
এক সময় বিকেল হলেই গ্রামের বাড়ি কিংবা পাড়ার উঠোনে শিশুদের দল জমে উঠত। কারও হাতে থাকত না মোবাইল ফোন, সামনে থাকত না ভিডিও গেমের পর্দা। খেলার জন্য দরকার হতো শুধু কয়েকজন বন্ধু এবং সামান্য খোলা জায়গা। সেই সহজ-সরল সময়ে নানা অঞ্চলে প্রচলিত ছিল অসংখ্য লোকজ খেলা, যার অনেকগুলোর নাম আজকের প্রজন্মের কাছে প্রায় অপরিচিত।
নুন-লঙ্কা তেমনই এক পুরনো লোকজ খেলাধুলার নাম, যার নিয়ম ও খেলার ধরন অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হতে পারে। কোথাও এটি দৌড় ও দলগত কৌশলের সঙ্গে যুক্ত ছিল, কোথাও আবার শিশুদের তৈরি করা স্থানীয় নিয়মে খেলা হতো। ফলে নুন-লঙ্কার একটি মাত্র সর্বজনীন নিয়ম নির্ধারণ করা কঠিন।
তবে এর মূল আকর্ষণ ছিল—দলবদ্ধভাবে খেলা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এগিয়ে চলা।
খেলার শুরুটা কীভাবে?
পুরনো দিনের অনেক লোকজ খেলার মতো নুন-লঙ্কার ক্ষেত্রেও প্রথমে শিশুদের মধ্যে ভূমিকা ভাগ করে নেওয়া হতো। খেলার জায়গা নির্দিষ্ট করা এবং কোথায় নিরাপদে দাঁড়ানো বা দৌড়ানো যাবে, তা ঠিক করে নেওয়া হতো।
অঞ্চলভেদে খেলোয়াড়দের মধ্যে কেউ একজন নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করত এবং বাকিরা দল হিসেবে তাকে এড়িয়ে বা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করত।
কোথাও দৌড়ের মাধ্যমে, কোথাও নির্দিষ্ট চিহ্ন স্পর্শ করার মাধ্যমে এবং কোথাও দলগত কৌশলের মাধ্যমে খেলা এগোত।
এই ভিন্নতাই প্রমাণ করে, লোকজ খেলাগুলো অনেক সময় বইয়ের পাতায় লেখা নির্দিষ্ট নিয়মে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং একটি প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে মুখে মুখে নিয়ম বদলেছে, নতুন নিয়ম যুক্ত হয়েছে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে।
নামের মধ্যেই লোকজ সংস্কৃতির ছাপ
‘নুন-লঙ্কা’ নামটি শুনলেই বাংলার ঘরোয়া জীবনের একটি পরিচিত ছবি মনে পড়ে। নুন এবং লঙ্কা—দুটিই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত উপাদান।
পুরনো লোকজ সংস্কৃতিতে খেলাধুলার নামের সঙ্গে এমন পরিচিত শব্দ যুক্ত হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। শিশুদের কল্পনার জগতেও রান্নাঘর, মাঠ, নদী, গাছপালা, পশুপাখি কিংবা গ্রামের দৈনন্দিন জীবন নানা ভাবে প্রবেশ করত।
তাই কোনো একটি খেলাকে শুধুমাত্র তার নিয়ম দিয়ে বিচার না করে, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্থানীয় ভাষা, নাম এবং স্মৃতিকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
খেলায় ছিল দলগত কৌশল
নুন-লঙ্কার মতো দলগত লোকজ খেলায় একা ভালো খেললেই সবসময় সাফল্য পাওয়া সম্ভব নয়। দলের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ এবং বোঝাপড়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠত।
একজন সামনে এগিয়ে গেলে অন্যজন তার অবস্থার দিকে নজর রাখত। কেউ বিপদে পড়লে বন্ধুরা তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করত।
এই ধরনের খেলায় শিশুরা নিজের অজান্তেই শিখত—দলের সঙ্গে আলোচনা করা, অন্যের কথা শোনা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের পরিকল্পনা বদলে নেওয়া।
আজকের দিনে শিশুদের দলগত কাজ শেখাতে নানা কার্যক্রম করা হয়। অথচ এক সময় এই শিক্ষার একটি অংশ স্বাভাবিকভাবেই চলে আসত পাড়ার খেলাধুলার মধ্য দিয়ে।
খেলাধুলার মধ্যেই তৈরি হতো সামাজিকতা
পুরনো দিনের পাড়ায় একটি শিশুর বন্ধুত্ব শুধু তার সমবয়সী কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। একই মাঠে বা উঠোনে বিভিন্ন বয়সের শিশুরা খেলত।
বড়রা ছোটদের নিয়ম শেখাত। ছোটরা বড়দের অনুকরণ করত। কেউ নিয়ম নিয়ে তর্ক করলে অন্যরা মিলে সমাধান বের করত।
ফলে খেলার জায়গাটিই হয়ে উঠত শিশুদের ছোট্ট সামাজিক শিক্ষাকেন্দ্র।
নুন-লঙ্কার মতো লোকজ খেলাগুলো এই সামাজিকতার পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করত।
কেন আজ আর দেখা যায় না?
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুদের জীবনযাপনও বদলেছে।
একদিকে শহরের ব্যস্ততা এবং খোলা জায়গার অভাব, অন্যদিকে ডিজিটাল বিনোদনের প্রসার—দুটিই শিশুদের বাইরে খেলাধুলার অভ্যাসে প্রভাব ফেলেছে।
আগে বাড়ির উঠোন বা পাড়ার ফাঁকা জায়গা ছিল সহজলভ্য। এখন অনেক জায়গায় সেখানে গাড়ি দাঁড়ায়, নির্মাণকাজ হয় অথবা মানুষের চলাচল বেড়েছে।
ফলে বহু পুরনো খেলাই ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবন থেকে সরে গেছে।
শুধু স্মৃতি নয়, লোকসংস্কৃতির অংশ
পুরনো খেলা নিয়ে আলোচনা করলে অনেক সময় আমরা শুধু ‘আগে কী মজা ছিল’—এই স্মৃতির মধ্যেই আটকে থাকি। কিন্তু লোকজ খেলাগুলোর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
এসব খেলার সঙ্গে যুক্ত থাকে স্থানীয় ভাষা, ছড়া, ডাক, শরীরী কৌশল, সামাজিক সম্পর্ক এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জীবনযাত্রা।
তাই নুন-লঙ্কার মতো কম পরিচিত খেলাগুলোর স্মৃতি সংরক্ষণ মানে শুধু একটি খেলার নাম সংরক্ষণ করা নয়। এর সঙ্গে সংরক্ষিত হয় একটি সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
শিশুদের নিরাপত্তা: পুরনো খেলা ফিরুক, কিন্তু ঝুঁকি নয়
বর্তমান সময়ে পুরনো কোনো লোকজ খেলা নতুন করে শিশুদের শেখানোর সময় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
খেলার আগে একটি পরিষ্কার ও সমতল জায়গা নির্বাচন করা জরুরি। রাস্তা, পার্কিং এলাকা, পুকুরের পাড়, নদীর ধারে, রেললাইনের কাছে বা নির্মাণাধীন বাড়ির আশেপাশে শিশুদের খেলতে দেওয়া উচিত নয়।
দৌড়ের খেলা হলে আগে থেকেই সীমানা নির্ধারণ করে দিতে হবে। শিশুরা যেন খেলতে খেলতে নির্ধারিত এলাকার বাইরে চলে না যায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
খেলার জায়গা থেকে কাচের টুকরো, ধারালো পাথর, লোহার অংশ বা অন্য বিপজ্জনক বস্তু সরিয়ে ফেলতে হবে।
শিশুদের একে অপরকে ধাক্কা দেওয়া, টেনে ফেলা বা ইচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করার মতো আচরণ একেবারেই অনুমোদন করা উচিত নয়।
খেলার নিয়ম এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে কারও শারীরিক ঝুঁকি তৈরি না হয়। খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে বড়দের উপস্থিতি বিশেষভাবে প্রয়োজন।
গরমের দিনে দীর্ঘ সময় দৌড়ঝাঁপ না করে মাঝেমধ্যে বিশ্রাম নিতে হবে এবং পর্যাপ্ত জল পান করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পুরনো খেলার নিয়মকে হুবহু অনুসরণ করার চেয়ে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে খেলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে পুরনো নিয়ম পরিবর্তন করে আধুনিক নিরাপত্তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
স্কুলেও ফিরতে পারে লোকজ খেলা
স্কুলের খোলা প্রাঙ্গণে শিক্ষকরা চাইলে বিভিন্ন পুরনো লোকজ খেলা পরিচয় করিয়ে দিতে পারেন। এতে শিশুরা নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
একটি ‘লোকজ খেলা দিবস’ আয়োজন করে একাধিক পুরনো খেলার সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করানো যেতে পারে। খেলার আগে শিক্ষক বা অভিভাবকরা নিয়ম ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো বুঝিয়ে দিতে পারেন।
এতে খেলা শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গেও শিশুদের পরিচয় ঘটবে।
ফিরে আসুক পুরনো দিনের সরল আনন্দ
নুন-লঙ্কার মতো অনেক খেলার সঠিক নিয়ম আজ হয়তো সব জায়গায় একইভাবে জানা নেই। কোথাও এর স্মৃতি রয়েছে, কোথাও নামটিই প্রায় হারিয়ে গেছে।
তবুও এই খেলাগুলোর কথা মনে রাখা জরুরি। কারণ এগুলো আমাদের এমন এক সময়ের কথা বলে, যখন শিশুদের আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন ছিল না।
কয়েকজন বন্ধু, একটি উঠোন, কিছু নিয়ম আর অনেকটা হাসি—এই ছিল বিনোদনের উপকরণ।
আজকের প্রজন্মের হাতেও সেই সরল আনন্দের কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, খেলা হবে নিরাপদ জায়গায়, নিয়ম মেনে এবং সবার আনন্দকে গুরুত্ব দিয়ে।
হয়তো পুরনো কোনো উঠোনে আবার একদিন শিশুদের দল জড়ো হবে। শুরু হবে নতুন খেলা। আর সেই খেলার সঙ্গে ফিরে আসবে হারিয়ে যাওয়া সময়ের একটি ছোট্ট স্মৃতি।
লোকজ খেলা হারিয়ে গেলেও তার গল্প যেন হারিয়ে না যায়।












Leave a Reply