
একটা সময় ছিল, যখন সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের উঠোন, বাড়ির বারান্দা কিংবা পাড়ার ফাঁকা জায়গায় শিশু-কিশোরদের আড্ডা জমে উঠত। হাতে মোবাইল ছিল না, টেলিভিশনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার অভ্যাসও ছিল না। দিনের কাজ শেষ করে বড়রা যখন বিশ্রাম নিতেন, তখন ছোটদের জগৎ হয়ে উঠত নিজেদের তৈরি নানা খেলা।
এই খেলাগুলোর অনেকগুলোর জন্য দামি খেলনা বা বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন হতো না। কয়েকজন বন্ধু, একটু খোলা জায়গা এবং প্রচুর কল্পনাশক্তিই ছিল যথেষ্ট।
‘আঁধার-আলো’ নামটি বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন অর্থে বা ভিন্ন নিয়মে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। কোথাও এটি আলো-আঁধারির মধ্যে লুকিয়ে থাকা ও অনুমানের খেলা, আবার কোথাও গল্প বা সংকেত ধরে সঙ্গীকে শনাক্ত করার লোকজ বিনোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাই এটিকে একটি নির্দিষ্ট সর্বজনীন নিয়মের খেলা না ধরে আঞ্চলিক লোকখেলার একটি ধরন হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
কীভাবে খেলা হতো?
অঞ্চলভেদে নিয়মে পার্থক্য থাকলেও খেলাটির মূল আকর্ষণ ছিল আলো ও অন্ধকারের পার্থক্য, শব্দের সংকেত এবং অনুমান।
সন্ধ্যার সময় যখন চারপাশ পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যেত না, তখন কয়েকজন খেলোয়াড় এক জায়গায় জড়ো হতো। একজনকে নির্দিষ্ট ভূমিকা দেওয়া হতো। অন্যরা কিছুটা দূরে সরে যেত বা নিজেদের মধ্যে অবস্থান বদল করত।
কখনও চোখ আংশিকভাবে ঢেকে রাখা হতো, কখনও অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে একজন অন্যদের অবস্থান পরিবর্তন করার চেষ্টা করত। তারপর শব্দ, ডাক বা পরিচিত কোনো সংকেতের সাহায্যে কে কোথায় রয়েছে তা অনুমান করতে হতো।
কোনো কোনো স্থানীয় রূপে খেলাটির সঙ্গে ছোট গল্প, ছড়া কিংবা প্রশ্ন-উত্তরও যুক্ত হতো। ফলে এটি শুধু দৌড়ের খেলা ছিল না; বরং শ্রবণশক্তি, স্মৃতিশক্তি ও অনুমান করার ক্ষমতারও পরীক্ষা ছিল।
খেলাটির সবচেয়ে মজার দিক
আঁধার-আলোর আনন্দ ছিল এর অনিশ্চয়তায়।
অন্ধকারে কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কে শব্দ করল, কোন দিক থেকে ডাক এল—এসব বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে খেলোয়াড়দের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা শুরু হয়ে যেত।
কেউ ইচ্ছে করে অন্য জায়গা থেকে শব্দ করত। কেউ আবার বন্ধুর কণ্ঠস্বর নকল করার চেষ্টা করত। ফলে সঠিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা সহজ ছিল না।
একজন যখন ভুল অনুমান করত, তখন অন্যরা হেসে উঠত। আবার সঠিক অনুমান হলে শুরু হতো অভিনন্দন ও নতুন পর্ব।
শুধু খেলা নয়, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম
পুরনো দিনের অনেক লোকজ খেলার মতো আঁধার-আলোও শিশুদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করতে সাহায্য করত।
একসঙ্গে খেলতে গেলে—
- একে অন্যের কথা শুনতে হতো।
- নিয়ম মেনে চলতে হতো।
- নিজের পালার জন্য অপেক্ষা করতে হতো।
- অন্যের ভুল নিয়ে অতিরিক্ত হাসাহাসি না করে খেলাকে আনন্দের মধ্যে রাখতে হতো।
- দলগতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হতো।
আজকের দিনে শিশুরা অনেক সময় একই ঘরে থেকেও আলাদা আলাদা পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। পুরনো দিনের এই ধরনের খেলায় তার বিপরীত চিত্র দেখা যেত—খেলার আনন্দ তৈরি হতো মানুষের উপস্থিতি থেকেই।
কল্পনাশক্তির ব্যবহার
এই ধরনের লোকজ খেলায় নির্দিষ্ট কোনো দামি সরঞ্জাম না থাকায় শিশুদের নিজেদের মতো করে পরিবেশ তৈরি করতে হতো।
একটি উঠোন হয়ে উঠত খেলার মাঠ। অন্ধকার হয়ে উঠত খেলার অংশ। একটি সাধারণ ডাক হয়ে উঠত সংকেত। আর বন্ধুদের উপস্থিতিই হয়ে উঠত পুরো বিনোদনের কেন্দ্র।
এতে শিশুদের কল্পনাশক্তি বাড়ার সুযোগ থাকত। তারা সাধারণ পরিবেশের মধ্যেই নতুন কিছু তৈরি করতে শিখত।
গ্রামের সন্ধ্যার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক
আঁধার-আলোর মতো খেলা মূলত এমন সময়ের স্মৃতি বহন করে, যখন গ্রামের সন্ধ্যার জীবন ছিল অনেক বেশি সামাজিক।
বাড়ির উঠোনে বসে গল্প, পাড়ার মানুষের সঙ্গে আড্ডা, শিশুদের খেলাধুলা—সব মিলিয়ে সন্ধ্যা ছিল এক ধরনের সামাজিক সময়।
বিদ্যুতের আলো সর্বত্র পৌঁছানোর আগে সন্ধ্যার আলো-আঁধারি নিজেই ছিল দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। সেই পরিবেশকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের খেলা ও বিনোদন তৈরি হওয়াটাও স্বাভাবিক ছিল।
আজ কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
এই ধরনের লোকজ খেলা হারিয়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।
প্রথমত, খোলা জায়গা কমে যাচ্ছে। বাড়ির সামনে বা পাড়ায় আগের মতো বড় উঠোন কিংবা ফাঁকা মাঠ অনেক জায়গায় নেই।
দ্বিতীয়ত, শিশুদের বিনোদনের ধরন বদলে গেছে। স্মার্টফোন, অনলাইন গেম, ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করেছে।
তৃতীয়ত, আগের প্রজন্মের কাছ থেকে পরের প্রজন্মে লোকজ খেলার নিয়ম ও গল্প পৌঁছানোর ধারাটিও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
ফলে একটি খেলার নাম হয়তো কোথাও কোথাও এখনও শোনা যায়, কিন্তু কীভাবে খেলতে হয়—সেটি আর অনেকেই জানেন না।
এই খেলাগুলো সংরক্ষণ করা কেন জরুরি?
লোকজ খেলা শুধুমাত্র বিনোদনের মাধ্যম নয়। এগুলোর মধ্যে একটি সমাজের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক সম্পর্কের অনেক তথ্য লুকিয়ে থাকে।
একটি ছোট্ট খেলা থেকেও জানা যায়—
- মানুষ কীভাবে অবসর কাটাত।
- শিশুরা কীভাবে দলবদ্ধ হতো।
- কোন ধরনের ছড়া বা সংকেত ব্যবহার করত।
- গ্রামের পরিবেশ কীভাবে খেলায় প্রভাব ফেলত।
- প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিনোদনের ধরন কীভাবে বদলেছে।
তাই পুরনো খেলাগুলোকে শুধু ‘সেকেলে’ বলে ভুলে যাওয়ার পরিবর্তে সেগুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা দরকার।
স্কুলেও ফিরতে পারে পুরনো খেলার স্মৃতি
স্কুলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকসংস্কৃতি সপ্তাহ বা ‘পুরনো দিনের খেলা’ বিষয়ক বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে নিরাপদ কিছু লোকজ খেলার পরিচয় নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা যেতে পারে।
শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের বাড়ির দাদা-দিদা, ঠাকুমা-দাদু বা প্রবীণ প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পুরনো খেলার নাম ও নিয়ম সংগ্রহ করতে বলতে পারেন।
এতে শিশুরা শুধু একটি খেলা শিখবে না, বরং নিজেদের এলাকার মৌখিক ইতিহাসও জানতে পারবে।
খেলতে গেলে নিরাপত্তা
আঁধার-আলোর মতো কোনো খেলা পুনরায় আয়োজন করলে সম্পূর্ণ অন্ধকার জায়গা বেছে নেওয়া উচিত নয়।
খেলার স্থান যেন সমতল ও বাধামুক্ত হয়। সিঁড়ি, পুকুর, রাস্তা, নির্মাণাধীন এলাকা বা যানবাহন চলাচলের জায়গার কাছে খেলা উচিত নয়।
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্যই বড়দের নজরদারি থাকা দরকার। চোখ বাঁধার কোনো নিয়ম ব্যবহার করা হলে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং ধাক্কা লাগতে পারে এমন পরিস্থিতি এড়াতে হবে।
হারিয়ে যাওয়া খেলাকে নতুনভাবে দেখা
আঁধার-আলোর মতো লোকজ খেলার আসল মূল্য হয়তো তার প্রতিযোগিতায় নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগে।
আজকের শিশুরা প্রযুক্তির সঙ্গে বড় হচ্ছে—এটি সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু তার পাশাপাশি পুরনো দিনের খেলাগুলোর গল্পও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে আমাদের লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অদৃশ্য হয়ে যাবে।
তাই পুরনো খেলা ফিরিয়ে আনার অর্থ অতীতে ফিরে যাওয়া নয়। বরং নতুন প্রজন্মকে বোঝানো—একসময় খুব সামান্য উপকরণ দিয়েও মানুষ কত আনন্দ তৈরি করতে পারত।
উপসংহার
আঁধার-আলো আজ হয়তো অধিকাংশ শিশুর কাছে অচেনা নাম। কোথাও এর নিয়ম বদলে গেছে, কোথাও হয়তো নামটিও হারিয়ে গেছে। কিন্তু এই ধরনের লোকজ খেলার স্মৃতির মধ্যে রয়েছে আমাদের সামাজিক জীবনের এক অন্য ছবি।
একটি উঠোন, কয়েকজন বন্ধু, সন্ধ্যার আলো-আঁধারি আর কিছু হাসি—এই সামান্য উপকরণেই একসময় তৈরি হতো আনন্দের জগৎ।
পুরনো দিনের সেই খেলাগুলো হয়তো আর আগের মতো ফিরে আসবে না। কিন্তু তাদের নাম, গল্প ও স্মৃতি সংরক্ষণ করা গেলে অন্তত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে—স্ক্রিনের যুগের আগেও শৈশবের আনন্দ ছিল, আর সেই আনন্দ ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের খুব কাছের সম্পর্কের মধ্যে।












Leave a Reply