কানামাছি: চোখ বাঁধা এক খেলায় জমে উঠত পাড়ার বিকেল।

কানামাছি: শৈশবের এক সরল অথচ উত্তেজনাপূর্ণ খেলা

একটা সময় ছিল, যখন বিকেল হলেই পাড়ার মাঠ, বাড়ির উঠোন কিংবা গ্রামের ফাঁকা জায়গায় শিশুদের কোলাহল শোনা যেত। সেই সময় বিনোদনের জন্য হাতে মোবাইল ফোন ছিল না, অনলাইন গেম ছিল না, ছিল না দামি খেলনাও। কয়েকজন বন্ধু একসঙ্গে হলেই নিজেদের মতো করে শুরু হয়ে যেত নানা ধরনের খেলা।

সেইসব খেলাগুলোর মধ্যে বাংলার পরিচিত একটি নাম কানামাছি

কানামাছি ছিল এমন একটি খেলা যেখানে একজন খেলোয়াড়ের চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দেওয়া হতো। এরপর অন্য খেলোয়াড়রা তার চারপাশে ঘুরে বেড়াত এবং চোখ বাঁধা খেলোয়াড় চেষ্টা করত কাউকে ধরে ফেলতে।

খেলাটি দেখতে অত্যন্ত সাধারণ হলেও এর মধ্যে ছিল উত্তেজনা, হাসি, কৌশল এবং অসাধারণ সামাজিক আনন্দ।

কীভাবে খেলা হতো কানামাছি?

কানামাছি খেলতে সাধারণত কয়েকজন খেলোয়াড়ের প্রয়োজন হতো। প্রথমে ঠিক করা হতো কে ‘কানা’ হবে।

তারপর একটি কাপড় বা রুমাল দিয়ে সেই খেলোয়াড়ের চোখ ভালোভাবে বেঁধে দেওয়া হতো। চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় তাকে নির্দিষ্ট খেলার জায়গার মধ্যে থাকতে হতো।

অন্য খেলোয়াড়রা তার আশপাশে অবস্থান করত। কেউ কাছে এসে শব্দ করত, কেউ দূরে সরে যেত, আবার কেউ কখনও ইচ্ছা করে পায়ের শব্দ করে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করত।

চোখ বাঁধা খেলোয়াড় শব্দ ও অনুমানের সাহায্যে অন্য কাউকে ধরার চেষ্টা করত।

কাউকে ধরতে পারলে সাধারণত ধরা পড়া খেলোয়াড়ের পালা আসত। তবে অঞ্চলভেদে নিয়মের কিছু পরিবর্তন দেখা যেত।

চোখের বদলে অন্য ইন্দ্রিয়ের ব্যবহার

কানামাছির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ছিল—চোখ বন্ধ থাকায় খেলোয়াড়কে অন্য ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করতে হতো।

পায়ের শব্দ কোথা থেকে আসছে?

কেউ কি পাশ দিয়ে দৌড়ে গেল?

কোন দিকে হাসির শব্দ শোনা গেল?

কেউ কি ইচ্ছা করে কাছে এসে আবার দ্রুত সরে গেল?

এসব বোঝার চেষ্টা করতে হতো।

চোখ দিয়ে সরাসরি পরিস্থিতি দেখা সম্ভব না হওয়ায় শ্রবণশক্তি, অনুমান এবং স্থান সম্পর্কে ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত।

হাসি-ঠাট্টায় ভরে উঠত খেলার মাঠ

কানামাছির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর মজার পরিবেশ।

চোখ বাঁধা খেলোয়াড় যখন কাউকে ধরার চেষ্টা করত, তখন অন্যরা তাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য কখনও ডানে, কখনও বাঁয়ে সরে যেত।

কেউ হয়তো একটু দূর থেকে ডাকত, আবার চোখ বাঁধা খেলোয়াড় সেই শব্দের দিকে এগিয়ে গেলে অন্যরা হাসতে হাসতে পালিয়ে যেত।

অনেক সময় খেলোয়াড় ভুল দিকে গিয়ে পড়লে সবাই হেসে উঠত।

তবে এই হাসি ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। কিছুক্ষণ পর যে খেলোয়াড় হাসছিল, তাকেই আবার চোখ বেঁধে মাঠে নামতে হতো।

বড় মাঠের প্রয়োজন ছিল না

কানামাছির জন্য ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো বিশাল মাঠের প্রয়োজন হয় না।

একটি নিরাপদ উঠোন, বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গা কিংবা পাড়ার একটি নির্দিষ্ট অংশেই খেলা সম্ভব।

এই কারণে গ্রাম ও মফস্বলের পাশাপাশি শহরের বাড়ির উঠোনেও একসময় এই খেলা সহজেই আয়োজন করা যেত।

তবে চোখ বাঁধা খেলোয়াড়কে যাতে কোনো গর্ত, সিঁড়ি, গাড়ি, ধারালো বস্তু বা অন্য কোনো বিপদের মুখোমুখি হতে না হয়, সে বিষয়টি সবসময় নিশ্চিত করা জরুরি।

কানামাছি এবং দলগত সম্পর্ক

খেলাটি যদিও ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ধরার উপর নির্ভর করে, তবুও এর মধ্যে দলগত আনন্দ ছিল প্রবল।

সবাই মিলে নিয়ম ঠিক করা, কে প্রথম ‘কানা’ হবে তা নির্ধারণ করা, খেলার জায়গা ঠিক করা এবং পালা বদল—সবকিছুতেই শিশুদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে হতো।

এই ধরনের খেলা শিশুদের সামাজিক মেলামেশার সুযোগ তৈরি করত।

বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা, হাসি-ঠাট্টা করা, ছোটখাটো মতবিরোধ মিটিয়ে আবার খেলা শুরু করা—এসবও শৈশবের সামাজিক শিক্ষার অংশ হয়ে উঠত।

অঞ্চলভেদে নিয়মের পার্থক্য

লোকজ খেলাগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য হলো, একই খেলার নিয়ম সব জায়গায় এক নয়।

কানামাছির ক্ষেত্রেও স্থানীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন নিয়ম প্রচলিত ছিল।

কোথাও চোখ বাঁধা খেলোয়াড় কাউকে ধরলেই তার পালা শেষ হতো। কোথাও আবার ধরা পড়া ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে হতো।

আবার কোনো কোনো জায়গায় খেলার সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো।

অর্থাৎ কানামাছি ছিল মূলত একটি লোকজ খেলা, যার নিয়ম মানুষের মুখে মুখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলেছে।

শুধু বাংলায় নয়

চোখ বেঁধে অন্য খেলোয়াড়কে ধরার অনুরূপ খেলা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই বিভিন্ন নামে পরিচিত। ইংরেজিতে এর একটি পরিচিত নাম Blind Man’s Buff

বাংলার কানামাছির নিজস্ব লোকজ রূপ থাকলেও মূল ধারণাটি বিশ্বের নানা সংস্কৃতিতে দেখা যায়।

এটি দেখায় যে চোখের দৃষ্টি বন্ধ করে শ্রবণ ও অনুমানের মাধ্যমে কাউকে খুঁজে বের করার ধারণাটি মানুষের খেলাধুলার সংস্কৃতিতে বহুদিন ধরেই আকর্ষণ তৈরি করেছে।

শিশুদের জন্য কী শেখার ছিল?

কানামাছি শুধু হাসি-ঠাট্টার খেলা ছিল না। এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতার অনুশীলনও হয়ে যেত।

চোখ বন্ধ রেখে শব্দের দিক বোঝার চেষ্টা করতে হতো। নিজের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা রাখতে হতো। কখন সামনে এগোতে হবে এবং কখন থামতে হবে, তা বুঝতে হতো।

এতে শ্রবণ ও স্থানিক সচেতনতার মতো দক্ষতা অনুশীলনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এটিকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ হিসেবে দেখা উচিত নয়; মূল উদ্দেশ্য ছিল আনন্দ ও খেলাধুলা।

কেন আজ কম দেখা যায়?

সময়ের সঙ্গে শিশুদের জীবনযাত্রা বদলেছে।

আগে বিকেলের বড় অংশ পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে কাটত। এখন অনেক শিশুর অবসর সময় ভাগ হয়ে যায় পড়াশোনা, কোচিং, টেলিভিশন, স্মার্টফোন এবং অনলাইন বিনোদনের মধ্যে।

শহরে নিরাপদ খেলার জায়গার অভাবও একটি বড় পরিবর্তন এনেছে।

ফলে কানামাছির মতো সহজ দেশি খেলাগুলো ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

একসময় যে খেলায় কয়েকজন শিশুর হাসির শব্দে গোটা পাড়া মুখরিত হয়ে উঠত, আজ অনেক জায়গায় সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না।

পুরনো খেলাগুলো ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ

কানামাছির মতো খেলা ফিরিয়ে আনতে খুব বেশি অর্থ বা পরিকাঠামোর প্রয়োজন নেই।

বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ‘হারিয়ে যাওয়া খেলা’ বিভাগ রাখা যেতে পারে। পাড়ার ক্লাব বা স্থানীয় সংগঠনও ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার ছোট অনুষ্ঠান করতে পারে।

শিশুদের পাশাপাশি তাদের বাবা-মা ও দাদা-দিদাদেরও অনুষ্ঠানে যুক্ত করা যেতে পারে।

তাহলে প্রবীণরা নিজেদের ছোটবেলার খেলার অভিজ্ঞতা শিশুদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবেন।

এতে একদিকে পুরনো খেলাগুলো পরিচিত হবে, অন্যদিকে প্রজন্মের মধ্যে যোগাযোগও বাড়বে।

নিরাপত্তা সবার আগে

কানামাছিতে যেহেতু একজন খেলোয়াড় চোখ বাঁধা অবস্থায় চলাফেরা করে, তাই নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া দরকার।

খেলার জায়গা সমতল ও বাধামুক্ত হওয়া উচিত। সিঁড়ি, গর্ত, গাড়ি, ধারালো বস্তু বা জলাশয়ের কাছাকাছি এই খেলা আয়োজন করা উচিত নয়।

খেলার পরিধি নির্দিষ্ট করে দেওয়া এবং ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের নজরদারি থাকা ভালো।

আধুনিক সময়ে নিরাপদ পরিবেশে খেলাটিকে নতুনভাবে আয়োজন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নাম

কানামাছি নামটি শুনলেই বহু মানুষের মনে পড়ে যেতে পারে ছোটবেলার বিকেল।

চোখে কাপড় বাঁধা, চারদিকে বন্ধুদের হাসি, কাউকে ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া—এই সরল মুহূর্তগুলোই একসময় শৈশবের আনন্দের বড় অংশ ছিল।

খেলাটিতে কোনো দামি সরঞ্জাম ছিল না। কোনো নির্দিষ্ট পোশাক ছিল না। ছিল না পুরস্কারের বড় আয়োজন।

ছিল শুধু কয়েকজন বন্ধু এবং একসঙ্গে সময় কাটানোর আনন্দ।

নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরুক কানামাছি

আজকের শিশুদের সামনে যদি কানামাছি খেলার সুযোগ তৈরি করা হয়, অনেকেই হয়তো প্রথমে অবাক হবে—চোখ বেঁধে আবার খেলা যায় নাকি?

কিন্তু একবার খেলা শুরু হলে সেই কৌতূহল দ্রুত আনন্দে পরিণত হতে পারে।

কারণ খেলাটির মূল আকর্ষণ প্রযুক্তি নয়—মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ।

একসঙ্গে হাসা, দৌড়ানো, নিয়ম মানা এবং বন্ধুকে এড়িয়ে যাওয়ার সেই আনন্দ কোনো ভার্চুয়াল স্ক্রিনে পুরোপুরি পুনরায় তৈরি করা কঠিন।

শেষ কথা

কানামাছি হয়তো আজ আর আগের মতো প্রতিটি পাড়ায় দেখা যায় না। কিন্তু এই খেলা আমাদের শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি বহন করে।

মাটির উঠোনে চোখ বাঁধা একটি শিশু, চারপাশে ছুটে বেড়ানো তার বন্ধুরা আর তাদের হাসির শব্দ—এই দৃশ্য হয়তো আজ অতীতের।

তবুও সেই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

হয়তো আবার কোনো বিকেলে কাপড় দিয়ে চোখ বাঁধা হবে, কেউ বলবে—“কানামাছি ভোঁ ভোঁ…” আর শুরু হবে হারিয়ে যাওয়া এক শৈশবের খেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *