
শহরের ব্যস্ত রাস্তার এক কোণে প্রতিদিন দুপুরবেলা একটি ছোট্ট খাবারের দোকান বসত। দোকান বলতে বাঁশের খুঁটি আর নীল ত্রিপলের ছাউনি। সামনে কয়েকটি বেঞ্চ। দোকানের মালিক ষাটোর্ধ্ব হরিপদ।
তার দোকানে দামি কোনো খাবার ছিল না। ভাত, ডাল, আলুভাজা, ডিম আর মাঝে মাঝে মাছ। কিন্তু দোকানটির একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল—যার কাছে টাকা নেই, সে-ও খালি পেটে ফিরত না।
হরিপদ বলতেন, “খিদে কখনও ধার দেখে আসে না।”
এক বর্ষার দুপুরে দোকানে এল এক কিশোর। বয়স পনেরো-ষোলো। জামাকাপড় ভিজে একাকার। ছেলেটি চুপচাপ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
হরিপদ জিজ্ঞেস করলেন, “খাবি?”
ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল, “টাকা নেই।”
“আমি টাকা চেয়েছি?”
ছেলেটি অবাক হয়ে তাকাল।
হরিপদ এক থালা ভাত, ডাল আর আলুভাজা এগিয়ে দিলেন।
ছেলেটি এমনভাবে খেতে শুরু করল, যেন বহুদিন ভালো করে খায়নি।
খাওয়া শেষ হলে হরিপদ বললেন, “নাম কী?”
“রাহুল।”
“বাড়ি কোথায়?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে বলল, “জানি না।”
হরিপদ আর প্রশ্ন করলেন না।
সেদিন থেকে রাহুল প্রায় প্রতিদিন দোকানে আসতে লাগল। কখনও খেত, কখনও দোকানের কাজ করে দিত। ধীরে ধীরে হরিপদ জানতে পারলেন, রাহুলের বাবা বহু বছর আগে মারা গেছেন। মা অন্য শহরে কাজ করতে গিয়ে আর ফেরেননি। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে কিছুদিন থাকার পর সে একসময় রাস্তায় এসে পড়ে।
হরিপদ তাকে নিজের দোকানের পাশে একটি ছোট ঘরে থাকতে দিলেন।
রাহুল স্কুলে পড়েনি ঠিকমতো। কিন্তু ছেলেটির শেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। রাতে দোকান বন্ধ করার পর হরিপদ পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে তাকে বাংলা পড়াতেন।
একদিন রাহুল জিজ্ঞেস করল, “কাকু, আমি বড় হয়ে কী হতে পারি?”
হরিপদ হেসে বললেন, “তুই যা হতে চাইবি, তাই হতে পারিস। শুধু একটা কথা মনে রাখিস—যেদিন তোর হাতে টাকা আসবে, সেদিন যেন কারও খিদে না থাকে।”
বছর কেটে গেল।
রাহুল পড়াশোনা শিখল। তারপর শহরের একটি গ্যারেজে কাজ নিল। কাজের পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে গেল। কয়েক বছর পর সে একটি বড় গাড়ি কোম্পানিতে চাকরি পেল।
তার জীবন বদলে গেল।
কিন্তু হরিপদকে সে ভুলল না।
প্রতিমাসে টাকা পাঠাত। হরিপদ অবশ্য খুব বেশি নিতেন না।
“আমার যতটুকু লাগে, ততটুকুই যথেষ্ট।”
একদিন রাহুল ছুটিতে গ্রামে ফিরে এসে দেখল, হরিপদের দোকান বন্ধ।
পাশের দোকানদার বললেন, “কাকু অসুস্থ। দোকান চালাতে পারছেন না।”
রাহুল ছুটে গেল হরিপদের বাড়িতে।
বিছানায় শুয়ে থাকা হরিপদ দুর্বল গলায় বললেন, “তুই এসেছিস?”
রাহুল তার হাত ধরে বলল, “আমি না এলে কে আসবে?”
হরিপদ মৃদু হাসলেন।
কয়েকদিন পর রাহুল তাকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে গেল। চিকিৎসার খরচের ব্যবস্থা করল। ধীরে ধীরে হরিপদ সুস্থ হয়ে উঠলেন।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার দিন রাহুল একটি কাগজ এনে হরিপদের সামনে রাখল।
“এটা কী?”
“আপনার নতুন দোকানের কাগজ।”
হরিপদ অবাক।
“নতুন দোকান?”
রাহুল বলল, “শুধু আপনার জন্য নয়। এখানে প্রতিদিন অন্তত পঞ্চাশজন মানুষ বিনামূল্যে খেতে পারবে।”
হরিপদের চোখ ভিজে উঠল।
“এত টাকা কোথায় পেলি?”
রাহুল হাসল।
“আপনি তো বলেছিলেন, হাতে টাকা এলে যেন কারও খিদে না থাকে।”
কয়েক মাস পর শহরের একটি ব্যস্ত এলাকায় নতুন দোকান খুলল।
নাম—‘এক মুঠো ভাত’।
দোকানের সামনে বড় করে লেখা ছিল—
“যার সামর্থ্য আছে, সে দাম দিয়ে খাবেন। যার নেই, সে বিনা দামে খাবেন।”
প্রথম দিন দুপুরে এক বৃদ্ধ ভিখারি দোকানে এসে দাঁড়ালেন।
কাঁপা গলায় বললেন, “বাবা, টাকা নেই।”
রাহুল নিজে থালা এগিয়ে দিল।
“খান।”
বৃদ্ধ খেতে শুরু করলেন।
দূরে দাঁড়িয়ে হরিপদ সব দেখছিলেন।
রাহুল তার দিকে তাকিয়ে বলল, “কাকু, আপনার ঋণ শোধ করছি।”
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
“না রে। এক মুঠো ভাতের ঋণ কখনও শোধ হয় না। শুধু অন্য কাউকে খাইয়ে দিতে হয়।”
রাহুল কিছু বলল না।
শুধু হাসল।
আর সেই দিন থেকে শহরের সেই ছোট্ট দোকানে প্রতিদিন দুপুরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যেত—একজনের দেওয়া ভাত আরেকজনের জীবন বদলে দিচ্ছে।
কারণ কখনও কখনও মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সাহায্যটা টাকা নয়।
একটি সময়মতো এগিয়ে দেওয়া খাবারের থালাও হতে পারে।












Leave a Reply