
সায়ন নতুন চাকরির জন্য শহর ছেড়ে একটি ছোট শহরে এসেছিল। থাকার জন্য খুব কম ভাড়ায় একটি পুরোনো বাড়ির দোতলার ঘর পেয়ে গেল।
বাড়ির মালিক বৃদ্ধা কমলা দেবী তাকে শুধু একটি কথা বলেছিলেন,
“রাতে জানালাটা খুলবেন না।”
সায়ন হেসে বলেছিল,
“কেন? ভূত আছে নাকি?”
বৃদ্ধা কোনো উত্তর দেননি।
প্রথম কয়েক দিন সব স্বাভাবিকই ছিল।
কিন্তু চতুর্থ রাতে সায়নের ঘুম ভেঙে গেল রাত ১টা ৪০ মিনিটে।
জানালার কাচে হালকা টোকা পড়ছে।
টক…
টক…
টক…
সায়ন বিছানা থেকে উঠে জানালার দিকে তাকাল।
জানালার ওপাশে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে।
সাদা পোশাক।
লম্বা চুল।
মুখটা দেখা যাচ্ছে না।
সায়নের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সাহস করে বলল,
“কে আপনি?”
মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না।
শুধু ধীরে ধীরে হাত তুলে জানালার কাচে লিখল—
“আমাকে খুঁজে বের করো।”
তারপর অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
সায়ন সারা রাত আর ঘুমাতে পারল না।
পরদিন সকালে সে কমলা দেবীকে সব বলল।
বৃদ্ধার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“আপনি তাকে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“কী লিখেছিল?”
“আমাকে খুঁজে বের করো।”
বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“ও মেয়েটার নাম ছিল মীরা।”
“কী হয়েছিল তার?”
“বিশ বছর আগে এই বাড়ির কাছেই সে নিখোঁজ হয়।”
“মারা গিয়েছিল?”
“কেউ জানে না।”
সায়নের কৌতূহল বেড়ে গেল।
সে মীরার ব্যাপারে খোঁজ করতে শুরু করল।
পুরোনো সংবাদপত্র ঘেঁটে সে একটি খবর পেল—
“কলেজছাত্রী মীরা নিখোঁজ, তদন্তে নতুন তথ্য নেই।”
খবরের সঙ্গে একটি ছোট ছবি।
ছবিটি দেখে সায়নের শরীর শিউরে উঠল।
ছবির মেয়েটিই সে গত রাতে জানালার ওপাশে দেখেছে।
কিন্তু রহস্য আরও গভীর হলো যখন সে খবরের নিচে একটি ঠিকানা পেল।
মীরার শেষ দেখা যাওয়ার জায়গা ছিল—এই বাড়ির ঠিক পেছনের পুরোনো বাগান।
সন্ধ্যায় সায়ন বাগানে গেল।
ঝোপঝাড়ের মধ্যে অনেক খুঁজেও কিছু পেল না।
হঠাৎ তার পা একটি শক্ত জিনিসে আটকে গেল।
মাটি সরিয়ে সে একটি মরচে ধরা লোহার বাক্স পেল।
বাক্সের ভেতরে ছিল কয়েকটি চিঠি, একটি পুরোনো ক্যামেরা এবং একটি ছোট্ট ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
“যদি আমার কিছু হয়, সত্যিটা এই ডায়েরিতেই আছে।”
সায়ন দ্রুত পড়তে শুরু করল।
মীরা লিখেছিল, সে একদিন এই বাড়ির মালিকের ছেলে রাহুলকে বাগানে কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেছিল।
রাহুল তাকে দেখে ফেলেছিল।
তারপর মীরা লিখেছিল—
“রাহুল আমাকে বলেছে, আমি যদি কাউকে কিছু বলি, তাহলে আমার ক্ষতি হবে।”
শেষ কয়েকটি পাতায় লেখা ছিল—
“আজ রাতে আমি সব প্রমাণ নিয়ে থানায় যাব।”
তারপর আর কিছু নেই।
সায়নের মনে হলো, রহস্যের উত্তর পেয়ে গেছে।
কিন্তু একটি প্রশ্ন রয়ে গেল—রাহুল কোথায়?
সে কমলা দেবীকে জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“রাহুলও আর বেঁচে নেই।”
“কবে মারা গেছেন?”
“পনেরো বছর আগে।”
সায়ন চমকে উঠল।
“তাহলে মীরার কী হয়েছিল?”
কমলা দেবী চোখ নামিয়ে বললেন,
“আমি জানতাম না।”
সায়ন ক্যামেরাটি পরীক্ষা করল। পুরোনো মেমোরি কার্ডে কয়েকটি ছবি ছিল।
একটি ছবিতে মীরা দাঁড়িয়ে।
তার পাশে রাহুল।
আর তাদের পেছনে একজন তৃতীয় ব্যক্তি।
সায়ন ছবিটি বড় করে দেখল।
তারপর তার বুক কেঁপে উঠল।
লোকটি আর কেউ নয়—কমলা দেবীর স্বামী।
মীরার নিখোঁজ হওয়ার সময় তিনিই ছিলেন বাড়ির মালিক।
সায়ন বৃদ্ধার সামনে ছবিটি রাখল।
কমলা দেবী অনেকক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“আমি সব জানতাম না। কিন্তু সেদিন রাতে আমার স্বামী বাগান থেকে একটা ভারী বাক্স নিয়ে বেরিয়েছিল। পরদিন মেয়েটা নিখোঁজ হয়ে যায়।”
“আপনি পুলিশকে বলেননি কেন?”
“ভয় পেয়েছিলাম।”
সায়ন সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে খবর দিল।
বাগানে আবার খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হলো।
কিছুক্ষণ পর মাটির নিচে একটি পুরোনো ধাতব বাক্স পাওয়া গেল।
তার ভেতরে মীরার কিছু জিনিস।
প্রমাণগুলো তদন্তের জন্য নেওয়া হলো।
সেদিন রাতে সায়ন ঘরে ফিরে জানালার সামনে দাঁড়াল।
রাত ১টা ৪০ মিনিট।
আবার কাচে তিনবার টোকা।
টক…
টক…
টক…
জানালার ওপাশে মীরা দাঁড়িয়ে।
কিন্তু এবার তার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
সে মৃদু হাসল।
সায়ন জানালার দিকে এগিয়ে গেল।
মীরা হাত তুলে কাচে লিখল—
“ধন্যবাদ।”
তারপর ধীরে ধীরে তার অবয়ব মিলিয়ে গেল।
সেদিনের পর আর কখনও জানালায় টোকা পড়েনি।
কয়েক মাস পরে বাড়িটি ছেড়ে যাওয়ার আগে সায়ন শেষবার জানালার দিকে তাকাল।
কাচে শিশির জমেছিল।
সেই শিশিরের ওপর খুব ছোট করে লেখা—
“এবার আমি বাড়ি যেতে পারি।”
সায়ন জানত না, মৃত মানুষ কোথায় যায়।
তবে এটুকু বুঝেছিল—
কখনও কখনও সত্যি চাপা পড়ে থাকতে পারে বহু বছর, কিন্তু সত্যেরও একদিন দরজা খুলে যায়।












Leave a Reply