মিষ্টির দোকানের শেষ আলো।

বিষ্ণুপুরের কাছাকাছি ছোট্ট একটা গ্রাম—মাধবপুর।

গ্রামের বাজারের একেবারে কোণায় ছিল ছোট্ট একটি মিষ্টির দোকান। দোকানের নাম ‘মধুরিমা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’।

দোকানের মালিক ছিলেন রঘুনাথ ময়রা।

বয়স সত্তরের কাছাকাছি।

চল্লিশ বছর ধরে তিনি সন্দেশ, ছানার জিলিপি, রসগোল্লা আর ক্ষীরকদম বানিয়ে আসছেন।

একসময় তাঁর দোকানের সামনে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড় লেগে থাকত।

কিন্তু এখন বাজার বদলে গেছে।

বড় বড় মিষ্টির দোকান হয়েছে। চকচকে প্যাকেট, সুন্দর আলো, অনলাইন অর্ডার—সবই এসেছে।

রঘুনাথের দোকানটা আগের মতোই রয়ে গেছে।

কাঠের তাক।

পুরোনো কাচের বাক্স।

একটা মাটির উনুন।

আর সন্ধ্যা হলে মাথার ওপরে জ্বলে ওঠা একটা ছোট হলুদ বাতি।

লোকজন বলতে শুরু করেছিল,

—রঘুনাথ কাকার দোকান আর বেশিদিন চলবে না।

রঘুনাথ এসব শুনেও চুপ থাকতেন।

শুধু প্রতিদিন ভোরে দোকান খুলতেন।


রঘুনাথের দোকানে কাজ করত পনেরো বছরের ছেলে বাবাই।

বাবাইয়ের বাবা অসুস্থ। সংসারে অভাব।

তাই স্কুলের পর সে রঘুনাথের দোকানে এসে কাজ করত।

একদিন বাবাই জিজ্ঞেস করল,

—কাকা, এত ভোরে দোকান খোলেন কেন?

রঘুনাথ বললেন,

—মিষ্টি বানানোরও একটা সময় আছে।

—কখন?

—যখন শহর ঘুমিয়ে থাকে, তখন গ্রামের মিষ্টির গন্ধ জেগে ওঠে।

বাবাই হেসে বলল,

—আপনার কথা শুনলে মনে হয় মিষ্টিও মানুষ।

রঘুনাথ বললেন,

—মানুষের হাতে তৈরি জিনিসে মানুষের মন লেগে থাকে। তাই ওরও একটা প্রাণ থাকে।

বাবাই কথাটা মনে রাখল।


একদিন সকালে রঘুনাথ একটা নতুন মিষ্টি বানালেন।

ছোট গোল মিষ্টি। বাইরে খোয়া, ভিতরে নারকেল আর গুড়ের পুর।

বাবাই খেয়ে বলল,

—কাকার নাম কী?

রঘুনাথ হেসে বললেন,

—নাম এখনও ঠিক করিনি।

বাবাই বলল,

—‘গ্রামের গন্ধ’ রাখুন।

রঘুনাথ থমকে গেলেন।

—কেন?

—খেলে মনে হয় শীতের সকালে ঠাকুমার রান্নাঘরে বসে আছি।

রঘুনাথ মৃদু হেসে বললেন,

—তাহলে নাম থাক ‘গ্রামের গন্ধ’।

পরদিন থেকে দোকানে নতুন মিষ্টি উঠল।

প্রথম দিন মাত্র আটটা বিক্রি হল।

দ্বিতীয় দিন বারোটা।

তৃতীয় দিন সব শেষ।


কিন্তু রঘুনাথের দোকানের সমস্যা অন্য জায়গায় ছিল।

দোকানের ছাদ ভেঙে যাচ্ছিল।

বৃষ্টির সময় জল পড়ত।

ফ্রিজ পুরোনো হয়ে গিয়েছিল।

অনেক সময় মিষ্টি রাখার সমস্যা হত।

রঘুনাথ হিসাব করে দেখলেন, নতুন যন্ত্রপাতি কেনার মতো টাকা তাঁর নেই।

তিনি ঠিক করলেন দোকানটা বন্ধ করে দেবেন।

সেদিন রাতে বাবাই দোকান বন্ধ করার সময় শুনে ফেলল।

—কাকা, দোকান বন্ধ করবেন?

রঘুনাথ চমকে উঠলেন।

—কে বলল?

—আপনি নিজেই বললেন।

রঘুনাথ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

—আর পারছি না রে।

বাবাই কিছু বলল না।

পরদিন স্কুলে গিয়ে সে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলল।

তারপর একটা পরিকল্পনা করল।


শুক্রবার বিকেলে গ্রামের স্কুলের মাঠে ছোট একটা মেলা বসত।

বাবাই সেখানে একটা স্টল নিল।

স্টলের নাম—

‘রঘুনাথ কাকার মিষ্টির গল্প।’

সে রঘুনাথের দোকানের পুরোনো ছবি সংগ্রহ করেছিল।

একটা ছবিতে রঘুনাথের বাবা মিষ্টি বানাচ্ছেন।

আরেকটায় তরুণ রঘুনাথ।

আরেকটায় গ্রামের দুর্গাপুজোর সময় দোকানের সামনে ভিড়।

মানুষ ছবিগুলো দেখতে এসে থমকে দাঁড়াল।

বৃদ্ধ নিতাই কাকু একটা ছবি দেখে বললেন,

—আরে! এটা তো সেই সময়ের ছবি, যখন আমি বিয়ে করিনি!

সবাই হেসে উঠল।

আরেকজন বললেন,

—এই দোকানের রসগোল্লা না হলে আমার মেয়ের বিয়ে সম্পূর্ণ হত না।

একজন বৃদ্ধা বললেন,

—আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর রঘুনাথই আমার বাড়িতে মিষ্টি পাঠিয়েছিল।

বাবাই বুঝল—

দোকানটা শুধু একটা ব্যবসা নয়।

এটা গ্রামের মানুষের স্মৃতির অংশ।


মেলার শেষে বাবাই একটা বাক্স সামনে রাখল।

তার ওপরে লেখা—

‘রঘুনাথ কাকার দোকানটাকে বাঁচাতে আপনার সাহায্য দরকার।’

কেউ দশ টাকা দিল।

কেউ পঞ্চাশ।

কেউ একশো।

একজন বললেন,

—আমি দোকানের ছাদটা মেরামত করে দেব।

আরেকজন বললেন,

—আমার পুরোনো ফ্রিজটা পড়ে আছে। নিয়ে যান।

কেউ বললেন,

—আমি দোকানের নতুন সাইনবোর্ড বানিয়ে দেব।

রঘুনাথ দূর থেকে সব দেখছিলেন।

তিনি বাবাইকে কাছে ডেকে বললেন,

—তুই এসব করলি?

বাবাই মাথা নিচু করে বলল,

—আপনি দোকানটা বন্ধ করে দিলে আমি কোথায় কাজ শিখব?

রঘুনাথের চোখ ভিজে গেল।

তিনি বললেন,

—শুধু কাজ শিখতে চাইছিস?

বাবাই বলল,

—না। আপনার মতো মিষ্টি বানাতে চাই।

রঘুনাথ হেসে বললেন,

—তাহলে দোকান বন্ধ করা যাবে না।


পরের কয়েক মাসে দোকানের চেহারা বদলে গেল।

ছাদ মেরামত হল।

নতুন ফ্রিজ এল।

দোকানে পরিষ্কার কাচের তাক বসানো হল।

কিন্তু রঘুনাথ একটা জিনিস বদলাতে দিলেন না।

সন্ধ্যার সেই ছোট হলুদ বাতিটা।

বাবাই বলল,

—এটা বদলে নতুন আলো লাগালে দোকানটা আরও সুন্দর হবে।

রঘুনাথ বললেন,

—না।

—কেন?

—এই আলোটা আমার বাবার সময় থেকে আছে।

বাবাই বলল,

—কিন্তু আলোটা তো খুব কম।

রঘুনাথ হেসে বললেন,

—আলো কম হলেও স্মৃতি অনেক।


একদিন শহর থেকে এক ব্যবসায়ী এলেন।

তিনি ‘গ্রামের গন্ধ’ মিষ্টি খেয়ে বললেন,

—এটা প্যাকেট করে শহরে বিক্রি করতে পারেন।

রঘুনাথ একটু চিন্তা করে বললেন,

—পারব।

ব্যবসায়ী বললেন,

—তাহলে বড় অর্ডার দেব।

বাবাই আনন্দে লাফিয়ে উঠল।

কিন্তু রঘুনাথ বললেন,

—একটা শর্ত আছে।

—কী?

—মিষ্টির নাম বদলানো যাবে না।

ব্যবসায়ী হেসে বললেন,

—ঠিক আছে।

রঘুনাথ বললেন,

—আর মিষ্টিটা হাতে তৈরি থাকবে।

ব্যবসায়ী কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,

—ঠিক আছে।

সেইভাবেই ‘গ্রামের গন্ধ’ মিষ্টি প্রথমবার গ্রামের বাইরে গেল।


কয়েক বছর পর বাবাই বড় হয়ে গেল।

সে মিষ্টি বানানো শিখল।

শুধু রঘুনাথের কাছ থেকে নয়—গ্রামের আরও কয়েকজন পুরোনো ময়রার কাছ থেকেও।

রঘুনাথ তাকে বলতেন,

—রেসিপি মুখস্থ করলেই ময়রা হওয়া যায় না।

—তাহলে?

—মানুষের মুখ দেখে বুঝতে হয়, সে কী খেতে চায়।

বাবাই হেসে বলত,

—এটা আবার কীভাবে শেখা যায়?

—মানুষকে ভালোবাসলে।


এক শীতের সন্ধ্যায় রঘুনাথ দোকানের সামনে বসেছিলেন।

বয়সের ভারে তাঁর হাত কাঁপছিল।

বাবাই দোকান সামলাচ্ছিল।

একটা ছোট মেয়ে এসে বলল,

—কাকু, ‘গ্রামের গন্ধ’ আছে?

বাবাই বলল,

—আছে।

মেয়েটা একটা কিনে মাকে দিল।

তারপর বলল,

—মা, এটা খেলে ঠাকুমার কথা মনে পড়ে।

রঘুনাথ কথাটা শুনে চুপ করে রইলেন।

কিছুক্ষণ পরে বাবাইকে ডাকলেন।

—শোন।

—কী?

—আজ বুঝলাম, মিষ্টির আসল কাজ কী।

—কী?

রঘুনাথ ধীরে ধীরে বললেন,

—মানুষকে তার প্রিয় মানুষদের কথা মনে করিয়ে দেওয়া।

বাবাই তাঁর হাত ধরল।

সন্ধ্যার বাতিটা তখন জ্বলছিল।

আলোটা খুব উজ্জ্বল ছিল না।

কিন্তু তার নিচে রঘুনাথের মুখে যে তৃপ্তির হাসি ছিল, তা যেন পুরো দোকানটাকেই আলোকিত করে তুলেছিল।

দোকানের কাঠের দরজার ওপরে নতুন সাইনবোর্ড ঝুলছিল—

‘মধুরিমা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার
রঘুনাথ ও বাবাই’

নিচে ছোট অক্ষরে লেখা—

‘মিষ্টি শুধু স্বাদের নয়, স্মৃতিরও।’

সেদিন রাতে দোকান বন্ধ করার আগে বাবাই সেই পুরোনো বাতিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—কাকা, এবার বুঝলাম কেন আলোটা বদলাতে দেননি।

রঘুনাথ হেসে বললেন,

—কী বুঝলি?

বাবাই বলল,

—কিছু আলো পথ দেখায়। আর কিছু আলো মানুষকে তার শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।

রঘুনাথ কিছু বললেন না।

শুধু দোকানের শাটার নামিয়ে দিলেন।

বাইরে তখন অন্ধকার।

কিন্তু দোকানের ভেতরে সেই ছোট্ট হলুদ আলোটা এখনও জ্বলছিল।

সমাপ্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *