রাত বারোটার পর যে বাঁশি বাজে।

 

মফস্বলের ছোট্ট শহরটির একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল একটি পরিত্যক্ত রেললাইন। বহু বছর ধরে সেখানে কোনো ট্রেন চলত না। আগাছায় ঢেকে যাওয়া লাইন, ভাঙা সিগন্যাল আর মরচে ধরা লোহার খুঁটি দেখে মনে হতো জায়গাটি যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

তবে এলাকার মানুষের কাছে জায়গাটির আরেকটি পরিচয় ছিল।

রাত বারোটার পর সেখানে নাকি বাঁশির শব্দ শোনা যায়।

একবার।

দুবার।

তারপর তিনবার।

লোকজন বলত, ওই বাঁশি শোনার পর কেউ যদি রেললাইনের দিকে এগিয়ে যায়, সে নাকি নিজের অতীতের এমন একটি দৃশ্য দেখতে পায়, যা সে সারাজীবন ভুলে থাকতে চেয়েছে।

অর্ণব এসব বিশ্বাস করত না।

এক রাতে বন্ধুর সঙ্গে বাজি ধরে সে ঠিক করল, রাত বারোটার পর পরিত্যক্ত রেললাইনের কাছে যাবে।

ঘড়িতে ১২টা বাজতেই চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

হঠাৎ—

ফিউউউউ…

একটি বাঁশির শব্দ।

অর্ণব থমকে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ পর আবার—

ফিউউউউ…

তারপর তৃতীয়বার।

ফিউউউউ…

বন্ধুটি ভয়ে পিছিয়ে গেল।

“চল ফিরে যাই।”

অর্ণব হাসল।

“এত ভয় পাচ্ছিস কেন?”

ঠিক তখনই দূরে একটি ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

রেললাইনের ওপর দিয়ে যেন কোনো ট্রেন আসছে।

অর্ণব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

ট্রেনটি ধীরে ধীরে কাছে এল।

কিন্তু আশ্চর্য—কোনো শব্দ নেই।

চাকা ঘুরছে, আলো জ্বলছে, অথচ ইঞ্জিনের কোনো আওয়াজ নেই।

ট্রেনটি অর্ণবের সামনে এসে থামল।

একটি দরজা খুলে গেল।

ভেতর থেকে একজন বৃদ্ধ বললেন,

“উঠে পড়ো।”

অর্ণবের পা যেন নিজের থেকেই ট্রেনের দিকে এগিয়ে গেল।

বন্ধুটি পিছন থেকে চিৎকার করছিল—

“অর্ণব! দাঁড়া!”

কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

ট্রেন চলতে শুরু করল।

অর্ণব জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।

স্টেশন, বাড়িঘর, রাস্তা—সব অদৃশ্য হয়ে গেছে।

তার বদলে দেখা যাচ্ছে একটি পুরোনো বাড়ি।

অর্ণব চিনতে পারল।

এটি তার শৈশবের বাড়ি।

বহু বছর আগে যে বাড়িটি বিক্রি হয়ে গেছে।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট অর্ণব।

তার বয়স তখন মাত্র আট বছর।

সামনে তার বাবা।

বাবা রাগ করে বলছেন,

“তুই আমার কথা শুনলি না কেন?”

ছোট্ট অর্ণব কাঁদছে।

তারপর দৃশ্য বদলে গেল।

বাবা একা ঘরে বসে আছেন।

হাতে একটি চিঠি।

তিনি চিঠিটি পড়ে কাঁদছেন।

অর্ণব বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

বাবা মারা যাওয়ার আগে তাকে কখনও কাঁদতে দেখেনি সে।

আরও একটি দৃশ্য।

বাবা হাসপাতালে শুয়ে।

মা পাশে বসে।

বাবা বারবার বলছেন,

“অর্ণবকে বলো, আমি ওর ওপর রাগ করিনি।”

অর্ণবের বুকটা কেঁপে উঠল।

সে তো ভেবেছিল, মৃত্যুর আগে বাবার সঙ্গে তার শেষ কথাটিই ছিল ঝগড়া।

বাবা তাকে ক্ষমা করেননি—এই বিশ্বাস নিয়েই সে এত বছর কাটিয়েছে।

হঠাৎ ট্রেন থেমে গেল।

বৃদ্ধ লোকটি এসে বললেন,

“এবার নামো।”

অর্ণব বলল,

“আমি কোথায়?”

বৃদ্ধ বললেন,

“যেখানে মানুষ নিজের ভুল ধারণাগুলো রেখে যায়।”

অর্ণব নেমে দেখল, সে আবার সেই পরিত্যক্ত রেললাইনে দাঁড়িয়ে।

বন্ধুটি পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।

“তুই কোথায় ছিলি?”

অর্ণব কিছু বলতে পারল না।

পরদিন সকালে সে সরাসরি মায়ের কাছে গেল।

“বাবা কি মৃত্যুর আগে বলেছিল, সে আমার ওপর রাগ করেনি?”

মা অবাক হয়ে তাকালেন।

“তুই জানলি কীভাবে?”

অর্ণবের চোখে জল এসে গেল।

মা ধীরে ধীরে বললেন,

“তোর বাবা তোকে খুব ভালোবাসত। কিন্তু তোদের শেষ ঝগড়ার পর তুই আর হাসপাতালে যাসনি। উনি বারবার তোকে দেখতে চেয়েছিলেন।”

অর্ণব মাথা নিচু করল।

“তুমি আমাকে আগে বলোনি কেন?”

“তুই শুনতে চাইতিস না।”

সেদিন বিকেলে অর্ণব বাবার পুরোনো ঘরে গিয়ে একটি বাক্স খুলল।

ভেতরে একটি চিঠি।

তার নাম লেখা।

চিঠিতে মাত্র কয়েকটি লাইন—

“অর্ণব,

জীবনে বাবার সঙ্গে ছেলের মতের অমিল হতেই পারে। কিন্তু তুই যেন কখনও ভাবিস না, আমি তোকে ভালোবাসিনি।

তুই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।

যদি কখনও আমার ওপর রাগ হয়, করে থাকিস। কিন্তু নিজেকে দোষী ভাবিস না।

—বাবা”

অর্ণব চিঠিটি বুকে চেপে ধরল।

সেই রাতে সে আবার রেললাইনের কাছে গেল।

রাত বারোটা বাজল।

চারদিক নিস্তব্ধ।

কিন্তু কোনো বাঁশির শব্দ হলো না।

অর্ণব মৃদু হেসে বলল,

“ধন্যবাদ, বাবা।”

দূরে ভাঙা সিগন্যালের লাল আলোটি একবার জ্বলে উঠল।

তারপর নিভে গেল।

সেদিনের পর আর কেউ কোনোদিন সেই রেললাইনে বাঁশির শব্দ শুনেছে কি না, অর্ণব জানে না।

তবে সে জানে—

কিছু বিদায় অনেক দেরিতে আসে।

আর কিছু ক্ষমা মানুষ মৃত্যুর পরেও পেয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *