজেছি। কিন্তু তোমার কোনো খবর পাইনি।”
নীলয় বলল,
“আমি এই শহরেই ছিলাম।”
“তাহলে আজ দেখা হলো কেন?”
নীলয় পকেট থেকে সেই চিঠিটি বের করল।
“হয়তো পাঁচ বছর আগে যে কথা আমরা কেউ বলতে পারিনি, সেটা আজ বলার সময় হয়েছে।”
মেঘলা চিঠিটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে বলো।”
নীলয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”
মেঘলার চোখ বেয়ে জল নেমে এল।
সে বলল,
“আমিও।”
বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছিল।
বটগাছের পাতার নিচে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল।
পাঁচ বছর আগে যে সম্পর্কটি ভুল বোঝাবুঝির কারণে থেমে গিয়েছিল, সেটি আজ আবার শুরু হলো।
কিন্তু নীলয়ের মনে একটি প্রশ্ন থেকেই গেল।
চিঠিটি কে পাঠিয়েছিল?
পরদিন ডাকঘরে ফিরে সে পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটতে লাগল।
চিঠিটির ডাকঘরের সিল ছিল অস্পষ্ট।
তবে একটি জিনিস স্পষ্ট ছিল।
চিঠিটি পাঁচ বছর আগে ঠিক সেই দিন পোস্ট করা হয়েছিল, যেদিন মেঘলার বিয়ে হয়েছিল।
আর প্রেরকের স্বাক্ষর—
নীলয়ের নিজের হাতের লেখার মতোই।
নীলয় অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর চিঠিটি যত্ন করে ভাঁজ করে রেখে দিল।
কিছু রহস্যের উত্তর হয়তো কখনও পাওয়া যায় না।
কিন্তু কিছু রহস্য মানুষের জীবনে এমন একটি দরজা খুলে দেয়, যেটা তারা নিজেরাই ভুল করে বন্ধ করে দিয়েছিল।












Leave a Reply