ড. নীনা গুপ্ত : জটিল গণিতের জগতে ভারতীয় এক অসাধারণ নারী।

গণিতকে অনেকেই কঠিন, শুষ্ক কিংবা শুধুই সংখ্যার হিসাব বলে মনে করেন। কিন্তু গণিতের গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, এটি আসলে যুক্তি, কল্পনা, ধৈর্য এবং নতুন সত্য আবিষ্কারের এক অসীম জগৎ। সেই জগতে নিজের অসাধারণ গবেষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিচিতি তৈরি করেছেন ভারতীয় গণিতবিদ ড. নীনা গুপ্ত।

কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই বিজ্ঞানী কমিউটেটিভ অ্যালজেব্রা এবং অ্যাফাইন অ্যালজেব্রিক জিওমেট্রির মতো জটিল বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল বহুদিনের একটি গাণিতিক সমস্যা—‘জারিস্কি ক্যানসেলেশন প্রবলেম’। এই গবেষণার জন্য তিনি ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ শাস্তি স্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কার লাভ করেন।

ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি আকর্ষণ

১৯৮৪ সালে কলকাতায় জন্ম নীনা গুপ্তের। ছোটবেলা থেকেই গণিতের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। অন্য অনেকের কাছে যে বিষয়টি কঠিন বলে মনে হতে পারে, নীনার কাছে সেটিই হয়ে উঠেছিল চিন্তা করার এক আনন্দময় মাধ্যম।

তিনি কলকাতার বেথুন কলেজে গণিতে পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে গণিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে একই প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল বীজগণিতের অত্যন্ত বিশেষায়িত একটি ক্ষেত্র।

এই পথটি সহজ ছিল না। গণিতের গবেষণায় অনেক সময় একটি সমস্যার সমাধান খুঁজতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। একটি ছোট সূত্রের পেছনেও থাকতে পারে অসংখ্য হিসাব, যুক্তি ও ব্যর্থ প্রচেষ্টা। নীনা গুপ্ত সেই দীর্ঘ গবেষণার পথেই নিজের জায়গা তৈরি করেন।

যে সমস্যার সঙ্গে যুক্ত তাঁর নাম

নীনা গুপ্তের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ‘জারিস্কি ক্যানসেলেশন প্রবলেম’-এর সঙ্গে যুক্ত গবেষণার কারণে।

সহজভাবে বললে, এই সমস্যাটি জানতে চায়—দুটি গাণিতিক বস্তুর সঙ্গে একই ধরনের একটি অতিরিক্ত অংশ যোগ করার পর যদি তারা সমান বা একই রকম হয়ে যায়, তাহলে মূল দুটি বস্তুকেও কি অবশ্যই একই রকম হতে হবে?

প্রশ্নটি শুনতে সরল মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে উচ্চতর বীজগণিত ও জ্যামিতির গভীর তত্ত্ব। বিখ্যাত গণিতবিদ অস্কার জারিস্কি ১৯৪৯ সালে সমস্যাটির একটি রূপ উত্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন গণিতবিদ এই সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করেছেন।

এই দীর্ঘ গবেষণার ধারায় নীনা গুপ্তের কাজ বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে ধনাত্মক characteristic-এর ক্ষেত্রে অ্যাফাইন স্পেস সম্পর্কিত সমস্যাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ counterexample তাঁর গবেষণায় সামনে আসে।

গবেষণার জগতে নিজের পরিচয়

ডক্টরেট শেষ করার পর নীনা গুপ্ত গবেষণার জগতে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন। তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে কাজ করেন এবং টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চেও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যান্ড ম্যাথমেটিক্যাল ইউনিটে অধ্যাপনা ও গবেষণার দায়িত্ব পালন করেন।

গবেষণার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের গণিতের প্রতি আগ্রহী করে তোলাও তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কারণ একটি দেশের বিজ্ঞানচর্চা শুধু একজন গবেষকের সাফল্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। নতুন গবেষক তৈরি করাও সেই ধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

একের পর এক সম্মান

নীনা গুপ্তের গবেষণার স্বীকৃতি এসেছে দেশ ও বিদেশ—দুই ক্ষেত্রেই।

২০১৪ সালে তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির ইয়ং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড পান। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে গণিতের ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ গবেষণার জন্য তিনি শাস্তি স্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কারে সম্মানিত হন। সরকারি পুরস্কার-তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কাজের মধ্যে জারিস্কি ক্যানসেলেশন প্রবলেম এবং অ্যাফাইন স্পেসে গ্রুপ অ্যাকশনের invariants সম্পর্কিত গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

২০২১ সালের জন্য তিনি উন্নয়নশীল দেশের তরুণ গণিতবিদদের দেওয়া DST-ICTP-IMU Ramanujan Prize-ও লাভ করেন। গণিতের আন্তর্জাতিক পরিসরে এই সম্মান তাঁর গবেষণার গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—তাঁর সাফল্যের ভিত্তি কোনও জনপ্রিয় প্রচার নয়, বরং বহু বছরের গভীর গবেষণা ও কঠিন গাণিতিক সমস্যার সমাধানের চেষ্টা।

গণিতের মতো কঠিন ক্ষেত্রেও নারীর জায়গা

বিজ্ঞান ও গণিতের উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ আজ অনেক বেড়েছে। কিন্তু কয়েক দশক আগেও পরিস্থিতি এতটা সহজ ছিল না। এখনও অনেক পরিবারে মেয়েদের পেশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারণার প্রভাব দেখা যায়।

নীনা গুপ্তের পথটি সেই প্রচলিত ধারণার বাইরে যাওয়ার একটি উদাহরণ।

তিনি দেখিয়েছেন, কোনও নির্দিষ্ট পেশা বা গবেষণাক্ষেত্রকে শুধু পুরুষদের জন্য উপযুক্ত বলে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। একজন নারীও অত্যন্ত বিমূর্ত ও জটিল গণিতের সমস্যাকে নিজের গবেষণার বিষয় করতে পারেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেন।

সাফল্যের আড়ালে দীর্ঘ অধ্যবসায়

একজন গবেষকের সাফল্যের গল্প সাধারণত পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্ত দিয়ে বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে একটি পুরস্কারের পিছনে থাকে দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম।

গণিতের গবেষণায় উত্তর সবসময় চোখের সামনে থাকে না। অনেক সময় একটি সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে গবেষককে বারবার নিজের ধারণা পরীক্ষা করতে হয়। কোনও অনুমান ভুল হলে আবার শুরু করতে হয়। একটি প্রমাণের সামান্য ত্রুটিও পুরো যুক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

নীনা গুপ্তের গবেষণাজীবন সেই ধৈর্যেরই প্রতিফলন। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল এমন একটি উচ্চতর গণিতের অঞ্চল, যেখানে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়গুলো হয়তো দুর্বোধ্য। কিন্তু সেই কঠিন জগতেই তিনি নতুন ফলাফল সামনে এনেছেন।

কলকাতার মাটিতে আন্তর্জাতিক গণিতচর্চা

নীনা গুপ্তের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল তাঁর কলকাতার সঙ্গে সম্পর্ক। বেথুন কলেজ থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট—শিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই শহরের নাম।

কলকাতা বহুদিন ধরেই বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেই শহর থেকেই আন্তর্জাতিক গণিতের অঙ্গনে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন নীনা গুপ্ত।

এটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। এটি ভারতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যেও যে বিশ্বমানের গবেষণা সম্ভব, তার একটি উদাহরণ।

তরুণ প্রজন্মের জন্য বার্তা

নীনা গুপ্তের জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—কঠিন কোনও বিষয়কে ভয় না পাওয়া।

গণিত কঠিন হতে পারে। গবেষণা দীর্ঘ হতে পারে। সাফল্য পেতে সময় লাগতে পারে। কিন্তু কোনও বিষয়কে ভালোবেসে তার গভীরে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে সেই কঠিন পথও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজকের ছাত্রছাত্রীরা যখন দ্রুত ফল পাওয়ার প্রত্যাশায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, তখন গবেষণার মতো ক্ষেত্র তাদের অন্যরকম একটি শিক্ষা দেয়—কিছু আবিষ্কার দ্রুত হয় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।

নীনা গুপ্তের পথ সেই ধৈর্যের উদাহরণ।

পুরস্কারের থেকেও বড় একটি পরিচয়

একজন বিজ্ঞানীর পরিচয় শুধু তাঁর পাওয়া পুরস্কারের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয় তিনি কোন প্রশ্ন নিয়ে ভেবেছেন, কী নতুন জ্ঞান তৈরি করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী রেখে গেছেন—তার মাধ্যমে।

নীনা গুপ্তের গবেষণা উচ্চতর গণিতের এমন একটি ক্ষেত্রে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি দৃশ্যমানভাবে যুক্ত নয়। তবুও মৌলিক বিজ্ঞানের গুরুত্ব এখানেই—আজকের তাত্ত্বিক গবেষণাই ভবিষ্যতের বহু জ্ঞান ও প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

শেষ কথা

ড. নীনা গুপ্তের গল্প কোনও রূপকথার গল্প নয়। এটি অধ্যবসায়, কৌতূহল এবং জ্ঞানের প্রতি গভীর ভালোবাসার গল্প।

কলকাতার এক তরুণী গণিতের প্রতি আগ্রহ থেকে ধীরে ধীরে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথে এগিয়ে গেলেন। তারপর এমন এক জটিল গাণিতিক সমস্যার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেন, যা বহু বছর ধরে বিশ্বের গণিতবিদদের ভাবিয়েছে। তাঁর গবেষণা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি পেল।

এই কারণেই নীনা গুপ্তের জীবন কেবল একজন গণিতবিদের জীবনী নয়। এটি সেইসব তরুণ-তরুণীর জন্য একটি অনুপ্রেরণার গল্প, যারা কোনও কঠিন বিষয়কে ভালোবেসে তার গভীরে যেতে চায়।

সংখ্যার জগতে তাঁর কাজ হয়তো সবার কাছে সহজে বোঝা সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর পথের মূল কথাটি খুব সহজ—কঠিন প্রশ্নকে এড়িয়ে না গিয়ে, তার উত্তর খুঁজে যাওয়াই গবেষণার আসল শক্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *