লীলা শেঠ: ভারতের বিচারব্যবস্থায় ইতিহাস গড়া এক পথিকৃৎ নারী।

ভারতের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে নারীদের পথচলা কখনও সহজ ছিল না। আইন পড়া থেকে শুরু করে আদালতে সওয়াল করা, বিচারকের আসনে বসা কিংবা দেশের বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছনো—প্রতিটি পর্যায়েই নারীদের নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়েছে।

এই দীর্ঘ যাত্রায় লীলা শেঠ একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন এমন একজন আইনজীবী ও বিচারপতি, যিনি শুধু নিজের পেশাগত সাফল্যের জন্য স্মরণীয় নন; ভারতীয় বিচারব্যবস্থায় নারীদের উপস্থিতির ইতিহাসেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন।

তিনি ভারতের প্রথম মহিলা যিনি কোনও রাজ্যের হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তিনি দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবেও কাজ করেছিলেন। আইন ও বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি নারী ও শিশু-সংক্রান্ত বিভিন্ন সামাজিক প্রশ্নেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

শৈশব থেকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি

লীলা শেঠের জন্ম ১৯৩০ সালের ২০ অক্টোবর লখনউয়ে। তাঁর শৈশব এমন সময়ে কেটেছিল যখন ভারতের সামাজিক কাঠামো আজকের তুলনায় অনেক বেশি রক্ষণশীল ছিল।

ছোটবেলায় তিনি বাবাকে হারান। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতিও সহজ ছিল না। জীবনের প্রথম দিকেই তাঁকে বুঝতে হয়েছিল যে ভবিষ্যৎ তৈরি করতে হলে নিজের শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এই বাস্তবতা তাঁকে দুর্বল করেনি। বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছা আরও শক্তিশালী হয়েছিল।

পরবর্তী জীবনে তিনি নিজেই তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী “On Balance”-এ ব্যক্তিগত জীবন, পেশা, পরিবার, সমাজ এবং একজন নারী হিসেবে তাঁর পথচলার নানা দিক উঠে এসেছে।

বিয়ের পর নতুন অধ্যায়

অল্প বয়সে বিয়ে হয় লীলা শেঠের। তাঁর স্বামী প্রেম সেঠ ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা।

বিয়ের পর অনেকের কাছে মনে হতে পারত, এবার হয়তো তাঁর পেশাগত জীবনের আকাঙ্ক্ষা থেমে যাবে। কিন্তু লীলা অন্য পথ বেছে নেন।

তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং আইন পেশায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন।

এই সিদ্ধান্ত সেই সময়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ তখনও ভারতে নারী আইনজীবীর সংখ্যা খুব কম ছিল।

লন্ডনে আইন পড়া

লীলা শেঠ তাঁর পরিবারের সঙ্গে লন্ডনে থাকার সময় আইন পড়ার সুযোগ পান। তিনি Lincoln’s Inn-এ আইন অধ্যয়ন করেন এবং বার পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করেন।

১৯৫৮ সালে তিনি ইংল্যান্ডে Bar-এ ডাক পান।

এরপর ভারতে ফিরে এসে দিল্লিতে আইন পেশা শুরু করেন।

একজন নারী হিসেবে আদালতে পেশাগত জীবন শুরু করার সময় তাঁকে নানা ধরনের সংশয় ও সামাজিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতার মাধ্যমে জায়গা তৈরি করেন।

দিল্লির আদালত থেকে বিচারকের আসনে

আইনজীবী হিসেবে লীলা শেঠের কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। তিনি বিভিন্ন ধরনের মামলা পরিচালনা করেন এবং বিশেষ করে সংবিধান, বাণিজ্যিক আইন, কর আইন ও দেওয়ানি বিষয়ে কাজ করেন।

দীর্ঘদিন আইন পেশায় কাজ করার পর ১৯৭৮ সালে তিনি দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।

এটি ছিল তাঁর পেশাগত জীবনের বড় পরিবর্তন।

যে আদালতে তিনি একসময় আইনজীবী হিসেবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতেন, সেখানেই এবার তাঁকে বিচারকের আসনে বসে সেই যুক্তিগুলির বিচার করতে হচ্ছিল।

হাইকোর্টের প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি

১৯৯১ সালে লীলা শেঠ হিমাচল প্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হন।

এটি ছিল ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

তিনি ভারতের কোনও রাজ্যের হাইকোর্টের প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন।

আজকের দিনে নারী বিচারপতি বা নারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক মনে হলেও সেই সময়ে এই অবস্থানে একজন নারীর পৌঁছনো ছিল বিরল ঘটনা।

লীলা শেঠের এই পদে অধিষ্ঠিত হওয়া পরবর্তী প্রজন্মের মহিলা আইনজীবী ও বিচারপতিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

বিচারব্যবস্থার বাইরেও কাজ

লীলা শেঠের অবদান শুধু আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

তিনি বিভিন্ন আইন সংস্কার ও সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছিলেন। নারী ও শিশুদের অধিকার, পারিবারিক আইন এবং বিচারব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারের মতো বিষয় তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

তিনি ভারতের আইন কমিশনের সদস্য হিসেবেও কাজ করেন।

এই সময়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন সংস্কার সংক্রান্ত আলোচনায় তিনি যুক্ত ছিলেন।

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে পরিবর্তন

ভারতে নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও আইনি বৈষম্য ছিল।

হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে নারীর অধিকার আরও শক্তিশালী করার জন্য যে সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়, তার সঙ্গেও লীলা শেঠের কাজের সম্পর্ক ছিল।

আইন কমিশনের সদস্য হিসেবে তিনি নারীর সম্পত্তির অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেন।

পরবর্তীতে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সংশোধনের মাধ্যমে কন্যাদের সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।

এই ধরনের আইনি পরিবর্তন দেখায় যে বিচারব্যবস্থা ও আইন সংস্কারের কাজ শুধু আদালতের রায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সমাজের কাঠামো পরিবর্তনেও তার গভীর প্রভাব থাকতে পারে।

২০১২ সালের দিল্লি গণধর্ষণ এবং বিচারব্যবস্থা

২০১২ সালের দিল্লির বহুল আলোচিত গণধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর নারী-নিরাপত্তা এবং যৌন সহিংসতা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা শুরু হয়।

সরকার সেই ঘটনার পর বিচারপতি জে. এস. ভার্মার নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। লীলা শেঠ এবং প্রাক্তন সলিসিটর জেনারেল গোপাল সুব্রহ্মণ্যম সেই কমিটির সদস্য ছিলেন।

কমিটি দ্রুত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

নারীর বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের ক্ষেত্রে আইন, পুলিশি ব্যবস্থা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং বিচারব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে সেই প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়।

এই কাজ লীলা শেঠের সামাজিক ও আইনি চিন্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি দৃষ্টিভঙ্গি

লীলা শেঠ বিশ্বাস করতেন, কেবল আইন তৈরি করলেই নারী-নিরাপত্তার সমস্যা সম্পূর্ণ সমাধান হয় না।

আইনের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রশাসনিক জবাবদিহি, পুলিশের কার্যকর ভূমিকা, দ্রুত বিচার এবং সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে শুধু একজন বিচারপতি নয়, একজন আইন-সংস্কারক হিসেবেও আলাদা করে তুলেছিল।

ব্যক্তিগত জীবন ও পেশার ভারসাম্য

লীলা শেঠের জীবন নিয়ে আলোচনা করলে তাঁর পারিবারিক ভূমিকাটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি ছিলেন তিন সন্তানের মা। তাঁর ছেলে বিক্রম শেঠ পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত লেখক হন।

একজন মা, স্ত্রী এবং একই সঙ্গে সফল আইনজীবী ও বিচারপতি হিসেবে তাঁর জীবন দেখায় যে পেশাগত পরিচয় ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে তাঁর পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি জীবনের নানা দ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্ত এবং অভিজ্ঞতা খোলাখুলি তুলে ধরেছেন।

“On Balance”

২০১০ সালে তাঁর আত্মজীবনী “On Balance” প্রকাশিত হয়।

এই বই শুধু তাঁর পেশাগত জীবনের ইতিহাস নয়। সেখানে উঠে এসেছে একজন নারী হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠা, বিয়ে, মাতৃত্ব, আইনজীবী হিসেবে কাজ, বিচারপতির দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামের কথা।

তাঁর জীবনকে বোঝার জন্য আত্মজীবনীটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এতে একজন নারী নিজের অভিজ্ঞতাকে নিজের ভাষায় তুলে ধরেছেন।

নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর গুরুত্ব

আজ ভারতের আদালতে মহিলা আইনজীবী ও বিচারপতিদের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এই পরিবর্তন একদিনে আসেনি।

লীলা শেঠের মতো পথিকৃৎ নারীরা সেই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরির প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন।

তিনি দেখিয়েছিলেন যে আইন পেশা শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য নয় এবং বিচারকের আসনেও একজন নারী সমান দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

তাঁর সাফল্য বিশেষ করে সেই সময়ের তরুণীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যখন পেশাগত জীবনে নারীদের উপস্থিতি এখনও অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নের মুখে পড়ত।

শেষ জীবন

লীলা শেঠ ২০১৭ সালের ৫ মে বেঙ্গালুরুতে মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।

কিন্তু তাঁর কাজের প্রভাব তাঁর জীবদ্দশার মধ্যেই শেষ হয়ে যায়নি।

ভারতের বিচারব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাসে তাঁর নাম আজও গুরুত্বপূর্ণ। হাইকোর্টের প্রথম মহিলা প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাঁর ঐতিহাসিক অবস্থান তাঁকে ভারতীয় আইন ও বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে স্থায়ী স্থান দিয়েছে।

উপসংহার

লীলা শেঠের জীবন কোনও সহজ সাফল্যের গল্প নয়। এটি ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি দীর্ঘ যাত্রার গল্প—শিক্ষা, আত্মনির্ভরতা, পেশাগত দক্ষতা, বিচারবোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে তৈরি সেই যাত্রা।

তিনি আইনজীবী হয়েছেন, বিচারপতি হয়েছেন, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির আসনে বসেছেন এবং আইন সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ কাজেও যুক্ত থেকেছেন।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কোনও একটি পদবি নয়।

একসময় যে পেশায় নারীর উপস্থিতি ছিল বিরল, সেখানে তিনি নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরি করেছিলেন। তাঁর পর আরও বহু নারী আইনকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন, আদালতের কঠিন লড়াইয়ে অংশ নিয়েছেন এবং বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব নিয়েছেন।

লীলা শেঠের জীবন তাই একটি দরজা খোলার গল্প।

একজন নারী যখন সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পিছিয়ে না গিয়ে এগিয়ে যান, তখন তাঁর নিজের পথ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথটিও কিছুটা সহজ হয়ে যায়।

ভারতের বিচারব্যবস্থায় লীলা শেঠ সেই পথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা—একজন আইনজীবী, বিচারপতি এবং পথিকৃৎ নারী, যাঁর জীবন আজও দৃঢ়তা ও পেশাগত নিষ্ঠার এক স্মরণীয় অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *