গল্প : শিউলি গাছের নিচে রাখা প্রদীপ।

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটেনি। গ্রামের সরু মাটির রাস্তার পাশে শিউলি গাছটির নিচে প্রতিদিন একটি ছোট প্রদীপ জ্বলতে দেখা যেত।

গ্রামের কেউ জানত না প্রদীপটি কে জ্বালায়।

শুধু জানত, ভোরের আগে কেউ একজন আসে, প্রদীপ জ্বালিয়ে চলে যায়।

সেই গ্রামেই থাকত অমিত। শহরে চাকরি করত, কিন্তু ছুটিতে গ্রামে এলেই শিউলি গাছটির পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকত।

কারণ এই গাছটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার জীবনের সবচেয়ে পুরোনো স্মৃতি।

বারো বছর আগে এই গাছের নিচেই তার সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল মাধবীর।

মাধবী প্রতিদিন ভোরে ফুল কুড়োতে আসত।

অমিত একদিন মজা করে বলেছিল, “এত ভোরে উঠে ফুল কুড়িয়ে কী করবে?”

মাধবী বলেছিল, “ঠাকুরের জন্য।”

“আর নিজের জন্য?”

“নিজের জন্য তো কিছু মানুষ ফুল হয়ে আসে।”

অমিত হেসে ফেলেছিল।

সেই হাসি থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের বন্ধুত্ব।

তারপর বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে ভালোবাসায় বদলে গিয়েছিল।

কিন্তু তাদের পরিবার ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। অমিতের বাবা চাইতেন ছেলে শহরে ভালো চাকরি করুক। মাধবীর পরিবার ছিল দরিদ্র কৃষক পরিবার।

একদিন অমিত শহরে চাকরি পেয়ে গেল।

যাওয়ার আগে সে মাধবীকে বলেছিল,

“আমি ফিরে আসব।”

মাধবী শুধু বলেছিল,

“আমি অপেক্ষা করব।”

কিন্তু শহরে গিয়ে অমিতের জীবন বদলে গেল।

নতুন চাকরি, নতুন মানুষ, নতুন দায়িত্ব।

প্রথম দিকে সে নিয়মিত ফোন করত।

তারপর ফোন কমে গেল।

চিঠিও বন্ধ হল।

মাধবী অপেক্ষা করেছিল।

এক বছর।

দুই বছর।

তিন বছর।

অমিত আর ফিরল না।

অবশেষে একদিন মাধবী জানতে পারল, অমিত শহরে বিয়ে করেছে।

খবরটি শুনে সে কাউকে কিছু বলেনি।

শুধু পরদিন ভোরে শিউলি গাছের নিচে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছিল।

তারপর থেকে প্রতিদিন।

অমিতের বিয়ের খবরের পর বহু বছর কেটে গেল।

অমিতের স্ত্রী মারা গেলেন কয়েক বছর আগে। একমাত্র মেয়েও বিদেশে চলে গেল।

অমিত অবসর নিয়ে একদিন হঠাৎ নিজের গ্রামে ফিরে এল।

গ্রাম অনেক বদলে গেছে।

কিন্তু শিউলি গাছটি এখনও আছে।

আর প্রদীপটিও জ্বলছে।

অমিত এক ভোরে গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।

কিছুক্ষণ পর দূর থেকে একজন বৃদ্ধা এগিয়ে এলেন।

হাতে তেলের ছোট বোতল।

অমিত চিনতে পারল না।

বৃদ্ধা গাছের নিচে বসে প্রদীপ জ্বালালেন।

তারপর উঠে দাঁড়াতেই অমিত বলল,

“আপনি প্রতিদিন প্রদীপ জ্বালান?”

বৃদ্ধা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“কারও জন্য অপেক্ষা করেছিলাম একদিন। সে আর আসেনি। তাই ভাবলাম, অন্তত তার পথটা যেন অন্ধকার না থাকে।”

অমিতের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সে ধীরে বলল,

“মাধবী?”

বৃদ্ধা মাথা তুললেন।

“তুমি অমিত?”

অমিত কোনো উত্তর দিতে পারল না।

মাধবী হাসলেন।

“অনেক দেরি করে ফিরেছ।”

“আমি… তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি।”

মাধবী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“কীসের জন্য?”

“তোমাকে অপেক্ষা করানোর জন্য।”

মাধবী মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“অপেক্ষা করেছিলাম ঠিকই। কিন্তু তোমার জন্য জীবন থামিয়ে রাখিনি।”

অমিত অবাক হয়ে তাকাল।

মাধবী জানালেন, অমিত চলে যাওয়ার পর তিনি গ্রামের মেয়েদের পড়াতে শুরু করেছিলেন। পরে একটি ছোট স্কুল তৈরি করেন। এখন গ্রামের বহু মেয়ে সেখানে পড়াশোনা করে।

অমিতের চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে এত বছর প্রদীপ জ্বালালে কেন?”

মাধবী একটু হেসে বললেন,

“তোমার জন্য নয়।”

“তাহলে?”

“যারা ভুল করে দূরে চলে যায়, তারা যেন কোনোদিন ফিরে আসতে চাইলে অন্ধকারে পথ না হারায়।”

অমিত মাথা নিচু করল।

সেদিন প্রথমবার সে বুঝল—ভালোবাসা সবসময় কাউকে নিজের কাছে পাওয়ার নাম নয়।

কখনও ভালোবাসা মানে কাউকে হারিয়েও তার জন্য একটি আলো জ্বালিয়ে রাখা।

পরদিন অমিত শিউলি গাছটির পাশে একটি বেঞ্চ বসিয়ে দিল।

তার ওপর ছোট্ট একটি ফলক লাগানো হল—

“যারা ফিরে আসতে দেরি করেছেন, তাদের জন্য।”

তারপর থেকে প্রদীপটি আর শুধু মাধবী জ্বালাতেন না।

গ্রামের মানুষও জ্বালাত।

আর শিউলি গাছের নিচে প্রতিদিন ভোরে ফুটে থাকত সাদা ফুল।

যেন বহু বছরের অভিমান পেরিয়ে সেখানে ভালোবাসা নতুন কোনো ভাষা খুঁজে পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *