
চন্দনপুর গ্রামের মাঝখানে একটা পুরোনো ঘড়িঘর ছিল।
ছোট্ট ইটের ঘর। তার মাথায় চারদিকে মুখ করা বিশাল চারটে ঘড়ি।
একসময় গ্রামের মানুষ ওই ঘড়ি দেখেই সময় বুঝত।
কৃষকরা মাঠে যেত।
দোকান খুলত।
স্কুলের ঘণ্টা বাজত।
বিকেলে ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফিরত।
কিন্তু বহু বছর ধরে ঘড়িটা বন্ধ।
চারটে কাঁটাই থেমে ছিল বিকেল পাঁচটা বেজে দশ মিনিটে।
গ্রামের লোকজন সেটাকে আর গুরুত্ব দিত না।
শুধু একজন মানুষ প্রতিদিন ঘড়িঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেন।
তাঁর নাম জগদীশ।
বয়স সত্তরের কাছাকাছি।
পেশায় তিনি ঘড়ি মেরামত করতেন।
একসময় তাঁর দোকান ছিল বাজারে।
এখন দোকান নেই।
তবু তাঁর হাতে এখনও একটা ছোট স্ক্রু-ড্রাইভার আর পুরোনো কাপড় থাকত।
একদিন স্কুলের ছাত্র নীলয় তাঁকে জিজ্ঞেস করল,
—জগদীশ কাকু, আপনি প্রতিদিন ওই বন্ধ ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকেন কেন?
জগদীশ বললেন,
—ওটা বন্ধ নয়।
নীলয় অবাক।
—কাঁটা তো নড়ে না!
—কাঁটা নড়ে না মানেই ঘড়ি বন্ধ হয়ে যায় না।
—তাহলে?
জগদীশ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—ওর ভেতরে এখনও সময় আছে।
নীলয় কিছুই বুঝল না।
পরদিন নীলয় আবার এল।
—কাকু, ঘড়িটা ঠিক করে দেবেন?
জগদীশ একটু চুপ করে বললেন,
—চাইলে পারি।
—তাহলে করছেন না কেন?
জগদীশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—একটা সময় সবাই বলেছিল, ঠিক করে কী হবে? এখন কেউ সময় দেখেই না।
নীলয় বলল,
—আমি দেখব।
জগদীশ হেসে ফেললেন।
—একজনের জন্য ঘড়ি চলে?
নীলয় বলল,
—একজন দিয়েই তো অনেক কিছু শুরু হয়।
কথাটা জগদীশের মনে লাগল।
পরদিন সকালে তিনি ঘড়িঘরের দরজা খুললেন।
ভেতরে ধুলো, মাকড়সার জাল আর মরচে পড়া লোহার যন্ত্র।
একটা বড় দাঁতওয়ালা চাকা আটকে আছে।
আরেকটা ভেঙে গেছে।
পুরোনো দড়ি ছিঁড়ে পড়ে আছে।
নীলয় বলল,
—এটা কি ঠিক করা সম্ভব?
জগদীশ বললেন,
—সবকিছু ঠিক করা সম্ভব নয়।
নীলয় মুখ ভার করল।
জগদীশ হাসলেন।
—কিন্তু চেষ্টা করা সম্ভব।
দুজন মিলে কাজ শুরু করল।
জগদীশ পুরোনো যন্ত্র খুলতেন।
নীলয় ধুলো পরিষ্কার করত।
কোনও অংশ ভাঙা থাকলে জগদীশ পুরোনো বাক্স থেকে যন্ত্রাংশ খুঁজে আনতেন।
একদিন নীলয় বলল,
—আপনার কাছে এত পুরোনো জিনিস আছে কেন?
জগদীশ বললেন,
—কারণ পুরোনো জিনিস ফেলে দেওয়ার আগে তার গল্পটা শুনতে হয়।
কয়েকদিন পর গ্রামের আরও কয়েকজন ছেলে কাজ দেখতে এল।
তাদের মধ্যে ছিল মিঠুন, সোহেল, পায়েল।
তারা জগদীশকে ঘিরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে লাগল।
—এই চাকা কী করে ঘোরে?
—কাঁটা কেন নড়ে?
—ঘড়ি কীভাবে শব্দ করে?
জগদীশ একে একে সব বোঝাতে লাগলেন।
তারপর বললেন,
—ঘড়ি শুধু যন্ত্র নয়। এটা শৃঙ্খলা শেখায়।
পায়েল বলল,
—কীভাবে?
—সময় কাউকে অপেক্ষা করে না। তাই মানুষকে নিজের কাজের সময় নিজেকেই ঠিক করতে হয়।
ছেলেমেয়েরা মন দিয়ে শুনল।
কাজ এগোচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎ একটা বড় সমস্যা দেখা দিল।
ঘড়ির মূল স্প্রিং ভেঙে গেছে।
নতুন স্প্রিং বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।
জগদীশ অনেক দোকানে খোঁজ করলেন।
কোথাও নেই।
তিনি বললেন,
—এবার বোধহয় আর হবে না।
নীলয় বলল,
—আপনি তো বলেছিলেন চেষ্টা করা সম্ভব।
জগদীশ তাকিয়ে রইলেন।
—হ্যাঁ।
—তাহলে চেষ্টা শেষ করলেন কেন?
জগদীশ মৃদু হেসে বললেন,
—ঠিক আছে। আবার শুরু করি।
সেই রাতে জগদীশ নিজের পুরোনো দোকানের বাক্স খুললেন।
বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা যন্ত্রাংশের মধ্যে তিনি একটা পুরোনো স্প্রিং পেলেন।
কিন্তু সেটার আকার ছোট।
নীলয় বলল,
—এটা হবে?
জগদীশ বললেন,
—পুরোপুরি নয়।
—তাহলে?
—কিছুটা বদলাতে হবে।
তিন রাত ধরে তিনি স্প্রিংটা ঘষে, কেটে, বাঁকিয়ে নতুন আকার দিলেন।
চতুর্থ দিন সেটা ঘড়িতে বসানো হল।
সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল।
জগদীশ ধীরে ধীরে যন্ত্রটা ছেড়ে দিলেন।
একটা শব্দ হল—
টিক…
তারপর—
টিক… টিক…
নীলয়ের চোখ বড় হয়ে গেল।
—চলছে!
জগদীশ কিছু বললেন না।
তিনি শুধু ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কাঁটা একটু নড়ল।
তারপর আবার।
ঘড়ি চলছে।
কিন্তু চারটে ঘড়ির কাঁটা এখনও পাঁচটা দশ মিনিটেই ছিল।
নীলয় বলল,
—এখন তো সময় ঠিক করতে হবে।
জগদীশ বললেন,
—হ্যাঁ।
তিনি কাঁটা ঘুরিয়ে বর্তমান সময়ে নিয়ে এলেন।
চারদিকে তখন গ্রামের মানুষ জড়ো হয়েছে।
কেউ বলছে,
—আবার ঘড়ি চলছে!
কেউ বলছে,
—বিশ্বাসই হচ্ছে না!
একজন বৃদ্ধ বললেন,
—আমার বাবা এই ঘড়ি চালু হওয়ার দিন আমাকে এখানে এনেছিলেন।
আরেকজন বললেন,
—আমাদের বিয়ের দিনও এই ঘড়ির ঘণ্টা শুনেছিলাম।
জগদীশ চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন।
তিনি বুঝতে পারলেন—
ঘড়িটা শুধু সময় দেখাত না।
মানুষের জীবনের কত স্মৃতি ধরে রেখেছিল।
সেদিন সন্ধ্যায় ঘড়ির ঘণ্টা বাজল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
তারপর পুরো গ্রাম যেন থেমে শুনল।
বহু বছর পর সেই শব্দ ফিরেছে।
নীলয় জগদীশকে বলল,
—কাকু, আপনি খুশি?
জগদীশ বললেন,
—খুব।
—কেন?
—কারণ আজ শুধু একটা ঘড়ি ঠিক হয়নি।
—তাহলে?
—একটা গ্রামের পুরোনো স্মৃতির দরজা আবার খুলেছে।
এরপর স্কুলে নতুন একটা ক্লাব তৈরি হল।
নাম—
‘সময়ের পাঠশালা।’
জগদীশ সপ্তাহে দুদিন সেখানে শিশুদের পুরোনো ঘড়ি, যন্ত্র আর হাতের কাজ শেখাতে লাগলেন।
তিনি বলতেন,
—যে জিনিস নিজে হাতে খুলে দেখে না, সে অনেক কিছু শুধু বইয়ে পড়ে জানে।
নীলয় ধীরে ধীরে ঘড়ি মেরামত শেখা শুরু করল।
একদিন সে একটা ছোট হাতঘড়ি খুলে ফেলল।
পায়েল বলল,
—এবার তো আর জোড়া লাগাতে পারবি না!
নীলয় বলল,
—জগদীশ কাকু একটা কথা বলেছেন।
—কী?
—ভুল করা মানে কাজ শেষ নয়। ভুল থেকে শেখা বন্ধ করাই আসল হার।
কয়েক বছর পর নীলয় বড় হয়ে শহরে ঘড়ি ও পুরোনো যন্ত্র মেরামতের কাজ শুরু করল।
কিন্তু চন্দনপুরের ঘড়িঘর সে ভুলল না।
প্রতি বছর গ্রামের পুজোর সময় সে ফিরে আসত।
একবার ফিরে এসে দেখল, জগদীশ ঘড়িঘরের সামনে বসে আছেন।
বয়স আরও বেড়েছে।
নীলয় তাঁর পাশে বসে বলল,
—কাকু, ঘড়িটা এখনও চলছে।
জগদীশ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—আমি জানতাম।
—কীভাবে?
—কারণ সময়কে একবার আবার হাঁটতে শেখালে সে সহজে থামে না।
নীলয় হেসে বলল,
—আপনি জানেন, এই ঘড়িটা আমার জীবনও বদলে দিয়েছে?
জগদীশ বললেন,
—জানি।
—কীভাবে?
—কারণ তুই ঘড়ির কাঁটা ঠিক করতে গিয়ে নিজের পথটা খুঁজে পেয়েছিস।
সন্ধ্যা নামছিল।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যাচ্ছিল।
একসময় ঘণ্টা বাজল।
নীলয় মাথা তুলে ঘড়িটার দিকে তাকাল।
তার মনে হল, ঘড়ির কাঁটা শুধু সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না—
মানুষের জীবনও তেমনই এগিয়ে যাচ্ছে।
কেউ অপেক্ষা করুক বা না করুক,
কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক,
সময় নিজের পথ তৈরি করে নেয়।
আর কখনও কখনও,
একটা থেমে যাওয়া ঘড়িকে আবার চালু করতে গিয়ে
একজন মানুষ নিজের ভেতরেও নতুন সময়ের শুরু করে দেয়।












Leave a Reply